এশিয়ার বাজারে সে ভাবে বিক্রি হচ্ছে না অপরিশোধিত খনিজ তেল। মুখ ফিরিয়ে আছে অধিকাংশ ‘ধনী’ খদ্দের। এর জেরে সৌদি আরবের ভাতে মরার দশা! কেন হঠাৎ রিয়াধের তরল সোনার আমদানি কমাচ্ছে ভারত, চিন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া (রিপাবলিক অফ কোরিয়া) এবং সাবেক ফরমোজ়া তথা তাইওয়ান (রিপাবলিক অফ চায়না)?
ডিজিটাল গণমাধ্যম ‘অয়েল প্রাইস ডট কম’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছরের মে মাসে দিনে মাত্র ৩৯ লক্ষ ব্যারেল তেল রফতানির বরাত পায় সৌদি প্রশাসন, যা এখনও পর্যন্ত সর্বনিম্ন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের মুখে ইরান পড়লে পশ্চিম এশিয়ায় বেধে যায় যুদ্ধ। তার পর থেকেই হু-হু করে নিম্নমুখী হয়েছে রিয়াধের তেল-বাণিজ্য।
বিগত কয়েক দশকে ভারত, চিন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা তাইওয়ানের মতো এশিয়ার তাবড় শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলিকে বিপুল তরল সোনার জোগান দিয়ে গিয়েছে সৌদি আরব। এখনও রিয়াধের সরকারি তেল সংস্থা ‘আরামকো’র সর্ববৃহৎ গ্রাহক হল বেজিং। এ বছরের জুনে সংশ্লিষ্ট উপসাগরীয় রাষ্ট্রটির থেকে দিনে ছ’লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানির কথা রয়েছে ড্রাগনের।
‘অয়েল প্রাইস ডট কম’ অবশ্য জানিয়েছে, এ বছরের এপ্রিলে সৌদির থেকে দ্বিগুণ জ্বালানি কিনেছিল চিন। কিন্তু, অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়ায় জুনে সেটাই দৈনিক ছ’লক্ষ ব্যারলে নামিয়ে আনছে বেজিং। শুধু তা-ই নয়, গত ফেব্রুয়ারিতে রিয়াধের মোট তরল সোনা রফতানির পরিমাণ ছিল দিনে ৭৩ লক্ষ ব্যারেল। মার্চে সেটাই কমে দৈনিক ৪৪ লক্ষ ব্যারেলে চলে আসায় আরব রাষ্ট্রটির কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, যুদ্ধ শুরু হতেই পারস্য উপসাগরের খনিজ তেল রফতানির গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রাস্তা হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে ইরান। ফলে প্রাথমিক ভাবে ধাক্কা খায় সৌদির জ্বালানি বাণিজ্য। যদিও রিয়াধের তরল সোনার চাহিদা কমে যাওয়ার সেটাই একমাত্র কারণ নয়। কারণ, হরমুজ় বন্ধ হওয়া ইস্তক বিকল্প রাস্তায় তেল সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে তারা।
পারস্য উপসাগরের সামুদ্রিক রাস্তাটি এড়াতে সৌদির হাতে আছে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন। সেটা লোহিত সাগরের উপকূল ইয়ানবু পর্যন্ত বিস্তৃত। বর্তমানে অধিকাংশ জ্বালানি সেখানকার বন্দর থেকে বাব এল-মান্দেব প্রণালী হয়ে এশিয়ার দেশগুলিকে সরবরাহ করছে রিয়াধ। উপসাগরীয় রাষ্ট্রটির প্রশাসন সূত্রে খবর, দিনে প্রায় ৫০ লক্ষ ব্যারেল ‘আরব ক্রুড’ পশ্চিমের উপকূলে পৌঁছে দিচ্ছে তাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলি জানিয়েছে, তেল-বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে তরল সোনার সরবরাহ বৃদ্ধির ছক কষছে সৌদি সরকার। ফলে আগামী দিনে সেটা দৈনিক ৭০ লক্ষ ব্যারলে পৌঁছোনোর সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া লোহিত সাগরের উপকূলে পাঁচটা শোধনাগার খুলেছে রিয়াধ। সেগুলি হল স্যামরেফ, ইয়াসরেফ, ইয়ানবু, পেট্রো রাবিঘ এবং জাজান। সম্মিলিত ভাবে এগুলি দিনে শোধন করতে পারে ১৮ লক্ষ ব্যারেল তেল।
কিন্তু, তার পরেও রিয়াধের অপরিশোধিত তেলের আমদানি কমিয়ে ফেলেছে ভারত, চিন বা জাপানের মতো আর্থিক দিক থেকে শক্তিশালী এশিয়ার একাধিক দেশ। বিশেষজ্ঞদের দাবি, সৌদির তরল সোনা তুলনামূলক ভাবে অন্যান্য দেশের জ্বালানির থেকে দামি। তা ছাড়া লোহিত সাগরের বন্দর থেকে খনিজ তেল সরবরাহ করায় বেড়েছে ট্যাঙ্কারের খরচ। হরমুজ়ের তুলনায় জ্বালানি আনতে সময়ও লাগছে অনেকটাই বেশি।
এ বছরের ১ মে খনিজ তেল রফতানিকারী দেশগুলির সংগঠন ওপেক ত্যাগ করে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (ইউএই)। বিশ্লেষকদের দাবি, আবু ধাবির এই সিদ্ধান্ত রিয়াধের বিপদ বাড়িয়েছে। কারণ, ওপেক ত্যাগের পর থেকেই ভারত-সহ বেশ কিছু দেশের সঙ্গে আলাদা করে তরল সোনার চুক্তি সেরে ফেলার ব্যাপারে উৎসাহ দেখাচ্ছে তারা। সৌদির ব্যবসায় কামড় বসাতে তেলের দামে দিচ্ছে কিছুটা ছাড়ও।
একটা উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টা বুঝে নেওয়া যেতে পারে। গত মার্চে আমিরশাহির সঙ্গে রিয়াধের খনিজ তেলের দামের পার্থক্য দাঁড়ায় প্রতি ব্যারলে এক থেকে দুই ডলার। কিন্তু, এপ্রিল আসতে আসতে সেটাই বেড়ে পৌঁছে যায় ১৬ থেকে ২০ ডলারে। মার্চ থেকে মে মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত ‘দুবাই ক্রুড’ বিক্রি হয়েছে ৯৭ ডলার/ব্যারেলে। সেখানে রিয়াধের তেলের দাম কখনওই ব্যারেলপ্রতি ১০২ ডলারের নীচে নামেনি।
দ্বিতীয়ত, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়া ইস্তক ইরানের থেকে তেল আমদানি বৃদ্ধি করে চিন। এর জেরে রাতারাতি সৌদির তরল সোনার চাহিদা কমে যায় বেজিঙের। গত ফ্রেব্রুয়ারিতে ড্রাগনভূমিতে পাঠানো রিয়াধের তেলের পরিমাণ ছিল দৈনিক ১৬ লক্ষ ব্যারেল। এপ্রিলে সেটাই ১২ লক্ষ ব্যারেলে নেমে আসে। মে মাসের শেষে অঙ্কটা আরও কমে দৈনিক ১১ লক্ষ ব্যারেল দাঁড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে।
চিনকে বাদ দিলে এত দিন সৌদির খনিজ তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা ছিল জাপান। এ বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে রিয়াধের থেকে দিনে ১০-১২ লক্ষ ব্যারেল তরল সোনা আমদানি করছিল টোকিয়ো। কিন্তু মার্চ-এপ্রিলে সেটাই কমে মাত্র ২.২ লক্ষ ব্যারেলে নেমে আসে। এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত মে মাসে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রে মাত্র দু’টি ট্যাঙ্কার পাঠিয়েছে ‘আরামকো’। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে মাত্র ১.৩ লক্ষ ব্যারেল তেল পাঠিয়েছে তারা।
সৌদির ‘আরব ক্রুড’ আমদানি হ্রাসের তৃতীয় কারণ হল দীর্ঘসূত্রিতা। রিয়াধের লোহিত সাগরের বন্দর থেকে চিন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা তাইওয়ানের মতো দেশগুলিতে তরল সোনা পৌঁছোতে সময় লাগছে এক মাস বা তারও বেশি। রাস্তা বেশি হওয়ার কারণে লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে ট্যাঙ্কার খরচ। সেই অতিরিক্ত ব্যয়ভার বহন করতে রাজি নয় উপসাগরীয় দেশটির এশিয়ার ‘ধনী’ খদ্দেররা।
চতুর্থত, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এশিয়ার জ্বালানি বাজারে এসেছে একাধিক ‘খেলোয়াড়’। এর মধ্যে ভেনেজ়ুয়েলা এবং নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এই সমস্ত রাষ্ট্র থেকে ধীরে ধীরে তরল সোনার আমদানি বাড়াতে দেখা যাচ্ছে ভারতকে। আর তাই ‘আরব ক্রুড’ বিক্রি করতে গিয়ে রিয়াধ যে প্রবল প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
নয়াদিল্লির সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক বেশ ভাল। তার পরেও গত এপ্রিলের তুলনায় রিয়াধের থেকে জ্বালানি আমদানি ৩০ শতাংশ কমিয়েছে ভারত। এপ্রিলে আরবের তেলের দৈনিক আমদানির পরিমাণ ছিল ৬.৭ লক্ষ ব্যারেল। মে মাসে সেটাই কমে ৪.৫ লক্ষ ব্যারেলে এসে দাঁড়িয়েছে। আগামী দিনে সংশ্লিষ্ট সূচক আরও কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি নীতি সুস্পষ্ট করেছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। নয়াদিল্লি জানিয়েছে, যেখানে সস্তায় মিলবে সেখান থেকেই খনিজ তেল কেনা হবে। এ ব্যাপারে তৃতীয় কোনও রাষ্ট্রের চাপ সহ্য করবে না ভারত। তা ছাড়া জ্বালানির ব্যাপারে কোনও একটি দেশের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকতে রাজি নয় দিল্লি। আমদানিতে বৈচিত্র রাখার দিকেও নজর দিয়েছে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধে জড়ানোর পর থেকেই সস্তায় খনিজ তেল বিক্রি শুরু করে রাশিয়া। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে গত চার বছর ধরে বিপুল পরিমাণে মস্কোর সেই ‘উরাল ক্রুড’ আমদানি করেছে নয়াদিল্লি। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে সেই সূচক কিছুটা নিম্নমুখী হলেও মে মাসে ফের তা চড়তে শুরু করেছে। পাশাপাশি, আমেরিকার থেকেও তেল আমদানি বাড়িয়েছে ভারত।
অন্য দিকে, ক্রেতা কমে যাওয়ায় লোহিত সাগরের বন্দর সংলগ্ন সমুদ্রে দাঁড়িয়ে থাকছে সৌদির তেলবোঝাই ট্যাঙ্কার। সূত্রের খবর, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে তরল সোনার দর কমানোর রাস্তায় হাঁটতে পারে রিয়াধ। তখন নয়াদিল্লি যে ফের আরবের তেলের দিকে ঝাঁপাবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
সব ছবি: সংগৃহীত।