Plum Island

বিদঘুটে অপার্থিব প্রাণী থেকে মহামারি ছড়ানো উকুন! ‘শয়তানের দ্বীপে’ মার্কিন গবেষণাগার ঘিরে আজও কাটেনি রহস্য

সরকারি গবেষণাগারের আড়ালে প্লাম আইল্যান্ডে যে জীবাণু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে, তা নিয়ে জল্পনার শেষ নেই। ১৯৭১ সালের নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি প্রবন্ধে এটিকে ‘শয়তানের দ্বীপ’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়। কারণ এই দ্বীপে পশু-পাখিদের শরীরে থাকা জীবাণুর মারাত্মক নমুনা নিয়ে গবেষণা চলত বলে দাবি।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৩৫
০১ ১৬
Plum Island

নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ডের উপকূলে অবস্থিত ৮৪০ একরের দ্বীপ। সেই ছোট্ট দ্বীপটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করার জন্য সমস্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মার্কিন সরকার। রহস্যের আকর এই দ্বীপটি। খাতায়-কলমে ১৯৫৪ সালে অ্যানিম্যাল ডিজ়িজ় সেন্টার (পিআইএডিসি)-এর গোড়াপত্তন হয়েছিল দ্বীপটিতে। দ্বীপের নাম প্লাম আইল্যান্ড।

০২ ১৬
Plum Island

মারাত্মক ক্ষতিকর ভিন্‌দেশি রোগ, বিশেষ করে ফুট-অ্যান্ড-মাউথ ডিজ়িজ় (এফএমডি) নিয়ে গবেষণার জন্য বেছে নেওয়া হয় এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপটিকে। যেহেতু এফএমডি অত্যন্ত সংক্রামক, তাই যুক্তরাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে এর উপর গবেষণা করা নিষিদ্ধ। সে কারণে দ্বীপটিকে বেছে নেওয়া হয় সংক্রামক রোগের গবেষণার জন্য।

০৩ ১৬
Plum Island

সাল ২০০৮। জুলাই মাস। নিউ ইয়র্কের মন্টেকের জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকত। সৈকতে পড়ে থাকতে দেখা যায় একটি জন্তুর মৃতদেহ। জন্তুটিকে দেখলে আঁতকে উঠবেন যে কেউ। এক ঝলক দেখলে মনে হবে যেন কোনও শিকারি কুকুর। অদ্ভুত দেখতে জন্তুটির মুখের ভিতর থেকে ধারালো দাঁত ঠিকরে বেরিয়ে ছিল। চেহারা বিবর্ণ, কারণ তত ক্ষণে দেহে পচন ধরতে শুরু করেছিল। সেই বিকটদর্শন জন্তুটির নাম দেওয়া হয় ‘মন্টেক মনস্টার’।

Advertisement
০৪ ১৬
Plum Island

এই ঘটনার সঙ্গে নাম জড়িয়ে যায় প্লাম আইল্যান্ডের। এ-ও জল্পনা ছড়ায় যে, প্লাম আইল্যান্ডে ‘অ্যানিম্যাল ডিজ়িজ় সেন্টার’ (যেখানে বিভিন্ন জন্তুর রোগ নিয়ে গবেষণা করা হয়) থেকে জন্তুটি বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু ওই কেন্দ্রে নিরাপত্তা এতটাই আঁটসাঁট যে, সেখান থেকে ‘মন্টেক মনস্টার’ বেরোনোর কোনও সম্ভাবনাই নেই বলে দাবি করেন কর্তৃপক্ষ।

০৫ ১৬
Plum Island

এই দাবিকে ষড়যন্ত্রতত্ত্ববাদীরা ফুৎকারে উড়িয়ে দেন। তাঁদের অনেকেরই দাবি, অদ্ভুতদর্শন জীবটির আঁতুড়ঘর প্লাম আইল্যান্ডের গবেষণাগার। সেখানে জীবজন্তুর রোগ নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি সংকর প্রজাতির জীবজন্তু ও জৈব অস্ত্র তৈরি করে মার্কিন সরকার। গুজব এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ভেসে বেড়ায় এক টুকরো ভূখণ্ডকে ঘিরে।

Advertisement
০৬ ১৬
Plum Island

সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী প্লাম আইল্যান্ডে উত্তর আমেরিকার একমাত্র ফুট-অ্যান্ড-মাউথ ডিজ়িজ় ভ্যাকসিন ব্যাঙ্কটি রয়েছে। সেখানে এই রোগের ৬০টিরও বেশি ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের জীবাণু মোকাবিলার জন্য তৈরি বিভিন্ন ধরনের ভ্যাকসিন সংরক্ষণ করা হয়। যদি রোগটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা মেক্সিকোয় ছড়াতে শুরু করে, তবে সেই ভ্যাকসিনগুলি প্রয়োগ করা যেতে পারে। আফ্রিকান সোয়াইন ফিভারের মতো পশুর ভিন্‌দেশি রোগ নিয়ে গবেষণাগার রয়েছে এখানে।

০৭ ১৬
Plum Island

সরকারি গবেষণাগারের আড়ালে প্লাম আইল্যান্ডে যে জীবাণু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে, তা নিয়ে জল্পনার শেষ নেই। ১৯৭১ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি প্রবন্ধে এটিকে ‘শয়তানের দ্বীপ’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়। কারণ এই দ্বীপে পশু-পাখিদের শরীরে থাকা জীবাণুর মারাত্মক নমুনা নিয়ে গবেষণা চলত।

Advertisement
০৮ ১৬
Plum Island

প্লাম আইল্যান্ডের ‘বিল্ডিং ২৫৭’ নিয়ে মাইকেল ক্যারল নামে এক লেখক একটি বই লিখেছিলেন। সেখানে দাবি করা হয় যে, এই দ্বীপে টিক বা উকুনের মাধ্যমে ছড়ানো যায় এমন জীবাণু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলত। তত্ত্বটি হল— পাখি বা হরিণের মাধ্যমে গবেষণাগার থেকে সংক্রামিত সেই উকুন কোনও ভাবে মূল ভূখণ্ডে চলে আসে। সেখান থেকেই লাইম ডিজ়িজ় ছড়িয়ে পড়ে।

০৯ ১৬
Plum Island

শোনা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ‘অপারেশন পেপারক্লিপ’-এর মাধ্যমে জার্মান বিজ্ঞানী এরিক ট্রাবকে আমেরিকায় আনা হয়েছিল। ‘অপারেশন পেপারক্লিপ’ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরবর্তী সময়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা পরিচালিত একটি অত্যন্ত গোপনীয় ও বিতর্কিত অভিযান। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল নাৎজ়ি জার্মানির শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং প্রযুক্তিবিদদের খুঁজে বার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা।

১০ ১৬
Plum Island

এই অভিযানের মাধ্যমে প্রায় ১৬০০ জার্মান বিজ্ঞানীকে সপরিবারে মার্কিনভূমে উড়িয়ে আনা হয়। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ট্রাব। তিনি নাৎজ়িদের হয়ে জৈব অস্ত্র নিয়ে কাজ করতেন। জার্মানির অন্যতম শক্তিশালী ও কুখ্যাত নেতা, হিটলারের অনুগত হেনরিখ হিমলারের অধীনে থাকা একটি গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান ছিলেন।

১১ ১৬
Plum Island

ট্রাবের প্রধান কাজ ছিল পশুপাখির মাধ্যমে ছড়ানো যায় এমন জীবাণু নিয়ে গবেষণা করা। মূল লক্ষ্য ছিল এমন সব জৈব অস্ত্র তৈরি করা, যা শত্রু পক্ষের গবাদি পশু ও খাদ্য সরবরাহ ধ্বংস করে দিতে পারে। বিশেষ করে পোকামাকড় (যেমন উকুন বা টিক) ব্যবহার করে রোগ ছড়ানোর বিষয়ে তিনি বিশেষজ্ঞ ছিলেন।

১২ ১৬
Plum Island

তিনিও তাঁর পূর্ববর্তী গবেষণাগারের সমস্ত তথ্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তাঁর গবেষণার একটি অংশ ছিল জীবাণু ছড়ানোর মাধ্যম বা অস্ত্র হিসাবে উকুন ও পোকামাকড় ব্যবহার করা। এটি ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকদের অন্যতম প্রধান যুক্তি। দ্বীপটির ইতিহাসে ট্রাবের নাম বার বার ফিরে আসে। ১৯৫০ সালে যখন প্লাম দ্বীপে অ্যানিম্যাল ডিজ়িজ় সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছিল, তখন ট্রাব সেখানে জৈব অস্ত্র গবেষণার পরিকাঠামো তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে অনেকেই দাবি করেন।

১৩ ১৬
Plum Island

প্লাম আইল্যান্ড এবং লাইম ডিজ়িজ় ছড়ানোর সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক মতের চেয়ে রহস্য বা ষড়যন্ত্রতত্ত্বগুলি বেশি প্রচলিত। এই রহস্যের মূল কারণ হল প্লাম আইল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান এবং সেখানে পরিচালিত অত্যন্ত গোপনীয়তার মোড়কে থাকা গবেষণা।

১৪ ১৬
Plum Island

১৯৭৫ সালে কানেটিকাটের ওল্ড লাইম শহরে প্রথম এই রোগটি ব্যাপক ভাবে ধরা পড়ে। কাকতালীয় ভাবে, প্লাম আইল্যান্ড অ্যানিম্যাল ডিজ়িজ় সেন্টারটি এই শহরের ঠিক উল্টো দিকে, সমুদ্রের মাঝে অবস্থিত। মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, পরীক্ষাগারের পাশের শহরেই কেন এই রহস্যময় রোগটি প্রথম দেখা দিল?

১৫ ১৬
Plum Island

গবেষণাগার থেকে কোনও ভাবে পাখি বা হরিণের মাধ্যমে সংক্রামিত উকুন বা এঁটুলি মূল ভূখণ্ডে চলে আসার ফলে পরবর্তী কালে মানুষের মধ্যে লাইম রোগ ছড়িয়ে পড়ে বলে মনে করা হয়। আধুনিক বিজ্ঞান অবশ্য প্লাম আইল্যান্ড থেকে রোগ ছড়ানোর তত্ত্বকে নাকচ করে দেয়। গবেষকেরা মিউজ়িয়ামে সংরক্ষিত ১০০ বছরের পুরনো উকুনের নমুনা পরীক্ষা করে দেখেছেন যে, লাইম রোগের জীবাণু আমেরিকায় এই গবেষণাগার তৈরির অনেক আগে থেকেই মজুত ছিল।

১৬ ১৬
Plum Island

বর্তমানে প্লাম দ্বীপের পরীক্ষাগারটি বন্ধ করে এর যাবতীয় গবেষণা কানসাসে নতুন গবেষণাগারে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে দ্বীপটি সাধারণের জন্য নিষিদ্ধ থাকায় এটি এখন একটি অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। লাইম রোগের সঙ্গে প্লাম দ্বীপের সরাসরি যোগাযোগের কোনও অকাট্য প্রমাণ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে পরীক্ষাগারের গোপনীয়তা আজও আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় একটি রহস্য।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
আরও গ্যালারি