ভারতীয় বহুজাতিক প্রযুক্তি সংস্থাগুলির মধ্যে উইপ্রো অন্যতম। কেবল ভারত নয়, ভারতের বাইরেও পৌঁছে গিয়েছে এই সংস্থার উল্লেখযোগ্যতা। বর্তমানে এই সংস্থা বিশ্ব জুড়ে ব্যবসা চালাচ্ছে।
কিন্তু ভারতীয় এই বহুজাতিক সংস্থার উইপ্রো হয়ে ওঠার গল্পটা একটু অন্য রকম। বিশ্ব তো দূরের কথা, ভারতের প্রযুক্তির বাজারে যে এত নাম হবে সেটা এই সংস্থার কর্ণধারের কল্পনাতেও ছিল না।
সাল ১৯৪৫। ডিসেম্বরের ২৯ তারিখ মহম্মদ হাশিম প্রেমজি নামের এক ব্যক্তি মহারাষ্ট্রের আমালনারে শুরু করেন একটি বনস্পতি বানানোর সংস্থা। নাম দেন ‘ওয়েস্টার্ন ইন্ডিয়া ভেজিটেবল প্রোডাক্টস লিমিটেড’।
ভারত তখন সদ্য ইংরেজ শাসন মুক্ত হয়ে স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে। সেই বাজারে স্বল্প মূল্যে ভোজ্যতেল এবং কাপড় কাচার সাবানের মতো পণ্য তৈরি করে বিক্রি করাই ছিল হাশিম প্রেমজির সংস্থার মূল লক্ষ্য।
সাল ১৯৬৬। প্রয়াত হন মহম্মদ হাশিম প্রেমজি। তাঁর একমাত্র ছেলে আজ়িম প্রেমজি সেই সময় ক্যালিফর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করছেন। বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি তড়িঘড়ি দেশে ফিরে আসেন।
দেশে ফেরার পর স্বাভাবিক ভাবেই বাবার সংস্থার সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ে আজ়িমের কাঁধে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২১ বছর।
সদ্য তারুণ্যে পা দেওয়া আজ়িম ছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তাঁর চিন্তাভাবনাও ছিল আধুনিক। সময়ের থেকে এগিয়ে ছিলেন তিনি।
আজ়িমের হাত ধরে ‘ওয়েস্টার্ন ইন্ডিয়া ভেজিটেবল প্রোডাক্টস লিমিটেড’ নামের তেল উৎপাদনকারী সংস্থা পরিণত হয় বহুজাতিক প্রযুক্তি সংস্থায়। কিন্তু সেই যাত্রাপথ সহজ ছিল না। বড় স্বপ্ন দেখার জন্য আজ়িমকে শুনতে হয় বহু মানুষের বাঁকা কথা। কিন্তু তিনি থেমে যাননি।
আজ়িম প্রথমে তাঁর সংস্থায় বিভিন্ন ধরনের জিনিস বানানো শুরু করেন এবং উৎপাদনের পরিমাণও বৃদ্ধি করেন। তাঁর বাবার সময়ে সেই সংস্থা কেবল ভোজ্যতেল এবং কাপড় কাচার সাবান তৈরি করত। কিন্তু ছেলের সুবাদে আরও নানা প্রসাধন সামগ্রী তৈরি হতে থাকে। ব্যবসা বৃদ্ধি পায়।
মহারাষ্ট্রের আমালনা থেকে মুম্বইয়ে সেই সংস্থাকে নিয়ে যাওয়া হয়। হাশিম প্রেমজির স্ত্রী গুলবানু প্রেমজিকে সেই সংস্থার চেয়ারপার্সন বানানো হয়। সব কিছু ঠিকঠাকই চলতে থাকে।
কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করা আজ়িমের তাতেও মন ভরে না। তিনি জানতেন যে পরিবর্তনই জীবনের নিয়ম। তাই ভোজ্যতেলের সংস্থাকে আর কী ভাবে প্রসারিত করা যায় সেই চিন্তা তাঁকে কুরে কুরে খেতে শুরু করে।
সাল ১৯৭৭। বৈদেশিক মুদ্রা আইন মেনে চলতে না পারার কারণে আইবিএমকে ভারতে ব্যবসা বন্ধ করে চলে যেতে হয়। হাতে চাঁদ পান আজ়িম।
সুযোগের সদ্ব্যবহার করে আজ়িম কম্পিউটার হার্ডঅয়্যার প্রস্তুতকারকের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেন। তাঁর এই পদক্ষেপ ভাল চোখে দেখেননি আশপাশের মানুষেরা। সকলে হাসাহাসি করেন এই ভাবনায় যে, তেল প্রস্তুতকারী সংস্থা হঠাৎ কম্পিউটার বানানোর দিকে যাচ্ছে কেন!
কিন্তু আজ়িম সে সবে কান দেননি। তিনি লক্ষ্য স্থির রেখে এগিয়ে চলেন। ‘ওয়েস্টার্ন ইন্ডিয়া ভেজিটেবল প্রোডাক্টস লিমিটেড’কে পরিণত করেন উইপ্রোয়।
১৯৮৯ সাল নাগাদ কম্পিউটার সিস্টেম, ভোগ্যপণ্য এবং শিল্পসামগ্রী প্রস্তুতকারক একটি বহুজাতিক সংস্থায় পরিণত হয় উইপ্রো। যে সকল ব্যক্তি তাঁর সংস্থার হয়ে ভোগ্যপণ্য সরবরাহের কাজ করতেন, তাঁদের দিয়েই কম্পিউটার সিস্টেম সরবরাহেরও কাজ করাতেন আজ়িম প্রেমজি।
১৯৯০ সালে যখন দেশ জুড়ে প্রযুক্তির বাজার প্রসারিত হচ্ছে, সেই সময় আজ়িম উইপ্রোকে তথ্যপ্রযুক্তির সংস্থায় পরিণত করার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। তিনি বাজার ঘেঁটে দেখতে শুরু করেন।
সেই সময় বেঙ্গালুরু ধীরে ধীরে হয়ে উঠছিল ভারতের ‘সিলিকন ভ্যালি’। বহু স্টার্টআপ গড়ে উঠছিল সেখানে। আজ়িম তখন উইপ্রোর প্রধান কার্যালয়কে সেখানে স্থানান্তরিত করেন।
২০০০ সালে উইপ্রো নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে নথিভুক্ত হয়। সেই সময় আজ়িম প্রেমজির বহুজাতিক সংস্থার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০০ কোটি ডলার।
২০১৯ সালের ৩১ জুলাই আজ়িম প্রেমজি উইপ্রোর এগ্জ়িকিউটিভ চেয়ারম্যান পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁর হাত ধরেই উইপ্রো এখন দেশের বাইরেও আনুমানিক ১৭টি দেশে নিজেদের ব্যবসা চালাচ্ছে।
সব ছবি: সংগৃহীত।