বুধবার মুম্বই থেকে বারামতী যাওয়ার পথে বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে মহারাষ্ট্রের উপপ্রধানমন্ত্রী অজিত পওয়ারের। বারামতী বিমানবন্দরে অবতরণের সময়ে ভেঙে পড়ে বিমানটি। দুর্ঘটনায় অজিত-সহ পাঁচ জনেরই মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার এনসিপি নেতার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
প্রাথমিক ভাবে অনুমান করা হচ্ছে, দৃশ্যমানতা কম থাকার কারণেই বিমানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু হয়েছে। অজিতের মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক মহলে শোকের ছায়া। শোকপ্রকাশ করেছেন দেশের তাবড় রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
মহারাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারগুলির মধ্যে অন্যতম হল পওয়ার পরিবার। বর্তমানে এর কেন্দ্রে রয়েছেন শরদ পওয়ার। কংগ্রেস ভেঙে বেরিয়ে শরদ ১৯৯৯ সালে এনসিপি তৈরি করেছিলেন। কয়েক দশক ধরে পওয়ার পরিবারের সদস্যেরা আঞ্চলিক ও জাতীয় রাজনীতিতে, বিশেষ করে এনসিপির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি করেছিলেন। তবে পওয়ার পরিবারের সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছিল পুণে জেলার বারামতীতে, যেখানে তাদের অনেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, আন্দোলন চালিয়েছেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন।
শরদের সঙ্গে মাঝে দূরত্ব তৈরি হওয়া অজিতই একসময় তাঁর উত্তরসূরি হিসাবে পরিচিত ছিলেন। এনসিপি ভেঙে বেরিয়ে শরদের সেই ভাইপো অজিত বিজেপির সঙ্গে জোট করেন। মহারাষ্ট্রের দেবেন্দ্র ফডণবীসের নেতৃত্বে বিজেপির জোট মহাযুতি সরকারের অন্যতম উপমুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি।
গত কয়েক মাসে পওয়ার পরিবার তথা এনসিপি-র দুই গোষ্ঠীর কাছাকাছি আসার ইঙ্গিত মিলছিল। মনে করা হচ্ছিল, দুই এনসিপি মিলে যাবে। রাজনীতি থেকে অবসর নেবেন শরদ। অজিতই জোটবদ্ধ এনসিপি-র হাল ধরবেন। আর জাতীয় স্তরে এনসিপি-র মুখ হবেন শরদ-কন্যা সুপ্রিয়া সুলে। সেই এনসিপি মহারাষ্ট্র এবং দিল্লিতে বিজেপির জোটেই থাকবে বলে আন্দাজ করছিলেন রাজনীতির অলিন্দে ঘোরাফেরা রয়েছে এমন বিশেষজ্ঞেরা।
তবে অজিতের বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু সারা দেশকে যেমন হতবাক করেছে, তেমনই তাঁর পরিবার তথা বংশের রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত গুরুত্ব— উভয়ই তুলে ধরেছে। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, মহারাষ্ট্রের তথা দেশের অন্যতম ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক পরিবার পওয়ারদের দল এবং পরিবারের রাশ এ বার কে ধরবে? অজিতের স্ত্রী সুনেত্রা বা দুই পুত্রের মধ্যে কেউ অজিতের এনসিপি-র হাল ধরবেন? না কি দুই এনসিপি মিলে শরদ-সুপ্রিয়ার হাতে রাশ থাকবে দলের?
তা বোঝার আগে জেনে নেওয়া যাক পওয়ার পরিবারের শিকড়, শাখা-প্রশাখা এবং উত্তরাধিকারীদের বিষয়ে। পওয়ার পরিবারের শিকড় মহারাষ্ট্রের গ্রামীণ এলাকায়। ভিত্তি বারামতী, মহারাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কৃষিক্ষেত্র। সেখান থেকে উঠে এসেই শরদ মহারাষ্ট্রের রাজনীতির আঙিনায় আবির্ভূত হন এবং রাজ্য তথা দেশের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হয়ে ওঠেন।
শরদের বাবা-মা ছিলেন গোবিন্দরাও এবং সারদা পওয়ার। গোবিন্দরাও বারামতীর শ্রমিক সমবায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৩৮ সালে পুণের স্থানীয় বোর্ডে নির্বাচিত হন সারদা। দম্পতির ১১ সন্তান— সাত ছেলে এবং চার মেয়ে। তাঁদেরই এক ছেলে শরদ।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরদের পরিবারের সদস্যেরাও রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। পওয়ার পরিবারের প্রবীণ প্রজন্মের মূল সদস্যদের মধ্যে যিনি এখনও মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে অনস্বীকার্য, তিনি শরদ। এনসিপি-র প্রতিষ্ঠাতা, মহারাষ্ট্রের চার বারের মুখ্যমন্ত্রী এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।
অজিত হলেন শরদের দাদা অনন্তরাও পওয়ারের পুত্র। অজিতের যখন মাত্র ১৮ বছর বয়স, তখন মারা যান অনন্তরাও। কাকার ছত্রছায়াতেই মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রকট হয়ে ওঠেন অজিত। একাধিক মেয়াদে মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। মহারাষ্ট্রের রাজ্য রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কুশলী এবং নেতা হিসাবেও ব্যাপক ভাবে স্বীকৃত ছিলেন।
অজিতের স্ত্রী সুনেত্রা পওয়ার বর্তমানে রাজ্যসভার সাংসদ। তিনি মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মন্ত্রী এবং লোকসভার প্রাক্তন সাংসদ পদ্মসিংহ পাটিলের কন্যা। বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজের জন্য বিশেষ ভাবে পরিচিত তিনি।
অন্য দিকে, শরদ এবং তাঁর স্ত্রী প্রতিভা পওয়ারের এক কন্যা, সুপ্রিয়া সুলে। সুপ্রিয়া দেশের এক জন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ। বারামতীর তিন বারের সাংসদ তিনি। এনসিপির (শরদ গোষ্ঠী) কার্যকরী সভাপতিও বটে। সুপ্রিয়ার দুই সন্তান। পুত্র বিজয় এবং কন্যা রেবতী।
পওয়ার পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মও মহারাষ্ট্রের জনজীবন এবং রাজনীতিতে প্রবেশ শুরু করেছে। তৃতীয় প্রজন্মের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন অজিত-পুত্র পার্থ। মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট সক্রিয় তিনি। যদিও অজিতের দ্বিতীয় পুত্র জয়কে এখনও সে ভাবে রাজনীতির আঙিনায় দেখা যায়নি।
২০১৯ সালে মাওয়ল থেকে লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন পার্থ পওয়ার। কিন্তু হেরে যান। দ্বিতীয় পুত্র জয় ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ২০২৫ সালে তাঁর বাগ্দান অনুষ্ঠানে শরদ এবং সুপ্রিয়া-সহ পরিবারের সকলে একজোট হয়েছিলেন।
এ ছাড়াও রয়েছেন সম্পর্কে শরদের নাতি রোহিত পওয়ার (শরদের দাদা আপ্পা সাহেবের নাতি)। রোহিত কর্জত-জামখেডের বিধায়ক। শরদ নেতৃত্বাধীন এনসিপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে এক জন তরুণ নেতা হিসাবে মহারাষ্ট্রের রাজনীতির আঙিনায় আবির্ভূত হয়েছেন তিনি। সদ্য রাজনীতিতে প্রবেশ করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন সম্পর্কে শরদের আরও এক নাতি যুগেন্দ্র পওয়ার।
পওয়ার পরিবারের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক, তাদের রাজনৈতিক কৌশল এবং জনসাধারণের উপর তাদের প্রভাব, অনেক দিন ধরেই রাজনৈতিক মহলের আলোচনার বিষয় ছিল। কিন্তু মাঝখানে কাকা-ভাইপোর সম্পর্কে চিড় ধরে। দূরত্ব তৈরি হয় শরদ এবং অজিতের মধ্যে। এনসিপিতেও ভাঙন দেখা দেয়। ২০২৩ সালে বিজেপি-শিবসেনা জোটের সঙ্গে হাত মেলান অজিত। শরদের এনসিপি থেকে সরে আসেন। তবে রাজনৈতিক মতানৈক্য থাকলেও পারিবারিক উৎসব একসঙ্গেই উদ্যাপন করত শরদ এবং অজিতের পরিবার।
গত লোকসভা নির্বাচনে শরদ পওয়ারের এনসিপি মহারাষ্ট্রের ৪৮টি লোকসভা আসনের মধ্যে ১০টি জিতেছিল। অজিতের এনসিপি মাত্র একটি আসন জিতেছিল। আবার বিধানসভা নির্বাচনে অজিতের এনসিপি মহারাষ্ট্রের ২৮৮টি আসনের বিধানসভায় ৪১টি আসন জেতে। শরদের এনসিপি মাত্র ১০টি আসন জিতেছিল। সম্প্রতি শরদ এবং অজিতের মধ্যে বরফ গলার ইঙ্গিত মিলছিল।
দুই এনসিপি এক হলে মরাঠাভূমে বিজেপির দাপট কমতে পারে বলে গেরুয়া শিবিরের চিন্তা বেড়েছিল। আবার বিজেপি নেতাদের মতে, এনসিপি-র দুই গোষ্ঠী এক হয়ে মহারাষ্ট্রে মহাযুতি সরকারে যোগ দিলে শিন্দেকে আরও কোণঠাসা করতে ফডণবীসের সুবিধা হবে। সে ক্ষেত্রে ইন্ডিয়া জোটে নতুন করে ভাঙন ধরবে বলে কংগ্রেসেরও চিন্তা বেড়েছিল।
তবে অজিতের মৃত্যু আপাতত সব সমীকরণে জল ঢেলেছে। এখন কে পওয়ার পরিবার এবং দলের রাশ হাতে রাখবেন, তা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে। অজিত-জায়া সুনেত্রা রাজ্যসভার সাংসদ হলেও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কম। পার্থ, জয়ও নিত্যদিনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন।
শরদ ভাইপোর বদলে কন্যাকে রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী করতে চাওয়ার কারণেই দু’পক্ষের বিবাদের সূত্রপাত। সেখান থেকেই দলে ভাঙন। কিন্তু অজিতের মতো জনমোহন ব্যক্তিত্ব বা সাংগঠনিক ক্ষমতা নেই সুপ্রিয়ার। সুপ্রিয়ার পক্ষে এনসিপি-কে জোটবদ্ধ করে হাল ফেরানো আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অন্য দিকে অজিতের আচমকা মৃত্যুতে মহারাষ্ট্রে মহাযুতি সরকারও প্রশ্নের মুখে। অজিতের জায়গায় এনসিপি থেকে কে উপমুখ্যমন্ত্রী হবেন, তা নিয়েও জল্পনা চলছে। উঠে আসছে প্রফুল্ল পটেলের নাম।
সব ছবি: সংগৃহীত।