আত্মানুসন্ধান: দেবভাষায় আয়োজিত চন্দনা হোরের শিল্পকর্মের প্রদর্শনী
দেবভাষা শিল্প ও বইয়ের আবাসে চন্দনা হোরের যে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল সম্প্রতি, সেখানে ছিল ১০১টি ছবি। অর্থাৎ সেই কলেজজীবনের শুরু থেকে এখনকার সমস্ত কাজ। এখনও পর্যন্ত যে সব মাধ্যমে শিল্পী পেন্টিং করেছেন, যেমন তেলরং, জলরং, কালি-কলম, প্যাস্টেল, ড্রয়িং ছাড়াও ব্রোঞ্জের কাজও ছিল এখানে।
সোমনাথ হোর ও রেবা হোরের একমাত্র কন্যা চন্দনা। তাঁদের বাড়ি ছিল রং, রেখা, মোমের গন্ধ লাগা এক বাড়ি। দুই ঘরে কর্মরত দু’টি মানুষ, যাঁরা কাজ ছাড়া কিছুই জানতেন না। আর পাঁচটা দম্পতির মতো সংসার করেননি। ছোট মেয়েটা বাবা-মায়ের সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হয়ে বেড়ে উঠেছে ঠিকই, কিন্তু শ্রেষ্ঠ শিল্পকলায় বেষ্টিত এক পরিবেশও পেয়েছে।
সেই মেয়েটির প্রথম স্মৃতি মায়ের ক্যানভাসের নানা রং— কমলা, লাল, হলুদ, নীল। যে মেয়েটির ব্যথার প্রথম স্মৃতি সাইকেল চালাতে গিয়ে পড়ে গিয়ে হাঁটু ছড়ে গেলে তার বাবা পেপার পাল্পে রক্তের প্রিন্ট নিতেন, তাঁর ‘উন্ডস’ পর্বের ছবির জন্য। অবাক হয়ে চন্দনা সে দিন নিজের মতো করে বুঝেছিলেন যে, ব্যথা প্রকাশ করতে হলে বোধহয় তাঁকেও রঙের ব্যবহার করতে হবে।
তার পরে কলাভবনে ভর্তি হয়ে ১৪-১৫ বছর বয়সে এক ব্যর্থ প্রেমের স্মৃতি নিয়ে, রবীন্দ্রসাহিত্য পড়ার পরে খানিক বিষণ্ণতা দানা বেঁধেছিল মনে। মেয়েটি তার বাবার কাছে কান্নাকাটি করত তার কোনও বন্ধু নেই বলে। পরবর্তী জীবনে ছবির মধ্যেই হয়তো সব কিছু খুঁজে পেয়েছেন শিল্পী চন্দনা।
অনেক ছোট বয়স থেকে আঁকার শুরু। প্রথমে শুধু কালি কলমে, পরে রঙে। শিল্পীর অন্তরের আনন্দ ক্রমশ বেদনার দিকে প্রবাহিত হয়েছে। প্রথম জীবনে কলকাতায় হস্টেলে থাকার সময়ে ধূসর রঙের ব্যবহার তাঁর ছবিতে ফিরে ফিরে আসত। তার পর গাঢ় নীল, প্রুশিয়ান ব্লু এবং সাদা তাঁর চিত্রপট অধিকার করে ছিল। কালো চারকোল আর ধূসর রঙের এক কলকাতা শহর ধরা দিয়েছিল কাজে। ওই সময়ে ফুটপাত নিয়েও বেশ কিছু কাজ করেছেন চন্দনা। রাতের কলকাতায় হেঁটে চলা মানুষদের নিয়ে, মেয়েদের নিয়ে কাজে এক ধরনের বিধুরতা নিয়ে আসতেন। শহরের পথে বিভিন্ন মানুষের ভিতরে এক রকম ক্ষয়িষ্ণু ভাষার প্রকাশ এঁকেছেন তখন।
এর পরে আমদাবাদে কানোরিয়া সেন্টারে স্কলারশিপ পেয়ে চলে যান। সেখানে মনীষা পারেখ, সুদর্শন শেঠ, রবিন্দর রেড্ডির মতো শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছেন। সেখানে এম এফ হুসেনের সঙ্গেও দেখা হয়। তিনি চন্দনার ছবি দেখে তাঁকে বলেছিলেন, তেল রং মাধ্যমটা নিয়ে আরও অন্বেষণ করতে। এই মাধ্যমের কাজের মধ্য দিয়েই চন্দনা পরিচিত হবেন। এই প্রদর্শনীতে চন্দনার ১০১টি কাজের মধ্যে বেশ বড় একটা অংশ তেল রঙে করা, আর সেখানেই নিজের শিল্পীসত্তা বেশ কিছুটা অনাবৃতকরেছেন শিল্পী।
আমদাবাদে বেশি দিন থাকেননি শিল্পী। শিকড়ের টানেই হয়তো প্রথমে শান্তিনিকেতনে এবং পরে কলকাতায় ফেরা। ইতিমধ্যে তাঁর বিবাহ এবং বিবাহবিচ্ছেদও হয়। তাঁর তখনকার কাজে কালো এবং সাদা রঙের প্রাধান্য।
তাঁর শেষ দিকের কাজে মনে হয়, বিশেষ করে এখনকার তেলরঙের কাজে দৃশ্যকল্প যেন অনেকটা একই রকম। ছবির শরীরই নিজের শরীর বলে ভেবেছেন বলেই হয়তো তাঁর কাজে কিছুটা পুনরাবৃত্তি দেখেছেন শিল্পরসিক। প্রথম জীবনের কাজে পারিপার্শ্ব ধরা পড়েছে অনেক সময়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক কাজে বারবার স্বগতোক্তির মতো তিনি নিজেকে ধরা দিয়েছেন। প্রত্যেকটি কাজের ভিতর একটি বাড়ির খোঁজ আছে। স্থিতিহীনতার মাঝে থেকে একটি নিরাপত্তার খোঁজ করেছেন বারংবার, রেখা এবং রঙের মাধ্যমে।
চন্দনা হোরের একটি ছবিতে আল্ট্রামেরিন নীল পটভূমিতে তাঁর নিজের কাঁধে একটি পাখি বসে আছে। যেন নিবিড় ভাবে দেখছে সেই পাখিটি। শরীরের রং হলুদ এবং চুলের রং সেই একই নীল। অপর একটি ছবিতে খুব উজ্জ্বল লাল প্রেক্ষাপটে তিনি একগুচ্ছ ফুল, লতাপাতা নিয়ে তাকিয়ে আছেন সামনে। এখানে মুখের বিমর্ষতা যেন হ্রাস পেয়েছে।
আর একটি ছবিতে তাঁকেই দেখা যায় আরও দু’টি মুখের সঙ্গে জড়িয়ে। এ ছবির বিষয় দু’রকম ভাবে ভাবা যেতে পারে। হয়তো তাঁর মনে সন্তানের জননী হওয়ার ইচ্ছে জেগেছিল কোনও সময়ে। তাদের জড়িয়ে রয়েছেন। কিংবা হয়তো তিনি নিজের সত্তাকেই আঁকড়ে ধরেছেন, খুঁজে পাওয়ার জন্য। অত্যন্ত উজ্জ্বল রঙে এঁকেছেন। কিছুটা বিষণ্ণতা জয় করা ছবি।
চন্দনা হোরের ভাস্কর্য তাঁর বাবার চেয়ে সম্পূর্ণ এক আলাদা আঙ্গিকে গড়া। এক জায়গায় চন্দনা লিখছেন— ‘শান্তিনিকেতনের পথে ঝরা পাতা, পড়ে থাকা মৃত প্রজাপতি, একটি মেয়ে ঘর্মাক্ত দেহে হেঁটে চলে যাচ্ছে, তার গায়ে কোনও গহনা নেই, কিন্তু সর্বশরীরে কান্না... শান্তিনিকেতনের জীবনের এই প্রান্তিকতা আমাকে সেই সময়ের ছবিগুলো আঁকতে সাহায্য করেছে। আর ওই প্রান্তিক পৃথিবীর কান্না নিয়েই আমি আমার ভাস্কর্যের কাজ শুরু করি।’ ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে তাঁর ভাবনা বড় নিজস্ব। তাঁর ছাঁচ একান্ত ভাবে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে গড়া। সেই যে নিজেকে খোঁজার রাস্তা, সেই রাস্তা কি পরিপূর্ণতা পায় তাঁর ভাস্কর্যে? শিল্পীর নিজের ভাষায়, ‘ভাস্কর্যের মধ্যেই আমার নিজস্ব লিখনভঙ্গিমা কাজ করে। ওখানেই একমাত্র নিজের আত্মাকে যেন রাখার জায়গা পেয়েছি।’
একটি ব্রোঞ্জ ভাস্কর্যে দেখা গেল এক নারীর পার্শ্বমুখ। তাঁর মায়ের মুখের সঙ্গে সাদৃশ্য লক্ষণীয়। খুব ফ্ল্যাট ফরম্যাটে করা কাজ। ছুরির আঘাতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
দ্বিতীয় একটি ভাস্কর্যে নারী-পুরুষের যুগ্ম মূর্তি। ব্রোঞ্জের কাজ। হয়তো প্রেমালিঙ্গন দেখিয়েছেন। সম্ভবত বাবা-মায়ের। কিন্তু পাশে অপর একটি পার্শ্বমুখের আভাস। আঙ্গিকে নিজস্বতা রেখেছেন। ফ্ল্যাট ফরম্যাটে গরম ছুরি দিয়ে কাটাকুটি।
চন্দনা আড়ালে থেকেছেন সারা জীবন। তাঁর ছবিকেও অন্তরালের ছবি বলা যায়। তিনি যে দুই বিখ্যাত মা-বাবার সন্তান, সেই সঙ্কটে সারা জীবন ভুগেছেন। কারণ তাঁকে অবিরাম এক নিজস্ব ভাষা খুঁজে যেতে হয়েছে। এই ভাবে খুঁজতে খুঁজতে ক্রমশ অনেক কিছু বর্জন করতেও শিখেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত করেছেন এক নিজস্ব শিল্পভাষা।