সাইকেল রিকশার পিছনে রাখা একটি বাক্স। তাতে কুলফি ভরা। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা হরিয়ানার ফতেহাবাদ জেলায় আইসক্রিম, কুলফি ফেরি করে বেড়ান এই বৃদ্ধ। গালে না কামানো পাকা দাড়ি, পরনে সাদা ফতুয়া, গলায় সাদা গামছা। পোশাক বা চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই এককালে সংসদে গিয়ে জনপ্রতিনিধিত্ব করেছেন এই কুলফিবিক্রেতা!
ভাগ্য ও পরিস্থিতির বিপাকে পড়ে আজ পথে পথে সাইকেল রিকশা টেনে আইসক্রিম ও কুলফি বেচেন তিনি। এই কাজ করেই পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে হয় অশীতিপর এই প্রাক্তন সাংসদকে। তিনি দাবায়া রাম। বেনজির ভুট্টোর আমলে পাকিস্তানের নির্বাচিত সাংসদ। এখন ভারতের হরিয়ানার ফতেহাবাদ জেলার বাসিন্দা। দাবায়া রাম ও তাঁর বিশাল পরিবার বর্তমানে রতনগড় গ্রামে থাকেন।
পহেলগাঁওয়ে সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার পর ভিসা নিয়ে ভারতে বসবাসকারী পাকিস্তানি নাগরিকদের পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয় ভারত। ভিসা নিয়ে আসা বহু পাকিস্তানি নাগরিকই এই দেশ ত্যাগ করে সীমান্ত পেরিয়ে নিজের দেশে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ২৪ এপ্রিল থেকে শুরু করে চার দিনের মধ্যে মোট ৫৩৭ জন পাকিস্তানি নাগরিক অটারী-ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে ভারত ছেড়েছেন।
সেই আবহে কেন্দ্রের ভিসা সংক্রান্ত নির্দেশিকার পর স্থানীয় থানায় ডেকে পাঠানো হয়েছিল রাম এবং তাঁর পরিবারকে। কারণ প্রাক্তন এই পাক সাংসদের পরিবারের ছ’জন ভারতীয় নাগরিকত্ব লাভ করেছেন। বাকি ২৮ জন সদস্যের কাছে এখনও পর্যন্ত নাগরিকত্বের শংসাপত্র নেই। দীর্ঘ দিন ধরেই তাঁরা ভারতে স্থায়ী ভাবে বসবাসের জন্য বহু বার আবেদন করেছেন। সরকারি নির্দেশ জারি হওয়ার পর রাম ও পরিবারের মধ্যে আরও এক বার ছিন্নমূল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।
৩৪ জন সদস্যের বিশাল পরিবার দাবায়া রামের। জিজ্ঞাসাবাদের পর ভারত সরকারের অনুমতিতেই তাঁদের ঘরে ফিরে যেতে বলা হয়। ফতেহাবাদ জেলার রাতিয়া তহসিলের রতনগড় গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় রামের পরিবারের ২৮ সদস্যকে।
দেশভাগের দু’বছর আগে পাকিস্তানের পঞ্জাবে জন্ম হয়েছিল রামের। দেশভাগের তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে জীবন কাটাতে হয়েছিল রামের পরিবারকে। সংখ্যালঘুদের উপর তীব্র চাপ সত্ত্বেও ১৯৪৭ সালের পর সে দেশেই থেকে যান তিনি। দাবায়ার পরিবারের উপর তৈরি হয় ধর্মান্তরণের প্রবল চাপ।
পাকিস্তানে জন্মের সময় তাঁর নাম দেশরাজ রাখা হয়েছিল। নির্বাচনের আগে ভোটার কার্ড তৈরি করতে আসা পাক কর্মকর্তারা জোর করে তাঁর নাম পরিবর্তন করে দাবায়া রাম রাখেন। ১৯৮৮ সালের পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্যদের তালিকায় তাঁর নাম আল্লাহ দাবায়া হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে বলপূর্বক ধর্মান্তরণের চেষ্টা করা হয়। এর প্রবল বিরোধিতা করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখেন রাম ও তাঁর পরিবারের সদস্যেরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও প্রতিকূল হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বৃত্তে পা রাখেন রাম। সংসদে স্থান করে নেওয়ার জন্য লড়াই শুরু হয় তাঁর। এক সময় রাজনীতির ময়দানে মুখ হয়ে ওঠা এই হিন্দু নাগরিক শক্তিশালী জনপ্রতিনিধি হয়ে ওঠেন।
১৯৮৮ সালে লোহিয়া এবং বখার জেলায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে পাক সংসদের সদস্য হন রাম। সাংসদ হওয়ার পরেও তাঁর পারিবারিক জীবনে সমস্যার কাঁটা নির্মূল হয়নি। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকেও পাকিস্তানের ধর্মান্ধতার খরতাপে পুড়তে হয়েছে তাঁকে। সঙ্গে মাসুল দিতে হয়েছে তাঁর পরিবারকেও। জনগণের জন্য আইনসভায় প্রবেশের অধিকার পেলেও বিচারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে তাঁকে।
ধর্মীয় মৌলবাদীরা রামের এক আত্মীয়াকে তুলে নিয়ে গিয়ে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেন। এই বিষয়ে বিচার চেয়ে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন তিনি। যদিও আদালত সেই মামলা খারিজ করে দেয়। সেই ঘটনার পর ও দেশে থাকা আর নিরাপদ মনে করেননি রাম। প্রায় ৫২ বছরের বেশি সময় ধরে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে গিয়েছিলেন তিনি। বহু ব্যক্তিগত বিপর্যয় সহ্য করেও নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করতে চাননি তিনি।
বিচারব্যবস্থার প্রতি হতাশ হয়ে এবং পরিবারের নিরাপত্তার ভয়ে ২০০০ সালে সপরিবার পাকিস্তান ছেড়ে চলে আসেন রাম। প্রথমে এক মাসের ভিসায় রোহতকে এক আত্মীয়ের শেষকৃত্যে যোগদানের জন্য ভারতে আসেন তিনি। তার পরে পাকভূমে ফিরে যাওয়ার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়়ে ফেলেন ও হরিয়ানার রতনগড়ে স্থায়ী ভাবে বসবাস করা শুরু করেন তিনি।
ভারতে আসার পর শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। বেঁচে থাকার নিশ্চিন্ত আশ্রয় জুটলেও সংসার চালানোর জন্য আরম্ভ হয় কঠোর পরিশ্রম। বৃদ্ধ বয়সে অন্নচিন্তা দূর করার জন্য তাঁকে বাধ্য হয়ে বেরিয়ে পড়তে হয় রাস্তায়। পাকিস্তানের প্রাক্তন সাংসদ ২৫ বছর ধরে ভারতের রাস্তায় আইসক্রিম ফেরি করে বেড়ান।
রাম তাঁর বিশাল পরিবারকে সাহায্য করার জন্য সাইকেল রিকশা নিয়ে কুলফি এবং আইসক্রিম বিক্রি শুরু করেছিলেন। আজও তিনি ঘুরে ঘুরে কুলফি, আইসক্রিম বিক্রি করে বে়ড়ান। রাম এবং তাঁর সাত সন্তান নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যে বিয়ে করেছেন। তাঁদের পরিবারও ভারতে বাস করতে শুরু করেছে।
পাকিস্তানে এখনও ২৫ একর পৈতৃক জমি রয়েছে রামের। সেই জমিটি বাখর জেলার দরিয়াপুর তহসিলের পাঁচগিরেহ এলাকায় অবস্থিত। জমিটি তাঁর দাদুর নামে কেনা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন এই বৃদ্ধ। রাজনৈতিক দল এবং সম্প্রদায়ের নেতাদের সহায়তায় রাম ভারতীয় নাগরিকত্ব লাভ করেন। ভারতে যে নিরাপত্তা এবং ভ্রাতৃত্ববোধ অনুভব করছেন তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রাক্তন এই পাক সংসদ।
রাম প্রথমে তাঁর পরিবারের সঙ্গে এক মাসের ভিসায় ভারতে আসেন। প্রাথমিক ভাবে, রামের পরিবারের যাঁরা নাগরিকত্ব পাননি তাঁদের এক বছর করে ভিসা বৃদ্ধি করা হত। পরে পরিবারটি পাঁচ বছরের ভিসা পেতে শুরু করে। এখন ৮০ বছরের বৃদ্ধ রাম চান তাঁর সন্তানেরা সরকারি চাকরি অথবা স্থায়ী কর্মসংস্থান পাক। সরকারের কাছে এটুকুই আশা তাঁর।
সব ছবি: সংগৃহীত।