আফগানিস্তান থেকে আসা ট্যালকম পাউডারের ব্যবসার আড়ালে ভারতে হেরোইন পাচার! জঙ্গি কার্যকলাপে অর্থের জোগানের অভিযোগ। দিল্লির ব্যবসায়ী হরপ্রীত সিংহকে গ্রেফতার করল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)।
ইডি জানিয়েছে, মাদক পাচারচক্র থেকে আয় করা ৭৪ কোটি টাকা হাওয়ালার মাধ্যমে আফগানিস্তানে পাঠিয়েছিলেন হরপ্রীত। সেই টাকা সন্ত্রাসী কার্যকলাপে অর্থায়নের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল।
অভিযোগ উঠেছে, পাকিস্তানের আইএসআই-এর মদতপুষ্ট এবং পলাতক রাজু দুবাইয়ের নেতৃত্বাধীন একটি চক্রের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন হরপ্রীত।
ইডি জানিয়েছে, আফগানিস্তান থেকে আধা-প্রক্রিয়াজাত ট্যালকম পাউডার আমদানির নামে তার মধ্যে মাদক লুকিয়ে পাচার করতেন হরপ্রীত। এর পরেই সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানী দিল্লির ছ’টি জায়গায় তল্লাশি চালান ইডির তদন্তকারী আধিকারিকেরা। গ্রেফতার করা হয় দিল্লির ব্যবসায়ী হরপ্রীতকে।
গত ২৪ জুন গ্রেফতার করা হয় মূল অভিযুক্ত হরপ্রীতকে। তাঁকে নয়াদিল্লির তিস হাজারি কোর্ট কমপ্লেক্সে অবস্থিত ‘প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট’ (অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন)-এর বিশেষ আদালতে হাজির করানো হয়।
২৪ এবং ২৫ জুন হরপ্রীতের এবং তার কর্মচারী, ব্যবসায়িক সহযোগী এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় তল্লাশি চালানো হয়। তল্লাশি চলাকালীন তদন্তকারীরা প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের চারটি বিলাসবহুল গাড়ি— রেঞ্জ রোভার স্পোর্ট ৩.০, টয়োটা ফরচুনার, মার্সিডিজ-বেঞ্জ সিএলই ৩০০ এবং কিয়া সেল্টোস বাজেয়াপ্ত করেন।
পাশাপাশি বিনিয়োগ সংক্রান্ত নথিপত্র এবং অন্যান্য অপরাধমূলক প্রমাণও উদ্ধার করা হয়। গাড়ি চারটিই হরপ্রীতের নিয়ন্ত্রণে থাকা বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে নথিভুক্ত ছিল।
জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)-র দায়ের করা একটি এফআইআরের ভিত্তিতে হরপ্রীতের বিরুদ্ধে এই তদন্ত শুরু করেছিল ইডি। এনআইএ ‘আনল’ফুল অ্যাক্টিভিটিস প্রিভেনশন অ্যাক্ট’ (বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন) বা ইউএপিএ, ‘নারকোটিক ড্রাগস অ্যান্ড সাইকোট্রপিক সাবস্টেন্সেস অ্যাক্ট’ (মাদক আইন) এবং অন্যান্য ধারার অধীনে মামলাটি নথিভুক্ত করেছিল।
সেই মামলায় এনআইএ ছ’টি চার্জশিট জমা দিয়েছিল আদালতে। সেই চার্জশিটে অভিযোগ করা হয়েছিল, আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং দুবাই থেকে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্রের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন হরপ্রীত।
এর পরেই ওই মামলায় জোড়ে কুখ্যাত মাদক পাচারকারী ‘রাজু দুবাই’-এর নাম। রাজু দুবাই ওরফে বিতায়শ কোসার এক জন কুখ্যাত এবং পলাতক মাদক পাচারকারী। তাঁর নেতৃত্বে চলা এই চক্রটিতে পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের এজেন্ট এবং আফগান নাগরিকদেরও যোগ ছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
ইডির তথ্য অনুযায়ী, অবৈধ ভাবে বিক্রি মাদক থেকে অর্জিত ৭৪ কোটি টাকা হাওয়ালা চ্যানেলের মাধ্যমে আফগানিস্তানে পাঠানো হয়েছিল এবং তা সন্ত্রাসী কার্যকলাপে অর্থায়নের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল।
তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন যে, ওই মাদক চক্র হরপ্রীতকে ট্যালকম পাউডারের মধ্যে হেরোইন ভরে পাঠাত। মাদক বিক্রির অর্থ থেকে কমিশনের একাংশ হিসাবে মোটা টাকা পেতেন হরপ্রীত। বাকি অংশ ড্রাই ফ্রুটস বা শুকনো ফল, খেজুর এবং সুগন্ধি হিসাবে দেওয়া হত হরপ্রীতকে।
তদন্তকারী সূত্রে খবর, মাদক বিক্রির কমিশন হিসাবে নগদে প্রায় ১.৬৫ কোটি টাকা পেয়েছিলেন হরপ্রীত। এ ছাড়াও কর্মচারী এবং বন্ধুদের নামে নথিভুক্ত একাধিক সংস্থা নিয়ন্ত্রণ করতেন হরপ্রীত।
সেই সংস্থাগুলির মধ্যে ‘মেসার্স ম্যাজেন্ট ইন্ডিয়া’ নামের একটি সংস্থার মাধ্যমে আধা-প্রক্রিয়াজাত ট্যালকম পাউডারের মধ্যে লুকিয়ে হেরোইন পাচার করা হত ভারতে। সেই মাদকের অর্থ আবার জঙ্গিমূলক কাজকর্মে ব্যবহৃত হত বলে অভিযোগ।
ইডির তদন্তকারীরা আরও জানতে পেরেছেন, হরপ্রীত এবং তাঁর সহযোগীরা বেপথে আয় করা অর্থ দিল্লির বেশ কয়েকটি নাইট ক্লাবে বিনিয়োগ করেছিলেন। এনআইএ-র মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর, হরপ্রীত তাঁর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার এক সহযোগী মাচেরি পরম্বা শামসুদ্দিন ওরফে সোহেল আহমেদের নামে হস্তান্তর করেন। পরে ওই ব্যক্তি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে সেই অর্থ বিনিয়োগ করেন।
কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাটি জানিয়েছে, মাদক পাচার চক্র এবং তার সঙ্গে জড়িত অর্থ পাচার এবং হাওয়ালা কার্যক্রম নির্মূল করার লক্ষ্যে সরকারের সমন্বিত প্রচেষ্টারই একটি অংশ হিসাবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আরও তদন্ত চলছে। পুরো বিষয়টি বিস্তারিত ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও খবর।
সব ছবি: প্রতীকী এবং ফাইল থেকে।