আমেরিকা বা রাশিয়ার পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান নয়। ফরাসি জেট রাফালেই ভরসা রাখছে ভারতীয় বিমানবাহিনী। আর তাই সাড়ে চার প্রজন্মের ১১৪টি এই যুদ্ধবিমানের বরাত দেওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি প্রায় নিয়ে ফেলেছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। শুল্ক সংঘাত ও নিষেধাজ্ঞার জেরে ওয়াশিংটন এবং মস্কোর থেকে মুখ ফেরাল নয়াদিল্লি? না কি ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সকে মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত? রাফাল চুক্তির আগে এই দুই প্রশ্নের চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
গত বছরের (২০২৫ সালের) মে মাসে ‘সিঁদুর’ অভিযান চলাকালীনই ফরাসি জেটটি নিয়ে একাধিক খবর ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় একটি রাফালকে গুলি করে নামিয়েছে বলে দাবি করে বসে পাকিস্তান। এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ঘুরিয়ে জবাব দেয় ভারতীয় বায়ুসেনা। নয়াদিল্লির বক্তব্য ছিল, অক্ষত রয়েছেন তাঁদের সমস্ত লড়াকু-পাইলট। তা ছাড়া লড়াইয়ে যুদ্ধবিমান ধ্বংস হতে পারে, ফৌজের শীর্ষ অফিসারদের এমন কথাও বলতে শোনা গিয়েছিল। ফলে এ ব্যাপারে তৈরি হয় ধোঁয়াশা।
‘সিঁদুর’ পরবর্তী সময়ে রাফাল ইস্যুতে সংসদে প্রশ্ন তোলেন বিরোধী নেতা-নেত্রীরা। যদিও সংশ্লিষ্ট ফরাসি জেটটির ভেঙে পড়ার কোনও প্রামাণ্য তথ্য দেয়নি প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। দাসো অ্যাভিয়েশনের তৈরি এই যুদ্ধবিমানটির লড়াইয়ের ময়দানে অক্ষত থাকার দুর্দান্ত রেকর্ড রয়েছে। মাঝ-আকাশের ‘ডগ ফাইটে’ আত্মরক্ষায় এর শরীরে আছে বিশেষ স্পেকট্রা স্যুট। সে কারণে রাফালকে ইউরোপের অন্যতম সেরা যুদ্ধবিমানের তকমা দিয়েছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ।
সাবেক সেনাকর্তাদের দাবি, ফরাসি জেটটিকে উড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা কখনওই ছিল না পাক বিমানবাহিনীর। আর তাই সংঘাত পরিস্থিতিতে ফৌজের মনোবল ঠিক রাখতে ভুয়ো খবর ছড়াতে থাকে ইসলামাবাদ। ভারতের সঙ্গে সংঘর্ষবিরতির পরও তা জারি রেখেছিলেন রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলরা। ফলে ‘সিঁদুর’ থামার এক মাসের মাথায় নয়াদিল্লির অন্তত চারটি রাফাল ধ্বংস হয়েছে বলে পশ্চিমের প্রতিবেশীটির গণমাধ্যমগুলিতে খবর ছড়িয়ে পড়ে।
ঠিক এই সময় পাকিস্তানের হয়ে আসরে নামে চিন। বিশেষজ্ঞদের দাবি, নিজেদের স্বার্থেই রাফাল ধ্বংসের ভুয়ো খবরে হাওয়া দেয় বেজিং। বিষয়টিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) প্রযুক্তির একাধিক ছবি ও ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ছড়াতে দেরি করেনি ড্রাগন। যদিও নয়াদিল্লির পাশাপাশি সেগুলি ফরাসি প্রতিরক্ষা মন্ত্রক চিহ্নিত করায় অচিরেই খুলে পড়ে মান্দারিনভাষীদের মুখোশ।
২০০৪ সালে জে-১০সি নামের একটি লড়াকু জেটের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে চিনা সংস্থা চেংডু এয়ারক্রাফট কর্পোরেশন। বেজিঙের পিপল্স লিবারেশন আর্মি বা পিএলএ বিমানবাহিনীকে বাদ দিলে এক ইঞ্জিন বিশিষ্ট মাঝারি ওজনের বহুমুখী এই যুদ্ধবিমানটির একমাত্র গ্রাহক পাকিস্তান। ‘সিঁদুর’-এ এর পারফরম্যান্স ছিল জঘন্য। লড়াই চলাকালীন একাধিক জে-১০সি হারানোর কথা স্বীকার করে নেয় ইসলামাবাদ। রাওয়ালপিন্ডির রাফাল ধ্বংসের ভুয়ো খবরে ড্রাগনের যোগ দেওয়ার সেটাই সবচেয়ে বড় কারণ, বলছেন বিশ্লেষকেরা।
বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী সময়ে মুখ খোলে ফরাসি প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। প্যারিসের গোয়েন্দাদের দাবি, গত কয়েক বছর ধরেই সস্তা দরের জে-১০সিকে রাফালের বিকল্প হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে চিন। সেই কারণেই দাসোর জেট ধ্বংসের আষাঢ়ে গল্প ছড়িয়ে দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে তারা। শুধু তা-ই নয়, কৃত্রিম মেধাভিত্তিক ছবি বা ভিডিয়োগুলি পোস্ট করতে সমাজমাধ্যমে কয়েক হাজার ভুয়ো অ্যাকাউন্টও খোলে বেজিং। যদিও তাতে জে-১০সির চাহিদা বেড়েছে, এমনটা নয়।
গত বছরের জুনে ‘অপারেশন সিঁদুরে’ রাফালের পারফরম্যান্স নিয়ে বিবৃতি দেন জেটটির নির্মাণকারী সংস্থা দাসো অ্যাভিয়েশনের চেয়ারম্যান ও চিফ এক্জ়িকিউটিভ অফিসার (সিইও) এরিক ট্র্যাপিয়ার। তাঁর কথায়, ‘‘পাকিস্তানে সামরিক অভিযান চলাকালীন আমাদের তৈরি একটি যুদ্ধবিমান হারায় ভারত। তবে তার কৃতিত্ব ইসলামাবাদের বিমানবাহিনীর নয়। কারিগরি ও প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণেই সংশ্লিষ্ট জেটটি ভেঙে পড়ে।’’
এরিকের এ-হেন মন্তব্যের প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছে ফরাসি প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের শীর্ষকর্তাদের গলায়। অন্য দিকে ভারতীয় বিমানবাহিনীর রাফাল ধ্বংসের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে সেখানকার ওয়েব-পোর্টাল অ্যাভিয়ন ডি চ্যাসে। তাদের দাবি, যোদ্ধা-পাইলটদের প্রশিক্ষণ চলাকালীন দাসোর জেটটি ভেঙে পড়ে। ওই সময় সেটি ১২ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতায় উড়ছিল। ফলে পাক রেডারে তার ধরা পড়ার প্রশ্নই ওঠে না।
ফরাসি পোর্টাল অ্যাভিয়ন ডি চ্যাসের প্রতিবেদনের সঙ্গে অবশ্য দাসো সম্পূর্ণ সহমত নয়। রাফাল নির্মাণকারী সংস্থাটির দাবি, সিঁদুর অভিযান চলাকালীনই লড়াকু জেট হারায় ভারত। ওই ঘটনার সঙ্গে প্রশিক্ষণের কোনও যোগ নেই। তবে যুদ্ধবিমান ধ্বংসের সংখ্যার ব্যাপারে একই কথা বলতে শোনা গিয়েছে তাদের। গত জুলাইয়ে তাতে সিলমোহর দেন খোদ নয়াদিল্লির প্রতিরক্ষা সচিব আরকে সিংহ। একটি টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাফালের প্রসঙ্গ তোলেন তিনি।
প্রতিরক্ষা সচিব আরকে সিংহের দাবি, ‘‘সিঁদুর শুরুর প্রথম দিন থেকেই ভারতের ফরাসি জেট ধ্বংসের বিভিন্ন রকমের সংখ্যা দিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। কখনও দুই-তিন, কখনও আবার সেটা বাড়িয়ে চার-পাঁচ পর্যন্ত বলা হচ্ছে। এমনকি রাফাল ডাহা ফেল করায় নাকি ফরাসি সংস্থা দাসোর সঙ্গে বচসায় জড়িয়েছেন এ দেশের বায়ুসেনার অফিসারেরা। এগুলিকে মজা হিসাবে নেওয়া যেতে পারে। কারণ, মিথ্যা বা ভুয়ো খবর বেশি দিন স্থায়ী হয় না।’’
সাবেক সেনাকর্তাদের কথায়, রাফাল নিয়ে পাকিস্তানের ফাঁকা আওয়াজ ধরা পড়ে গত বছরের সেপ্টেম্বর। ওই সময় ১১৪টি ফরাসি জেট আমদানির প্রস্তাব প্রতিরক্ষা মন্ত্রকে জমা করে ভারতীয় বিমানবাহিনী। কয়েক দিনের মধ্যেই জানা যায়, নয়াদিল্লির মতো বায়ুসেনার বহরে রাফাল যুদ্ধবিমান যুক্ত করার ব্যাপারে আগ্রহী ইন্দোনেশিয়া। সেই লক্ষ্যে ফ্রান্সের সঙ্গে ইচ্ছাপত্রে (লেটার অফ ইনটেন্ট) সই করেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্বাধিক মুসলিম জনসংখ্যার ওই দেশ।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির তথ্য অনুযায়ী, জাকার্তা ইতিমধ্যেই দাসোকে ২৪টি জেটের বরাত দিয়েছে। সেই সংখ্যা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা আছে তাদের। যদিও সরকারি ভাবে এই নিয়ে কোনও বিবৃতি দেয়নি ইন্দোনেশিয়া। অন্য দিকে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বহরে থাকা ৩৬টি যুদ্ধবিমানের আধুনিকীকরণের কাজ শুরু করার কথা আছে সংশ্লিষ্ট ফরাসি সংস্থার। সেই প্রক্রিয়া শেষ হলে রাফালের শক্তি যে কয়েক গুণ বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।
দাসোর থেকে কেনা ভারতের রাফাল জেটগুলি এফ-৩ শ্রেণির। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে খবর, আধুনিকীকরণের মাধ্যমে সেগুলিকে এফ-৪ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করবে নির্মাণকারী ফরাসি সংস্থা। তবে তার জন্য অবশ্য অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে না নয়াদিল্লিকে। কারণ, পূর্ববর্তী চুক্তিতেই এ ব্যাপারে সবুজ সঙ্কেত দিয়েছিল দাসো অ্যাভিয়েশন। সেটা মেনেই এ দেশের বিমানবাহিনী সেই সুবিধা পেতে চলেছে বলে জানা গিয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতসফরে আসছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকরঁ। প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করার কথা রয়েছে তাঁর। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, নয়াদিল্লি এসে রাফাল চুক্তি চূড়ান্ত করবেন তিনি। সংশ্লিষ্ট লেনদেনের আর্থিক দিকটি অবশ্য সে ভাবে প্রকাশ্যে আসেনি। তবে সেটা যে কয়েক হাজার কোটি ডলার হতে চলেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
সূত্রের খবর, ১১৪টি রাফালের মধ্যে ফ্রান্সের দাসোর কারখানায় তৈরি হবে ১৮টি জেট। বাকিগুলি ভারতের মাটিতে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে যুদ্ধবিমানটির প্রযুক্তি হস্তান্তর করতে পারে মাকরঁ সরকার। পাশাপাশি, এতে অন্তত ৩০ শতাংশ দেশীয় উপাদান থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট জেটটিতে বিদেশি হাতিয়ারের পাশাপাশি দেশি ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করতে চাইছে এ দেশের বায়ুসেনা। তবে সেই অনুমতি মিলবে কি না, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
২০১৬ সালে ৩৬টি রাফালের জন্য ৮৭০ কোটি ডলার খরচ করেছিল কেন্দ্র। এ ছাড়া গত বছর ২৬টি রাফাল-এম (মেরিন) আমদানির ব্যাপারে ছাড়পত্র দেয় মোদী মন্ত্রিসভা। বিমানবাহী রণতরীতে সংশ্লিষ্ট জেটগুলিকে ব্যবহার করবে ভারতীয় নৌসেনা। এর জন্য ৬৩ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে বলে জানা গিয়েছে। এ বারের যুদ্ধবিমানের চুক্তি অবশ্য আরও বড়। আর সেটা ৩,৬০০ কোটি ডলার ছাড়াতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের বড় অংশই মনে করেন, ‘সিঁদুরে’ সম্ভবত কোনও রাফালের গায়ে টোকা পর্যন্ত মারতে পারেনি পাক বিমানবাহিনী। সেই কারণেই ফরাসি জেটটিকে এতটা ভরসা করছে ভারতীয় বায়ুসেনা। এ ব্যাপারে নয়াদিল্লির বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল এপি সিংহের একটি মন্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কথায়, ‘‘শত্রু যদি রাফাল ভেঙেছে ভেবে খুশি থাকতে চায় তো থাকুক। আমরা ওদের কী হাল করেছি, সেটা তো দুনিয়া দেখেছে। ইসলামাবাদের ১১টি বিমানঘাঁটি উড়িয়েছে আমাদের ফৌজ।’’
সব ছবি: সংগৃহীত।