সম্মিলিত: গ্যালারি বি-ক্যাফ আয়োজিত প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম
সম্প্রতি গ্যালারি বি-ক্যাফ-এর ললিতকলা অ্যাকাডেমির সহযোগিতায় এবং থার্ড প্রিন্ট বিয়েনেলের অধীনে একটি প্রদর্শনী দেখতে পেলেন কলকাতার শিল্পরসিকরা। প্রদর্শনীটি কিউরেট করেছেন শিল্পী পরাগ রায়।
ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের আদানপ্রদান চলছে সেই আদিকাল থেকেই। প্রাচীন যুগে ঝড়বৃষ্টি, প্রলয়, বজ্রপাত, বন্যা এবং বন্যপ্রাণীদের আক্রমণের ভয়ভীতি থেকেই এক বৃহৎ শক্তি কল্পনা করে বিশ্বাসের জন্ম হয়েছিল আদিম মানবের চেতনায়। সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সেই বৃহৎ শক্তিকে বিভিন্ন নামে সম্বোধন করেছে মানুষ, গড়ে উঠেছে উপাসনার নানা উপায়। বিশ্বাসের ভিত্তিতে বিভাজন মাথা তুলেছে। যুগে যুগে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, আঞ্চলিক সংস্কৃতির তারতম্য এবং বিভিন্ন ধর্মের আধিপত্যের কারণে মূর্তি এবং সঙ্কেতের পরিবর্তন ঘটেছে। রাজনৈতিক আধিপত্য, ধন আহরণের অতিরিক্ত লোভ এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার কারণে আজ মানুষ বিচ্ছিন্ন, বিভক্ত এবং বিক্ষিপ্ত। এই সমস্ত কথা হৃদয়ে রেখে বি-ক্যাফ-এর প্রতিষ্ঠাতা রিনা দেওয়ান শিল্পীগোষ্ঠীকে ছবি আঁকতে বলেছিলেন। মিডিয়াম হতে হবে ছাপচিত্র। প্রদর্শনীর নাম ‘ইন দ্য নেম অব গড’।
কাঠের ব্লকের উপর ছবি ও ডিজ়াইন এঁকে কাগজে এবং সিল্কে প্রিন্ট করার প্রচলন ছিল প্রথম চিনে। সেটা পৌঁছেছিল ইউরোপে আরব বণিকদের হাত ধরে প্রথমে জার্মানিতে, পরে অন্যান্য দেশেও। এ দেশে ঊনবিংশ শতাব্দীতে রাজা রবি বর্মা দেবদেবীর ছবি প্রিন্ট করতেন কাপড়ে। সেইগুলো ছিল ঠিক তেলরঙের মতো দেখতে। তাকে বলা হত অলিওগ্ৰাফ।
তারপর ফরাসি শিল্পী আন্দ্রে কার্পেলেস কাঠের খোদাইয়ের সব কৌশল নিয়ে আসেন শান্তিনিকেতনে। এর পরে সহজ পাঠে নন্দলাল বসুর লিনোকাটের সঙ্গে আমরা পরিচিত। কলকাতায় গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও বেশ কিছু ছাপচিত্র ছিল। কলকাতায় মুকুল দে ছিলেন প্রথম প্রশিক্ষিত ছাপশিল্পী। তিনি শিকাগোতে গিয়ে ড্রাই পয়েন্ট এচিং এবং পরে ইংল্যান্ড থেকে প্রশিক্ষণ গ্ৰহণ করে আসেন। তারপর আসেন রমেন চক্রবর্তী এবং আরও পরে হরেন দাস। সত্তরের দশকে কলাভবনে শুরু হল প্রিন্ট মিডিয়ার কাজ, অধ্যক্ষ দিনকর কৌশিকের সময়ে সোমনাথ হোর এবং সনৎ করের হাত ধরে। এঁরাই ছিলেন ছাপচিত্রের মাস্টারমশাই।
প্রদর্শনীতে প্রথমেই চোখে পড়ে রমেন্দ্রনাথ কাষ্ঠার অনবদ্য ছবি। নাম ‘ইন দ্য নেম অব গড’। তিনটি বস্তু তিন জায়গায় রেখেছেন আলাদা ভাবে। এক দিকে একটি ছাগলের অর্ধেক অবয়ব, আর এক দিকে বলিকাঠের অংশবিশেষ এবং আর এক দিকে পূজারিনীর মুণ্ডহীন দেহ। এঁর মিডিয়াম হচ্ছে সেরিগ্ৰাফি এবং শিন-কোলে। সেরিগ্ৰাফিতে যে রকম মোটা রঙের স্তরে স্তরে ছাপ নেওয়া হয়, যাতে ছাপচিত্র উঁচু বুনট বা টেক্সচারে থাকে, তার সঙ্গে শিন-কোলে (এটি একটি চিনা এবং জাপানি পদ্ধতি, যেখানে ছাপচিত্রের উপর ফোটোগ্ৰাফিক প্রতিকৃতি বসানো হয় অথবা আরও একটি পাতলা কাগজে রঙিন চিত্র বসিয়ে তারপর ছাপ নেওয়া যায়), এই ভাবে বেশ সূক্ষ্ম কাজ করা সম্ভব। বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য এই ছবির কম্পোজ়িশন।
এর পর আসে মনোজ বৈদ্যের শিরোনামহীন ছবি। এখানে তিনি দেখিয়েছেন যে জন্তু এবং মানুষ উভয়েরই ঈশ্বরের নামে ভয়, ভক্তি যেন এক জায়গায় এসে স্থির। শিল্পী এচিং, অ্যাকোয়াটিন্ট এবং শিন-কোলে ব্যবহার করে, রীতিমতো জটিল শ্রমসাধ্য পদ্ধতিতে অপূর্ব একটি ইমেজ সৃষ্টি করেছেন যেটা একাধারে মানুষ এবং চতুষ্পদ প্রাণীর। এরা একনিষ্ঠ ভাবে উচ্চতর ক্ষমতার কাছে সমর্পিত। কালো, সাদা এবং গোল্ডের টোনে সুন্দর কাজ।
পরাগ রায়ের ‘লঙ্কাদহন’ ছবিটি ভাল লাগে, তার কারণ তিনি কাজটি যদিও করেছেন লিনোকাটে, ব্যবহার করেছেন অতি নয়নাভিরাম কয়েকটি রং। সেখানেই তাঁর দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়। যখনই শিল্পী একাধিক রং ব্যবহার করেন লিনোকাটে, তাঁকে হয়তো বহু বার ছাপ নিতে হয় লিনোকাটের উপরে নানা উপায়ে। ছবিতে স্বয়ং হনুমান লঙ্কার চার দিকে আগুন ধরিয়ে ধ্বংসে মগ্ন। মুখের অভিব্যক্তি অসাধারণ।
মানিক কুমার ঘোষ ‘অর্নামেন্টেড রিয়্যালিটি’ ছবিটি এচিংয়ে করেছেন। সম্ভবত এটি সকলের পরিচিত এক নাড়ুগোপালের প্রতিকৃতি। কিন্তু ভারী সুন্দর এক জালি কাজের ভিতর থেকে দেখা যাচ্ছে যেন লেসের চাদরে ঢাকা। শুধুমাত্র এচিংয়ে এই কাজ শিল্পীর দক্ষতার পরিচয়বাহী।
পলা সেনগুপ্তের ‘দা গ্ৰিন জ়েব্রাস’ এচিং এবং অ্যাকোয়াটিন্টে ভারী সুন্দর কাজ। শুধুমাত্র রেখার সাহায্যেই নয়, বিস্তৃত এলাকায় রঙের টোন দিয়ে যেন কিছুটা জলরঙের ওয়াশের মেজাজে দু’টি জ়েব্রার মিলনের পূর্বরাগ দেখিয়েছেন।
অতীন বসাকের ছবির মাধ্যম এচিং। একটি মানুষের মাথা সামনে থেকে দেখিয়ে তার মধ্যে বিশাল ক্ষতচিহ্ন শিল্পী এঁকেছেন। মানুষের মাথায় ঈশ্বরকে নিয়ে কত রকম চিন্তা চলে সারা জীবন। হয়তো উত্তর পায় না। গভীরে গিয়ে একটি ক্ষত হয়তো মানুষটিকে বিভ্রান্ত করে। এচিং-এর সঙ্গে মিশ্র মাধ্যমে জটিল টেক্সচারে, একাধিক রঙে তিনি অনবদ্য এক প্রতীকী ছাপচিত্র সৃষ্টি করেছেন।
দিলীপ কুমার শাসমল ছবির নাম রেখেছেন ‘নাঙ্গা বাবা’। তিনি যেন ঈশ্বরকে প্রশ্ন করছেন, ‘হে মহারাজ, তুমি আজ বস্ত্রহীন কেন?’ এই নেতা বা মহারাজের মস্তিষ্ক হিংস্রতায় ভরে দিয়েছেন দিলীপ। এটি করেছেন উডকাট এবং এনগ্ৰেভিং-এর সখ্যে। সাধারণত উডকাট হয় কাঠের উপরে এবং এনগ্ৰেভিং পাথর বা ধাতুতে খোদাই করে। তিনি এই দুই প্রণালীকে একত্রে ব্যবহার করে কাজটি সুসম্পন্ন করেছেন। কমল মিত্রের সুন্দর নীল রঙের ছবিটি তিনি সাইনোটাইপ এবং উডকাটের সাহায্যে করেছেন। দু’টি হাত যেন ঈশ্বর বা কোন দৈব শক্তির সুরক্ষা চায়।
শুচিতা বারিক এচিংয়ে করা খাঁড়াটিকে ঈশ্বরের অস্ত্র বলে দেখিয়েছেন। প্রদর্শনীতে অরিজিৎ মুখোপাধ্যায়, শ্রীকান্ত পাল, রজত হালদার, রাজেন মণ্ডল, দেবজ্যোতি ধারা, শ্রেয়সী সাহা, শুক্লা পোদ্দার, খোকন গিরি, অমল মিত্র, জয়ন্ত নস্কর, দশরথ দাস, বিনীতা বন্দোপাধ্যায়, দীপাঞ্জন বাগলি, সিদ্ধার্থ ঘোষ, শ্রাবণী সরকারের বিভিন্ন পদ্ধতিতে করা দর্শনীয় বেশ কিছু ছাপচিত্র দেখতে পাওয়া গেল।
অনুষ্ঠান
নাটকের একটি দৃশ্য।