দ্বিতীয় দফায় হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর চাপ বাড়াচ্ছে ইরান। শুধু তা-ই নয়, পারস্য উপসাগরের ওই সঙ্কীর্ণ জলপথে জ্বালানি পরিবহণের সময় দু’টি ভারতীয় ট্যাঙ্কারে গুলিও চালিয়েছে তেহরান। তা সত্ত্বেও সাবেক পারস্যের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে সামান্য ‘বকাঝকা’ ছাড়া সে ভাবে কোনও কড়া পদক্ষেপ করেনি নয়াদিল্লি। শিয়া মুলুকটিকে নিয়ে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের কেন এই নরম মনোভাব? ভারতের দিক থেকে ইরানকে ‘হাতে রাখতে’ চাওয়ার নেপথ্যে যে একাধিক কারণ রয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার বহু আগে থেকেই পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপের সঙ্গে পণ্য পরিবহণের বিকল্প রাস্তার খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছিল ভারত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে নয়াদিল্লির জন্য তা একান্ত ভাবে প্রয়োজন। তা ছাড়া গত কয়েক বছরে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন নতুন একাধিক রাস্তা তৈরি করেছে চিন। আর্থিক, সামরিক এবং কৌশলগত দিক থেকে যেগুলির গুরুত্ব অপরিসীম। বেজিঙের এ-হেন পদক্ষেপ উদ্বেগ বাড়িয়েছে কেন্দ্রের।
মধ্য এশিয়ার পণ্য পরিবহণে ভারতের সবচেয়ে বড় বাধার নাম পাকিস্তান। স্থলবেষ্টিত ওই এলাকায় পৌঁছোনোর দু’টি রাস্তা রয়েছে। একটি আফগানিস্তানের ‘ওয়াখান বারান্দা’। ৩৫০ কিলোমিটার লম্বা এবং ১৩-৬৫ কিলোমিটার চওড়া ওই পার্বত্য রাস্তাটি সুপ্রাচীন কাল থেকে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বহুল ব্যবহৃত পথ হিসাবে পরিচিত। কিন্তু সমস্যা হল, এর সীমান্ত লাগোয়া এলাকাটি ইসলামাবাদ অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীরের গিলগিট-বাল্টিস্তানের অন্তর্গত। ফলে কাবুলের সঙ্গে সুসম্পর্ক সত্ত্বেও ওয়াখান করিডরে আমদানি-রফতানি করতে পারছে না নয়াদিল্লি।
দ্বিতীয়ত, সামুদ্রিক রাস্তাতেও আফগানিস্তান এবং মধ্য এশিয়ায় যাওয়া ভারতের পক্ষে অসম্ভব। কারণ, মাঝখানে খাড়াই পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে পাকিস্তান। এ-হেন পরিস্থিতিতে ওই এলাকায় পৌঁছোতে নয়াদিল্লির হাতে আছে দু’টি বিকল্প। সেগুলির পোশাকি নাম, ইন্ডিয়া মিডল-ইস্ট ইউরোপ ইকোনমিক করিডর (আইএমইইইসি) এবং ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডর (আইএনএসটিসি)। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, কোনও না কোনও ভাবে ইরানকে ছুঁয়ে এগিয়েছে এই দুই বাইপাস।
উদাহরণ হিসাবে প্রথমে আইএনএসটিসির কথা বলা যেতে পারে। ২০০২ সালের মে মাসে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের জন্য রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি করে ভারত। পরবর্তী কালে তাতে যোগ দেয় ওমান, তুর্কমেনিস্তান, উজ়বেকিস্তান, কাজ়াখস্তান এবং আজ়ারবাইজান। পাকিস্তানকে এড়িয়ে এই রাস্তায় মুম্বই থেকে মস্কো পর্যন্ত বাণিজ্যের সুযোগ রয়েছে নয়াদিল্লির। তবে প্রায় সব পণ্যই নিয়ে যেতে হবে তেহরানের চাবাহার বন্দর দিয়ে।
২০২২ সালে আংশিক ভাবে চালু হয় ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডর। গত চার বছরে এই রাস্তায় ভারতে কিছু পণ্য পাঠিয়েছে রাশিয়া। ফলে প্রতি ১৫ টনের পরিবহণ খরচ ২,৫০০ ডলার কমেছে বলে জানা গিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট বাইপাসে কিছু জায়গায় রেললাইন পাতার কাজ এখনও চলছে। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পাথুরে জমির কারণে তা দ্রুত শেষ করাও বেশ কঠিন। তবে তাতে হাল ছাড়তে নারাজ মস্কো ও তেহরান।
ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডর আংশিক ভাবে চালু হতেই এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে আফগানিস্তান। ইরানের চাবাহার বন্দর দিয়ে ভারতীয় পণ্য ঘরের মাটিতে নিয়ে যেতে আগ্রহী কাবুল। গত বছর (২০২৫ সাল) নভেম্বরে এ ব্যাপারে কথা বলতে নয়াদিল্লি সফর করেন পঠানভূমির তালিবান সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী নূরউদ্দিন আজিজি। বাণিজ্য মন্ত্রকের যুগ্মসচিব আনন্দ প্রকাশের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক হয়েছিল তাঁর।
পরে ভারত-আফগানিস্তান বাণিজ্য প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন তালিবান সরকারের মন্ত্রী নূরউদ্দিন। তিনি জানান, কাবুলের সঙ্গে দিল্লি এবং অমৃতসরকে আকাশপথে জুড়তে পণ্যবাহী করিডরগুলি সক্রিয় করা হয়েছে। ওই পথগুলিতে খুব দ্রুত পণ্যবাহী বিমান চালু হবে। পাশাপাশি, চাবাহার বন্দর থেকে বাণিজ্যপথ চালুতে সহায়তার জন্য নয়াদিল্লিকে অনুরোধও করেন পঠানভূমির ওই রাজনৈতিক নেতা।
বর্তমানে ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়ে থাকে। এই অঙ্ক আরও বৃদ্ধি করতে আগ্রহী নয়াদিল্লি ও কাবুল। আর তাই গত বছরের (২০২৫ সাল) সফরে এ দেশে এসে তালিবান সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমরা কখনওই হিংসা চাই না। আফগানিস্তান অনেক রক্ত দেখেছে। তা ছাড়া ব্যবসা আর রাজনীতিকে মিশিয়ে দেওয়া উচিত নয়। দেশের উন্নতিতে একটা বাণিজ্যিক পরিবেশ তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য।’’
আফগানিস্তানের খনি, স্বাস্থ্য, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, শক্তি, বস্ত্র এবং কৃষিক্ষেত্রে বিনিয়োগে ভারতীয় লগ্নিকারীদের বেশ আগ্রহ রয়েছে। ‘কাবুলিওয়ালার দেশ’টিকে বাদ দিলে মধ্য এশিয়ার উজ়বেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তাজ়িকিস্তান, কাজ়াখস্তান এবং কিরঘিজ়স্তানে নয়াদিল্লির পণ্যের চাহিদা প্রবল। পাকিস্তানকে এড়িয়ে সেখানে আমদানি-রফতানি বাড়াতে হলে ইরানের চাবাহার বন্দর ছাড়া গতি নেই। আর তাই তেহরানের সঙ্গে যতটা সম্ভব সুসম্পর্ক রেখে চলছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার।
ভারতের জন্য ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ হয়ে ওঠা এ-হেন চাবাহার বন্দরের অবস্থান দক্ষিণ ইরানি উপকূলের সিস্তান-বালোচিস্তানে। গুজরাতের কান্দলা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৫৫০ নটিক্যাল মাইল। স্থানীয় ভাষায় চাবাহার শব্দটির অর্থ হল ‘চারটি ঝরনা’। ২০০২-’০৩ সালে প্রথম বার সংশ্লিষ্ট বন্দরটির পরিকাঠামোগত উন্নতির জন্য তেহরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে নয়াদিল্লি। ২০১৬ সালে এই নিয়ে চুক্তি করে দু’পক্ষ। সেই সমঝোতার পর চাবাহারে বিপুল টাকা লগ্নি করতে দেরি করেনি কেন্দ্র।
২০২৪ সালে চাবাহার নিয়ে ইরানের সঙ্গে ১০ বছরের মেয়াদে একটি দীর্ঘস্থায়ী চুক্তি করে মোদী সরকার। সেই সমঝোতা অনুযায়ী বর্তমানে তেহরানের ওই বন্দর পরিচালনা করছে রাষ্ট্রায়ত্ত ভারতীয় সংস্থা ‘ইন্ডিয়া পোর্টস গ্লোবাল লিমিটেড’। এর জেরে পণ্য লেনদেনের জন্য চাবাহার ব্যবহার করতে পারছে আফগানিস্তানের তালিবান নেতৃত্ব। এ ব্যাপারে ত্রিপাক্ষিক চুক্তি করার দাবি তুলেছে কাবুল।
অন্য দিকে ২০২৩ সালে জি-২০ সম্মেলনে ইন্ডিয়া মিডল-ইস্ট ইউরোপ ইকনমিক করিডর তৈরির প্রস্তাব দেয় নয়াদিল্লি, যা সঙ্গে সঙ্গে লুফে নেয় আমেরিকা, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, জর্ডন, ইজ়রায়েল, গ্রিস এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এই পথটিকে চিনের বিআরআই প্রকল্পে বিকল্প হিসাবে গড়ে তুলতে চাইছে কেন্দ্র। ফলে সবচেয়ে বেশি সমর্থন জুগিয়েছে ওয়াশিংটন ও তেল আভিভ।
প্রস্তাবিত ইন্ডিয়া মিডল-ইস্ট ইউরোপ ইকনমিক করিডরের শুরুটা হবে কোনও না কোনও পশ্চিম ভারতীয় বন্দরে। সেখান থেকে জাহাজে করে পণ্য যাবে আমিরশাহি। তার পর সড়ক ও রেলপথে সৌদি আরব, জর্ডন ও ইজ়রায়েল হয়ে পৌঁছোবে ভূমধ্যসাগরের কোলের হাইফা বন্দরে। সেখান দিয়ে ফের সমুদ্র পেরিয়ে সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হবে গ্রিস, ইটালি বা ফ্রান্সে। অর্থাৎ, বাব এল মান্দেব প্রণালী, লোহিত সাগর এবং সুয়েজ় খাল এড়িয়ে এই পথে দিব্যি পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারবেন এ দেশের শিল্পপতিরা।
প্রথাগত রাস্তায় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারতের সামনে রয়েছে একাধিক চ্যালেঞ্জ। বাব এল মান্দেব প্রণালীতে দাপিয়ে বেড়ায় সোমালিয়ার জলদস্যুরা। তা ছাড়া গত কয়েক বছরে বহু বার ইরান মদতপুষ্ট ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ওই সঙ্কীর্ণ সামুদ্রিক রাস্তা আটকাতে দেখা গিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা। ফলে ওই রাস্তায় আমদানি-রফতানি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞেরা অবশ্য মনে করেন আইএমইইইসি প্রকল্পের বাস্তবায়ন ইরানের মদত ছাড়া সম্ভব নয়। কারণ, এই বাইপাস রুটের বড় অংশই যাবে আমিরশাহি এবং সৌদি আরবের মধ্য দিয়ে। আর সেখানে পৌঁছোতে হলে হরমুজ় প্রণালী হয়ে পারস্য উপসাগরে ঢোকা ছাড়া অন্য পথ নেই। এই সঙ্কীর্ণ সামুদ্রিক রাস্তাটির উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে তেহরানের।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজ়রায়েল যৌথ ভাবে ইরান আক্রমণ করলে পশ্চিম এশিয়ায় বেধে যায় যুদ্ধ। ফলে শত্রুর উপরে চাপ তৈরি করতে লড়াইয়ের প্রথম দিন থেকেই হরমুজ় অবরুদ্ধ করে সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজ। এই পরিস্থিতিতে তেহরানকে কোনও ভাবে চটাতে চায়নি নয়াদিল্লি। উল্টে সঙ্কীর্ণ ওই সামুদ্রিক রাস্তা দিয়ে নিজেদের পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানের সঙ্গে আলোচনার রাস্তায় হেঁটেছে কেন্দ্র।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইজ়রায়েল সফর করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। তিনি ইহুদি রাষ্ট্র থেকে ঘরে ফেরার পর ইরানে হামলা চালায় ওয়াশিংটন ও তেল আভিভের যৌথ ফৌজ। তবে চাবাহার বন্দরে কোনও রকমের আঘাত হানেনি তারা। ফলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে বিকল্প রাস্তা দু’টিতে নয়াদিল্লি বাণিজ্য বৃদ্ধি করতে পারবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
ছবি: সংগৃহীত, প্রতীকী ও এআই সহায়তায় প্রণীত।