গুপ্তচরবৃত্তির ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও টেমসের তীরে বিশাল দূতাবাস খোলার অনুমতি। ঠিক তার পরেই বেজিং সফরে গিয়ে ড্রাগন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের সঙ্গে পাক্কা তিন ঘণ্টা বৈঠক। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টার্মারের জোড়া পদক্ষেপে হতবাক বিশ্ব। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘দৌরাত্ম্যে’ অতিষ্ঠ হয়ে চিনের ব্যাপারে ছুতমার্গ কাটিয়ে উঠছেন তিনি? এর জেরে ‘লৌহ ভাই’ ওয়াশিংটন ও লন্ডনের অটুট বন্ধুত্বে ধরবে চিড়? ইংলিশ চ্যানেলের পারের দ্বীপরাষ্ট্রের এই নিয়ে তুঙ্গে উঠেছে জল্পনা।
চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি টেমসের তীরে শর্তসাপেক্ষে চিনা দূতাবাস নির্মাণের অনুমোদন দেন ব্রিটিশ আবাসনমন্ত্রী (কমিউনিটি সেক্রেটারি) স্টিভ রিড। রাজধানী লন্ডনের বিখ্যাত টাওয়ার ব্রিজের কাছে রয়্যাল মিন্ট কোর্টে তা গড়ে তুলবে বেজিং। স্থানীয় গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী দিনে সেখানে ২০০-র বেশি কর্মীকে মোতায়েন রাখার পরিকল্পনা রয়েছে ড্রাগন প্রেসিডেন্ট শি-র। অনুমোদিত দূতাবাসটি ইউরোপের মধ্যে আয়তনে সবচেয়ে বড় হতে চলেছে বলেও জানিয়েছে ওয়াকিবহাল মহল।
লন্ডনে এ-হেন পেল্লায় দূতাবাস খোলার স্বপ্ন দীর্ঘ দিন ধরেই দেখে আসছে চিন। কিন্তু বিশ্বাস করে কখনওই বেজিংকে জায়গা দিতে চায়নি ব্রিটিশ প্রশাসন। এর নেপথ্যে অবশ্য ছিল তিনটি কারণ। প্রথমত, ড্রাগনের বিরুদ্ধে তথ্য ও প্রযুক্তি চুরির ভূরি ভূরি অভিযোগ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, দূতাবাস তৈরি হলে হংকং ইস্যুতে ড্রাগনের অশান্তি ছড়ানোর আশঙ্কায় ভুগছিলেন ইংরেজ গোয়েন্দারা। সব শেষে অবশ্যই বলতে হবে সাইবার হ্যাকিংয়ের আতঙ্কের কথা। তা ছাড়া ঘরোয়া রাজনীতিতে মান্দারিনভাষীদের প্রভাব বাড়ুক, চায়নি আটলান্টিকের পারের দ্বীপরাষ্ট্র।
তার পরেও অবশ্য হাল ছাড়েনি চিন। ক্রমাগত ব্রিটিশদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মজবুত করার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে বেজিং। ২০২৪ সালে স্টার্মার প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিলে এ ব্যাপারে আসরে নামেন খোদ প্রেসিডেন্ট শি। শুভেচ্ছাবার্তা পাঠানোর পাশাপাশি তাঁর সঙ্গে ফোনে কথাও বলেন জিনপিং। সূত্রের খবর, তখনই দূতাবাস খোলার ব্যাপারে দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে কথা হয়েছিল। ওই ঘটনার দু’বছরের মাথায় তাতে সবুজ সঙ্কেত দিল ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট, যাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
চিনের ব্যাপারে ব্রিটেনের মনবদলের নেপথ্যে অবশ্য ট্রাম্পের হাতযশ নেহাত কম নয়। সম্প্রতি দাভোসে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে (ডব্লিউইএফ) অংশ নিতে সুইৎজ়ারল্যান্ড সফর করেন তিনি। সেখানে ফক্স নিউজ়কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গ্রিনল্যান্ডের ব্যাপারে হুমকি দিতে গিয়ে ইংরেজ সৈনিকদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ফলে ইংলিশ চ্যানেলের পারের দ্বীপরাষ্ট্রে তাঁর বিরুদ্ধে আছড়ে পড়ে সমালোচনার ঢেউ। ট্রাম্পের বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয় প্রধানমন্ত্রী স্টার্মারের ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের দফতরও।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সবচেয়ে বড় জঙ্গি আক্রমণের মুখে পড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওই দিন বিমান ছিনতাই করে নিউ ইয়র্ক শহরের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার-সহ একাধিক জায়গায় আত্মঘাতী হামলা চালায় আল-কায়দার সন্ত্রাসীরা। গোটা ঘটনার মূলচক্রী হিসাবে উঠে আসে ওসামা বিন-লাদেনের নাম। ওই সময় আফগানিস্তানে লুকিয়েছিলেন ওই কুখ্যাত জঙ্গি। ফলে ৯/১১ হামলার বদলা নিতে হিন্দুকুশের কোলের দেশটিকে আক্রমণ করে আমেরিকা। সেখান থেকে আল-কায়দাকে নির্মূল করাই ছিল ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য।
আফগানিস্তানে সামরিক অভিযানের নাম ‘অপারেশন এনডুয়েরিং ফ্রিডম’ রেখেছিল আমেরিকা। যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে ওই যুদ্ধে জড়ায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট ‘নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন’ বা নেটো। সংশ্লিষ্ট সংগঠনটির অন্যতম সদস্য হওয়ায় হিন্দুকুশের কোলের দেশটিতে সেনা পাঠিয়েছিল ব্রিটেনও। শুধু তা-ই নয়, ওই লড়াইয়ে অংশ নেন ইংরেজ রাজপরিবারের ছোট যুবরাজ প্রিন্স হ্যারি। পরবর্তী কালে আত্মজীবনীতে সেই অভিজ্ঞতার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেন তিনি।
২০০১-’২১ সাল পর্যন্ত ২০ বছর ধরে চলা আফগানিস্তানের যুদ্ধে প্রাণ হারান ৪৫৭ জন ব্রিটিশ সৈনিক। এঁদের মধ্যে শত্রুর আক্রমণে মৃত্যু হয়েছিল অন্তত ৪০০ জনের। এঁদের সিংহভাগেরই প্রাণ গিয়েছিল পঠানভূমির হেলমন্দ প্রদেশের লড়াইয়ে। এ ছাড়া আহত হন দু’হাজারের বেশি ইংরেজ সামরিক কর্মী। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ফক্স নিউজ়কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বন্ধুর এই আত্মত্যাগ মানতে চাননি ট্রাম্প। উল্টে তাঁদের ‘ভীরু-কাপুরুষ’ বলতেও কুণ্ঠা বোধ করেননি তিনি।
আফগানিস্তান প্রসঙ্গে ফক্স নিউজ়ের একটি প্রশ্নে ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস) বলেন, ‘‘ওখানকার যুদ্ধে ব্রিটিশেরা কখনওই সামনের সারিতে ছিল না। ইংরেজ সৈনিকদের রণাঙ্গন থেকে অনেক দূরে রাখা হয়েছিল। হিন্দুকুশের লড়াইয়ের যাবতীয় কৃতিত্ব শুধুমাত্র আমেরিকার। বাকিরা কেউ কিছুই করেনি। কারণ, নেটোর সামরিক ক্ষমতা সীমিত। আমরা ছাড়া ওই জোটের কেউ শক্তিশালী নয়। (আমাদের ছাড়া) ওরা অস্তিত্ব টেকাতে পারবে না।’’
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরেই ইংলিশ চ্যানেলের পারের দ্বীপরাষ্ট্রে পড়ে যায় হইচই। ব্রিটিশ সৈনিকদের ছবি দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে সমাজমাধ্যমে একের পর এক পোস্ট করতে থাকেন সেখানকার বাসিন্দারা। এর মধ্যে ছিল প্রিন্স হ্যারির একটি ভিডিয়োও, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে সাক্ষাৎকার দিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। আচমকা বোমাবর্ষণ শুরু হলে সাক্ষাৎকার অসমাপ্ত রেখেই লড়়াইয়ের ময়দানের দিকে দৌড় লাগান তিনি।
আফগানিস্তান যুদ্ধের আত্মবলিদান প্রসঙ্গে ব্রিটিশ আমজনতা সরব হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অবশ্য পিছু হটেন ‘পোটাস’। দেশে ফিরে নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে এ ব্যাপারে একটি পোস্ট করেন তিনি, যার ছত্রে ছত্রে ছিল ইংরেজ সৈনিকদের বীরত্ব ও গৌরবগাথা। পাশাপাশি, ওয়াশিংটন ও লন্ডনের অটুট বন্ধুত্বের কথাও বার বার বলতে শোনা যায় তাঁকে। যদিও তত দিনে ট্রাম্পকে বিশ্বাস করার রাস্তা থেকে সরতে শুরু করেছে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট, বলছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
চলতি বছরের জানুয়ারির গোড়ায় ভেনেজ়ুয়েলায় সামরিক অভিযান চালায় মার্কিন ডেল্টা ফোর্স। লাটিন আমেরিকার দেশটির রাজধানী কারাকাসে ঢুকে সস্ত্রীক সেখানকার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনে তারা। এর পরই গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার ব্যাপারে চাপ দেন ট্রাম্প। সুমেরু সাগর সংলগ্ন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ দ্বীপটির প্রকৃত মালিকানা রয়েছে নেটোভুক্ত ডেনমার্কের কাছে। ট্রাম্পের যুক্তি, ‘সবুজ দ্বীপে’ দিন দিন বাড়ছে রাশিয়া ও চিনের প্রভাব, যেটা আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ।
গ্রিনল্যান্ডের ব্যাপারে ট্রাম্প নাছোড় মনোভাব দেখানোয় প্রমাদ গোনে পশ্চিম ইউরোপ। আগামী দিনে নেটো-ভুক্ত অন্য দেশগুলিকে কব্জা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বায়না ধরতে পারে বলে সেখানে ছড়িয়ে যায় আতঙ্ক। এই পরিস্থিতিতে ‘আগ্রাসী’ ওয়াশিংটনকে আটকাতে জানুয়ারির মাঝামাঝি প্রথম বার চিনের দিকে মুখ ফেরান ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকরঁ। ইংরেজ প্রধানমন্ত্রী স্টার্মার তাঁরই দেখানো রাস্তায় হাঁটছেন বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
২০১৮ সালে চিন সফর করেন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। পরবর্তী সাত বছরে তাঁর কোনও উত্তরসূরি আর বেজিঙের রাস্তা মাড়াননি। সেই কারণেই স্টার্মারের সিদ্ধান্তকে ‘ব্যতিক্রমী’ হিসাবে দেখছে ওয়াকিবহাল মহল। প্রেসিডেন্ট শি-র সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে দু’তরফে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধির কথা বলেছেন তিনি, যা নিয়ে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিতে দেরি করেনি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন।
জিনপিঙের সঙ্গে বৈঠক সেরে বেরিয়ে স্টার্মার জানান, চিনের সঙ্গে ব্রিটেনের আরও পরিশীলিত, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হতে চলেছে। তারা পরস্পরের বাজারে আরও বেশি করে প্রবেশাধিকার পাবে। বাণিজ্যে শুল্ক কমবে উভয় তরফেই। তা ছাড়া, উভয় দেশে বিনিয়োগের বিষয়েও দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর। ফলে আগামী দিনে বেজিং-লন্ডন বাণিজ্যিক সম্পর্ক মজবুত হতে চলেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
অন্য দিকে, এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে এক লাইনে ব্রিটেনকে সতর্ক করেন ট্রাম্প। তাঁর কথায়, ‘‘ওরা যদি এটা করে, তবে ওদের পক্ষে খুবই বিপজ্জনক হবে।’’ কিসের বিপদ এবং সে ক্ষেত্রে আমেরিকাই বা কী করবে, তা অবশ্য খোলসা করেননি তিনি। ব্রিটেনকে বাদ দিলে সম্প্রতি বেজিঙের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করেছে কানাডা। অটোয়ার এই সিদ্ধান্তও ওয়াশিংটনের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে, বলছেন সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ।
তবে এগুলির উল্টো মতও রয়েছে। লন্ডনে চিনা দূতাবাসের জন্য বিশাল জায়গা দেওয়ায় স্টার্মার সরকারের প্রবল সমালোচনা করেছে সেখানকার প্রধান বিরোধী দল কনজ়ারভেটিভ পার্টি। এই ইস্যুতে বিক্ষোভও দেখায় তারা। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন রক্ষণশীল দলটির হেভিওয়েট নেত্রী প্রীতি পটেল। তিনি বলেছেন, ‘‘বেজিঙের সামনে তো আমরা আত্মসমর্পণ করলাম। ওদের একটা বিশাল গুপ্তচরকেন্দ্র খোলার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য যেটা বিপজ্জনক।’’
চলতি বছরের এপ্রিলে চিন সফরে যাওয়ার কথা আছে ট্রাম্পের। সেখানে প্রেসিডেন্ট শি-র সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন তিনি। ইতিমধ্যেই বেজিঙের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে জড়়িয়েছেন ‘পোটাস’। অন্য দিকে গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৫র যাবতীয় রিপোর্ট অস্বীকার করে ড্রাগনকে দূতাবাস খোলার অনুমতি দিয়েছে স্টার্মার প্রশাসন। ফলে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায় সেটাই এখন দেখার।
সব ছবি: সংগৃহীত।