কখনও উঁচু আসনে বসে ক্ষমতা জাহির। কখনও আবার নিরাপত্তারক্ষীকে ঢুকতে না দেওয়া। গণপ্রজাতন্ত্রী চিন (পিপল্স রিপাবলিক অফ চায়না) সফরে গিয়ে রীতিমতো ‘নাকানি-চোবানি’ খেলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুধু তা-ই নয়, ড্রাগনভূমির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের সামনে ‘সুপার পাওয়ার’ রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে তাঁর গুমর একরকম গুঁড়িয়ে গিয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। বেজিং-যাত্রায় ট্রাম্পের এ-হেন ব্যর্থতা ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্দরেই উঠছে প্রশ্ন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট অবশ্য জিনপিঙের সঙ্গে কূটনৈতিক যুদ্ধে হেরে যাওয়ার তত্ত্ব মানতে নারাজ। উল্টে চিনের থেকে বিপুল লগ্নি টানা গিয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। ড্রাগনভূমি থেকে দেশে ফিরে গণমাধ্যমের সামনে মুখ খোলেন ট্রাম্প। বলেন, ‘‘বোয়িংয়ের তৈরি কমপক্ষে ২০০টি উড়োজাহাজ এবং জেনারেল ইলেকট্রিকের থেকে ৪৫০টি জেট বিমানের ইঞ্জিন কিনতে রাজি রয়েছে বেজিং।’’ যদিও এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও ঘোষণা করেনি মান্দারিনভাষী সরকার।
ট্রাম্পের এ বারের চিনসফরে ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ় সঙ্কট নিয়ে আলোচনা হবে বলে আশাবাদী ছিল কূটনৈতিক মহল। পারস্য উপসাগরের ওই সঙ্কীর্ণ সামুদ্রিক রাস্তাটি বর্তমানে অবরুদ্ধ করে রেখেছে তেহরান। বেজিঙের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করে তা খোলানোর মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যদিও তাতে লাভ কিছুই হয়নি। উল্টে ইরান ইস্যুতে মতপার্থক্য বজায় রেখেই দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষ করেন জিনপিং। পাশাপাশি, তাইওয়ানের ব্যাপারেও কোনও সমাধানসূত্রে আসতে পারেননি তাঁরা।
ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের ব্যর্থতার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন আমেরিকার ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ়’-এর চিন বিশেষজ্ঞ হেনরিয়েটা লেভিন। ‘অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘তেহরানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বেজিঙের নিজস্ব স্বার্থ। সাবেক পারস্যের খনিজ তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলেন জিনপিং। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা সমস্যগুলির সমাধানে ড্রাগনভূমির কোনও আগ্রহ থাকার কথা নয়।’’
দ্বিতীয়ত, ইরান যুদ্ধে জড়ানোর জেরে টান পড়েছে আমেরিকার হাতিয়ারের ভান্ডারে। যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে পশ্চিম এশিয়ায় মোতায়েন থাকা মার্কিন ফৌজের ক্ষেপণাস্ত্রের বহর। দ্রুত সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারছে না পেন্টাগন। সব দিক থেকে তা চিনের জন্য অনুকূল। কারণ, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এ বার অনায়াসেই সাবেক ফরমোজ়া তথা তাইওয়ান (রিপাবলিক অফ চায়না) দখলে ঝাঁপাতে পারবেন প্রেসিডেন্ট শি।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে মানতে নারাজ চিন। সাবেক ফরমোজ়াকে বরাবরই নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে এসেছে বেজিং। এ-হেন আরওসি (রিপাবলিক অফ চায়না) দখলে ড্রাগন প্রেসিডেন্ট শি-র সামনে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমেরিকা। তাইপের অস্তিত্ব রক্ষায় সেখানে বিবিধ আধুনিক অস্ত্র মোতায়েন করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। আর তাই ইরান যুদ্ধে ওয়াশিংটনের শক্তিক্ষয় যে বেজিঙের জন্য স্বস্তিজনক, তা বলাই বাহুল্য।
কৌশলগত অবস্থানের কারণে তাইওয়ানের গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অপরিসীম। সংশ্লিষ্ট দ্বীপটি চিনের কব্জায় গেলে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার আধিপত্য হারাবে আমেরিকা। পাশাপাশি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা আরওকে (রিপাবলিক অফ কোরিয়া) এবং ফিলিপিন্সের মতো রাষ্ট্রগুলির উপর থেকেও মার্কিন প্রভাব পুরোপুরি মুছে যাওয়ার আশঙ্কা থাকছে। এতদসত্ত্বেও জিনপিঙের সঙ্গে বৈঠকে সাবেক ফরমোজ়া নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করতে পারেননি ট্রাম্প।
তৃতীয়ত, চিন সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ছিলেন ধনকুবের শিল্পপতিদের একটি প্রতিনিধি দল। ফলে কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে দু’তরফে একাধিক চুক্তি হবে বলে আশা করেছিল ওয়াকিবহল মহল। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেমন কোনও সমঝোতায় যায়নি বেজিং। শুধুমাত্র আমেরিকার থেকে সয়াবিন আমদানি বৃদ্ধির কথা বলতে শোনা গিয়েছে তাদের, ট্রাম্পের কাছে যা ‘সাত্ত্বনা পুরস্কার’ পাওয়ার সামিল।
চতুর্থত, আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে উন্নতির জন্য চাই বিপুল পরিমাণে বিরল খনিজ (রেয়ার আর্থ মেটাল্স)। সেগুলির উৎপাদন থেকে পরিশোধন, বর্তমানে পুরোপুরি ভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে চিন। গত বছর (২০২৫ সাল) আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সংঘাতের সময় সংশ্লিষ্ট পদার্থগুলির রফতানির উপর লাগাম টানেন জিনপিং। এর জেরে কেঁপে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। বিশ্লেষকদের অনুমান, আগামী দিনে ফের এই ধরনের ‘ব্ল্যাকমেলিং’-এর রাস্তায় হাঁটাতে পারে বেজিং।
কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হল, শি-র সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক চলাকালীন এই বিষয়টিও তুলতে পারেননি ট্রাম্প। উল্টে সৌর, বায়ুশক্তি, বৈদ্যুতিন যান এবং গ্রিড স্টোরেজ-সহ একাধিক ক্ষেত্রে আমেরিকার বাজার চিনের জন্য খুলে দিয়েছেন তিনি। এতে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রযুক্তিতে সারা বিশ্বে চিনের একাধিপত্য পাওয়ার রাস্তা সহজ হল বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ট্রাম্পের সফর শুরুর আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রকে নানা ভাবে হুমকি দিয়ে আসছিল চিন। বেজিঙের ঐতিহাসিক ‘গ্রেট হল অফ দ্য পিপল’-এ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শুরুর মুখেও তা বজায় রাখেন জিনপিং। ড্রাগনভূমিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের পা পড়তেই তিনি বলেন, ‘‘আমেরিকার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হল তাইওয়ান। এ ক্ষেত্রে কোনও ভুল পদক্ষেপ অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।’’
উল্লেখ্য, চিনের উদ্দেশে ট্রাম্প যাত্রার শুরুর আগে এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) দু’টি পোস্ট করে ওয়াশিংটনের চিনা দূতাবাস। সেখানে বলা হয়, ‘‘তাইওয়ান বা পশ্চিমি গণতন্ত্র নিয়ে কোনও রকম জ্ঞান দিলে ‘লক্ষ্মণরেখা’ অতিক্রম করবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যার পরিণাম ভুগতে হবে তাঁকে।’’ পাশাপাশি, পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শনের দিকেও নজর রাখার কথা বলতে শোনা গিয়েছিল তাদের।
ওয়াশিংটনের চিনা দূতাবাসের ওই পোস্ট নিয়ে আমেরিকা জুড়ে পড়ে যায় হইচই। কিন্তু ওই সময় কোনও রকম পাল্টা বিবৃতি দেয়নি হোয়াইট হাউস। ফলে অনেকটা পিছিয়ে থেকে জিনপিঙের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ট্রাম্প বসতে চলেছেন বলে উল্লেখ করেন কূটনীতিকদের একাংশ। তাঁদের সেই অনুমান যে অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
বিশ্লেষকদের দাবি, গোড়া থেকেই ট্রাম্পের উপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ বজায় রেখেছিল চিন। বেজিঙের অনুষ্ঠানে তাঁর থেকে উঁচু আসনে বসেন জিনপিং। পাশাপাশি, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে থাকা নিরাপত্তারক্ষী এবং গণমাধ্যমগুলিকেও একটি জায়গায় আটকানো হয়। বিষয়টি নিয়ে ড্রাগনভূমির প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে প্রায় ৯০ মিনিট তর্কাতর্কিতে জড়িয়ে পড়েন তাঁরা। এ ভাবেই ধীরে ধীরে দাবার প্রতিটা চালে নিজের জয় নিশ্চিত করেন প্রেসিডেন্ট শি।
মার্কিন বিদেশ দফতর অবশ্য এই সফরকে পুরোপুরি ব্যর্থ বলতে নারাজ। সেখানকার একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে সংবাদসংস্থা ‘রয়টার্স’ জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট শি-র সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন ট্রাম্প। তা ছাড়া হরমুজ় প্রণালী ও ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করার বিষয়ে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিক ভাবে এ ব্যাপারে হ্যাঁ বা না, কোনওটাই বলেনি বেজিং।
দেশে ফিরে ট্রাম্প আবার দাবি করেন, ইরানে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হোক এবং হরমুজ় প্রণালী দ্রুত খুলে যাক, এই বিষয়টিতে চিন সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি, এই দুই বিষয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ারও প্রস্তাবও দিয়েছেন জিনপিং। যদিও মার্কিন বিদেশ দফতরের সূত্রটি জানিয়েছে, বিষয়টিতে ‘পোটাস’-এর (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস) বক্তব্যকে সমর্থন করলেও নির্দিষ্ট কোনও প্রতিশ্রুতি দেননি প্রেসিডেন্ট শি।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের শেষে ট্রাম্পকে পাশে বসিয়ে জিনপিং বলেন, ‘‘এটা একটা অসাধারণ মুহূর্ত। আশা করি, আগামী দিনে আমাদের দু’দেশের মধ্যে আরও ভাল কিছু হবে। আরও অনেক বিষয়ে আমরা পারস্পরিক সম্পর্ক মজবুত করে তুলব।’’ ওই সময় পাল্টা বিবৃতি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাঁর কথায়, ‘‘অনেক সমস্যারই সমাধান হয়েছে, যেগুলি অনেকেই করতে ব্যর্থ হয়েছেন।’’
বেজিং থেকে ফেরার সময় যুক্তরাষ্ট্রে আসার জন্য জিনপিংকে আমন্ত্রণ জানান ট্রাম্প। এ বছরের সেপ্টেম্বরে আমেরিকা সফরে যেতে পারেন তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই পদক্ষেপেরও প্রবল সমালোচনা করছে ওয়াশিংটনের গণমাধ্যমগুলির একাংশ। অন্য দিকে দুই রাষ্ট্রনেতার বৈঠক সংক্রান্ত একাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে চিনের সরকারি সংবাদসংস্থা ‘গ্লোবাল টাইম্স’-এ। সেখানে ‘খোঁড়া দৈত্য’র সঙ্গে ট্রাম্পের তুলনা টানতে দেখা গিয়েছে তাঁদের।
ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।