নয়ডা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বা জেওয়ার বিমানবন্দর। উত্তরপ্রদেশের গৌতম বুদ্ধ নগর জেলার জেওয়ারের কাছে নির্মীয়মাণ বিমানবন্দরটিই হতে চলেছে ভারতের বৃহত্তম বিমানবন্দর। প্রথম পর্যায়ে বার্ষিক ১ কোটি ২০ লক্ষ যাত্রী পরিচালনার জন্য বিমানবন্দরটি তৈরি হচ্ছে। পরবর্তী পর্যায়ে ২০৫০ সালের মধ্যে এটি বার্ষিক ৬-১২ কোটি যাত্রীকে পরিচালনা সক্ষম হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিকল্প হিসাবে গড়ে তোলা হচ্ছে জেওয়ার বিমানবন্দরকে। নয়ডার বিমানবন্দরটি ইন্দিরা গান্ধী এবং হিন্ডন বিমানবন্দরের পর দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলের তৃতীয় বাণিজ্যিক বিমানবন্দর হিসাবে গড়ে উঠছে। বিমানবন্দর তৈরির কাজ বর্তমানে জোরকদমে চলছে।
জেওয়ারে যখন ভারতের বৃহত্তম বিমানবন্দরটি গড়ে উঠতে শুরু করে, তখন স্থানীয় কৃষকদের ১২,০০০ একর উর্বর জমি ছেড়ে দিতে হয়েছিল। বিনিময়ে ক্ষতিপূরণ হিসাবে তাঁরা পেয়েছিলেন কোটি কোটি টাকা।
অনেক পরিবারের কাছে সেই জমিগুলির পরিবর্তে পাওয়া টাকা ছিল এমন সম্পদ, যা তারা জীবনেও কল্পনা করেনি। টাকা পেয়ে ওই কৃষক পরিবারগুলির জীবনযাত্রাতেও পরিবর্তন এসেছিল। কেউ বড় বাড়ি হাঁকিয়েছিলেন, আবার কেউ ট্র্যাক্টর বিক্রি করে কিনেছিলেন বিলাসবহুল গাড়ি। হাতে উঠেছিল অত্যাধুনিক আইফোন।
জেওয়ারের গ্রামগুলিতে কৃষকদের জীবনযাত্রার পরিবর্তনে অনেকেরই চোখ টাটিয়েছিল। কৃষকদের সমৃদ্ধি দেখে খুশিও হয়েছিলেন অনেকে। কিন্তু বিমানবন্দরের প্রত্যাশিত উদ্বোধনের ঠিক আগে জেওয়ারের কৃষকদের সেই সমৃদ্ধি, সেই উজ্জ্বলতা যেন কিছুটা নিষ্প্রভ এবং ক্ষীণ। তেমনটাই উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া টুডে’র প্রতিবেদনে।
জেওয়ারেরই এক কৃষক পরিবারের সন্তান কয়েক বছর আগে ক্ষতিপূরণের টাকা আসার পর ৯০,০০০ টাকা দিয়ে স্মার্টফোন কিনেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই মোবাইলের স্ক্রিন এখন নষ্ট হয়ে গিয়েছে। চার্জারও খারাপ। ফোন মেরামতের বা চার্জার কেনার টাকা না থাকায় এখন একটি অস্থায়ী চার্জার দিয়েই ওই ভাঙা ফোন চালান তিনি। তরুণের কথায়, ‘‘আমি ৯০,০০০ টাকার একটি ফোন কিনেছিলাম। এখন আর আমি এটা ঠিক করতে পারছি না।’’
অন্য এক কৃষক জমির পরিবর্তে ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েই একটি দামি গা়ড়ি কিনেছিলেন। সেই গাড়ি চড়েই মাঠেঘাটে যেতেন তিনি। কিন্তু এখন গাড়ি থাকলেও পেট্রল কেনার টাকা তাঁর নেই। ইসমাইল বলেন, ‘‘আমরা গাড়ি চড়ে মাঠে ঘুরতে যেতাম। কিন্তু এখন আর আমাদের কাছে পেট্রলের জন্যও টাকা অবশিষ্ট নেই।’’
টাকা হাতে পেয়ে আরও একটি জিনিস কিনেছিলেন ওই কৃষক। একটি আইফোন ১১ প্রো ম্যাক্স। লক্ষাধিক টাকার সেই ফোন এখন বিক্রি করে দিতে হয়েছে তাঁকে। পরিবর্তে কিনেছেন একটি সস্তা অ্যান্ড্রয়েড ফোন।
তবে বিমানবন্দর তৈরির জমি দেওয়ার পরিবর্তে টাকা পেয়ে সঠিক বিনিয়োগ করেছেন এমন কৃষকও রয়েছেন জেওয়ারে। তবে সে সংখ্যা খুবই কম। তাঁদেরই এক জন ঠাকুর ধর্মপাল সিংহ। টাকা পেয়ে দুধের ব্যবসা শুরু করেছেন তিনি। বিভিন্ন জায়গায় দুধ সরবরাহ করেন।
গ্রামের বুকে সাড়ে তিন কোটি টাকা দিয়ে বাড়িও বানিয়েছেন ধর্মপাল। সেই বাড়ির অন্দরসজ্জা বিলাসবহুল হোটেলের মতো। মার্বেলের মেঝে, আড়ম্বরপূর্ণ বসার ঘর, আধুনিক চিমনি দিয়ে সজ্জিত রান্নাঘর— কী নেই সেখানে!
ধর্মপালের কথায়, ‘‘আমি এখন দুধ বিক্রি করি এবং ব্যবসা করি। বাড়ির পাশাপাশি দু’টি গাড়িও আছে। আমি খুশি। এটা ঈশ্বরের করুণা।’’ ধর্মপাল জানিয়েছেন, ক্ষতিপূরণের টাকা কী ভাবে বুদ্ধির সঙ্গে বিনিয়োগ করে বহু গুণ করেছেন তিনি।
কিন্তু ধর্মপালের যেখানে বাড়ি সেই কলোনিরই অন্য অংশে ভিন্ন চিত্র। পাড়ার পার্কে রোজ ৫০ জনেরও বেশি যুবক-প্রৌঢ়-বৃদ্ধের জমায়েত হয়। তাঁদের অনেকের পরিবারও কোটি কোটি টাকা পেয়েছিল জমির জন্য। কিন্তু এখন সঞ্চয় তলানির দিকে।
পার্কে বসা গ্রামবাসীদের অনেকেরই দাবি, তাঁদের সঞ্চয় শেষ হয়ে গিয়েছে। টাকা আর প্রায় নেই বললেই চলে। টাকা পেয়ে জীবনযাত্রায় যে পরিবর্তন তাঁরা এনেছিলেন, তা আর টানতে পারছেন না। ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছেন।
এই দলে যেমন এমএ পাশ যুবক রয়েছেন, তেমনই রয়েছেন বিটেক পাশ করে আগে চাকরি করা যুবক। কিন্তু ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়ে তাঁদের কেউ পড়াশোনা, কেউ চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। এখন তাঁরা অনেকেই বেকার। অনেকে মদ্যপান, অলসতা এবং জুয়ার শিকার। জমানো টাকা ভাঙিয়ে কোনও মতে সংসার চলছে তাঁদের।
২০১৮ সালে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার প্রথম পর্যায়ে, কৃষকদের প্রতি বিঘায় প্রায় ২০ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে চতুর্থ পর্যায়ে অর্থের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। বিঘাপ্রতি ৪০ লক্ষ করে পাচ্ছেন কৃষকেরা।
অধিগ্রহণের প্রথম পর্যায়ে যাঁরা জমি বিক্রি করেছিলেন, তাঁরা এখন দাবি তুলেছেন অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণের। তাঁদের যুক্তি, প্রাথমিক পর্যায়ে যে টাকা দেওয়া হয়েছিল, তা তাঁদের জীবন কাটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
বহু প্রজন্ম ধরে জমি ছিল জেওয়ারের কৃষকদের ভিত্তি এবং একমাত্র স্থায়ী সম্পদ, যা খাদ্য, আয় এবং নিরাপত্তা— তিনই দিত। সেই সম্পদের পরিবর্তে ক্ষতিপূরণ হিসাবে এককালীন টাকা পেয়েছিলেন ওই কৃষকেরা। কিন্তু এই অর্থ নিয়ে ভাল এবং নতুন পরিকল্পনা করার পরিবর্তে অনেকেই দু’হাতে টাকা উড়িয়েছেন।
স্থানীয় প্রশাসনও পুরো বিষয়টিতে কৃষকদের উপরেই দায় চাপিয়েছে। জেওয়ারের বিধায়ক ধীরেন্দ্র সিংহ জানিয়েছেন, ‘‘জমির জন্য সরকার কৃষকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে পারে। কিন্তু তারা কী ভাবে সেই অর্থ ব্যয় করবে তা তাঁদের উপরই নির্ভর করে।’’
এই প্রসঙ্গে আর্থিক বিশেষজ্ঞদের দাবি, মানুষ ৩০-৪০ বছর আগে যে বিলাসবহুল জিনিসপত্রের কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারত না, তা কেনার টাকা হাতে চলে এলে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। মানুষকে তাদের অর্থ বুদ্ধি করে বিনিয়োগ করতে হবে। এ নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে সঠিক পথ দেখানোর পরামর্শও দিয়েছেন তাঁরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জেওয়ারের ঘটনা একটি কঠিন সত্যও সামনে এনেছে। আর তা হল অর্থ চিরস্থায়ী নয়। কৃষকদের হাতে যেমন কোটি কোটি টাকা এসেছিল, তেমনই অনেক পরিবারের হাত থেকে তা চলেও গিয়েছে। স্বেচ্ছায়, দ্রুত এবং কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই ব্যয়ের কারণেই তা হয়েছে। অন্য দিকে, যাঁরা পরিকল্পনা করে বিনিয়োগ করেছিলেন, তাঁরা সে টাকা থেকে আরও অর্থ উপার্জন করেছেন।
জেওয়ার এখন কেবল একটি বিমানবন্দরের গল্প নয়। এটি এখন হঠাৎ পাওয়া সম্পদের অপচয় করা এবং নীতিগত সুরক্ষার অভাব বোধ করা কিছু কৃষকের গল্পও বটে।
সব ছবি: সংগৃহীত।