North Korea of Africa

বিরোধীশূন্য রাজনীতি, বাঘে-গরুতে এক ঘাটে খায় জল! তবু কেন গৃহযুদ্ধের আতঙ্কে কাঁপছে ‘আফ্রিকার উত্তর কোরিয়া’?

‘আফ্রিকার উত্তর কোরিয়া’ হিসাবে পরিচিত ইরিত্রিয়ায় গত ৩৩ বছর ধরে ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ শাসনব্যবস্থা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াস আফওয়ার্কি। এ বার কি নেতৃত্বের অভাবে সেখানে আসতে চলেছে কোনও বড় রাজনৈতিক ঝড়? তুঙ্গে জল্পনা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৩২
০১ ১৮
Why Eritrea is called North Korea of Africa

সারা দেশে দ্বিতীয় কোনও রাজনৈতিক দল নেই। ভোট হয় বটে, তবে সেটাকে ঠিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলা যায় না। ‘সর্বোচ্চ নেতা’র কথাই সেখানে বেদবাক্য। আমজনতার মুক্ত চিন্তার অবকাশও খুব কম। গত প্রায় সাড়ে সাত দশক ধরে এই কায়দাতেই শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করছে পিয়ংইয়ং। ৭,৫০০-৮০০০ কিলোমিটার দূরে এ বার পড়ল তার ছায়া। এর ফলে অনেকেই সংশ্লিষ্ট দেশটিকে ‘আফ্রিকার উত্তর কোরিয়া’ নামে ডাকতে শুরু করেছেন।

০২ ১৮
Why Eritrea is called North Korea of Africa

পূর্ব আফ্রিকার ইরিত্রিয়ার এ-হেন ‘বদনামের’ নেপথ্যে অবশ্য একাধিক কারণ রয়েছে। বিশ্ব গণতান্ত্রিক সূচকে তাদের অবস্থান একেবারে নীচের দিকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অসরকারি সংগঠন ‘ফ্রিডম হাউস’ এ ব্যাপারে তাদের ১০০-র মধ্যে তিন রেটিং দিয়েছে। এই রেটিং রাষ্ট্রপুঞ্জের সমস্ত দেশগুলির মধ্যে শেষের দিক থেকে ইরিত্রিয়াকে রেখেছে চার নম্বরে। গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) ভি-ডেম নির্বাচনী গণতান্ত্রিক সূচকে আবার দ্বিতীয় সর্বনিম্ন স্থান পায় আসমারা।

০৩ ১৮
Why Eritrea is called North Korea of Africa

এই রেটিংগুলিই ইরিত্রিয়ার শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি বোঝার পক্ষে যথেষ্ট। এককথায় সেখানে ‘চরম স্বৈরতন্ত্র’ রয়েছে বললে অত্যুক্তি করা হবে না। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র (সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক), সুদান এবং চাদ-সহ এই মহাদেশের অন্য বেশ কিছু রাষ্ট্রের অবস্থাও তথৈবচ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইরিত্রিয়ার চেয়েও তাদের অবস্থা খারাপ বলা যেতে পারে। কিন্তু একটি জায়গায় আসমারার সঙ্গে অমিল রয়েছে তাদের।

Advertisement
০৪ ১৮
Why Eritrea is called North Korea of Africa

বিশ্লেষকদের দাবি, সেটা হল দমনমূলক নীতি। মার্কিন অসরকারি সংগঠনগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে বিন্দুমাত্র দয়ামায়া দেখাতে রাজি নন ইরিত্রিয়ার দীর্ঘ দিনের শাসক ইসাইয়াস আফওয়ার্কি। যে কারণে আফ্রিকার বহু দেশ গৃহযুদ্ধের আগুনে পুড়লেও তা সযত্নে এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে আসমারা। যদিও এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনের জেরে প্রেসিডেন্ট আফওয়ার্কির দেশ বড়সড় ঝুঁকির মুখে পড়তে চলেছে বলেই মনে করে ওয়াকিবহাল মহল।

০৫ ১৮
Why Eritrea is called North Korea of Africa

কৌশলগত অবস্থানের নিরিখে ইরিত্রিয়ার আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। ‘আফ্রিকার শিং’ বা হর্ন অফ আফ্রিকার মধ্যে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রটি গড়ে উঠেছে। এর পশ্চিমে আছে সুদান এবং দক্ষিণ-পূর্বে জিবুতি। এ ছাড়া উত্তর-পূর্ব এবং পূর্ব অংশে মিলবে লোহিত সাগরের বিস্তীর্ণ উপকূলরেখা যার ও পারে ইয়েমেন এবং সৌদি আরব। ভূ-রাজনৈতিক কারণে গত কয়েক বছরে ওই এলাকা বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ফলে দুনিয়ার তাবড় ‘সুপার পাওয়ার’গুলির চোখ যে আসমারার উপর রয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।

Advertisement
০৬ ১৮
Why Eritrea is called North Korea of Africa

এ-হেন ইরিত্রিয়ার শাসনব্যবস্থার শীর্ষে পৌঁছোতে প্রেসিডেন্ট আফওয়ার্কিকে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকে দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ওই সময় আফ্রিকার দেশটিকে শাসন করছিল ব্রিটিশ সরকার। সেই শৃঙ্খল ভেঙে ফেলতে ‘ইরিত্রিয়ান লিবারেশন ফ্রন্টে’ (ইএলএফ) যোগ দেন আফওয়ার্কি। শুধু তা-ই নয়, কয়েক জন বিশ্বস্ত বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে আসমারা থেকে পালিয়ে সুদানে ঢুকে পড়েন তিনি। সেখানে একটি গুপ্ত সংগঠন গড়ে তোলেন।

০৭ ১৮
Why Eritrea is called North Korea of Africa

১৯৬৭ সালে সুদান থেকে চিন পাড়ি দেন আফওয়ার্কি। সেখানে মাওবাদী আদর্শ এবং গেরিলা যুদ্ধকৌশল আয়ত্ত করেন। এই সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন আরও চার সহযোগী। ফেরার পথে সৌদি আরবে গ্রেফতার হন আফওয়ার্কি। নৌকায় লোহিত সাগর পেরিয়ে ইরিত্রিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন তাঁরা। এর জন্য রিয়াধে ছ’মাস জেলে থাকতে হয়েছিল তাঁদের। শেষে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে আসেন আফওয়ার্কি এবং তাঁর বিপ্লবী বন্ধুরা।

Advertisement
০৮ ১৮
Why Eritrea is called North Korea of Africa

আফওয়ার্কি ঘরে ফিরতেই তাঁকে ডেকিবারেক এলাকার রাজনৈতিক কমিশনার নিযুক্ত করে ‘ইরিত্রিয়ান লিবারেশন ফ্রন্ট’ (ইএলএফ)। যদিও কিছু দিনের মধ্যেই দলের কাজকর্মে মোহভঙ্গ হয় তাঁর। তিনি বুঝতে পারেন ইএলএফের মূল লক্ষ্য স্বাধীনতা নয়। মূলত দেশ জুড়ে খ্রিস্টান বিদ্বেষ এবং সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াতে চাইছে তারা। আর তাই দল ছেড়ে দিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করেন তিনি। নাম দেন ‘পিপলস ফ্রন্ট অফ ডেমোক্র্যাসি অ্যান্ড জাস্টিস’ (পিএফডিজে)।

০৯ ১৮
Why Eritrea is called North Korea of Africa

গত শতাব্দীর ৭০-এর দশকে ইএলএফের সঙ্গে এক ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে পিএফডিজে। সেটা ১৯৭২-’৭৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। এই লড়াই চলাকালীন আফ্রিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্রেরা দলে দলে যোগ দেন আফওয়ার্কির বাহিনীতে। অন্য দিকে নেতৃত্বের সঙ্কটে ভুগছিল ‘ইরিত্রিয়ান লিবারেশন ফ্রন্ট’। ফলে তাদের হারিয়ে দেশের অবিসংবাদি নেতা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন আফওয়ার্কি। পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে তাঁর রাজনৈতিক জীবন পুরোপুরি পাল্টে গিয়েছিল।

১০ ১৮
Why Eritrea is called North Korea of Africa

১৯৯১ সাল আসতে আসতে রাজধানী আসমায়া দখল করে আফওয়ার্কির দল। সে বছরই ইরিত্রিয়ার স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন জানায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯৩ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের তত্ত্বাবধানে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় সেখানে। ওই সময় থেকেই আফ্রিকার দেশটির প্রেসিডেন্টের কুর্সি পেয়ে যান আফওয়ার্কি। পাশাপাশি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দলের মহাসচিবও নির্বাচিত হন তিনি। তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৯৪ সালে চালু হয় জাতীয় সেবা কর্মসূচি। সেখানে ১৮ বছর বয়স হলে ছ’মাসের জন্য সৈনিক জীবন কাটানো বাধ্যতামূলক করা হয়।

১১ ১৮
Why Eritrea is called North Korea of Africa

গোড়ার দিকে একাধিক বিশ্বনেতার প্রশংসা কুড়োন আফওয়ার্কি। উদাহরণ হিসাবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের কথা বলা যেতে পারে। আফওয়ার্কিকে ‘আফ্রিকান রেনেসাঁ নেতা’ বলে উল্লেখ করতেন তিনি। যদিও কয়েক বছরের মধ্যেই স্বৈরাচারী মনোভাব প্রকাশ পায় তাঁর। ১৯৯৭ সালে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে ইরিত্রিয়া। কিন্তু আজও তা কার্যকর করেননি আসমারা। পাশাপাশি, ৯০-এর দশক থেকে শুরু করে একের পর এক নির্বাচনকে বাতিল বলে ঘোষণা করেছে সেখানকার প্রশাসন।

১২ ১৮
Why Eritrea is called North Korea of Africa

২০০১ সালে শেষ বার সংসদীয় নির্বাচনের মুখ দেখেছিল ইরিত্রিয়া। কিন্তু ভোট শেষ হতেই তড়িঘড়ি তা অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত করে দেন প্রেসিডেন্ট আফওয়ার্কি। তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি সেনা ও পুলিশের পাশাপাশি ভাড়াটে ফৌজ রাখার অভিযোগও রয়েছে। ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ করে তাদের সাহায্যেই একের পর এক পথের কাঁটা সরিয়েছেন ইসাইয়াস। ২০১৪ সালে সংবিধানকে ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করেন তিনি। কথা দেন, দেশ চালাতে তৈরি হবে নতুন আইনের বই, যা আজও প্রকাশ্যে আসেনি।

১৩ ১৮
Why Eritrea is called North Korea of Africa

এ ভাবে নিজের মুঠোর মধ্যে ইরিত্রিয়াকে আটকে রাখলেও বর্তমানে জটিল সমস্যার মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট আফওয়ার্কি। কারণ, ৮০ বছর বয়স হয়ে যাওয়ার জেরে ধীরে ধীরে অক্ষম হয়ে পড়ছেন তিনি। ফলে হঠাৎ করে যদি তাঁর মৃত্যু হয় তা হলে নেতৃত্বের বড়সড় সঙ্কটের মুখে পড়বে ইরিত্রিয়া। তখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে ব্যক্তিকেন্দ্রিক-স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, বলছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। বাধতে পারে গৃহযুদ্ধও।

১৪ ১৮
Why Eritrea is called North Korea of Africa

মজার বিষয় হল, গত ৩৩ বছরে নিজের উত্তরসূরি তৈরির ব্যাপারে কোনও চেষ্টাই করেননি প্রেসিডেন্ট আফওয়ার্কি। নিজের দলের মধ্যেও তাঁর কোনও ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ নেই। ১৯৯৩ সালে কুর্সিতে বসার এক বছরের মধ্যেই যাবতীয় স্বাধীন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব মুছে ফেলেন ইসাইয়াস। ফলে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা হিসাবে উঠে আসার সুযোগও পাননি কেউ।

১৫ ১৮
Why Eritrea is called North Korea of Africa

তুর্কমেনিস্তান এবং উত্তর কোরিয়া বা ডিপিআরকেতে (ডেমোক্র্যাটিক পিপল্‌স রিপাবলিক অফ কোরিয়া) ঠিক এই ধরনের ব্যক্তিবাদী শাসনব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু, সেখানে ক্ষমতা টিকে যাওয়ার নেপথ্যে মূল কারণ হল সময় থাকতে উত্তরাধিকারী নির্বাচন। আশখাবাদ এবং পিয়ংইয়ং ইতিমধ্যেই সেই ইঙ্গিত বেশ কয়েক বার দিয়ে ফেলেছে। অন্য দিকে এ ব্যাপারে যথেষ্ট উদাসীন আফওয়ার্কি। ফলে নেতৃত্বের সঙ্কট আফ্রিকার দেশটির বিপদের কারণ হতে পারে, বলছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।

১৬ ১৮
Why Eritrea is called North Korea of Africa

এ ব্যাপারে আবার অন্য যুক্তি দিয়েছে ‘জিয়োপলিটিক্যাল মনিটর’। গণমাধ্যম সংস্থাটির দাবি, উত্তরাধিকার খোঁজার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট আফওয়ার্কির একটা অসুবিধা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে দলের ভিতরে প্রতিযোগিতার আশঙ্কা প্রবল, যা শাসনব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। এমনকি আফওয়ার্কির ব্যক্তিগত ক্ষতির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে মৃত্যুর আগেই ক্ষমতাচ্যুত হতে হবে তাঁকে, যা কোনও ভাবেই চান না আফ্রিকার এই রাজনৈতিক নেতা।

১৭ ১৮
Why Eritrea is called North Korea of Africa

দ্বিতীয়ত, আর্থিক দিক থেকে ইরিত্রিয়ার বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হল কম কৃষি উৎপাদন এবং অনিয়ন্ত্রিত কালোবাজারি। তবে দারিদ্র থাকা সত্ত্বেও আফ্রিকার দেশটি কখনওই দুর্ভিক্ষের মুখে পড়েনি। লম্বা সময় ধরে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠতে চিনের মতো যৌথ খামার তৈরির চেষ্টা হচ্ছে সেখানে। আসমারা তাতে অবশ্য এখনও সাফল্য পায়নি। তা ছাড়া ইরিত্রিয়ার রাজস্ব এবং বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার অনেকটাই অবৈধ বাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

১৮ ১৮
Why Eritrea is called North Korea of Africa

ইরিত্রিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় অংশই মনে করেন, এই ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট আফওয়ার্কির জুড়ি মেলা ভার। আমেরিকা এবং চিন, দুই ‘সুপার পাওয়ারের’ সঙ্গেই বেশ সুসম্পর্ক রয়েছে তাঁর। ফলে জটিল ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় স্বৈরাচারী সত্ত্বেও তাঁকে মেনে নিতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না আফ্রিকাবাসীর।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
আরও গ্যালারি