কেরলের ‘ভাতের পাত্রে’ বিষ! তেমনটাই উঠে এল সমীক্ষা এবং মৃৎপরীক্ষায়। আর তা নিয়ে উদ্বিগ্ন চাষি, স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে পরিবেশবিজ্ঞানীরা।
কথা হচ্ছে কুট্টানাড়ের। কুট্টানাড় পরিচিত কেরলের ভাতের পাত্র বা ‘রাইস বোল’ নামে। উপকূলবর্তী এই এলাকায় বিশেষ পদ্ধতিতে ধানচাষ হয় সমুদ্রপৃষ্ঠের নীচে।
সেই কুট্টানাড়েরই মাটি পরীক্ষায় এ বার উঠে এল উদ্বেগজনক ফলাফল। পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে কুট্টানাড়ের ধানখেতগুলিতে অ্যালুমিনিয়ামের ঘনত্ব বিপজ্জনক ভাবে বেশি, যা ফসলের স্বাস্থ্য এবং উৎপাদনশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি।
কেরল কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ভিটিলা ধান গবেষণাকেন্দ্রে কেরলের পতঙ্গ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (কেসিপিএম)-এর তরফে কুট্টানাড় এবং উচ্চ কুট্টানাড়ের বিভিন্ন অংশের ধানখেত থেকে মাটির নমুনা সংগ্রহ করে এই পরীক্ষা করা হয়েছিল।
পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, কুট্টানাড়ের ধানখেতগুলিতে অ্যালুমিনিয়ামের মাত্রা ৭৭.৫১ পিপিএম থেকে ৩৩৪.১০ পিপিএম-এর মধ্যে রয়েছে, যা ধানচাষের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
সাধারণত ধানখেতে দুই পিপিএম বা প্রতি কেজি মাটিতে দুই মিলিগ্রাম পর্যন্ত অ্যালুমিনিয়াম থাকা স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। কিন্তু এখন কুট্টানাড়ের মাটিতে অ্যালুমিনিয়ামের যে মাত্রা রয়েছে তা অনুমোদিত স্তরের চেয়ে প্রায় ৩৯ থেকে ১৬৫ গুণ বেশি। আর তা নিয়েই যাবতীয় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কেসিপিএম-এর প্রজেক্ট ডিরেক্টর স্মিতা বি সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, ধানখেতের মাটির অম্লতা বৃদ্ধির কারণেই এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা ১২টি ধানখেত থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছিলাম এবং সবগুলোতেই অ্যালুমিনিয়ামের ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি দেখা গিয়েছে।’’
স্মিতা আরও জানিয়েছেন, মাটির পিএইচ মাত্রা পাঁচের নীচে নেমে গেলে অ্যালুমিনিয়াম আরও দ্রবণীয় এবং বিষাক্ত হয়ে ওঠে। পিএইচ-এর প্রতিটি ইউনিট হ্রাসের সঙ্গেও অ্যালুমিনিয়ামের পরিমাণ ১০ গুণ বৃদ্ধি পায়।
অতিরিক্ত অ্যালুমিনিয়াম ধানগাছের মূলের ক্ষতি করে এবং ফসফরাস, ক্যালশিয়াম, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ শোষণ করে ধানের মারাত্মক ক্ষতি করে বলে জানিয়েছেন স্মিতা।
স্মিতা বলেন, ‘‘কুট্টানাড়ের মাটি এখন অম্ল। অত্যন্ত অম্ল মাটিতে অ্যালুমিনিয়ামের পাশাপাশি লোহাও বেশি পরিমাণে উপস্থিত থাকে। সেই ধাতুও গাছের ক্ষতি করে।’’
তাই কুট্টানাড়ের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং মাটির স্বাস্থ্য ফেরাতে ইতিমধ্যেই তৎপর হয়েছে প্রশাসন এবং পরিবেশবিজ্ঞানীরা। সংশোধনমূলক ব্যবস্থা হিসাবে মাটির অম্লতা কমানোর দিকেও জোর দেওয়া হয়েছে।
এক প্রশাসনিক কর্তার কথায়, “যখন মাটির অম্লতা হ্রাস পায় এবং পিএইচ ৫.৫-এর উপরে উঠে যায় তখন অ্যালুমিনিয়াম এবং লোহার দ্রাব্যতা হ্রাস পায়। ফলে মাটিতে তাদের ক্ষতিকারক প্রভাবও হ্রাস পায়।’’
তিনি জানিয়েছেন মাটির অম্লতার নিয়ন্ত্রণ কেবল চুনযুক্ত উপকরণ এবং সঠিক রাসায়নিক প্রয়োগের মাধ্যমেই সম্ভব। অতিরিক্ত অ্যালুমিনিয়াম নিয়ন্ত্রণের জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপকরণ হিসাবে ডলোমাইট এবং ক্যালশিয়াম সিলিকেট ব্যবহার করা যেতে পারে বলেও জানিয়েছেন ওই কর্তা।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কেরলের মাভেলিকারার কংগ্রেস সাংসদ কোডিকুনিল সুরেশও। কুট্টানাড়ের মাটিতে উচ্চমাত্রায় অ্যালুমিনিয়াম দূষণকে ‘মারাত্মক পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা’ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
আপাতত কুট্টানাড়ের জমিতে অ্যালুমিনিয়ামের মাত্রা উদ্বেগজনক ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ধানচাষিদের জীবন এবং জীবিকা। তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কংগ্রেস সাংসদ।
সুরেশ দাবি করেছেন, মাটির উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং ফলস্বরূপ ধানের ফলনে উল্লেখযোগ্য হ্রাস হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের জীবিকাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছে। তাঁর কথায়, “কুট্টানাড় অঞ্চলে অ্যালুমিনিয়াম দূষণের পরিমাণ বৈজ্ঞানিক ভাবে মূল্যায়ন, দূষণের উৎস চিহ্নিতকরণ এবং তাৎক্ষণিক মাটি ও জল প্রতিকার ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য সরকারের জরুরি পদক্ষেপ করা উচিত।’’
সব ছবি: সংগৃহীত।