ফের রক্তাক্ত পাকিস্তান। আত্মঘাতী বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল রাজধানী ইসলামাবাদের শেহজ়াদ টাউন এলাকার শিয়া টারলাই ইমামবাড়ার মসজিদ। ঘটনায় এখনও পর্যন্ত সরকারি হিসাবে মৃত্যু হয়েছে ৩১ জনের, আহত ১৫০। তাঁদের মধ্যে অনেকের অবস্থাই সঙ্কটজনক হওয়ায় নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। জুম্মার নমাজ চলাকালীন হওয়া এই ফিদায়েঁ হামলার নেপথ্যে আছে কাদের হাত? এই ইস্যুতে রাওয়ালপিন্ডির অবসরপ্রাপ্ত এক সেনা অফিসারের চাঞ্চল্যকর দাবি ঘিরে পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশটিতে পড়ে গিয়েছে শোরগোল।
চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি ইসলামাবাদের শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বিস্ফোরণের কিছু ক্ষণের মধ্যেই সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় একটি ভিডিয়ো। সেখানে এই ধরনের ফিদায়েঁ হামলার আশঙ্কা করে রাওয়ালপিন্ডির অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসার আদিল রাজাকে একাধিক বিস্ফোরক মন্তব্য করতে শোনা গিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এর জন্য পাক সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান তথা সিডিএস (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে দায়ী করেছেন তিনি। ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিয়োর সত্যতা অবশ্য যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম।
এক্স হ্যান্ডলের (সাবেক টুইটার) ‘ফ্রন্টালফোর্স’ নামের একটি অ্যাকাউন্টে পোস্ট হওয়া ওই ভিডিয়োতে আদিলকে ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশনের কথা বলতে শোনা গিয়েছে। তাঁর দাবি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশ মেনে গাজ়ার ‘বোর্ড অফ পিস্’-এ যোগ দিয়েছে পাকিস্তান। ফলে শর্ত মেনে আগামী দিনে প্যালেস্টাইনভূমিতে সৈনিক পাঠাতে হবে ইসলামাবাদকে। ইজ়রায়েলের পক্ষ নিয়ে সেখানে লড়তেও হতে পারে তাঁদের, যা একেবারেই চাইছেন না ফিল্ড মার্শাল মুনির। আর তাই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলিকে ব্যবহার করে দেশের ভিতরে অস্থিরতা তৈরির ছক রয়েছে তাঁর।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, আদিলের এই মন্তব্যের কয়েক দিনের মাথাতেই খোদ রাজধানী ইসলামাবাদে শিয়া মসজিদে ফিদায়েঁ হামলার ঘটনা ঘটায় দানা বেঁধেছে সন্দেহ। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের অনেকেই এতে দু’য়ে দু’য়ে চার করেছেন। তাঁদের দাবি, আগামী দিনে ভারত ও আফগানিস্তান সীমান্তেও এই ধরনের ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশনের পরিকল্পনা করতে পারেন ফিল্ড মার্শাল মুনির। কারণ, সেটা ছাড়া ট্রাম্পকে ধোঁকা দেওয়ার দ্বিতীয় কোনও রাস্তা তাঁর সামনে খোলা নেই। সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এক ঢিলে দুই পাখি মারার সুযোগ পেয়ে যাবেন তিনি।
এখন প্রশ্ন হল, কী এই ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশন? এটি প্রকৃতপক্ষে একটি গোপন সামরিক বা রাজনৈতিক অভিযান, যার মাধ্যমে কোনও দেশের সেনা বা গুপ্তচর সংস্থা নিজেদের এলাকাতেই ধ্বংসাত্মক মিথ্যা অভিযান চালিয়ে থাকে। তার পর অত্যন্ত সুচতুর ভাবে ঘটনার দায়ভার শত্রুদের উপর চাপিয়ে দেয় তারা। সংশ্লিষ্ট অভিযানকে নিয়ে ব্যাপক ভাবে চালাতে থাকে মিথ্যা প্রচার। জিগির তোলে জাতীয়তাবাদের। এককথায় ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশনকে সংঘর্ষ শুরুর উস্কানি বলা যেতে পারে, যা যুগে যুগে ব্যবহার করে এসেছেন নিষ্ঠুর সেনা কমান্ডারেরা।
এ ব্যাপারে উদাহরণ হিসাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনার সময়কার ঘটনার কথা বলা যেতে পারে। ১৯৩৯ সালের অগস্টে ফ্যুয়েরার আডল্ফ হিটলারের নির্দেশে নাৎজ়ি জার্মানির আধাসেনা এসএস বাহিনী পোল্যান্ড সীমান্তে নিজেদের একাধিক রেডিয়ো স্টেশনে জোরালো আক্রমণ শানায়। ইতিহাসে যা গ্লিউইটজ় ঘটনা নামে পরিচিত। হামলার সময় এসএস সদস্যদের গায়ে ছিল পোলিশ সৈনিকদের পোশাক। ফলে ওই ঘটনার দায় পুরোপুরি ভাবে ওয়ারশ’র কাঁধে চাপিয়ে দিতে হিটলারের তেমন অসুবিধা হয়নি। পাশাপাশি, পোল্যান্ড অভিযানের রাস্তাও খুলে গিয়েছিল।
১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধ থেমে গেলেও এই ধরনের মিথ্যা অভিযানে কিন্তু ছেদ পড়েনি। উল্টে গত শতাব্দীর ৬০ এবং ৭০-এর দশক থেকে এতে হাত পাকাতে শুরু করে বিভিন্ন দেশের গুপ্তচর সংস্থা। সেই তালিকায় নাম আছে পাকিস্তানের ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স বা আইএসআইয়েরও। ফিল্ড মার্শাল মুনির একসময় ওই গুপ্তচর সংস্থার শীর্ষপদে ছিলেন। ফলে কোনও জঙ্গিগোষ্ঠীকে ব্যবহার করে শিয়া মসজিদে ফিদায়েঁ হামলা চালানো তাঁর পক্ষে যে একেবারেই কঠিন নয়, তা বলাই বাহুল্য।
বিশ্লেষকদের দাবি, আদিলের কথা সত্যি হলে মূলত দু’টি কারণে খোদ রাজধানীর বুকে এই ধরনের মিথ্যা অভিযান চালিয়েছেন পাক সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট ফিদায়েঁ হামলার জেরে ঘরোয়া অস্থিরতার অজুহাত দিয়ে প্যালেস্টাইনের গাজ়া উপত্যকায় সৈনিক পাঠাবেন না তিনি। এ ব্যাপারে সরাসরি ট্রাম্পকে ‘নেতিবাচক’ জবাব দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই নিজের দেশের বাসিন্দাদের খুন করে ফিল্ড মার্শাল মুনির নিজের পিঠ বাঁচালেন বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেওয়ার পর থেকেই গাজ়া উপত্যকায় ইজ়রায়েল ও প্যালেস্টাইনপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের মধ্যে লড়াই থামাতে তৎপর হন ট্রাম্প। সেই লক্ষ্যে এ বছরের জানুয়ারিতে সুইৎজ়ারল্যান্ডের দাভোসে ‘বোর্ড অফ পিস’-এর সূচনা করেন তিনি। পাশাপাশি, ওই এলাকার জন্য একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীল বাহিনী তৈরির কথা বলতে শোনা গিয়েছে তাঁকে। সৈনিক সরবরাহের মাধ্যমে তা গঠনে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল পাকিস্তান। যদিও পরবর্তী কালে এ ব্যাপারে ইসলামাবাদের অন্দরে দানা বাঁধে গণবিক্ষোভ।
ট্রাম্পের মস্তিষ্কপ্রসূত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীল বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেবে ইজ়রায়েল। গাজ়া উপত্যকায় হামাসের নিরস্ত্রীকরণই হবে তাদের প্রধান কাজ। বিশ্লেষকদের দাবি, এতে দু’দিক থেকে বিপদে পড়েছেন ফিল্ড মার্শাল মুনির। প্রথমত, এই শর্ত মেনে নিলে ইহুদিভূমিকে বকলমে স্বীকৃতি দিয়ে ফেলবে ইসলামাবাদ, যাকে রাষ্ট্র হিসাবে এখনও মান্যতাই দেয়নি ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশী। শুধু তা-ই নয়, পশ্চিম এশিয়ার আরব দুনিয়ায় তেল অভিভের অস্তিত্ব মুছে গিয়ে কেবলমাত্র প্যালেস্টাইন থাকুক— এই তত্ত্ব মেনেই এগিয়েছে পাকিস্তানের বিদেশনীতি।
দ্বিতীয়ত, ট্রাম্পের দেওয়া শান্তি সমঝোতা মেনে হাতিয়ার ছাড়তে নারাজ প্যালেস্টাইনপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস। ফলে গাজ়ায় তাঁদের নিরস্ত্রীকরণের প্রক্রিয়া একেবারেই সহজ নয়। ফলে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীল বাহিনী হামাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়াবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। সে ক্ষেত্রে পাক সৈনিকদের হাতে প্যালেস্টাইনপন্থীদের মৃত্যু হওয়ার আশঙ্কা ষোলো আনা। এতে নিজের দেশেই জনপ্রিয়তা হারাতে পারেন ফিল্ড মার্শাল মুনির। সেই ঝুঁকি কোনও অবস্থাতেই নিতে চাইছেন না ইসলামাবাদের ‘সিপাহসালার’।
এ ছাড়া গাজ়া উপত্যকায় ট্রাম্প প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীল বাহিনীকে পুরোপুরি ভাবে ইজ়রায়েলি কমান্ডারেরা নিয়ন্ত্রণ করবেন বলে মনে করা হচ্ছে। গত কয়েক মাসে এই সমস্ত খবর প্রকাশ্যে আসতেই উত্তপ্ত হয় ইসলামাবাদের ঘরোয়া রাজনীতি। পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশটির একাধিক এলাকায় আছড়ে পড়ে জনরোষ, যাতে নেতৃত্ব দেয় ‘তেহরিক-ই-লাব্বাইক পাকিস্তান’ (টিএলপি) নামের একটি কট্টরপন্থী দল। সেই বিক্ষোভ থামাতে কালঘাম ছুটে গিয়েছিল শাহবাজ় প্রশাসনের। ওই সময় আন্দোলন থামাতে বহু জায়গায় গুলি চালাতেও পিছপা হয়নি পাক পুলিশ ও আধা সেনা।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এগুলি বাদ দিলে আরও একটি কারণে গোটা ঘটনার নেপথ্যে মুনিরের হাত থাকার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ফিদায়েঁ হামলার দায় ইতিমধ্যেই ভারত ও আফগানিস্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এতে আগামী দিনে যুদ্ধের জিগির তোলা তাঁর পক্ষে অনেক বেশি সহজ হবে। পাশাপাশি, সামরিক খাতে ব্যয়বৃদ্ধির জন্য প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ়ের উপর চাপ তৈরি করতে পারবেন পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান।
ইসলামাবাদের শিয়া মসজিদে বিস্ফোরণকাণ্ডের বেশ কয়েক ঘণ্টা পর হামলার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেয় কুখ্যাত জঙ্গিগোষ্ঠী দায়েশ বা ইসলামিক স্টেট (আইএস)। গত বছর এদেরই মদত দেওয়ার অভিযোগে পাক গুপ্তচরবাহিনী আইএসআইয়ের বিরুদ্ধে আঙুল তুলেছিল আফগানিস্তানের তালিবান সরকার। শাহবাজ় প্রশাসন ও রাওয়ালপিন্ডির সেনাকর্তারা অবশ্য পত্রপাঠ তা খারিজ করে দেন। তার পরেও অবশ্য এ ব্যাপারে সন্দেহ দূর হয়নি। উল্টে ৬ ফেব্রুয়ারির ফিদায়েঁ হামলায় সেই জল্পনার আগুনে যে ঘি পড়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
পাক গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুপুরে নমাজপাঠের সময় আত্মঘাতী হামলা চালায় এক দায়েশ জঙ্গি। মসজিদের ফটকের সামনে তাঁকে ইতিউতি ঘোরাফেরা করতে দেখেই সন্দেহ হয় নিরাপত্তারক্ষীদের। বাধা দিতে গেলে আচমকা আগ্নেয়াস্ত্র বার করে এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে সে। এর পর একরকম জোর করে মসজিদের ভিতরে ঢুকে পড়ে ওই সন্ত্রাসী। তার পরনে ছিল ‘সুইসাইড ভেস্ট’ বা আত্মঘাতী কবচ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায়, ওই সময় মসজিদের ভিতরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হুড়োহুড়ি করে সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন অনেকে। যদিও ফিদায়েঁ হামলাকারী সেই সুযোগ দেয়নি। মুহূর্তে বোতাম টিপে নিজেকে উড়িয়ে দেয় সে। সেই বিস্ফোরণে উড়ে যায় মসজিদের একাংশ। পরে আত্মঘাতী জঙ্গিকে শনাক্ত করে পাক প্রশাসন। যদিও নিরাপত্তা ও তদন্তের স্বার্থে তার নাম এখনই প্রকাশ করা হবে না বলে জানিয়েছে ইসলামাবাদ।
সংশ্লিষ্ট হামলার পর মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইম্সের কাছে মুখ খোলেন শাহবাজ় সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ। তিনি জানিয়েছেন, হামলাকারী পাকিস্তানি নাগরিক। তবে একাধিক বার আফগানিস্তানে যাতায়াত করেছিল সে। সেই প্রমাণ মিলেছে। গোটা ঘটনায় আফগান তালিবানের হাত দেখছে ইসলামাবাদ। তাঁদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভারতই নাকি গোটা বিষয়টি পরিচালনা করেছে। যদিও এর সপক্ষে কোনও প্রমাণ দেখাতে পারেনি পশ্চিমের প্রতিবেশী।
৬ ফেব্রুয়ারি রাতেই পাকিস্তানের এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা করে পাল্টা বিবৃতি দেয় নয়াদিল্লি। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘‘অভ্যন্তরীণ সামাজিক সমস্যাগুলির দিকে নজর না দিয়ে দোষারোপে ব্যস্ত আছে ইসলামাবাদ। সেই কারণেই বার বার মিথ্যা অভিযোগ করছে তারা।’’ ভারতের মতোই খোয়াজ়া আসিফের মন্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মুখপাত্র এনায়েতুল্লাহ খোয়ারিজমি।
সব ছবি: সংগৃহীত।