বিশ্বখ্যাত সঙ্গীত উৎসবের গায়ে লাগল ছুরির আঘাত, ধর্ষণ, সিরিঞ্জ হামলা, মাদক ব্যবহারের কলঙ্ক। ফ্রান্সের অন্যতম বৃহত্তম গণ উৎসব বার্ষিক ‘ফেট দে লা মুজিক’ সঙ্গীত উৎসবটি পরিণত হল আতঙ্কে। জনপ্রিয় বার্ষিক সঙ্গীত উৎসবে এ বার আনন্দের পাশাপাশি একাধিক গুরুতর অপরাধের অভিযোগ প্রকাশ্য এসেছে।
উৎসব চলাকালীন কয়েক জন নারীকে মাদক খাইয়ে ধর্ষণের অভিযোগ এবং ছুরি, সিরিঞ্জ দিয়ে আঘাতের মতো হিংসাত্মক ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দেশ জুড়ে। দেশ-বিদেশ থেকে উৎসবের টানে ছুটে আসা সঙ্গীতপ্রেমীদের সামনে মুখ পুড়েছে ফ্রান্সের। প্রতি বছর এই উৎসবে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। এত বড় জনসমাগমের কারণে নিরাপত্তা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ, শব্দদূষণ এবং জনস্বাস্থ্য নিয়ে প্রশাসনকে এমনিই সতর্ক নজর রাখতে হয়।
‘ফেট দে লা মুজ়িক’ হল ফ্রান্সের অন্যতম জনপ্রিয় বার্ষিক সঙ্গীত উৎসব। প্রতি বছর ২১ জুন গোটা দেশে এই উৎসব পালিত হয়। এই দিনটিতে ফ্রান্সের রাস্তাঘাট, পার্ক, ক্যাফে ও বিভিন্ন জনসমাগমের জায়গা সঙ্গীতের মুক্ত মঞ্চে পরিণত হয়। ১৯৮২ সালে উৎসবটির সূচনা হয়েছিল। মূল ভাবনা ছিল, ‘সঙ্গীত সকলের জন্য’। এখানে পেশাদার শিল্পীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও অংশ নিতে পারেন।
কোনও বড়সড় মূল্যের টিকিটের প্রয়োজন হয় না এখানে। বেশির ভাগ অনুষ্ঠানই বিনামূল্যে হয়। ২১ জুনকে ইউরোপের দীর্ঘতম দিন বলে ধরা হয়। এই বিশেষ দিনটিকেই উৎসবের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল। সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে অনেক জায়গায় রাতভর চলে গানবাজনা।
সেই নজর এড়িয়েও বিশৃঙ্খলার পরিবেশ তৈরি হয়েছে সপ্তাহান্তের এই উৎসবটিতে। একাধিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে এসেছে গণ উৎসবের অন্ধকার দিকটি। ছুরি দিয়ে আঘাত, যৌন নিপীড়ন এবং ছিনতাইয়ের একাধিক ঘটনায় বিশৃঙ্খলা ও হিংসার পরিবেশ ছড়িয়ে পড়েছে। এই সমস্ত অপরাধমূলক ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দেশ জুড়ে ২৪৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এই উৎসব উপলক্ষে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরের রাস্তা, পার্ক ও প্রকাশ্যে স্থানে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন। গান, নাচ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই উৎসব সাধারণত উদ্যাপনের প্রতীক হিসাবে পরিচিত। প্যারিসে অনুষ্ঠিত এই সঙ্গীত উৎসবে ২০ লক্ষেরও বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
বিদেশ থেকে আগত পর্যটকদের মধ্যে ছিলেন কয়েক হাজার ব্রিটিশ ও আইরিশ পর্যটকও। ‘দ্য ডেলি মেল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অনুষ্ঠানটি ব্যাপক বিশৃঙ্খলায় পর্যবসিত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা রাস্তাঘাটের অবস্থাকে প্রলয়ঙ্কর বলে বর্ণনা করেছেন।
উৎসবে অংশ নেওয়ার সময় বেশ কয়েক জন তরুণী ও মহিলা এমন পরিস্থিতির শিকার হন যা তাঁরা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি। ভিড়ের সুযোগে তাঁদের পানীয়ে মাদক মেশানো হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। মাদক মেশানো পানীয় খেয়ে তাঁরা অসুস্থ বা অচেতন হয়ে পড়েন। সেই সুযোগে তাঁদের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুষ্ঠান চলাকালীন একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় মহিলাদের লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি। অজানা উপাদানে ভরা সিরিঞ্জ দিয়ে মহিলা ইঞ্জেকশন দেওয়ার মতো ১০টিরও বেশি মারাত্মক অভিযোগ পুলিশের কাছে আসে। ইঞ্জেকশন দেওয়ার পর প্যারিসের একটি বাড়িতে এক তরুণীকে ধর্ষণ করা হয় বলে পুলিশে অভিযোগ জমা পড়েছে।
অন্য দিকে নোজ়ঁ-স্যুর-মার্ন নামের শহরতলিতে এক ১৫ বছর বয়সি কিশোরীর ধর্ষণের শিকার হওয়ার কথা জানা গিয়েছে। গ্যাগনি নামের অন্য একটি শহরে, ১২ বছরের এক নাবালিকাকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে ৪৮ বছর বয়সি এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে খবর।
সোমবার ২২ জুন ভোরে টুলুজ় এলাকায় পৃথক দু’টি ঘটনায় ৪০ বছর বয়সি এক তরুণ ও তরুণীকে ছুরি দিয়ে নৃশংস ভাবে কোপানোর খবর পাওয়া গিয়েছে। মধ্যরাতে তরুণের উপর ঝাঁপিয়ে প়ড়ে আততায়ী। কিছু ক্ষণ পরেই নিকটবর্তী কোলোমিয়ে এলাকায় ছুরির আঘাতে মারাত্মক জখম হন এক তরুণীও। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি দু’জনেই।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে উদ্ধৃত করে একাধিক সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, পুলিশ ফ্রান্স জুড়ে ২৪৩ জনকে গ্রেফতার করেছে। তার মধ্যে শুধু প্যারিস থেকেই ১৪৮ জন। রাজধানী শহরে সন্ধে নামতেই শৃঙ্খলাভঙ্গের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। জনবহুল এলাকায় মারামারি, যানবাহন ভাঙচুর এবং চুরির অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে পুলিশে।
প্রশাসনের দাবি, বড় বড় উৎসবগুলিতে বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতির কারণে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে হিংসাত্মক ঘটনা ঠেকাতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, নজরদারি বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার উপর জোর দেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
রাত ১১টার পর নোত্র দাম ক্যাথিড্রালের কাছে শাতলে এলাকায় প্রথমে গোলযোগ শুরু হয়। সেখানে অতিরিক্ত ভিড়ের সুযোগে একদল যুবক মারামারি শুরু করে। পথচারীদের ঘুষি মারার অভিযোগ ওঠে। পরে পুলিশ সেন্ট জার্মেইন ডি প্রেস এলাকায় ভিড় নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। রাজধানী শহরেও চলে এই তাণ্ডব। দুষ্কৃতীরা গাড়ির কাচ ভেঙেছে, যানবাহন ভাঙচুর করেছে এবং দোকানে প্রবেশের চেষ্টা করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে হয়ে আসা এই সঙ্গীত উৎসব ফ্রান্সের অন্যতম জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রতি বছর এই উৎসবের সময় রাস্তা, চত্বর এবং বিভিন্ন জনসমাগমের জায়গা খোলা মঞ্চে পরিণত হয়, যেখানে মানুষ বিনামূল্যে গান ও সঙ্গীত উপভোগ করেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই উৎসবে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
বিপুল সংখ্যক মানুষের ভিড় সামলানো, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং যৌন হয়রানি বা দুর্ঘটনা ঠেকানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। প্যারিসের ডেপুটি মেয়র ২০২৫ সালের উৎসবের সময় বিশৃঙ্খলা ও যৌনহিংসার অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, বড় জনসমাগমের এই ধরনের অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সদ্যসমাপ্ত উৎসবটিতেও শৃঙ্খলার অভাব ও নিরাপত্তার ঘাটতি-সহ ধর্ষণ ও মাদকসেবনের মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে আসায় প্রশাসনের উৎকণ্ঠা আরও বেড়েছে। কর্তৃপক্ষ ঘটনাগুলির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শুরু করেছেন। ভবিষ্যতে উৎসবের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কী ভাবে উন্নত করা যায়, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে ফরাসি দেশের প্রশাসনিক মহলে।
সব ছবি: সংগৃহীত।