বিন্দুতে সিন্ধু: সিমা আর্ট গ্যালারির প্রদর্শনী ‘লেস ইজ় মোর’-এর চিত্রকর্ম
সেন্টার অফ ইন্টারন্যাশনাল মডার্ন আর্টের ডিরেক্টর এবং কিউরেটর রাখি সরকারের সাজানো একটি অমূল্য প্রদর্শনী চলছে সিমা আর্ট গ্যালারিতে, দু’টি পর্বে। নাম ‘লেস ইজ় মোর’। ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত চলবে এই প্রদর্শনী, যার মূল বক্তব্য, স্বল্পেই শিল্পের সম্পূর্ণতা। রাখি সরকারের লেখা একটি টেক্সটে তিনি বিমূর্ততা এবং মিনিমালিজ়ম সম্পর্কে লিখছেন যে, প্রাচীন ভারতের দর্শনশাস্ত্রে বস্তুনিরপেক্ষ বিমূর্ততার এক বিশাল জায়গা আছে। এটির জন্ম প্রধানত প্রাচীন ভারতের আধ্যাত্মিক ধ্যানধারণার পটভূমিতে। মিনিম্যালিস্ট চিন্তা ভারতীয় শিল্পচিন্তার প্রধান উপাদান সব সময়েই ছিল।
আর্ট ডিরেক্টর ড. অলকা পাণ্ডে লিখছেন যে, যেমন প্রতীকী উপস্থাপনার গোড়ায় আমরা দেখতে পাই বিন্দু, বৃত্ত, চৌকো রূপ, ত্রিভুজ, পদ্ম ইত্যাদি। এই সমস্ত কিছুর অনবদ্য ব্যাখ্যা আছে আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রে। সেখানে শাক্ত এবং তন্ত্র শাস্ত্রের ভূমিকাও খুব উল্লেখযোগ্য। ভরতের নাট্যশাস্ত্রে যে শুদ্ধ জ্যামিতির উল্লেখ আছে, সেখানেও বেদ এবং অন্যান্য শাস্ত্রীয় প্রভাব লক্ষণীয়। বৌদ্ধ ধর্মের মণ্ডলা ছাড়াও জৈন ধর্মের কসমিক বা মহাজাগতিক যন্ত্র বা নকশা ইত্যাদির ইঙ্গিত আমাদের প্রাচীন গ্রন্থেও পাওয়া যায়।
ভারতীয় শিল্পের একেবারে গোড়ায় দেখা যায় প্রতীকী উপলব্ধি। কারণ মনে করা হত যে, গ্ৰাহ্য পৃথিবীর সীমা ছাড়ালে ধরে ফেলা সম্ভব দর্শনাতীত এক অদৃশ্য সূক্ষ্ম সত্যকে। বাস্তবায়িত শিল্প শুধুই আমাদের পারিপার্শ্বিক জগৎকে একটা শারীরিক ব্যাপ্তিতে ধরতে পারে। যেমন মনে করা হয়, পদ্ম শুধু একটি ফুলই নয়, এটি হচ্ছে শুদ্ধতা এবং তুরীয় ভাবের প্রতীক। আগুন কেবল আগুন নয়, সেটি হচ্ছে মানুষ এবং ঈশ্বরের মধ্যে চিরকালীন যোগসূত্র। এই সমস্ত প্রতীক আমাদের বেদ, উপনিষদ, পুরাণ এবং তান্ত্রিক উত্তরাধিকার এবং পরে উপজাতীয় শিল্প থেকে আমরা পেয়েছি শিল্পের সরলীকরণ। এই বিশ্বাসই যুগে যুগে ভারতীয় শিল্পীকে নারায়ণকে শিলা রূপে এবং শিবকে লিঙ্গ রূপে (পুরুষ ও প্রকৃতি একসঙ্গে) ভাবতে শিখিয়েছে। পরে থিওসফিক্যাল সোসাইটি অনেক ভাবে শিল্পীসমাজকে সাহায্য করেছে অন্য ভাবে ভাবতে।
অরুণ বসুর ‘মাস্ক’ এবং ‘রয়্যাল এন্ট্রান্স’ এচিং দু’টিতে খুব নরম রঙের বিভাজন এবং সূক্ষ্মতা চোখে পড়ে। ১৯৮৭ সালে ভিএস গায়তোণ্ডে রেখে গিয়েছেন কাগজে কালি এবং ব্রাশ দিয়ে ক্যালিগ্ৰাফি বা হস্তলিপির সুন্দর স্বাক্ষরে উপজাতীয় লেখা। চারিত্রিক ভাবে সেগুলিকে অনায়াসে ছবি বলা যেতে পারে। যথেষ্ট আধুনিক এই ক্যালিগ্ৰাফিতে লাইনের সৌন্দর্যে ধরা হয়েছে সঙ্গীতের ধ্বনি।