Nanavati Case

স্ত্রীর প্রেমিককে ‘খুন’ করেও নির্দোষ! এই মামলার পর জুরিপ্রথাই উঠে যায় দেশের বিচারব্যবস্থা থেকে

প্রেম, দাম্পত্য, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, ঈর্ষা এবং খুনের মিশেলে মোড়া নানাবতী মামলার কাহিনি পরে ঠাঁই নিয়েছিল ওয়েব সিরিজ় থেকে বলিউডি ছবির পর্দায়।

Advertisement
নিজস্ব প্রতিবেদন
শেষ আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ০৭:৪৭
০১ ২৬
Representational picture of murder accused

স্বামীর অনুপস্থিতিতে অন্য সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন স্ত্রী। সে কথা জানতে পেরে স্ত্রীর প্রেমিকের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন স্বামী। স্ত্রী এবং তাঁর সন্তানদের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করায় স্ত্রীর সেই প্রেমিককে খুন করেছিলেন তিনি। এর পর থানায় আত্মসমর্পণ করেন।

০২ ২৬
Representational picture of crime

সিনেমার চিত্রনাট্যের মতো নাটকীয় ঘাতপ্রতিঘাতে ভরপুর এ কাহিনি। তবে এর চরিত্রেরা কাল্পনিক নয়। ঘটনাও সত্য। পঞ্চাশের দশকে তৎকালীন বম্বেতে এই খুনের মামলা ঘিরে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল গোটা দেশে। প্রেম, দাম্পত্য, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, ঈর্ষা এবং খুনের মিশেলে মোড়া যে কাহিনি পরে ঠাঁই নিয়েছিল ওয়েব সিরিজ় থেকে বলিউডি ছবির পর্দায়।

০৩ ২৬
Picture of KM Nanavati

স্ত্রী সিলভিয়ার প্রেমিককে খুনের অভিযোগে কাঠগড়ায় উঠেছিলেন নৌসেনা কম্যান্ডার কাবস মানেকশ নানাবতী। তবে ‘খুন করলেও’ তৎকালীন বম্বের জেলা ও দায়রা আদালতে জুরিদের বিচারে নির্দোষ সাব্যস্ত হন তিনি। ৯ জন জুরির মধ্যে কেবলমাত্র ১ জনই এ রায়ের বিপক্ষে ছিলেন।

Advertisement
০৪ ২৬
Picture of Bombay High Court

অনেকের দাবি, ‘নানাবতী ভার্সাস স্টেট অফ মহারাষ্ট্র’ মামলায় পর থেকেই এ দেশে বিচারপ্রক্রিয়ায় জুরিপ্রথার চলন তুলে দেওয়া হয়েছিল। তবে তা ঠিক নয়। ষাটের দশকে বেশ কয়েকটি মামলায় বিচারে অংশ নিয়েছিলেন জুরিরা। যদিও সেই মামলাগুলি নানাবতী মামলার মতো চাঞ্চল্যকর ছিল না।

০৫ ২৬
Representational picture of Sylvia

সংবাদপত্র মিড ডে-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৫৯ সালের ২৭ এপ্রিল কাজ সেরে কাফ প্যারেড এলাকায় নিজের বাড়ি ফিরেছিলেন নৌসেনার তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কম্যান্ডার নানাবতী। স্ত্রীকে আনমোনা বসে থাকতে দেখে প্রশ্ন করায় উত্তরে তাঁর স্বীকারোক্তি মিলেছিল। জানিয়েছিলেন, স্বামীর অনুপস্থিতিতে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ফেলেছেন।

Advertisement
০৬ ২৬
Picture of Sylvia

প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্ক হলেও তাঁকে বিয়ে করবেন কি না, তা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন নানাবতীর স্ত্রী সিলভিয়া। সে কথাও স্বামীর কাছে স্বীকার করেছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমের দাবি।

০৭ ২৬
Picture of main characters of the Nanavati case KM Nanavati and Sylvia

সিলভিয়ার থেকে তাঁর প্রেমিক প্রেম ভগবানদাস আহুজার নাম জেনে নিয়েছিলেন নানাবতী। ঘটনাচক্রে, আহুজা ছিলেন নানাবতীর বন্ধু। মালাবার হিল এলাকায় নেপিয়ান সি রোডের ‘জীবনজ্যোত’ নামে একটি অভিজাত অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন আহুজা।

Advertisement
০৮ ২৬
Representational picture of crime

আহুজার অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকার আগে নৌসেনার ফাঁড়িতে গিয়েছিলেন নানাবতী। মিথ্যা কারণ দেখিয়ে সেখান থেকে নিজের পিস্তল এবং ৬টি কার্তুজ নিয়ে নেন। এর পর সোজা আহুজার অফিসে পৌঁছন।

০৯ ২৬
Representational picture of crime scene

আহুজার অফিসে গেলেও সেখানে তাঁর দেখা পাননি নানাবতী। এর পর সেখান থেকে আহুজার অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে ওঠেন তিনি। সঙ্গে ছিল গুলিভরা পিস্তলটি।

১০ ২৬
Picture of Prem Ahuja

অবশেষে স্ত্রীর প্রেমিকের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে তাঁর মুখোমুখি হন নানাবতী। সটান জিজ্ঞাসা করেন, নানাবতীর স্ত্রীকে তিনি বিয়ে করবেন কি না? তাঁর ৩ সন্তানের দায়িত্ব নিতে পারবেন কি না? কোনও প্রশ্নের জবাবেই ‘হ্যাঁ’ বলেননি আহুজা।

১১ ২৬
Representational picture of crime scene

আহুজার জবাবের প্রত্যুত্তরে তাঁকে ৩টি বুলেট ‘উপহার’ দিয়েছিলেন নানাবতী। ওই অ্যাপার্টমেন্ট থেকে আহুজার নিথর দেহ মিলেছিল। ‘খুনের’ আগে দু’জনের মধ্যে হাতাহাতিতে নানাবতীর পিস্তল থেকে আরও ২টি বুলেট বেরিয়েছিল বলে দাবি। যদিও সেগুলি লক্ষ্যভেদ করেনি।

১২ ২৬
Representational picture of court

স্ত্রীর প্রেমিককে ‘খুনের’ পর থানায় পৌঁছন নানাবতী। ‘মুম্বই ফেবলস’ বইয়ে সে কাহিনির বর্ণনা দিয়েছেন লেখক জ্ঞান প্রকাশ। খুনের দিনই শহরের তৎকালীন ডেপুটি পুলিশ কমিশনার জন লোবোর অফিসে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন নানাবতী।

১৩ ২৬
Representational picture of accused

‘মুম্বই ফেবলস’ অনুযায়ী, সুঠাম গড়নের এক সুপুরুষ পার্সি ওই পুলিশকর্তার অফিসে ঢুকে বলেন, ‘এক জনকে গুলি করেছি।’ উত্তরে নির্লিপ্ত গলায় লোবো বলেন, ‘‘তিনি মৃত। গামদেবী থানা থেকে এখনই জানতে পেরেছি।’’ শুনে নানাবতীর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। এ ভাবেই নানাবতীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য বর্ণনা করেছেন জ্ঞান প্রকাশ। যদিও বাস্তবে ঠিক এমনটাই ঘটেছিল কি না, তা জানা যায়নি।

১৪ ২৬
Representational picture of crime scene

‘খুনির স্বীকারোক্তির’ আগেই ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল গামদেবী থানার পুলিশ। তদন্তকারীরা জানিয়েছিলেন, আহুজার অ্যাপার্টমেন্টের বাথরুমে ভাঙা কাচ ছড়িয়েছিল। দেওয়ালে এবং দরজার হাতলে মিলেছিল রক্তের দাগ। মেঝেয় পড়েছিল একটি বাদামি রঙের ফাঁকা খাম। তার উপরে লেখা— লেফ্টেন্যান্ট কম্যান্ডার কেএম নানাবতী।

১৫ ২৬
Representational picture of crime scene

আহুজাকে খুনের মামলা গোড়ায় উঠেছিল জেলা ও দায়রা আদালতে। খুনের মামলা হলেও থ্রিলারের যাবতীয় রসদ মজুত ছিল এ মামলায়।

১৬ ২৬
Picture of main characters of the Nanavati case KM Nanavati, Sylvia and Prem Ahuja

সুন্দরী বিদেশিনি স্ত্রী। ইংরেজ স্ত্রীর প্রেমে বুঁদ এক পার্সি নৌসেনা আধিকারিক। এবং অবশ্যই স্ত্রীর ধনী, অবিবাহিত সিন্ধ্রি প্রেমিক। খুনের মামলার এ হেন পাত্র-পাত্রীর আবেদন আমজনতা থেকে তথাকথিত শহুরে বিদ্বজ্জনের অন্দরমহলে গিয়ে পৌঁছেছিল। সংবাদপত্রের পাতায় মামলার খুঁটিনাটি ছাপামাত্রই গ্রোগাসে গিলতে শুরু করেছিলেন পাঠকেরা।

১৭ ২৬
Picture of KM Nanavati

১৯৫৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মামলার শুনানি শুরু হয়েছিল। আদালতে নিজের জবানবন্দিতে নানাবতীর দাবি ছিল, ঘটনার দিন বাড়ি ফিরে সিলভিয়াকে কাছে টেনে নিলেও সাড়া পাননি। সিলভিয়া তাঁকে ভালবাসেন কি না জানতে চাইলে নিরুত্তর ছিলেন স্ত্রী। তবে কি অন্য কারও প্রেমে মগ্ন সিলভিয়া? সিলভিয়া কি তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন? এ বার স্ত্রীর উত্তর ছিল— ‘না’।

১৮ ২৬
Representational picture of Sylvia and Prem Ahuja

সিলভিয়ার প্রেমিকের থেকেও ‘আশানুরূপ’ উত্তর পাননি নানাবতী। সংবাদমাধ্যমের দাবি, সিলভিয়াকে প্রেমিকা নয়, শয্যাসঙ্গিনী হিসাবেই দেখতেন আহুজা। ফলে তাঁর বা নানাবতীর সন্তানদের দায়িত্ব নিতে চাননি।

১৯ ২৬
Representational picture of court

মাসখানেক শুনানির পর জুরিদের রায়ে নির্দোষ সাব্যস্ত হন নানাবতী। সেই রায় শুনে হাততালি দিয়ে ওঠেন আদালতকক্ষে উপস্থিত লোকজন। যদিও ওই রায় খারিজ করে বম্বে হাই কোর্টে মামলা পাঠিয়ে দেন জেলা ও দায়রা আদালতের বিচারক। এ বার মামলা পৌঁছয় হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে।

২০ ২৬
Representational picture of accused

১৯৬০ সালের ১১ মার্চ আহুজাকে খুনে দোষী সাব্যস্ত হন নানাবতী। তাঁকে যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা দেয় বম্বে হাই কোর্ট। যদিও সে সাজা মাফ করে দেন মহারাষ্ট্রের তৎকালীন রাজ্যপাল। কয়েক মাস পরে রাজ্যপালের নির্দেশকে খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট। এর পর নানাবতীকে জেলে পাঠানো হয়।

২১ ২৬
Picture of Vijayalakshmi Pandit

১৯৬৩ সালে স্বাস্থ্যজনিত কারণে নানাবতীর প্যারোলের আবেদন মঞ্জুর করে হাই কোর্ট। সব মিলিয়ে বছর তিনেক জেলে ছিলেন নানাবতী। প্যারোলের বছরখানেক পর তাঁর সাজা মাফ করে দেন মহারাষ্ট্রের তৎকালীন রাজ্যপাল তথা জওহরলাল নেহরুর বোন বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত।

২২ ২৬
Picture of KM Nanavati

সাজা থেকে অব্যাহতির পর ১৯৬৮ সালে সিলভিয়া এবং সন্তানদের নিয়ে কানাডা চলে যান নানাবতী। ২০০৩ সালের ২৪ জুলাই মৃত্যু হয় তাঁর।

২৩ ২৬
Representational picture of protest

এই মামলা নিয়ে শহরের সাপ্তাহিক ট্যাবলয়েড থেকে শুরু করে দেশের বহু সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নানাবতীকে নায়কের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। খলনায়কের ভূমিকায় দাঁড় করানো হয়েছিল আহুজাকে। মামলা চলাকালীন জনসমর্থনও ছিল নানাবতীর পক্ষে। পার্সি সম্প্রদায়ের একাংশ তাঁর সমর্থনে মিছিলও বার করেছিলেন।

২৪ ২৬
Picture of main characters of the Nanavati case Sylvia, Prem Ahuja and KM Nanavati

এই চর্চিত মামলার জেরে শিরোনামে উঠে এসেছিলেন এর আইনজীবীরাও। আইনজীবীদের পরামর্শ দেওয়ার জন্য রাম জেঠমলানিকে নিয়োগ করেছিলেন আহুজার বোন। আদালতে গিয়ে সওয়াল না করলেও দেশভাগের পর করাচি থেকে আসা এই তরুণ আইনজীবীর পেশাগত জীবনে সদর্থক ছাপ ফেলেছিল এই মামলা।

২৫ ২৬
Representational picture of court

অন্য দিকে, নানাবতীর হয়ে আদালতে দাঁড়িয়েছিলেন পার্সি শিল্পকলার বিশেষজ্ঞ, বায়ুসেনা আধিকারিক তথা আইনজ্ঞ কার্ল জামশেদ খণ্ডালাওয়ালা। পরে যাঁকে পদ্মশ্রী দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছিল।

২৬ ২৬
Picture of web series and movie based on the Nanavati case

নানাবতী মামলার উপর ভিত্তি করে বলিউডে দু’টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। প্রথম বার ১৯৭৩ সালে গুলজ়ারের পরিচালনায় ‘অচানক’। যাতে নানাবতীর ভূমিকায় ছিলেন বিনোদ খন্না। সিনেমার দর্শকদের জন্য যার গল্প লিখেছিলেন আর এক পরিচালক খোয়াজ়া আহমেদ আব্বাস। এর বহু বছর পর ২০১৬ সালে এসেছিল ‘রুস্তম’। তুমুল জনপ্রিয় হয় অক্ষয় কুমারের সে ছবি। অন্য দিকে, ২০১৯ সালে ওটিটি-র পর্দায় আসে একতা কপূরের ‘দ্য ভার্ডিক্ট’। এই ওয়েব সিরিজ় নিয়েও কম হইচই হয়নি।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
আরও গ্যালারি