ইতিহাসের পাতা উল্টে জাহাজডুবির দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করলে সর্বপ্রথম টাইটানিকের কথা মাথায় আসে। হিমশৈলের সঙ্গে ধাক্কায় নিহত হন দেড় হাজারেরও বেশি। টাইটানিক ডুবে যাওয়ার সাক্ষী ছিলেন এক পরিচারিকা। প্রাণে বেঁচে ফিরেছিলেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, কর্মজীবনে মোট তিন বার জাহাজডুবির সম্মুখীন হয়েছিলেন। তিন বারই সমুদ্রের ভয়াবহতার সাক্ষী থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরেছিলেন তিনি। সেই পরিচারিকার জীবনকাহিনি শুনলে গায়ে কাঁটা দিতে বাধ্য। আসল নামের পরিবর্তে ‘মিস আনসিঙ্কেবল’ নামে খ্যাতি পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
১৮৮৭ সালের অক্টোবরে আর্জেন্টিনায় জন্ম ভায়োলেট জেসপের। তাঁর বাবা-মা দু’জনেই আয়ারল্যান্ডের বাসিন্দা ছিলেন। আর্জেন্টিনায় জন্ম হলেও কেরিয়ার গড়ার জন্য পরিবার-সহ ব্রিটেনে চলে গিয়েছিলেন ভায়োলেট। বিলাসবহুল জাহাজে পরিচারিকার কাজ করতে শুরু করেন তিনি।
ভায়োলেট যখন পেশাজীবনে ধীরে ধীরে থিতু হওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন তাঁর কাছে বড় সুযোগ আসে। সেই সময় বিলাসবহুল প্রচুর জাহাজ আটলান্টিক মহাসাগরের উদ্দেশে পাড়ি দেওয়া শুরু করেছিল। এই জাহাজের কর্মী হিসাবে কাজের সুযোগ পাওয়া বেশ লোভনীয় ছিল। বিরল স্বাধীনতা এবং বিপুল আয়ের আকর্ষণে সেই চাকরি গ্রহণ করেছিলেন ভায়োলেট।
প্রথম বিপর্যয়টি ঘটেছিল ১৯১১ সালে। সেই সময় আরএমএস অলিম্পিক জাহাজে কর্মরত ছিলেন ভায়োলেট। সেই সময়ে আইল অফ ওয়াইটের কাছে ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস হকের সঙ্গে জাহাজটির সংঘর্ষ হয়েছিল।
যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে অলিম্পিক মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে, সেই জাহাজটি ডুবে যায়নি। কোনও রকমে বন্দরে ফিরে গিয়েছিল। ভায়োলেটও গুরুতর আঘাত ছাড়াই বেঁচে গিয়েছিলেন।
অলিম্পিকের দুর্ঘটনার পর এক বছর কাটতে না কাটতেই ভায়োলেট কাজের সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলেন টাইটানিকে। ১৯১২ সালের ১০ এপ্রিল। সাদাম্পটন থেকে নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে প্রথম যাত্রা শুরু করেছিল টাইটানিক। সেই সময় জাহাজের নাবিকদলের ক্রু সদস্য হিসাবে টাইটানিকে চড়েছিলেন ভায়োলেট।
যাত্রা শুরুর চার দিন পর উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে একটি হিমশৈলের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ডুবতে শুরু করেছিল বিলাসবহুল টাইটানিক। যে সকল যাত্রী ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে পারতেন না, তাঁদের শান্ত করে ডকে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পড়েছিল ভায়োলেটের উপর।
ভায়োলেট বহু যাত্রীকে শান্ত করে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। তাঁদের লাইফবোটে তুলে নিজেও ১৬ নম্বর লাইফবোটে উঠে পড়েছিলেন। দীর্ঘ সময় পর কার্প্যাথিয়া নামের একটি জাহাজ তাঁদের উদ্ধার করেছিল। দ্বিতীয় বার জাহাজ দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যান ভায়োলেট।
তার পর প্রায় চার বছরের বিরতি। ১৯১৬ সাল। দু’বার ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়েও মনোবল ভাঙেনি ভায়োলেটের। টাইটানিকের ‘সিস্টার শিপ’ নামে পরিচিত এইচএমএইচএস ব্রিটানিক জাহাজে নার্স হিসাবে কাজ শুরু করেন তিনি। সেখানেও জাহাজডুবির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন।
এজিয়ান সাগরে মাইন বিস্ফোরণের সম্মুখীন হয়েছিল ব্রিটানিক। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে জাহাজটি ডুবতে শুরু করে। ভায়োলেট লাইফবোটে চেপে প্রাণে বাঁচার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে লাইফবোটটি জাহাজের প্রপেলারে আটকে গিয়েছিল।
শেষ মুহূর্তে প্রাণরক্ষার জন্য লাইফবোট থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছিলেন ভায়োলেট। প্রাণে বেঁচে গেলেও মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন তিনি। আশ্চর্যজনক ভাবে, তিনটি সামুদ্রিক বিপর্যয় থেকে বেঁচে গিয়ে পরবর্তী সময়েও বহু জাহাজে কাজ চালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
এত বড় বড় দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়ে ভায়োলেটের প্রাণহানি না হওয়ায় অনেকেই তাঁর ডাকনাম রেখে দিয়েছিলেন ‘মিস আনসিঙ্কেবল’। বাংলায় যার অর্থ, ‘যিনি কখনও ডোবেন না’। দীর্ঘ ৪২ বছর জাহাজে কাজ করেছিলেন তিনি।
১৯৫০ সালে পছন্দের পেশা থেকে অবসর নিয়েছিলেন ভায়োলেট। পরবর্তী কালে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি স্মৃতিকথা লিখেছিলেন তিনি। অবসরজীবন কাটাতে ইংল্যান্ডের গ্রামাঞ্চলে চলে গিয়েছিলেন এবং শেষ জীবন সেখানেই কেটেছিল ভায়োলেটের। ১৯৭১ সালের মে মাসে ৮৩ বছর বয়সে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় ‘মিস আনসিঙ্কেবল’-এর।
সব ছবি: সংগৃহীত।