প্রশান্ত মহাসাগরের তলায় হলুদরঙা ইট দিয়ে বাঁধানো একটি রাস্তা! আর গভীর সমুদ্রের সেই রাস্তা অবাক করেছে অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদেরও। হাওয়াইয়ের কাছে অনুসন্ধানের সময় সমুদ্রের তলদেশে ওই আকর্ষণীয় গঠন দেখতে পান বিজ্ঞানীরা, যা সোজা ইটের তৈরি রাস্তার মতো দেখতে। ইটের মতো এক একটি কাঠামো আবার একে অপরের পাশে প্রায় নিখুঁত ভাবে সাজানো, যেন সেটি মানুষের হাতে তৈরি কোনও প্রাচীন রাস্তা। আর তার পরেই উঠে আসে নানান তত্ত্ব, নানান জল্পনা।
২০২২ সালে প্রশান্ত মহাসাগরের তলায় হলুদরঙা ইট দিয়ে বাঁধানো সেই রাস্তার সন্ধান পান সমুদ্র গবেষণার সঙ্গে যুক্ত একদল বিজ্ঞানী।
সে বছর ‘এক্সপ্লোরেশন ভেসেল নটিলাস’ দলের সদস্যেরা হাওয়াইয়ের উত্তরে প্রশান্ত মহাসাগরে আমেরিকার পাপাহানাউমোকুয়াকে মেরিন ন্যাশনাল মনুমেন্টের লিলিউওকালানি রিজ নামক সামুদ্রিক অঞ্চলে গবেষণার কাজ চালাচ্ছিলেন।
সেই অনুসন্ধান চালানোর সময় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,০০০ মিটার নীচে লিলিউওকালানি রিজ এবং নুটকা সিমাউন্টের কাছে একটি রহস্যময় গঠন ধরা পড়ে ওই গবেষকদের কাছে।
গবেষকদের সেই দল সমুদ্রের নীচে অগ্ন্যুৎপাতের ফলে তৈরি পাহাড়ের একটি বিভাজিকার বিষয়ে অনুসন্ধান করতে ওই জায়গায় গিয়েছিলেন। আর তাই তাঁরা ভিডিয়ো রেকর্ড করার সমস্ত সরঞ্জাম নিয়েই সমু্দ্রের নীচে নেমেছিলেন।
সমুদ্রের নীচে নেমে অনুসন্ধান চালানোর সময় হঠাৎই কিছু একটায় হোঁচটে খান এক গবেষক। ভাল করে দেখে বুঝতে পারেন, হলুদ রঙের ইটের তৈরি রাস্তার মতো দেখতে একটি রহস্যময় গঠনে হোঁচট খেয়েছেন তিনি।
রাস্তাটির কাঠামো ভেঙেচুরে গেলেও খাঁজ কাটা কাটা নকশা দেখে বিজ্ঞানীরা প্রাথমিক ভাবে মনে করেন, কোনও একসময় সেটি একটি ব্যবহারযোগ্য রাস্তা ছিল। সমুদ্রের তলার সেই রাস্তা এতটাই আকর্ষণীয় ছিল যে গবেষকদল সেটির নামকরণ করেন ‘হলুদ ইটের রাস্তা’।
সেই সময়ে সমুদ্রের তলার সেই রাস্তার একটি ইউটিউব ভিডিয়ো হইচই ফেলেছিল সমাজমাধ্যমে। ইউটিউবের সেই ভিডিয়োয় এক গবেষককে বলতে শোনা গিয়েছিল, ইটের এই রাস্তা দিয়ে হাঁটা দিলে পৌঁছে যাওয়া যাবে আটলান্টিসে। অন্য এক গবেষকের দাবি ছিল, এই রাস্তার উপস্থিতি যথেষ্ট অদ্ভুতুড়ে।
আর তার পরেই তৈরি হয় জল্পনা এবং তত্ত্ব। গ্রিসের পৌরাণিক উপকথা অনুযায়ী আটলান্টিস সমুদ্রের তলায় রয়েছে হারিয়ে যাওয়া একটি দ্বীপ। সবার প্রথম এই সভ্যতার উল্লেখ পাওয়া যায় প্লেটোর ‘ডায়লগ টাইমাউস অ্যান্ড ক্রিটিয়াস’ বইয়ে।
প্লেটোর লেখা অনুযায়ী প্রায় ৯০০০ বছর আগে আটলান্টিস সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল। হারকিউলিসের পিলারের পাদদেশের দ্বীপটি নৌবাহিনীর সাহায্যে ইউরোপের অধিকাংশ স্থান জয় করে বলেও সেই বইয়ে উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু আথেন্স জয় করতে গিয়ে নাকি হোঁচট খায় আটলান্টিস। পরে এক প্রলয়ের মুখোমুখি হয়ে চিরতরে সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যায় এই সভ্যতা।
তবে এই সভ্যতার অস্তিত্ব সম্পর্কে প্লেটোর সমসাময়িক অনেকেই সন্দিহান ছিলেন। অনেকে আবার আটলান্টিসকে কল্পনাপ্রসূত বলেও উড়িয়ে দিয়েছেন। অনেকে আবার আটলান্টিসের সত্যতা নিয়ে বিদ্রুপ করতেও ছাড়েননি।
যদিও অনেকেই আটলান্টিসের উপস্থিতিকে সত্যি বলে মেনে নিয়ে সমুদ্রের তলায় লুকিয়ে থাকা ধনরত্নের খোঁজে অভিযান চালিয়েছেন। কিন্তু সমুদ্রের তলায় লুকিয়ে থাকা এই দ্বীপের খোঁজ পেতে সকলেই ব্যর্থ হয়েছেন।
কিন্তু হাওয়াইয়ের কাছে ওই রাস্তা আবিষ্কারের পর আটলান্টিসের উপস্থিতি নিয়ে আবার জল্পনা ছড়ায়। যদিও পরে বিজ্ঞানীরা পরিষ্কার করেন, রাস্তার মতো দেখতে ওই গঠন কোনও প্রাচীন সভ্যতার অংশ নয়, বরং প্রাকৃতিক বিস্ময়।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছিলেন, কাঠামোটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং হায়োক্লাস্টাইট দিয়ে তৈরি। হায়োক্লাস্টাইট একটি আগ্নেয়গিরির শিলা যা গরম লাভা ঠান্ডা সমুদ্রের জলে মিলিত হলে তৈরি হয়। দ্রুত শীতল হওয়ার ফলে লাভায় ফাটল ধরে এবং তাপ ও শীতলকরণের পুনরাবৃত্তি চক্র ভাঙন এবং সমকোণ তৈরি করে।
সমুদ্রের নীচে নুটকা পাহাড়ের শিখরে সন্ধান পাওয়া সেই রাস্তাও ভাঙা হায়ালোক্লাস্টাইট পাথর থেকে তৈরি হয়েছে বলে গবেষকদের একটি দল জানায়। তারা প্রথমে মনে করে, রাস্তাসদৃশ এই কাঠামো আসলে প্রাচীনকালে সক্রিয় আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের ফলেই তৈরি হয়েছিল।
গবেষকেরা এ-ও জানিয়েছিলেন, অগ্ন্যুৎপাতের কারণে বার বার গরম এবং ঠান্ডা হওয়ায় পাথরের গায়ে ফাটল তৈরি হয়েছে। আর তার ফলেই এই অভিনব নকশা তৈরি হয়েছে।
যদিও ওই রাস্তাসদৃশ কাঠামোর আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, মহাসাগরগুলির তলদেশের কত রহস্য এখনও অনাবিষ্কৃত রয়ে গিয়েছে। ২০২৫ সালের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, মানুষ সমুদ্রের তলদেশের মাত্র ০.০০০৬ থেকে ০.০০১ শতাংশ অন্বেষণ করতে পেরেছে।
সব ছবি: সংগৃহীত এবং প্রতীকী।