‘সময়ের থেকে এগিয়ে জাপান’। সমাজমাধ্যম খুলে বসলে এই ক্যাপশন-যুক্ত রিল হামেশাই দেখা যায়। তাতে জাপানের যা রূপ দেখা যায়, ক্যাপশনের সঙ্গে সহমত পোষণ করা ছাড়া উপায়ও থাকে না।
প্রযুক্তি, খাবার, জীবনধারার মান সব দিক দিয়েই আমাদের চেয়ে কয়েক গুণ এগিয়ে জাপান। কেবল ভারতই নয়, বহু দেশই ‘ইকিগাই’-এর দেশের আধুনিকতার ধারেকাছে ঘেঁষতে পারবে না।
বিশ্বের নানা প্রান্তের অ্যানিমে ও জিবলি (জাপানি অ্যানিমেশন) প্রেমীদের স্বপ্নের দেশ জাপান। বহু দেশের তরুণ-তরুণীই পড়াশোনা শেষে সেখানে চাকরিজীবন কাটানোর আকাঙ্ক্ষা মনের কোণে লুকিয়ে রাখেন।
কিন্তু জাপানিরাই আর চাকরি করতে চাইছেন না। কর্পোরেট জীবন ছেড়ে দিয়ে তাঁরা বেছে নিচ্ছেন বৌদ্ধ ভিক্ষুর জীবন। চাকরিজীবন থেকে তাঁরা চাইছেন মুক্তি। সমীক্ষা তেমনটাই জানাচ্ছে।
বর্তমানে জাপানে চাকরিছাড়াদের সংখ্যা হু-হু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কারণ হিসাবে মনোবিদেরা দায়ী করছেন জাপানের কর্পোরেট সংস্কৃতিকে। সেই দেশের কর্পোরেট অফিসগুলির কাজের চাপ এতটাই বেশি যে কর্মীরা তা আর সহ্য করতে না পেরে ইস্তফা দেওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন।
জাপানের চাকরিজীবীরা ‘স্যালারিম্যান’ হিসাবে পরিচিত। তাঁদের এ রূপ নামকরণের কারণ গোটা চাকরিজীবন একই অফিসে কাজ করে চলা। বাকি দেশগুলির বাসিন্দারা সাধারণত পেশাজীবনে অগ্রগতির জন্য কর্মক্ষেত্র বদলান। ভাল সুযোগের হাতছানি পেলে আর পুরনো অফিসের দিকে ফিরে চান না।
কিন্তু জাপানের কর্পোরেট সংস্কৃতিতে তা নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে দেশকে উন্নত করার লক্ষ্যে এই রেওয়াজ চালু করা হয়। জাপানের মানুষেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যে কর্মস্থানে যোগ দেন, মোটামুটি ভাবে সেখানেই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করে চলেন। জাপানের বেশির ভাগ কর্মক্ষেত্রে এমনটাই হতে দেখা যায়।
জাপানের কর্মসংস্কৃতি অত্যন্ত কঠোর। সেখানে অতিরিক্ত কাজের চাপে মৃত্যুর ঘটনা এতটাই পরিচিত যে এর জন্য জাপানি ভাষায় একটি নির্দিষ্ট শব্দ রয়েছে, যা হল ‘কারোশি’। অতিরিক্ত কাজের চাপ সহ্য করতে না পেরে স্ট্রোক বা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারানোর ঘটনাকে জাপানি ভাষায় কারোশি বলা হয়।
জাপানের অফিসগুলিতে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের সময় বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনে আট ঘণ্টার পরেও কাজ করতে হয়। সেটির জন্য কোনও বাড়তি টাকাও দেওয়া হয় না বেশির ভাগ ক্ষেত্রে।
এখানেই শেষ নয়। কাজের পর সহকর্মীদের সঙ্গে মদ্যপান করা, খেতে যাওয়াও পূর্ব এশিয়ার দেশের কর্মসংস্কৃতির অর্ন্তগত। কোনও কর্মীর কাছে সেই সামাজিকীকরণকে ফাঁকি দেওয়ার উপায় নেই। কারণ, কর্মক্ষেত্র থেকে সেটি করা বাধ্যতামূলক বলে জানানো হয়। না করলেই সহকর্মীদের চক্ষুশূল হয়ে উঠতে হবে। তার সঙ্গে সহ্য করতে হতে পারে আরও নানা সমস্যা।
এর সঙ্গে বসের মন জুগিয়ে চলার মানসিক চাপ তো আছেই। যাঁরা বসের মনোমতো চলতে পারেন, তাঁরা হয়ে ওঠেন প্রিয়পাত্র। কিন্তু সে কাজ যাঁরা পারেন না, তাঁদের জন্য কর্মজীবন হয়ে ওঠে অত্যন্ত কঠিন।
২০২৫ সালে ‘মাইনাবি কেরিয়ার রিসার্চ ল্যাব’-এর করা এক সমীক্ষায় উঠে এসেছিল যে, জাপানি কর্মীরা আর সফলতার পিছনে ছুটছেন না। তাঁরা ঘড়ির কাঁটা ধরে অফিসে ঢুকছেন এবং যতটুকু না করলেই নয়, সেটুকু কাজ করেই বেরিয়ে যাচ্ছেন। পদোন্নতি, বেতনবৃদ্ধি এ সকল বিষয়ে তাঁদের আর কোনও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। এমনকি কেমন কাজ করছেন তার উপর বরাদ্দ থাকা বোনাসের প্রতিও তাঁদের লোভ নেই।
বর্তমানে জাপানি কর্মীরা কর্পোরেট জীবন ছেড়ে বেছে নিচ্ছেন বৌদ্ধ ভিক্ষুর জীবন। অনেকে আবার ছুটির দিনগুলি ভিক্ষু হিসাবে কাটাচ্ছেন। জাপানি ভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘সুকুবা’। সাময়িক সন্ন্যাসজীবনকে জাপানি ভাষায় সুকুবা বলে।
জাপানের বৌদ্ধ মঠগুলি সেখানকার লোকজনকে স্বল্পমেয়াদি সন্ন্যাস কর্মসূচির সুবিধা দিচ্ছে। সেখানে অনেকে ছুটি নিয়ে সন্ন্যাসজীবন কাটাতে যান। জীবনে শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই ‘সূর্যোদয়ের দেশের’ মানুষেরা এ পথ বেছে নিচ্ছেন।
বৌদ্ধ মঠগুলিতে জাপানিরা সাধারণ ভিক্ষুর মতো জীবন যাপন করেন। তাঁদের মতো জামাকাপড় পড়ে আধ্যাত্মিক চিন্তার মধ্য দিয়ে দিন কেটে যায়। ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। এই ‘নেশা’ থেকে একেবারেই সরে আসতে হয় ভিক্ষুদের। দীর্ঘ সময় নীরবতা পালন করা হয়।
বহু কর্মী আবার চাকরিজীবন থেকে বিদায় নিয়ে পুরোপুরি বৌদ্ধ ভিক্ষুর জীবন বেছে নিচ্ছেন। কর্মক্ষেত্রের ‘অত্যাচার’ সহ্য করতে না পারাই এর মূল কারণ। বেতনবৃদ্ধি বা পদোন্নতির সুযোগও তাঁদের আটকে রাখতে পারছে না। দু’দণ্ড শান্তির খোঁজে মঠের পথে পাড়ি দিচ্ছেন জাপানি কর্মীরা।
বিশেষ করে, জাপানের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভাবধারার বিশেষ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেখানকার মানুষদের মধ্যে কাজকেই জীবন মনে করার যে প্রবণতা ছিল, বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে তেমনটা আর দেখা যাচ্ছে না। উল্টে শান্তিকেই তাঁরা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
মঠে ধ্যান, ধর্মালোচনা, পরিবেশের সঙ্গে মিশে থাকার মধ্যে প্রশান্তি খুঁজে পাচ্ছেন জাপানিরা। কর্পোরেট অফিসের ঠান্ডা ঘর এবং আধুনিক প্রযুক্তি তাঁদের সেই সুখ দিতে পারছে না। উল্টে হতাশার গভীরে তলিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।
সেই কারণে জাপানের লোকজন এখন আর ‘সময়ের থেকে এগিয়ে জাপান’-এর সঙ্গে না চলে, বৌদ্ধ দর্শনকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। প্রযুক্তি নয়, প্রশান্তিকে সঙ্গে নিয়েই সুখে থাকতে চাইছেন ‘সূর্যোদয়ের দেশের’ মানুষেরা।
সব ছবি: সংগৃহীত এবং এআই সহায়তায় প্রণীত।