অভিনয় নিয়েই বরাবর কেরিয়ার গড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরিবারের তরফে সম্মতি ছিল না। মেয়ের স্বপ্নপূরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন নায়িকার মা। মেয়ে অভিনয় করলে তিনি আত্মহত্যা করে ফেলবেন, এমন হুমকিও দিতেন। তবুও মায়ের হুমকিকে অগ্রাহ্য করে নিজের জেদ পূরণ করেন বাঙালি নায়িকা সায়নী গুপ্ত।
১৯৮৫ সালের অক্টোবর মাসে কলকাতায় জন্ম সায়নীর। বাবা-মা এবং দুই ভাইয়ের সঙ্গে কলকাতায় থাকতেন তিনি। তাঁর বাবা পেশায় সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন। রেডিয়ো সংস্থায় কাজ করতেন তিনি। সায়নীর মা কাজ করতেন বিএসএনএল-এ।
ছোট থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল সায়নীর। মেয়ের এই প্রবল ইচ্ছার আঁচ পেয়েছিলেন নায়িকার মা। তিনি ছিলেন কড়া প্রকৃতির। সায়নীকে শাসনে রাখতেন তাঁর মা। মেয়ে অভিনয়কে পেশা হিসাবে বেছে নিক, তা চাইতেন না তিনি।
স্কুল-কলেজের পড়াশোনা শেষ করার পর কলকাতার নামকরা নাটকের দলে যোগ দেন সায়নী। সেই সুবাদে বিভিন্ন নাটকে অভিনয়ও করেন তিনি। কিন্তু নাটকের মহড়া দিতে যেতে দিতেন না সায়নীর মা।
সায়নীর দাবি, তাঁর মা ঘরবন্দি করে রাখতেন অভিনেত্রীকে। কোনও ভাবেই বাড়ি থেকে বেরোতে দিতেন না তিনি। অভিনয় করলে দেহব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত হতে হবে— এমন ভাবনা পোষণ করতেন নায়িকার মা। তাই মেয়েকে সেই পেশা বেছে নিতে দিতেন না তিনি।
সায়নী এক সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি মায়ের কথা অমান্য করে নাটকের মহড়া দিতে যেতেন। কোনও উপায় না দেখে সায়নীকে আত্মহত্যার হুমকি দিতে শুরু করেন তাঁর মা। তিনি মেয়েকে বলতেন, ‘‘তুমি যদি অভিনয় করো তা হলে আমি এখনই হাত কেটে ফেলব।’’
নিজের স্বপ্নপূরণ করবেন বলে জেদ ধরে নিয়েছিলেন সায়নী। পড়াশোনা শেষ করার পর এক বেসরকারি সংস্থার মার্কেটিং এবং সেল্স বিভাগে চাকরি শুরু করেন তিনি। কিন্তু ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে বেশি দিন সেই চাকরি টিকিয়ে রাখতে পারেননি।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, ২১ বছর বয়সে মোটা বেতনের চাকরি ছে়ড়ে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সায়নী। ২০০৬ সালে চাকরি ছেড়ে পুণে চলে যান তিনি। সেখানে গিয়ে ‘ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া’ (এফটিআইআই)-এ ভর্তি হন।
সায়নীর সিদ্ধান্তে সমর্থন জানান তাঁর বাবা। কিন্তু তাঁর মা কথা বলা বন্ধ করে দেন। মায়ের অমতেই পুণে চলে যান সায়নী। সেখানে গিয়ে অভিনয় নিয়ে পড়াশোনা করতে শুরু করে দেন তিনি।
সায়নী এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, টানা এক মাস তাঁর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ রেখেছিলেন মা। তার পর নিজেই পুণেতে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। অভিনেত্রী বলেছিলেন, ‘‘মা আমার সঙ্গে ক্যাম্পাসে দেখা করতে এসেছিলেন। সেখানকার ছাত্রছাত্রীরা মাকে দেখে ৫টি ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। একটি ছবিতে মা অভিনয়ও করেছিলেন।’’
নিজে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর পর মত পরিবর্তন করেন সায়নীর মা। অভিনেত্রীকে তিনি বলেছিলেন, ‘‘আগামী দু’বছর তুই যদি এই ধরনের কাজকর্মের সঙ্গে জু়ড়ে থাকতে পারিস, তা হলে আমার কোনও আপত্তি নেই। তুই অভিনয় কর।’’
২০১৫ সালে ‘মার্গারিটা উইথ আ স্ট্র’ ছবির মাধ্যমে বলিপাড়ায় কেরিয়ার শুরু সায়নীর। তাঁর কেরিয়ারের তৃতীয় ছবি শাহরুখের খানের সঙ্গে। ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ফ্যান’ ছবিতে অভিনয় করতে দেখা যায় সায়নীকে।
‘বার বার দেখো’, ‘জলি এলএলবি ২’, ‘জগ্গা জাসুস’, ‘আর্টিকল ১৫’, ‘অ্যাক্সন’, ‘জ়ুইগ্যাটো’-র মতো একাধিক হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেন সায়নী। তা ছাড়া ‘ইনসাইড এজ’, ‘ফোর মোর শট্স প্লিজ়!’, ‘দিল্লি ক্রাইম ৩’-এর মতো ওয়েব সিরিজ়েও অভিনয় করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।
সায়নী এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, চুম্বনের দৃশ্যে অভিনয়ের সময় সহ-অভিনেতার কারণে অস্বস্তিতে পড়েছিলেন তিনি। অভিনেত্রী বলেছিলেন, ‘‘শুটিং শেষ হওয়ার সময় পরিচালক ‘কাট’ বলে দিয়েছেন। তবুও সহ-অভিনেতা আমায় চুমু খেয়ে যাচ্ছিলেন। থামছিলেন না তিনি।’’ যদিও সহ-অভিনেতা অথবা সেই হিন্দি ছবিটির নাম উল্লেখ করেননি নায়িকা।
শুটিং সেটে নায়িকাদের নিরাপত্তার অভাব নিয়েও সমালোচনা করেছিলেন সায়নী। এক পুরনো অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে ক্ষোভপ্রকাশও করেছিলেন তিনি। ‘ফোর মোর শট্স প্লিজ়!’ প্রথম সিজ়নের শুট করতে গোয়ায় যেতে হয়েছিল তাঁকে। ছোট পোশাক পরে একটি দৃশ্য শুট করার কথা ছিল তাঁর। তখনই খারাপ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন নায়িকা।
সায়নী বলেছিলেন, ‘‘গোয়ার সমুদ্রসৈকতে বালির উপর শুয়ে আমায় আবেদনভরা অভিব্যক্তি নিয়ে অভিনয় করতে হত। ক্রুয়ের সদস্য-সহ আমার সামনে তখন ৭০ জন দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু সকলেই পুরুষ। কোনও মহিলা ছিলেন না। ৭০ জন পুরুষের সামনে আমায় ছোট পোশাক পরে সেই শট দিতে হল। কারও মনে হল না যে, অন্তত একটা চাদর নিয়ে আমার কাছে দাঁড়িয়ে থাকবে। নায়িকার নিরাপত্তা নিয়ে কেউ চিন্তাই করলেন না।’’
বহু বছর ধরে ‘সিঙ্গল’ রয়েছেন সায়নী। এমনকি, বিয়ে করতেও নাকি ভয় পান তিনি। ২০২১ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘‘বিয়ের পর স্বামী পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে স্ত্রী তাঁকে ক্ষমা করে আবার দ্বিতীয় সুযোগ দেবেন— এই ধরনের ঘটনা আজকের যুগেও ঘটে। বিয়ের পর আমার সঙ্গেও এমন কিছু হলে আমি নিজেকে কখনও ক্ষমা করতে পারব না।’’
সব ছবি: সংগৃহীত।