স্মার্টফোনের স্ক্রিনে আঙুল ছোঁয়ালেই কেল্লাফতে। নিমেষে এক লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন করতে পারেন এ দেশের আমজনতা। বাড়ি ভাড়া থেকে শুরু করে খুচরো বাজারে কেনাকাটা, স্টক-মিউচুয়াল ফান্ডে লগ্নি হোক বা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি জমা করা, বর্তমানে সব কিছুতেই জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে ডিজিটাল লেনদেন। সেখানেই এ বার ‘বড় বদল’ আনার প্রস্তাব দিয়েছে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (আরবিআই)। প্রস্তাব শুনে আঁতকে উঠছেন ব্যবহারকারীরা।
ভারতে ডিজিটাল লেনদেনে বিপ্লব ঘটানো এই ব্যবস্থার নাম ‘ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস’ বা ইউপিআই। এর নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি হল ‘ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া’ (এনপিসিআই)। এটি স্বশাসিত হলেও আরবিআইয়ের নির্দেশ মেনে যাবতীয় কাজ করে থাকে। আর তাই কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের ইউপিআই লেনদেনে লাগাম পরানোর প্রস্তাবে বাড়ছে জল্পনা। কারণ, কিছু ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকার বেশি ডিজিটাল পেমেন্টে এক ঘণ্টা সময় নেওয়ার কথা বলেছে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক।
অত্যন্ত দ্রুত এবং তাৎক্ষণিক ইউপিআই লেনদেনে আরবিআইয়ের লাগাম পরাতে চাওয়ার নেপথ্যে একাধিক যুক্তি রয়েছে। প্রথমত, গত কয়েক বছরে ডিজিটাল অর্থ প্রদানে বেড়েছে সাইবার অপরাধ। অনেকে আবার ‘ডিজিটাল গ্রেফতারি’র শিকার পর্যন্ত হয়েছেন। এ-হেন পরিস্থিতিতে সরকারি-বেসরকারি ব্যাঙ্কে গচ্ছিত গ্রাহকদের অর্থ সুরক্ষিত করতে উদ্যোগী হয়েছে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক। আর তাই ইউপিআইয়ের লেনদেনের গতি শ্লথ করে জালিয়াতি আটকানোর প্রস্তাব দিতে দেখা গিয়েছে তাদের।
হ্যাকারদের হানা সামলাতে ডিজিটাল লেনদেনকে ঠিক কেমন রাখতে চাইছে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক? আরবিআইয়ের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে, কোনও ব্যক্তি ইউপিআইয়ে ১০ হাজার টাকা দিলে, সঙ্গে সঙ্গেই সেটা অপরজনের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢুকবে না। এর জন্য তাঁকে অন্তত এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। এই সময়সীমার মধ্যে লেনদেনটি বাতিল করার সুযোগ পাবেন গ্রাহক। তবে সংশ্লিষ্ট নিয়ম ব্যক্তিবিশেষে প্রযোজ্য হবে বলে মনে করা হচ্ছে। দোকান-বাজার ও স্কুল-কলেজের লেনদেন অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছে আরবিআই। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের কর্তা-ব্যক্তিদের দাবি, দোকান-বাজারে ‘কুইক রেসপন্স’ (কিউআর) কোড স্ক্যান করে বিল মেটাচ্ছে আমজনতা। ফলে সেখানে জালিয়াতির আশঙ্কা প্রায় নেই বললেই চলে। অন্য দিকে পুরনো কায়দা ছেড়ে নতুন পদ্ধতিতে গ্রাহকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফাঁকা করার ফাঁদ পাতছে সাইবার অপরাধীরা। সেই ঘটনাগুলি সমীক্ষা করে ইউপিআই লেনদেনকে ঢেলে সাজার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
আরবিআই ও পুলিশ রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সিঁদ কাটার চেষ্টা করছে না হ্যাকারেরা। উল্টে ছলে-বলে-কৌশলে ইউপিআই ব্যবহারকারীদের নানা ভাবে প্রভাবিত করে টাকা পাঠাতে বাধ্য করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক এই জালিয়াতির নাম দিয়েছে ‘অথরাইজ়ড পুশ পেমেন্ট’ বা এপিপি। এ ক্ষেত্রে ব্যাঙ্কের কর্মী, সরকারি আধিকারিক বা ভুক্তভোগীর পরিচিত কোনও ব্যক্তির নাম নিয়ে ফোন করে ফাঁদ পাতছে অভিযুক্তেরা।
রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক জানিয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীকে কোনও সমস্যা বা দুর্ঘটনার কথা বলে দ্রুত টাকা পাঠানোর আর্জি জানায় জালিয়াত। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, তাদের কথার চাতুরিতে ভুলে তড়িঘড়ি সেই অর্থ ইউপিআই লেনদেন মারফত পাঠিয়ে প্রতারিত হয়েছেন গ্রাহক। এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরবিআইয়ের এক আধিকারিক বলেছেন, ‘‘এটা ডিজিটাল পেমেন্টের কোনও প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়। বরং রিয়েল টাইম বৈশিষ্ট্য। এর ফলে প্রতারণা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়েছে।’’
ইউপিআই লেনদেনের সবচেয়ে বড় অসুবিধা হল, একবার টাকা দেওয়া হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে সেটা অপর ব্যক্তির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে চলে যায়। সংশ্লিষ্ট অর্থ ফেরানোর জন্য গ্রাহক সময় পান মাত্র কয়েক মিনিট। তার মধ্যে টাকা পুনরুদ্ধার না হলে সেটা ফেরত পাওয়া প্রায় অসম্ভব। আমজনতার সঞ্চিত অর্থ সুরক্ষিত রাখতে এ বার এই পদ্ধতিটি বদলাতে চাইছে আরবিআই। আর তাই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবের পক্ষে জনমত সংগ্রহে নেমেছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক।
নতুন নিয়ম চালু হলে, ১০ হাজার টাকার বেশি ব্যক্তিভিত্তিক লেনদেনে অর্থ প্রত্যাহারের যে সুযোগ ইউপিআই গ্রাহক পাবেন, তাকে ‘সোনালি ঘণ্টা’ বা ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বলে উল্লেখ করতে চাইছে আরবিআই। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের কর্তা-ব্যক্তিরা মনে করেন, ততক্ষণে উদ্ভূত পরিস্থিতি যাচাই করার যথেষ্ট সুযোগ তিনি পাবেন। ফলে আর্থিক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে। তা ছাড়া এই ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের সুযোগ পাবে সরকারি-বেসরকারি ব্যাঙ্ক।
নতুন ব্যবস্থায় আরও একটি নিয়ম আনতে পারে আরবিআই। সেটা হল, অস্বাভাবিক এবং সন্দেহজনক পেমেন্টকে ব্যাঙ্ক কর্তৃক চিহ্নিতকরণ। সেখানে দ্বিতীয় বার নিশ্চিত হওয়ার জন্য তথ্য চাইবার অধিকার পাবে তারা। এতে ব্যক্তিভিত্তিক ইউপিআই লেনদেনের গতি কিছুটা শ্লথ হবে ঠিকই, কিন্তু প্রতারণা পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে বলে মনে করে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের আধিকারিকদের কথায়, ‘‘এই বিলম্ব শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়। বরং একে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাটির অভ্যন্তরের একটা আচরণগত সুরক্ষা বলা যেতে পারে।’’
ইউপিআই সংক্রান্ত আরবিআইয়ের এই প্রস্তাব নিয়ে আমজনতার মনে বেশ কিছু প্রশ্ন রয়েছে। অনেকেরই বক্তব্য, কোন যুক্তিতে জালিয়াতির নিম্নসীমা ১০ হাজার টাকা ধরে এগোচ্ছে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক? প্রতারকেরা ফোন করে ভুক্তোভোগীর থেকে তার থেকে কম অর্থ চাইতে পারে। এ ক্ষেত্রে যুক্তি হিসাবে সমীক্ষা রিপোর্টকে তুলে ধরেছে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। সেখানে বলা হয়েছে, ১০ হাজার টাকার বেশি ইউপিআই লেনদেনে জালিয়াতির অভিযোগের পরিমাণ প্রায় ৯৮ শতাংশ।
বর্তমানে ভুল ইউপিআই আইডিতে টাকা পাঠিয়ে দিলে তা ফেরত পাওয়ার সুনির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতি রয়েছে। কারণ, ডিজিটাল অর্থের লেনদেন তাৎক্ষণিক হলেও তা শনাক্ত করার সুযোগ আছে। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি বার টাকা দেওয়ার সময় তৈরি হয় একটি আইডি। এর উপর নজরদারি করতে পারে ব্যাঙ্ক। ফলে ইউপিআই গ্রাহকদের কে, কোথায় টাকা পাঠাচ্ছেন, তার বিস্তারিত তথ্য সব সময়েই থাকে তাদের কাছে।
আর তাই ইউপিআইয়ে ভুল হলেই নিকটবর্তী ব্যাঙ্কের শাখায় যোগাযোগ করতে বলেছে আরবিআই। সেখানে লেনদেনের আইডি, টাকার পরিমাণ, তারিখ, সময় এবং লেনদেনের স্ক্রিনশট দিয়ে আবেদন করতে হবে গ্রাহককে। যাবতীয় তথ্য জমা হয়ে গেলে অর্থ প্রাপক ব্যাঙ্কের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্যার কথা জানাবে ওই আর্থিক প্রতিষ্ঠান। শুধু তা-ই নয়, গ্রাহকের টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধও করতে পারে তারা।
রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের নিয়ম অনুযায়ী, কোনও ব্যাঙ্ক ইউপিআইয়ের অর্থ প্রাপকের সম্মতি ছাড়া তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে কেটে নিতে পারে না। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি রাজি হলে দ্রুত সমস্যার সমাধান হতে পারে। তখন ওই ব্যাঙ্কের থেকে আবেদনকারী গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ফিরে আসবে টাকা। এ ছাড়া টাকা ফেরত পাওয়ার আরও কিছু উপায় রয়েছে।
বর্তমানে অধিকাংশ ইউপিআই অ্যাপে অভিযোগ জানাতে পারেন গ্রাহক। ভুল লেনদেন হয়ে গেলে অ্যাপের ওই অংশে ঢুকে বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারেন তাঁরা। সে ক্ষেত্রে ‘ভুল ব্যক্তির কাছে টাকা পাঠানো হয়েছে’ বা ‘ভুল ইউপিআই আইডি’র মতো বিকল্পগুলি বেছে নিতে হবে তাঁদের। প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হলেই গ্রাহকের ব্যাঙ্ককে সতর্ক করে দেয় সার্ভিস প্রোভাইডার। তৈরি হয় একটি অফিশিয়াল নথিও। এই ধরনের ক্ষেত্রে অর্থ প্রাপককে নানা ভাবে টাকা ফেরত দিতে বাধ্য করতে পারে গ্রাহকের ব্যাঙ্ক।
তবে এই পদ্ধতিগুলির সব ক’টিই বেশ জটিল এবং এতে টাকা ফেরত পাওয়ার আশা অনিশ্চিত। আর তাই আরবিআই প্রস্তাবিত ‘গোল্ডন আওয়ার’ বা ‘সোনালি ঘণ্টা’র নিয়ম চালু হলে গ্রাহকেরা যে বাড়তি সুরক্ষা পাবেন, তা বলাই বাহুল্য। সূত্রের খবর, এই লক্ষ্যে ইউপিআই অ্যাপে একটি ‘আনডু’ বিকল্প আনতে পারে ‘ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া’ বা এনপিসিআই।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, জালিয়াতি আটকাতে ইউপিআইয়ে ব্যক্তিগত লেনদেনে একটি ‘সিকিউরিটি কুলিং পিরিয়ড অ্যাক্টিভ’ টাইমার যুক্ত করার নির্দেশ দিতে চলেছে আরবিআই। সেখানে টাকা দেওয়ার পর ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা ‘সোনালি ঘণ্টা’র প্রতিটা সেকেন্ড দেখতে পাবেন গ্রাহক। এতে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে তাঁর।
তবে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের প্রস্তাব কার্যকর হওয়ার পুরোটাই নির্ভর করছে আমজনতার গ্রহণযোগ্যতার উপর। কারণ, অনেকের এতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ভয় পেয়ে কেউ বার বার ব্যক্তিগত লেনদেন বাতিল করতে পারেন। যা অন্য জটিলতা তৈরি করবে। সেই কথা মাথায় রেখেই গোটা বিষয়টি চালু করতে হবে আরবিআইকে।
সব ছবি: সংগৃহীত ও প্রতীকী।