Iran’s Economy

রণক্লান্ত ইরানে হু হু করে বাড়ছে মুদ্রাস্ফীতি! বেকারত্ব, মুল্যবৃদ্ধির ক্ষতে রক্তশূন্য সাবেক পারস্য কি এ বার দেউলিয়া হওয়ার পথে?

নতুন বছরের শুরু থেকে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি ছিল ইরানে। গত বছরের শেষে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শান্তিপূর্ণ ভাবে গণবিক্ষোভ শুরু হলেও, অচিরেই তা হিংসাত্মক রূপ ধারণ করে। ইরানের পুলিশ এবং আইআরজিসি বাহিনীর দমননীতির জেরে সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে না দিতেই বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:১৭
০১ ১৮
Iran’s Economy

পাঁচ সপ্তাহ পেরিয়ে ইরানের সঙ্গে সাময়িক সংঘর্ষবিরতির কথা ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরান যুদ্ধে তৈরি হওয়া জ্বালানি সঙ্কটের অস্থিরতা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে তাবড় দেশ। পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও পারস্য এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী সরু সামুদ্রিক রাস্তাটিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে ইরানের আধা সেনা ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি।

০২ ১৮
Iran’s Economy

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথটি অবরুদ্ধ করে আমেরিকাকে ‘শিক্ষা’ দিতে গিয়ে যুদ্ধের আঁচে পুড়ছে তেহরানের শরীরও। সামরিক শক্তিতে ইরান প্রতিরোধ টিকিয়ে রাখলেও ভিতরে ভিতরে ফোঁপরা হয়ে যাচ্ছে দেশটি, এমনটাই মনে করছেন আর্থিক বিশ্লেষকেরা।

০৩ ১৮
Iran’s Economy

পশ্চিমি সংবাদমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে দাবি উঠেছে, অর্থনৈতিক ভাবে কোমর ভেঙে গিয়েছে সাবেক পারস্যদেশটির। মোজ়তবা খামেনেইয়ের দেশটি এখন একটি অচল রাষ্ট্রের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, এমনটাই দাবি একটি মার্কিন সংবাদসংস্থার। সংঘর্ষবিরতি হতেই আর্থিক হাল ফেরাতে হরমুজ় প্রণালীতে জাহাজপিছু ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ট্রানজ়িট ফি বা টোল (শুল্ক বা মাসুল) আদায় করছে ইরানি সামরিক বাহিনী আইআরজিসি। পাশাপাশি, ওই সামুদ্রিক রাস্তাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণেই রাখতে চায় তারা।

Advertisement
০৪ ১৮
Iran’s Economy

ইউরেশিয়ান টাইমসের একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানে অর্থনীতির হাঁড়ির হাল। দু’সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ইরানকে খুব একটা স্বস্তি দিচ্ছে না। কারণ দেশের অর্থনীতি তলানিতে ঠেকেছে। উৎপাদন এবং রফতানি খাত থেকে আয় মৃতবৎ। পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধের পর ইরানের অর্থনীতি বিধ্বস্ত, জিনিসপত্রের দাম তিন গুণ বেড়েছে, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ঝাঁপ বন্ধ। এর দোসর আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি।

০৫ ১৮
Iran’s Economy

পরিসংখ্যান বলছে, ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মান সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে ১ ডলারের নিরিখে রিয়ালের মান ১১ লক্ষ থেকে ১৩ লক্ষ পর্যন্ত ওঠানামা করছে। ইরানি জনতার জমানো টাকার কোনও মূল্যই অবশিষ্ট নেই। ‘অপারেশন এপিক ফিউরির’ আগেও তেহরানে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছিল। পাঁচ সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা প্রাণঘাতী সংঘাতের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে বলে সংবাদ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

Advertisement
০৬ ১৮
Iran’s Economy

খাদ্যপণ্যের মুদ্রাস্ফীতি ৭০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশের ঘর ছুঁয়ে ফেলেছে ইরানে। যুদ্ধের প্রভাবে অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে তিন গুণ বা তার বেশি দাম চোকাতে হচ্ছে ইরানি জনতাকে। যুদ্ধের তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে। খাবার, পানীয়, ওষুধ বা ডায়াপার থেকে শুরু করে শহরের ক্যাফেতে দুপুরের খাবার— সব কিছুর দামই চড়া।

০৭ ১৮
Iran’s Economy

নতুন বছরের শুরু থেকে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি ছিল ইরানে। গত বছরের শেষে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শান্তিপূর্ণ ভাবে গণবিক্ষোভ শুরু হলেও, অচিরেই তা হিংসাত্মক রূপ ধারণ করে। ইরানের পুলিশ এবং আইআরজিসি বাহিনীর দমননীতির জেরে সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে না দিতেই বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। আমেরিকান ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা রিয়ালের তীব্র অবমূল্যায়ন দুর্বিষহ করে তুলেছে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন।

Advertisement
০৮ ১৮
Iran’s Economy

২০১৮ সালে তেহরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেরিয়ে যাওয়ার পর তেল বিক্রয় এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। গত সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করার পর, ইরানি মুদ্রার মান আরও কমে যায়। ইরানের পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্যমতে, ফেব্রুয়ারি মাসে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৪৭.৫ শতাংশ।

০৯ ১৮
Iran’s Economy

ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করতে তৎপর মার্কিন বাহিনীও। জানা গিয়েছে সংঘাতের ১৩তম দিনে ইরানের ব্যাঙ্কগুলিকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় আমেরিকা। এর মধ্যে ছিল ইরানের সবচেয়ে পুরনো ব্যাঙ্কও। ইজ়রায়েল ও মার্কিন হামলায় ইরানের তেল শোধনাগার এবং গ্যাসক্ষেত্রগুলিও (বিশেষ করে দক্ষিণ পার্স) মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেল রফতানি বন্ধের মুখে। সরকারি আয়ের প্রধান উৎসটিই মৃতপ্রায়।

১০ ১৮
Iran’s Economy

আর্থিক প্রতিবেদনগুলিতে উঠে এসেছে, দেশটির প্রায় ৫৭ শতাংশ মানুষ বর্তমানে পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের দু’বেলা খাবার জোটানোই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারখানা থেকে শুরু করে পাড়ার ছোট কফিশপ বা দোকান— সবই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বেকারত্বের হার অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যাওয়ায় গণবিক্ষোভের আশঙ্কাকেও দূরে সরিয়ে রাখা যাচ্ছে না।

১১ ১৮
Iran’s Economy

ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় শহর তাবরিজের একটি ছোট পোশাক কারখানার মালিক আরাশ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, তিনি উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে তাঁর উপর নির্ভরশীল ১২ জন কর্মচারী সাময়িক ভাবে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তেহরানের উপকণ্ঠের বাসিন্দা ৪০ বছর বয়সি এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, তিনি যে টোস্ট খান তার দাম হঠাৎ করে ৭,০০,০০০ রিয়াল থেকে বেড়ে ১,০০০,০০০ রিয়াল (প্রায় ০.৭৫ ডলার) হয়েছে।

১২ ১৮
Iran’s Economy

লাগামছাড়া মুদ্রাস্ফীতির লক্ষণ হল ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের নোট ছাপানো। মার্চ মাসের মাঝামাঝি এক কোটি রিয়ালের একটি নতুন নোট চালু করেছে সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক অফ ইরান। এটি সর্বোচ্চ মূল্যমানের নোট। ১ কোটি রিয়ালের এই নোটটির মূল্য বর্তমানে মাত্র ৭ ডলার বা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৬৫০-৭১২ টাকার সমান। বাজারে টাকার জোগান স্বাভাবিক রাখতে ফেব্রুয়ারি মাসে ৫০ লক্ষ রিয়ালের নোট ছেড়েছিল ইরান।

১৩ ১৮
Iran’s Economy

যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ইরানি জনতার উপর। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে। মার্কিন ও ইজ়রায়েলি হানায় অন্তত ১,৯৩৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত হয়েছেন ২৪,৮০০ জনেরও বেশি মানুষ।

১৪ ১৮
Iran’s Economy

যুদ্ধ মানেই যুযুধান দেশগুলির অর্থব্যবস্থায় আঘাত। অর্থব্যবস্থার স্বাস্থ্যহানি ঘটানোর পাশাপাশি মানবসম্পদের হানি যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণাম। যুদ্ধ করতে হলে তার খরচ তো আছেই, কিন্তু তা মোট আর্থিক ক্ষতির একটি অংশমাত্র। যুদ্ধের অন্যান্য আর্থিক ক্ষতির তালিকাও দীর্ঘ। যদি মানবসম্পদ বা রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর ক্ষতির মতো জিনিসগুলিকে হিসাবের বাইরেও রাখা যায়, তবে যুদ্ধের অন্যতম ক্ষতি হল, একাধিক দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়া।

১৫ ১৮
Iran’s Economy

ইরান সরকারের এক সাবেক কর্মকর্তার মতে, অর্থনীতির চালিকাশক্তি বৃহত্তম শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিকে মেরামত করতে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর সময় লাগবে। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেওয়া হলে দেশটি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। জেস্তান ও ইসফাহানের বিশাল ইস্পাত কারখানাগুলি বন্ধ হয়েছে। প্রতিটি কারখানায় হাজার হাজার শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ ছাড়া মার্কিন হামলায় একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বিকল হওয়ার কারণে উপসাগরীয় উপকূলের শিল্পাঞ্চলেও তালা পড়েছে।

১৬ ১৮
Iran’s Economy

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পাঁচ সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধের বিপুল সামরিক ব্যয়ভার। ইরানের সামরিক অভিযানের সঠিক ব্যয় কত তা নিয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট বা সরকারি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ইরান সরকার তাদের সামরিক বাজেট বা যুদ্ধের খরচ সম্পর্কে গোপনীয়তা বজায় রাখে। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে একটি খরচের কাঠামোর আভাস দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে।

১৭ ১৮
Iran’s Economy

সেই প্রতিবেদনগুলিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান যে পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করছে, তার উৎপাদন ব্যয় এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মার্কিন অস্ত্রের তুলনায় বহুলাংশে কম। সস্তার ড্রোন আর কম খরচের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র— এই দিয়েই সুপার পাওয়ারের সঙ্গে লড়ে গিয়েছে ইরানি ফৌজের কমান্ডারেরা। প্রতিটি শাহিদ-১৩৬ ড্রোন তৈরি করতে আনুমানিক ২০,০০০ থেকে ৫০,০০০ ডলার খরচ হয়। কিছু বিশ্লেষক আবার বিশেষ পরিস্থিতিতে এর উৎপাদন খরচ ১০,০০০ থেকে ৩৫,০০০ ডলারের আশপাশে হতে পারে বলেও মত দিয়েছেন।

১৮ ১৮
Iran’s Economy

ইরানের সংস্কারপন্থী কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সূত্রের দেওয়া তথ্যগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইরানের নীতি-নির্ধারকেরা একটি ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সম্মুখীন। মোজ়তবা প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, ইরান এখন তার ইতিহাসের অন্যতম কঠিন মোড়ে দাঁড়িয়ে। এক দিকে যুদ্ধের ময়দানে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ, অন্য দিকে নিজের দেশের ভিতর ক্ষুধার্ত ও ক্ষুব্ধ জনগণের সম্ভাব্য বিদ্রোহের আশঙ্কা। যুদ্ধক্ষেত্রে হয়তো তারা ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আমেরিকা ও ইজ়রায়েলকে ব্যস্ত রাখছে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে দেশটি দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে।

ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
আরও গ্যালারি