মঞ্চে উপবিষ্ট শিল্পীরা।
অধুনা-বাংলার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-পরিসরে, প্রধানত রবীন্দ্রগান-সঙ্কলিত আয়োজনে আমরা ‘তাই তো কবি বলিয়াছেন’ গোত্রের গুরুতর ছাত্রবন্ধু-আভাস পেয়ে অভ্যস্ত। কোনও গ্রন্থনা ‘আকাশ’ দিয়ে শেষ হলে নিয়তিক্রমে পরের গান শুরু হতে বাধ্য ‘আকাশ আমায় ভরল আলোয়’ দিয়ে। এই নিরবচ্ছিন্ন ক্লান্তি থেকে, ভাবনার এই দুর্মদ দীনতা থেকে বাঁচিয়ে দিল ‘রবি পরম্পরা’ সংস্থার সাম্প্রতিক একটি আয়োজন, যার শীর্ষনাম ‘পিতা নোহসি’। আলেখ্য বলা উচিত হবে না, বরং প্রযোজনা বলা যেতে পারে। প্রযোজনাটি ভাবিত করেছে কী ভাবে ভাবা যেতে পারে, তার রসদ জুগিয়ে। অমিত দাশগুপ্তের ভাষ্য রচনা নিছক কোনও একটি গল্প বলেনি, নিছক সারার্থ তুলেও ধরেনি, এমনকি টীকা সংযোজনা থেকেও শতহস্ত বিরত থেকেছে। সে ভাষ্য চেতনাপ্রবাহ বা ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেস’ এঁকেছে। সে দিক থেকে কলকাতার উত্তম মঞ্চে পরিবেশিত এই আয়োজনটি নাচ-গান-গ্রন্থনার পাশাপাশি অলক্ষ্য ক্যানভাসে আঁকা দক্ষ চিত্রকরের বিমূর্ত কোলাজও।
‘পিতা নোহসি’ বেদমন্ত্র। শুক্লযজুর্বেদ— ‘পিতা নোহসি/পিতা নো বোধি’। এই মন্ত্রের সাম্পান ঠাকুর পরিবার, রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর আশ্রমিকদের স্নায়ুস্রোতে চির-ভাসমান ছিল। বেদ-উপনিষদের আর্ষ থেকে ব্রাহ্ম উপাসনা-পর্ব— সর্বত্র তার রণন বয়ে নিয়ে গিয়েছে রবীন্দ্রসংস্কৃতি। বাবামশাই রবীন্দ্রনাথ বা গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের কাছে ‘পিতা’ বাবা শব্দের পরিচিত অর্থের চেয়ে অনেক গুণ বেশি আরাধ্য-আদরণীয় অন্য কিছু। রবীন্দ্রনাথের জীবনের একেবারে শেষ-সময়ে বিধুশেখর শাস্ত্রীকে এই মন্ত্রই উচ্চারণ করতে শোনা গিয়েছিল জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে।
রবি পরম্পরার আয়োজনের গতিসূত্রেও এক পিতার আখ্যান-আভাস রয়েছে। রয়েছে এক অল্পবয়সি মেয়ের কথাও। বাবা আর মেয়েকে আমরা সেখানে প্রথম দেখতে পাই শান্তিনিকেতনের লাল মাটিতে। শহুরে মেয়ের জগৎ অন্য বাতায়নে খুলে গিয়েছিল সে দিন। সেখানেই বাবা তার সঙ্গে এক মাতৃরূপা নারীর পরিচয় করিয়ে দেন। সে পরিচয় থেকে কিশোরীর প্রাপ্তি এক অভিজ্ঞান— গানই বীজমন্ত্র। ছুটি ফুরোলে কিশোরী ফিরে যায় তার শহরে। কিন্তু রাঙাধুলো তার স্বপ্নে বাসা বাঁধে, তাঁর মনের শালবীথি ধরে হেঁটে আসেন রবীন্দ্রনাথ। এই বিপুল উপলব্ধির ভার বহন করতে করতে কিশোরীর দিন বয়ে চলে। মধ্যে গান শেখার, গাওয়ার পরিসর তৈরি হয়। কিশোরী তার কৈশোর অতিক্রম করে চেনা জীবনছন্দে বেজে ওঠে। পরে কালের নিয়মে বাবাকে হারায়। অনেক পরে অন্য এক শহরের এক হোটেলে তার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুমন্ত স্বামীর নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পায়। এ পরিসর তার একার। আচমকা মনে হয়, কারও যেন ডাক শুনতে পেল সে। মনে হল, বাবা তার গান শুনতে চাইছেন। সে গায়— ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’।
আঁধারের যাত্রী আলো হাতে চললেও কেন আলোর নয়, আঁধারেরই যাত্রী, সে প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ মাথা খেয়ে বসে আছেনই। শুধু ব্রহ্মাণ্ডের চির-আঁধার বা বিচ্ছুরিত আলোককণার কাহিনি নয়, হৃদয়পথও সে অঙ্কিত যাত্রার রং-তুলি। ‘পিতা নোহসি’ প্রযোজনা নানা ভাবে সেই পথ এবং তার চার পাশের নানা পথের মোড়ে আমাদের সঙ্গে দেখা করে যায়।
সঙ্গীতাংশে যে সব গান ব্যবহার করা হয়েছে এই পরিসরে, তা রবীন্দ্রনাথের নানা পর্যায়ের গান থেকে সংকলিত। বিচিত্র পর্যায়ের বাউলাঙ্গ ‘এই তো ভাল লেগেছিল’ বা একই পর্যায়ের ভৈরবী ‘হাটের ধুলা সয় না’ এসে মেশে পূজা পর্যায়ের বেহাগ ‘আমার ভাঙা পথের রাঙা ধুলায়’ আর প্রেম পর্যায়ের কেদারা ‘পূর্ণ প্রাণে চাবার যাহা’য়। আবার প্রকৃতি পর্যায়ের গৌড়মল্লার ‘আজি শ্রাবণঘনগহন মোহে’র পথ মিলিত হয় বিচিত্র পর্যায়ের বাউলাঙ্গ ‘গ্রামছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ’ গানে। পূজা পর্যায়ের পিলু-খাম্বাজের বাউল চলনে গাঁথা ‘কোন ভীরুকে ভয় দেখাবি’ এসে মেশে একই পর্যায়ের বিভাস-বাউল ‘আমি কান পেতে রই’ গানে। পূজা পর্যায়ের ভৈরবী ‘আমার মাঝে তোমারি মায়া’ পেরিয়ে প্রেম পর্যায়ের কীর্তনাঙ্গ ভৈরবী ‘যে ছিল আমার স্বপনচারিণী’ ছুঁয়ে প্রযোজনা শেষ হয় বিচিত্র পর্যায়ের কানাড়া ‘তুমি কি কেবলই ছবি’ গানে।
গানে একক, দ্বৈত ও সমবেত কণ্ঠের সুচিন্তিত ব্যবহার প্রশংসার দাবিদার। মৈনাকমৌলী দাস, চৈতালি বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়, শাঁওলি দাশগুপ্ত, অনন্যা দাশগুপ্ত, বেলি নাহা— প্রত্যেকের পরিবেশনা সুচারু-সুন্দর। ‘তুমি কি কেবলই ছবি’ গানে সমবেত উপস্থাপনার অংশের ভাবনা চমকিত করে। অনিতা পাল তাঁর সব ক’টি একক এবং দ্বৈত গানেই আলাদা ভাবে স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন। বিশেষত, ‘আমি কান পেতে রই’ গানের লয় নির্বাচন এবং ‘আমার মাঝে তোমারি’ গানের ধৈর্যে মুগ্ধ করেন। ‘তাপস তুমি ধেয়ানে তব/কী দেখ মোরে কেমনে কব’ অংশের সমাহিত গাম্ভীর্য মনে রেখে দেওয়ার মতো।
অভিজিৎ পাল ও মধুমিতা বসুর ভাষ্যপাঠ নির্মেদ-মধুর। যন্ত্রানুষঙ্গে বিপ্লব মণ্ডল, নন্দন দাশগুপ্ত, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, সৌম্যজ্যোতি ঘোষ, সন্দীপন আচার্য প্রত্যেকেই সহজসুন্দর। গোটা উপস্থাপনায় নাচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর সতীর্থ শিল্পীদের ধ্রুপদী, লোক এবং আধুনিক শৈলী-উপচারে গাঁথা প্রতিটি পরিবেশনা নজরকাড়া। উত্তীয় জানার আলো বিশেষ ভাবে প্রশংসার দাবি রাখে।
প্রযোজনার শেষে যবনিকা পড়ে। কিন্তু ভাষ্য রচয়িতা অমিত দাশগুপ্তের কৃৎকৌশলে চেতনাস্রোত বহমান থাকে। যে স্রোতে হয়তো ভেসেছিলেন কখনও প্রতিমা দেবী, ইন্দিরা দেবী, রানী চন্দ কিংবা অন্য কোনও অঙ্গনা।