লতা মঙ্গেশকর এবং আশা ভোসলে— এই নাম দু’টি সঙ্গীতজগতে পিঠোপিঠি ভাবে উল্লেখ করা হত। প্রিয় লতাদিদির থেকে আশা ছিলেন চার বছরের ছোট। কিন্তু পিতৃবিয়োগের পর দুই বোন সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন হাসিমুখে। শৈশব থেকে পরস্পরকে চোখে হারাতেন তাঁরা। কিছুটা ব্যক্তিগত কারণে আবার অনেকটাই গুঞ্জন ছড়িয়ে যাওয়ায় দুই বোনের দূরত্বও আলোচনায় এসেছিল। কিন্তু তাঁরা ছিলেন অভিন্নহৃদয় সখী। লতা-আশার মৃত্যুও তাঁদের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ভাঙতে পারেনি।
১৯২৯ সালে জন্ম লতার। তার চার বছর পর ১৯৩৩ সালে জন্ম আশার। বাবা-মা, চার বোন, এক ভাই মিলে তৎকালীন দেশীয় রাজ্য সাঙ্গলীর গোয়ার নামে এক জনপদে (পরে মহারাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত) থাকতেন তাঁরা। আশার যখন মাত্র ৯ বছর বয়স, তখন তাঁর পিতা প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর মারা গিয়েছিলেন।
দীননাথের মৃত্যুর পর পুণে থেকে কোলহাপুর হয়ে অবশেষে মুম্বইয়ে গিয়ে থিতু হয়েছিল মঙ্গেশকর পরিবার। পরিবারের ভার গিয়ে পড়েছিল লতা এবং আশার কাঁধে। চার বছরের ছোট্ট বোনটিকে সব সময় আগলে রাখার চেষ্টা করতেন লতা।
আশা যখন পেশাদার ভাবে গান গাওয়া শুরু করেছিলেন, তখন লতা খ্যাতির চূড়ায় না পৌঁছোলেও সঙ্গীতজগতে নিজের অবস্থান শক্ত করে ফেলেছিলেন। ১৯৪৯-’৫০ সালে লতা সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তখন আশা সুযোগ পাচ্ছিলেন পার্শ্বচরিত্রদের কণ্ঠে গান গাওয়ার। প্রধান নায়িকার গানের জন্য লতাকেই প্রথম পছন্দ হিসাবে রাখতেন সঙ্গীত পরিচালকেরা।
সঙ্গীতজগতে নিজের জায়গা তৈরি করার জন্য আরও ১০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল আশাকে। ওপি নইয়র, শচীন দেব বর্মণ, রাহুল দেব বর্মণের সুরে গান গাওয়ার পর সফল হতে শুরু করেছিলেন আশা। কিন্তু কানাঘুষো শোনা যেতে থাকে, সেই সময় প্রিয় লতাদিদির সঙ্গে দূরত্বও বেড়ে গিয়েছিল আশার।
আশা তখন মাত্র ১৬ বছরের কিশোরী। তাঁর ব্যক্তিগত সচিব গণপতরাও ভোসলের প্রেমে পড়েছিলেন তিনি। দু’জনের বয়সের পার্থক্য ছিল ২০ বছরের। গণপতরাওয়ের সঙ্গে আশার সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি আশার পরিবার।
পরিবারের অমতেই গণপতরাওকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আশা। ১৯৪৯ সালে গণপতরাওকে বিয়ে করেছিলেন আশা। কিন্তু বিয়ের পর বাপের বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কে চিড় ধরতে থাকে সঙ্গীতশিল্পীর। গণপতরাও চাইতেন না যে, আশা তাঁর বাপের বাড়ির কোনও সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন।
অন্য দিকে, দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গেও তা নিয়ে আশার বিবাদ লেগে থাকত। এক সাক্ষাৎকারে আশা বলেছিলেন, ‘‘লতাদিদি আমার সঙ্গে বহু দিন কথা বলেননি। প্রেম করে বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু সেই বিয়ে সুখের ছিল না। আমার শ্বশুরবাড়ি খুব রক্ষণশীল ছিল। এক গায়িকা তাঁদের বাড়ির পুত্রবধূ হয়েছে, তা মেনে নিতে পারেননি কেউ।’’ শ্বশুরবাড়িতে অধিকাংশ সময় মানসিক নির্যাতনের শিকার হতেন বলেও জানিয়েছিলেন আশা।
অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় শ্বশুরবাড়ি থেকে দুই সন্তানকে নিয়ে আবার বাপের বা়ড়ি ফিরে গিয়েছিলেন আশা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই বোনের মনোমালিন্যের ক্ষতও মিলিয়ে যেতে শুরু করেছিল। অনেকে মনে করতেন, লতা এবং আশার মধ্যে এককালে পেশাদারি প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গিয়েছিল।
বলিউডের সঙ্গীতজগতে যখন লতার একচ্ছত্র আধিপত্য, তখন আশা নিজের জায়গা তৈরির চেষ্টা করছিলেন। সেই সময় বহু সঙ্গীত পরিচালক মনে করতেন, লতা তাঁর প্রভাব ব্যবহার করে আশার কেরিয়ার নাকি কিছুটা সীমাবদ্ধ করে ফেলেছিলেন। লতা প্রধানত গজ়ল, ভজন এবং ধীরগতির মেলোডি গান গাইতেন। কিন্তু আশা সুযোগ পেতেন ক্যাবারে, ‘আইটেম সং’ বা পাশ্চাত্য ধাঁচের গান গাওয়ার।
একাংশের দাবি, লতা এবং আশার মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক ওপি নইয়র। আশার কেরিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নায়ার নাকি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, লতাকে দিয়ে কখনও গান গাওয়াবেন না। আশাকে তিনি লতার বিকল্প হিসাবে নয়, বরং লতার চেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করতেন। এই পেশাদার বিভাজনই নাকি দুই বোনের মধ্যে মানসিক ভাবে দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছিল।
তবে, পেশাদার কারণে লতা এবং আশার মনোমালিন্যের ঘটনা অনেকটা রটনাও বটে। তৎকালীন পত্রিকায় চটকদার খবর ছাপতেও কেউ কেউ দুই বোনের সম্পর্ক নিয়ে কাটাছেঁড়া করতেন। কারণ, নইয়র পরবর্তী কালে ‘ফাগুন’ ছবিতে ‘পিয়া পিয়া পিয়া’ গানটি দুই বোনকে দিয়ে গাইয়েছিলেন। নিজেদের কেরিয়ারে বহু গান ডুয়েট গেয়েছিলেন লতা এবং আশা।
শেষজীবনে লতা এবং আশা অধিকাংশ সময় একসঙ্গে কাটাতেন। ২০২২ সালে লতার প্রয়াণে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন আশা। বলিপাড়া সূত্রে খবর, দুই বোনের মৃত্যুতেও কাকতালীয় ভাবে একাধিক মিল ধরা পড়েছে। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন লতা। পরে নিউমোনিয়াও ধরা পড়েছিল তাঁর।
মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল লতাকে। দীর্ঘ ২৮ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। কোভিড-পরবর্তী শারীরিক জটিলতার কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। একাধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়ায় মৃত্যু হয়েছিল লতার।
মৃত্যুর সময় লতার বয়স ছিল ৯২ বছর। শনিবার সন্ধ্যায় বুকে সংক্রমণ হওয়ার কারণে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল আশাকে। লতার মতো তাঁকেও মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল।
হাসপাতালের চিকিৎসকদের মতে, বুকে সংক্রমণ নিয়ে ভর্তি হলেও পরে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সব বিকল হয়ে গিয়েছিল আশার। দিদির মতো একই কারণে মারা গিয়েছেন আশা। মৃত্যুর সময় আশারও বয়স ছিল ৯২ বছর।
সব ছবি: সংগৃহীত।