বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হল মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পওয়ারের। বুধবার সকাল পৌনে ৯টা নাগাদ মহারাষ্ট্রের বারামতী বিমানবন্দরে অবতরণের সময় ভেঙে পড়ে অজিতের চার্টার্ড বিমানটি। ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাতে আগুন ধরে যায়।
মাঝারি মাপের একটি চার্টার্ড বিমানে করে জেলা পরিষদের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের হয়ে প্রচারের জন্য মুম্বই থেকে বারামতী যাচ্ছিলেন মহারাষ্ট্রের ‘মহাজুটি’ সরকারের অন্যতম শরিক তথা উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত। বিমানটি লিয়ারজেট ৪৫ মডেল-এর ‘ভিটি-এসএসকে’ গোত্রের। ‘বম্বার্ডিয়ার এরোস্পেস’ সংস্থার তৈরি এই বিমানটি বিমানবন্দরের মাটি ছোঁয়ার আগেই আছড়ে পড়ে ভেঙে যায়।
জরুরি অবতরণের চেষ্টা করার সময় বিমানটি বিধ্বস্ত হয় এবং ধাক্কা লাগার সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে যায়। দুর্ঘটনাস্থলে বিমানের ধ্বংসাবশেষ থেকে ঘন ধোঁয়া বার হতে থাকে। এনসিপি নেতা অজিত ছাড়াও আরও পাঁচ জন ছিলেন ওই বিমানে। দুর্ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রীর।
ভারতের ইতিহাসে বার বার ফিরে এসেছে বিমান দুর্ঘটনার কালো দিন। বিমান দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন বহু রাজনীতিবিদই। নেপথ্য কারণ হিসাবে চালকের ভুল থেকে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সবই উঠে এসেছে সেই সমস্ত বিমান দুর্ঘটনায়।
৪৫ বছর আগে জুন মাসে ঘটে যাওয়া একটি বিমান দুর্ঘটনার খবর নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা দেশকে। দিল্লির সফদরজং বিমানবন্দর ফ্লাইং ক্লাব থেকে একটি নতুন পিটস এস-২এ বিমান ওড়াতে গিয়ে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন সঞ্জয় গান্ধী, ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ছোট ছেলে। মাঝ-আকাশে বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় উড়ান পর্ব।
নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাত্র ১২ মিনিটের মাথায় ভেঙে পড়ে বিমানটি। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ৩৩ বছরের সঞ্জয় গান্ধীর। বিমান দুর্ঘটনার খবর পেয়েই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছোন ইন্দিরা। তত ক্ষণে সব শেষ। ছেলেকে আর ফিরে পাননি তিনি। শুধুই বিমানের ধ্বংসস্তূপ পড়ে ছিল সেখানে। আর ছিল সঞ্জয়ের ছিন্নভিন্ন দেহাবশেষ।
সকাল ৭টা ৫৮ মিনিটে বিমানটি আকাশে উড়েছিল। সঞ্জয়ের সঙ্গে ছিলেন তাঁর উড়ান প্রশিক্ষক সুভাষ সাক্সেনা। তবে সেই বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই রেখেছিলেন ইন্দিরা-পুত্র। এর আগে তাঁর মাত্র ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট বিমান ওড়ানোর অভিজ্ঞতা ছিল। সেই অভিজ্ঞতা সম্বল করেই প্রিয় বিমানটি নিয়ে স্টান্ট দেখাতে শুরু করেন সঞ্জয়। বিমান ঠিক কতটা উচ্চতায় চালাচ্ছেন তা আন্দাজ করতে পারেননি চালক।
গত বছরের (২০২৫ সাল) ১২ জুন গুজরাতে অহমদাবাদের সর্দার বল্লভভাই পটেল বিমানবন্দরে ঘটে যায় ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা। যাত্রা শুরুর ঠিক পাঁচ মিনিট পরেই ভেঙে পড়ে লন্ডনগামী বিমান। দুর্ঘটনাগ্রস্ত অভিশপ্ত বিমানের ২৪১ জন যাত্রীর মধ্যে নাম ছিল গুজরাতের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রূপাণীর। বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন তিনি।
লন্ডনবাসী মেয়ের কাছে যাচ্ছিলেন রূপাণী। মেয়ের কাছে আগেই চলে গিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী। ১ জুলাই স্বামী-স্ত্রীর যুগলে দেশে ফেরত আসার কথা ছিল। লন্ডনে পৌঁছোনোর আগেই না ফেরার দেশে চলে যান গুজরাতের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।
একই ভাবে বিমান দুর্ঘটনার কবলে পড়ে মারা যান আর এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ২০০১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর উত্তরপ্রদেশে বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা তৎকালীন কংগ্রেস সাংসদ মাধবরাও সিন্ধিয়াও। উত্তরপ্রদেশের মোত্তা গ্রামে বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। ৫৬ বছর বয়সি সিন্ধিয়া কানপুরে একটি সমাবেশে ভাষণ দিতে যাচ্ছিলেন।
আট জন যাত্রী বহনকারী ব্যক্তিগত বিমানে চড়ে কানপুর থেকে ১৬০ কিলোমিটার দূরে মৈনপুরীর উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন মাধবরাও। আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর ধ্বংসাবশেষ থেকে বিমানের আট জন আরোহীর দেহ উদ্ধার করা হয়।
মৃতদেহগুলি এমন ভাবে পুড়ে গিয়েছিল যে তাঁদের শনাক্ত করার উপায় ছিল না। কংগ্রেস সাংসদের গলার একটি লকেট দেখে তাঁকে শনাক্ত করা হয়েছিল। বিমানে সিন্ধিয়া ছাড়াও ছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত সচিব রুপিন্দর সিংহ, চার জন সাংবাদিক। দু’জন চালক-সহ যাত্রীরা কেউই বেঁচে ফিরতে পারেননি সেই দুর্ঘটনা থেকে।
২০০৯ সালে অন্ধ্র-রায়লসীমার মাঝামাঝি জায়গায় নাল্লামালার জঙ্গলে আছড়ে পড়ে বেল ৪৩০ সিরিজ়ের একটি হেলিকপ্টার। সেই দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন অখণ্ড অন্ধ্রের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তথা কংগ্রেস নেতা রাজশেখর রেড্ডিও। এক দিন পরে চিরুনিতল্লাশি করে দুর্ঘটনাস্থলটি খুঁজে পাওয়া যায়।
এরই দু’বছর পর তাওয়াং থেকে ইটানগর যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন অরুণাচল প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ও হেভিওয়েট কংগ্রেস নেতা দোরজি খান্ডূ। হেলিকপ্টারটি নিখোঁজ হওয়ার পাঁচ দিন পর অরুণাচলের মুখ্যমন্ত্রী দোরজি খান্ডূর মৃতদেহ চিন সীমান্তের কাছে লুগুথাং-এ পাওয়া যায়।
পবনহংস হেলিকপ্টারে করে অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং থেকে ইটানগর যাত্রা করেছিলেন তিনি। ওড়ার ২০ মিনিটের মধ্যেই ১৩ হাজার ফুট উপরে সেলা পাসের কাছে পৌঁছোনোর পর হেলিকপ্টারটির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রতিকূল আবহাওয়াতেই কপ্টারটি ভেঙে পড়ে বলে জানা যায়।
২০০২ সালের ৩ মার্চ অন্ধ্রপ্রদেশের পশ্চিম গোদাবরী জেলায় এক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা যান তৎকালীন লোকসভার স্পিকার এবং তেলুগু দেশম পার্টির প্রবীণ নেতা জিএমসি বালাযোগী। মাঝ-আকাশে হেলিকপ্টারটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। ফলে সেটি ভেঙে পড়ে।
২০০৫ সালের মার্চ মাসে এক মর্মান্তিক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় হরিয়ানার তৎকালীন বিদ্যুৎমন্ত্রী ওপি জিন্দাল এবং কৃষিমন্ত্রী সুরেন্দ্র সিংহ নিহত হন। সুরেন্দ্র সিংহ ছিলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি শঙ্কর দয়াল শর্মার ছেলে। চন্ডীগঢ় থেকে দিল্লি যাওয়ার পথে সাহারানপুরের কাছে হেলিকপ্টারটিতে আগুন ধরে গিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটেছিল। দু’জনেই ভূপিন্দর সিংহ হুডার ক্যাবিনেটের মন্ত্রী ছিলেন।
পঞ্জাবের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী গুরনাম সিংহ ১৯৭৩ সালের ৩১ মে দিল্লিতে এক বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান। গুরনাম সিংহ ছিলেন পঞ্জাবের প্রথম অ-কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী। পেশায় আইনজীবী ও বিচারক গুরনাম দু’বার অকালি দলের সমর্থনে রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন।
অজিতের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ রাজনৈতিক মহল। বিমান দুর্ঘটনার সঠিক তদন্তের দাবি তুললেন মমতা। একই সঙ্গে শরদ পওয়ার-সহ গোটা পওয়ার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি। শোকপ্রকাশ করেছেন নরেন্দ্র মোদীও। অজিতের উত্থান এবং রাজনৈতিক দক্ষতার কথা স্মরণ করে এক্স হ্যান্ডলে একটি পোস্ট করেন প্রধানমন্ত্রী।
সব ছবি: পিটিআই ও সংগৃহীত।