দেশ জুড়ে তীব্র খাদ্যসঙ্কট। আমজনতার বড় অংশেরই প্রতি দিন দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জুটছে না! এ-হেন পরিস্থিতিতে আর্থিক উন্নতির চিন্তাভাবনা শিকেয় তুলে যখন ইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে কোমর বেঁধে লেগে পড়েছে পাকিস্তান, তখন বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ইসলামাবাদ নেমেছে একেবারে তলানিতে। শুধু তা-ই নয়, ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশী রাষ্ট্রে বাড়তে পারে অপুষ্টিজনিত রোগের প্রকোপ, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে ওই রিপোর্টে।
সম্প্রতি, বিশ্বের খাদ্যসঙ্কট নিয়ে বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ করে রাষ্ট্রপুঞ্জ সমর্থিত একটি সংস্থা। সেখানে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকা দেশগুলির একটি তালিকা প্রকাশ করেছে তারা। ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস, ২০২৬’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট তালিকার প্রথম ১০-এ আছে পাকিস্তানের নাম। ইসলামাবাদকে বাদ দিলে সেখানে জায়গা পেয়েছে নয়াদিল্লির আরও তিন প্রতিবেশী। তারা হল আফগানিস্তান, মায়ানমার ও বাংলাদেশ।
রাষ্ট্রপুঞ্জ সমর্থিত সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৫ সালের তথ্যের উপর ভিত্তি করে এই তালিকা ও রিপোর্ট তৈরি করেছে তারা। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা যে সব দেশের, তার একেবারে শীর্ষে রয়েছে নাইজেরিয়ার নাম। দ্বিতীয় স্থান পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো (ডিআরসি)। সুদান, ইয়েমেন ও আফগানিস্তান রয়েছে যথাক্রমে তিন, চার ও পাঁচ নম্বরে। ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম স্থানে জায়গা পেয়েছে মায়ানমার, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান। প্রথম ১০-এর শেষ দু’টি দেশ হল সাউথ সুদান ও সিরিয়া।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খাদ্যসঙ্কট পরিমাপ করার একটা বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। এর পোশাকি নাম খাদ্য নিরাপত্তা পর্যায় শ্রেণিবিন্যাস বা আইপিসি (সিকিউরিটি ফেজ় ক্লাসিফিকেশন)। আন্তর্জাতিক সংগঠনটি জানিয়েছে, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এর সূচকও যথেষ্ট নেমে গিয়েছে। বর্তমানে, আইপিসির চতুর্থ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে ইসলামাবাদ। ফলে পশ্চিমের প্রতিবেশী রাষ্ট্রে ক্রমশ বাড়ছে অনাহারে মৃত্যুর আশঙ্কা।
‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ অনুযায়ী, পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশের দু’বেলা ঠিকমতো জোটে না খাবার। ফলে আধপেটা খেয়ে বা খালি পেটে দিন কাটাচ্ছেন সেখানকার ১.১ কোটি বাসিন্দা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ১.৬ কোটি। তবে শতাংশের নিরিখে কিছুটা এগিয়ে আছে ঢাকা। ভারতের পূর্বের প্রতিবেশী রাষ্ট্রে প্রতি ১০০-তে ১৭ জনের দু’বেলা ঠিকমতো খাবার জুটছে না বলে সংশ্লিষ্ট রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপুঞ্জ সমর্থিত সংস্থার রিপোর্টকে উদ্ধৃত করে ইতিমধ্যেই একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জনপ্রিয় পাক গণমাধ্যম ‘দ্য ডন’। সেখানে বলা হয়েছে, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকা বাসিন্দাদের মধ্যে ৯৩ লাখকে ‘সঙ্কটজনক’ এবং ১৭ লাখকে ‘জরুরি অবস্থা’র অন্তর্ভুক্ত করেছে এই আন্তর্জাতিক সংগঠন। বিশ্লেষকদের দাবি, দুর্ভিক্ষের ঠিক আগের পরিস্থিতি তৈরি হলে এই ধরনের রেটিং পেয়ে থাকে কোনও রাষ্ট্র। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে ইসলামাবাদে ভিক্ষার অভাব হবে বলেও মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
পাকিস্তানের এ-হেন বেহাল দশার নেপথ্যে অবশ্য একাধিক কারণ রয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, চরম আবহাওয়া, যখন-তখন ভারী বৃষ্টিপাত এবং তার জেরে বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতির জেরে চরম খাদ্যসঙ্কটের মুখে পড়েছে ইসলামাবাদ। গত বছর (২০২৫ সাল) বিভিন্ন প্রান্তে ভয়াবহ বন্যায় একরকম ভেসে গিয়েছে বিশ্বের একাধিক দেশ। এর মধ্যে পাকিস্তান অন্যতম। ভারী বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যায় সেখানকার ৬০ লক্ষ বাসিন্দার বাড়িঘর, উর্বর জমি এবং রাষ্ট্রীর পরিকাঠামোর বহু কিছু পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, পাকিস্তানের চারটি প্রদেশের মধ্যে তিনটিতেই খাদ্যসঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে। সেগুলি হল বালোচিস্তান, সিন্ধ এবং খাইবার-পাখতুনখোয়া। এই তিন প্রদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভাল নয়। গত কয়েক বছরে ইসলামাবাদ থেকে পৃথক হওয়ার দাবিতে বালোচিস্তান এবং খাইবার-পাখতুনখোয়ায় দানা বেঁধেছে সশস্ত্র বিদ্রোহ। প্রায়ই রাওয়ালপিন্ডির সেনা বা পুলিশের উপর হামলা চালাচ্ছে তারা। ফলে সেখানকার ক’জন বাসিন্দা আধপেটা বা একদম না খেয়ে থাকছেন, সেই তথ্য পাক সরকারের হাতে নেই।
খাদ্যসঙ্কটের রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকা ইসলামাবাদের জেলার সংখ্যা ছিল ৪৩। গত বছর (২০২৫ সাল) সেটা বেড়ে ৬৮-তে পৌঁছে গিয়েছে। নতুন জেলাগুলির সব ক’টি বালোচিস্তান, খাইবার-পাখতুনখোয়া ও সিন্ধের অন্তর্গত। ২০২৪ সালে পাক জনতার ১৬ শতাংশের রোজ ঠিকমতো মিলছিল না খাবার। ২০২৫ সালে সেটা বেড়ে হয়েছে ২৫ শতাংশ। এতে নতুন করে যুক্ত হয়েছেন ১.৪ কোটি বাসিন্দা।
‘দ্য ডন’ জানিয়েছে, ২০২৬-’২৭ আর্থিক বছরে পাকিস্তানের মুদ্রাস্ফীতির হার বাড়তে পারে ছ’শতাংশ। ফলে খাদ্যসঙ্কট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ইসলামাবাদের বাণিজ্যিক ঘাটতি। ফলে সেখানকার কেন্দ্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘স্টেট ব্যাঙ্ক অফ পাকিস্তান’-এর পক্ষে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। শুধু তা-ই নয়, পশ্চিম এশিয়ার ইরান যুদ্ধের জেরে সেখানকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি নিয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি দেয় পাক শীর্ষ ব্যাঙ্ক। বর্তমানে ইসলামাবাদের বৈদেশিক মুদ্রাভান্ডারে রয়েছে মাত্র ১,৬৪০ কোটি ডলার। এই পরিস্থিতির জন্য আমদানি খরচ বৃদ্ধিকেই দায়ী করেছে সেখানকার স্টেট ব্যাঙ্ক। উল্টো দিকে পাল্লা দিয়ে কমছে রফতানির সূচক।
২০২৫-’২৬ আর্থিক বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত পাকিস্তানের আমদানি খরচ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৫৮০ কোটি ডলার। সেখানে রফতানি থেকে মাত্র ২৭৪ কোটি ডলার আয় করতে পেরেছিল ইসলামাবাদ। এ ছাড়া ভিন্রাষ্ট্রে কর্মরতদের থেকে ৩৫৯ কোটি ডলার আয় করতে সক্ষম হয় পাক স্টেট ব্যাঙ্ক, যা আর্থিক সঙ্কট মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত নয় বলে জানিয়ে দেয় তারা। এ বছর পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সমস্যা পশ্চিমের প্রতিবেশীর বিপদ আরও বাড়াতে চলেছে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, এ বছর পাকিস্তানকে আরও বেশি অনাহারক্লিষ্ট করতে পারে জলসঙ্কট। ২০২৫ সালে ইসলামাবাদ মদতপুষ্ট জঙ্গি হামলায় জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে প্রাণ হারান ২৬ জন নিরীহ পর্যটক। নির্বিচারে গুলি চালিয়ে তাঁদের খুন করে লশকর-এ-ত্যায়বার ছায়া সংগঠন টিআরএফ (দ্য রেজিস্ট্যান্ট ফ্রন্ট)। ওই ঘটনার পর পশ্চিমের প্রতিবেশীর সঙ্গে থাকা সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত করে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার।
কৃষিভিত্তিক পাকিস্তানের পঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশের সেচ পুরোপুরি ভাবে সিন্ধু নদী এবং তার উপনদীগুলির উপর নির্ভরশীল। এর প্রতিটিতে বাঁধ দিয়ে জল নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা রয়েছে দিল্লির। সেই লক্ষ্যে দীর্ঘ, মধ্য এবং স্বল্পমেয়াদি, তিন ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রক। নদীর জল আসা বন্ধ হলে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইসলামাবাদের চাষ। সেটা বুঝতে পেরে ইতিমধ্যেই সুর চড়াচ্ছেন পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফ ও সেনাসর্বাধিনায়ক ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।
দ্বিতীয়ত, এ বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানের কাছে ৩৫০ কোটি ডলারের ঋণ ফেরত চেয়ে বসে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (ইউএই)। এই পরিমাণ ইসলামাবাদের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের হাতে থাকা মোট নগদের এক-পঞ্চমাংশ। ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীকে বিপদে পড়তে দেখে অবশ্য এগিয়ে এসেছে সৌদি আরব। তাদের থেকে প্রথম ধাপে ৩০০ কোটি ডলারের ঋণ পাবে পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ়ের সরকার। পরের ধাপে আরও ৫০০ কোটি ডলার দিতে পারে রিয়াধ। সে ক্ষেত্রে ২০২৭ সালের মধ্যে অনায়াসেই আবু ধাবিকে টাকা ফেরাতে পারবে তারা।
পাকিস্তানের আর্থিক দুরবস্থা ও খাদ্যসঙ্কটের নেপথ্যে আরও একটি কারণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেটা হল, সন্ত্রাসবাদ। রাষ্ট্রপুঞ্জ স্বীকৃত জঙ্গিদের মদত ও আশ্রয় দেওয়ায় গত কয়েক বছরে বহু বার ‘ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স’ বা এফএটিএফ নামের আন্তর্জাতিক সংস্থার ধূসর তালিকায় থেকেছে ইসলামাবাদ। ফলে ‘আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার’-এর (ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড বা আইএমএফ) থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন হয়েছে তাদের।
সন্ত্রাসবাদে মদত দেওয়ার কারণে গত বছর ভারতের সঙ্গে চার দিনের ‘যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়ে পাকিস্তান। এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সীমান্ত সংঘাত ও জঙ্গি নাশকতাকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী আফগানিস্তানের সঙ্গে সংঘর্ষ চালিয়ে যাচ্ছে ইসলামাবাদ। পাশাপাশি, ইরানের লড়াইয়ে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ায় আমিরশাহির মতো আরব রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে শাহবাজ় সরকারের। এর জেরে চরম আকার ধারণ করতে পারে জ্বালানিসঙ্কট।
‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের ৪৭টি দেশের অন্তত ২৬ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষ অনাহারের সঙ্গে লড়াই করছেন। ২০২৫ সালে সুদান এবং প্যালেস্টাইনের গাজ়াকে ‘দুর্ভিক্ষপীড়িত’ বলে চিহ্নিত করে তারা। এ বছরের প্রতিবেদনে প্রথমে ১০-এ থাকা দেশগুলিতে দুনিয়ার অনাহারক্লিষ্টদের দুই-তৃতীয়াংশ বাস করছেন বলে জানিয়েছে তারা। এ-হেন খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার কারণে পাকিস্তানে জঙ্গি নাশকতা আরও বড় আকার নেয় কি না, সেটাই এখন দেখার।
ছবি: সংগৃহীত ও প্রতীকী।