Cultural programme Review

গানে-বাদ্যে সাজানো নৈবেদ্য

উৎসবের দ্বিতীয় দিনের সূচনা হয় পণ্ডিত শান্তনু ভট্টাচার্যের কণ্ঠসঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে। শুরু করলেন রাগ ইমন কল্যাণ দিয়ে।

গৌরব দত্ত
শেষ আপডেট: ২৭ জুন ২০২৬ ০৬:৪০
পণ্ডিত বসন্ত কাবরা।

পণ্ডিত বসন্ত কাবরা।

সম্প্রতি জি ডি বিড়লা সভাঘরে অন্নপূর্ণা দেবী ফাউন্ডেশনের পরিচালনায় ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী ও সঙ্গীতগুরু অন্নপূর্ণা দেবীর জন্মশতবর্ষ উদ‌্‌যাপনের সূচনা হল। তিন দিন ব্যাপী এই উৎসবে বিভিন্ন ঘরানার শিল্পীরা অন্নপূর্ণা দেবীর সঙ্গীত-পরম্পরার গভীরতা, শৃঙ্খলা ও আধ্যাত্মিকতাকে তুলে ধরেন।

উৎসবের দ্বিতীয় দিনের সূচনা হয় পণ্ডিত শান্তনু ভট্টাচার্যের কণ্ঠসঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে। শুরু করলেন রাগ ইমন কল্যাণ দিয়ে। তাঁর প্রথম খেয়াল ‘সাজন গরওয়া নি হ্যায়’ বিলম্বিত ঝুমরার বিস্তীর্ণ পরিসরে মগ্নতার আবহ তৈরি করে। মাঝে অবশ্য কল্যাণের স্বরবিন্যাস অক্ষুণ্ণ রেখে তিনি ষড়জ পরিবর্তন করে রাগসঙ্গীতে ষড়জের অনড় অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেন। এতে শিল্পীর স্বরবোধের এক অননুকরণীয় সূক্ষ্মতা প্রমাণিত হলেও রাগদারীর কোনও অতিরিক্ত শ্রীবৃদ্ধি হয় না। এর পরে তিনি মধ্যলয় তিনতালের বন্দিশ ‘পরমব্রহ্ম কো পূজন করিয়ে’ পরিবেশন করেন। তার পরে তিনি উস্তাদ তানরাস খাঁ-র বিখ্যাত বন্দিশ ‘কিনারে কিনারে’ এবং কিরানা ঘরানার জনপ্রিয় তরানা ‘ওদের লেতে দেরে তানা’ গেয়ে শোনান। তারানা গাওয়ার সময়ে মুখড়া নিয়ে লয়কারী করতে শিল্পীকে একটু বেগ পেতে হয় বটে, তবে অভিজ্ঞতার জোরে পরিস্থিতি সামলেও নেন। শান্তনু ভট্টাচার্যের পরবর্তী পরিবেশনা ছিল নিজের সৃষ্ট রাগ ‘অঞ্জলি’। রাগ বাচস্পতির গান্ধারকে কোমল করলে, অথবা রাগ সরস্বতীতে কোমল গান্ধার ব্যবহার করলে হয়তো এই রাগের চলনের সঙ্গে কিছু সাদৃশ্য পাওয়া যেতে পারে। গাইলেন বিলম্বিত একতালে ‘হে মহেশ্বরী’ এবং দ্রুত আদ্ধা তালে ‘পূজা করুঁ সরস্বতী কি’। তবলায় আর্চিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গত ছিল অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও সংযত। শিল্পীকে হারমোনিয়ামে যথাযত সঙ্গত করলেন রূপশ্রী ভট্টাচার্য এবং অপরিচিত রাগেও সাবলীল সঙ্গতে নিজের জাত চিনিয়ে দিলেন।

পণ্ডিত রাজেন্দ্র প্রসন্ন

পণ্ডিত রাজেন্দ্র প্রসন্ন

এর পরে সরোদ পরিবেশনে পণ্ডিত বসন্ত কাবরার হাতে অন্নপূর্ণা দেবীর শিক্ষাপদ্ধতি এবং বিশুদ্ধ মাইহার ঘরানার ঐতিহ্যশালী বাদনশৈলী প্রকাশ পায়। বাজালেন রাগ দরবারি কানাড়া, যা সরোদের শব্দের গভীরতা ও গাম্ভীর্যের কারণে চিরকালই এক আদর্শ নির্বাচন। অন্নপূর্ণা দেবীর শেখানো রীতি এবং তাঁর এই বিশেষ রাগের ব্যাখ্যা অনুসরণ করে এই বর্ষীয়ান শিল্পীর পরিবেশনা রজনীগন্ধার মতো ফুটে ওঠে। বিলম্বিত ঝাঁপতালের বন্দিশে স্পষ্ট ছিল শিল্পীর ঐতিহ্যের প্রতি নিষ্ঠা, আর পরবর্তী মধ্যলয় ও দ্রুত তিনতালের অংশে দেখা যায় ছন্দের শক্তিশালী প্রকাশ। এর পর রাগ কাফিতে রূপক তালের গৎ এবং মধ্যলয় তিনতালের গৎ বাজিয়ে প্রমাণ করে দেন, অভিজ্ঞতার কোনও জুড়ি হয় না। তবলায় সন্দীপ কুমার ঘোষ যথাযথ সহযোগিতা করেন, যদিও একটি পর্যায়ে তিহাই পরিবেশনের সময়ে সামান্য ছন্দের বিচ্যুতি ঘটে।

তৃতীয় দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন বিখ্যাত বাঁশিবাদক পণ্ডিত রাজেন্দ্র প্রসন্ন। তাঁকে বাঁশিতে সহযোগিতা করেন রিতেশ প্রসন্ন এবং তবলায় অভিষেক মিশ্র। তাঁর প্রথম পরিবেশনা ছিল রাগ মারওয়া—বিলম্বিত একতালের একটি অতি পরিচিত গৎ দিয়ে শুরু হয়ে মধ্যলয় তিনতালের গৎ হয়ে দ্রুত তিনতালের গৎ-এর ক্লাইম্যাক্সে গিয়ে সমাপ্ত হয়। পণ্ডিত প্রসন্নর স্বভাবসিদ্ধ বলিষ্ঠ স্বরক্ষেপণে মারওয়ার বিষাদ কখনও চাপা কান্নার মতো কাছে ডেকে নেয়, তো কখনও হাহাকার হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারা প্রেক্ষাগৃহে। এর পরে শিল্পী শ্রোতাদের আবদারে মধ্যলয় আদ্ধা তালে বাজান রাগ বসন্তের উপর একটি গৎ। পরে মিশ্র মাঝ খাম্বাজের উপর হোরি ও কাজরি বাজিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করেন।

বিদুষী অশ্বিনী ভিড়ে দেশপাণ্ডে

বিদুষী অশ্বিনী ভিড়ে দেশপাণ্ডে

এ দিন সন্ধ্যার সমাপ্তি ঘটে বিদুষী অশ্বিনী ভিড়ে দেশপাণ্ডের অসাধারণ কণ্ঠসঙ্গীতের রেশ নিয়ে। তিনি রাগ জয়জয়ন্তী দিয়ে শুরু করেন এবং বিলম্বিত ঝাঁপতাল বন্দিশ ‘আলি পিয়া’, পরে দ্রুত আড়া চৌতালে বন্দিশ ‘সুন্দর শ্যাম সালোনে’ পরিবেশন করেন। প্রথিতযশা, বিশ্ববন্দিতা ‌এই সাধিকা অতি পরিচিত রাগেও দেখালেন কত নতুন পথ। এর পর নন্দ ও হংসধ্বনির সংমিশ্রণে সৃষ্ট রাগ নন্দ-ধ্বনিতে পঞ্চম থেকে কখনও সরাসরি নিষাদে, আবার কখনও ধৈবত হয়ে নিষাদে যাওয়ার মধ্যে যতটা সারল্য ছিল, ছিল ততটাই গভীর সৃজনশীলতা। এই রাগে তিনি গাইলেন রূপক তালে নিবদ্ধ ‘আয়ো রি সখি’, দ্রুত তিনতালে ‘চলো রি সখি’। শেষ পরিবেশনায় গাইলেন দু’টি হোরি— রাগ ভৈরবী ও দীপচণ্ডী তালে বাঁধা ‘রং ছিরকত রং ডারি’ ও দাদরার উপর ‘পিচকারি না মারো’। তবলায় সঙ্গতে ছিলেন জ্যোতি ভগবৎ ও হারমোনিয়ামে স্বমহিমায় ছিলেন রূপশ্রী ভট্টাচার্য। শ্রোতাদের মনেযেন বসন্তের দোলা দিয়ে অনুষ্ঠান সমাপন হল।


আরও পড়ুন