দুই হাত-পায়ের কোনওটাই নেই। সমাজের কাছে এত দিন তিনি কেবল এক প্রতিবন্ধী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু এখন তার পরিচয়ে অন্য পালক যোগ হয়েছে। বর্তমানে তিনি স্বর্ণপদকজয়ী প্যারা তিরন্দাজ। তাঁর নাম পায়েল নাগ।
এপ্রিলের শুরুতে ব্যাংককে হয়ে যাওয়া ‘ওয়ার্ল্ড আর্চারি প্যারা সিরিজ়’-এ বিশ্বের এক নম্বর প্যারা তিরন্দাজ শীতল দেবীকে হারিয়েছেন ওড়িশার মেয়ে পায়েল নাগ। জিতে নিয়েছেন স্বর্ণপদক।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক সোনার পদক জিতে নেওয়া পায়েলের এই যাত্রাপথ সহজ ছিল না। এক প্রকার হঠাৎ করেই তাঁর জীবনে তিরন্দাজির প্রবেশ ঘটে।
ওড়িশার বালাঙ্গিরে এক দিনমজুরের ঘরে জন্ম পায়েলের। তিনি জন্ম থেকে প্রতিবন্ধী নন। জন্মের পর ‘দীর্ঘ’ আট বছর তিনি আর পাঁচজন সাধারণ শিশুর মতো হেসেখেলে বেড়িয়েছেন।
আট বছর বয়সে একটি দুর্ঘটনা পয়েলের জীবন বদলে দেয়। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার কারণে তাঁর দুই হাত-পা বাদ চলে যায়। তার পর থেকেই শুরু হয় পায়েলের যুদ্ধ।
গরিব বাবা-মা বুঝতে পারছিলেন না প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে কী করবেন। তাঁরা তাই মেয়েকে শিশু আবাসে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। পায়েলের বড় হয়ে ওঠা ‘পর্বতগিরি বালনিকেতন’ নামের শিশু আবাসে।
সেখানে তিনি জীবনে পথচলার নতুন মন্ত্র শেখেন। হাত-পা না থাকা তাঁকে কখনও থামাতে পারেনি। পায়েল মুখের সাহায্যে ছবি আঁকতে এবং লিখতে শিখে যান।
পায়েলের শেখার ইচ্ছা এবং দৃঢ়তা ছিল প্রশংসনীয়। তিনি নিয়মিত মুখের সাহায্যে লেখা এবং ছবি আঁকার চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। নিরন্তর পরিশ্রম করার সুবাদে পায়েলের দুর্বলতাই ক্রমশ তাঁর দক্ষতায় পরিণত হয়ে যায়।
তিরন্দাজ হিসাবে খ্যাতি অর্জনের আগে পায়েল অঙ্কনশিল্পী হিসাবে নাম করেন। তাঁর আঁকা ছবি জেলা স্তরের প্রতিযোগিতায় স্বীকৃতি লাভ করে।
পায়েলের তিরন্দাজির প্রতি প্রেম জন্মায় প্যারা তিরন্দাজ শীতল দেবীর ভিডিয়ো দেখে। যাঁকে হারিয়ে সোনার পদক পয়েছেন পায়েল, সেই শীতল দেবীকেই তিনি অনুপ্রেরণা মনে করেন।
কয়েক বছর আগে পায়েলের মুখ দিয়ে ছবি আঁকার একটি ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। তা নজর কাড়ে তিরন্দাজির প্রশিক্ষক কুলদীপ বেদওয়ানের। তিনি নিজে গিয়ে পায়েলের সঙ্গে আলাপ করেন।
কুলদীপের সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর থেকে পায়েলের জীবন তিরন্দাজির দিকে বাঁক নেয়। কাটরার ‘মাতা বৈষ্ণোদেবী শ্রাইন আর্চারি অ্যাকাডেমি’তে প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেন পায়েল।
কথায় বলে, শিক্ষকই আমাদের দ্বিতীয় অভিভাবক। পায়েলের ক্ষেত্রে এ কথাটি অক্ষরে অক্ষরে ফলে গিয়েছে। প্রশিক্ষক কুলদীপের হাত ধরেই তাঁর জীবনে নতুন ভোর আসে।
শীতলকে অনুপ্রেরণা মনে করলেও তাঁর দেখানো কায়দায় তিরন্দাজি করার সুযোগ পায়েলের কাছে ছিল না। তিরন্দাজির ক্ষেত্রে শীতল তাঁর পায়ের সাহায্য নেন। কিন্তু পায়েলের পা-হাত কোনওটাই নেই। তাই তিনি তির-ধনুক চালানোর জন্য নিজস্ব কায়দা খুঁজে বার করেন।
পায়েল মুখ দিয়ে ধনুককে স্থির করেন। তার পর মুখের সাহায্যে তির চালান। প্রশিক্ষণের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কৌশলই খেলার ভিত্তিতে পরিণত হয়ে যায়।
ধীরে ধীরে পায়েল জাতীয় স্তরের তিরন্দাজির প্রতিযোগিতাগুলিতে অংশ নেওয়া শুরু করেন। নানা পদকও জেতেন। ২০২৫ সালে পায়েল ‘ইন্ডিয়া প্যারা গেমসে’ রুপোর পদক জেতেন। সেই বছরই দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত ইয়ুথ প্যারা গেমসেও অংশ নেন পায়েল।
জীবনের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক তিরন্দাজির প্রতিযোগিতা, ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড আর্চারি প্যারা সিরিজ়’-এ পায়েল তাঁর অনুপ্রেরণা শীতল দেবীকে ১৩৯-১৩৬ পয়েন্টে হারিয়ে সোনা জিতে নেন। এখন তিনি ২০২৬ সালের এশিয়ান প্যারা গেমসে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সব ছবি: পিটিআই, এআই সহায়তায় প্রণীত, সংগৃহীত এবং ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া।