সমাজমাধ্যমে প্রায়ই বেশ কিছু পুরনো ছবি এবং গল্প প্রকাশ্যে আসে, যা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং নেটাগরিকদের বদান্যতায় ভাইরালও হয়। সে রকমই একটি ভাইরাল গল্প পারস্যের (বর্তমানের ইরান) কাজার রাজবংশের এক রাজকন্যাকে নিয়ে।
ভাইরাল সেই পোস্টে বছরের পর বছর ধরে দাবি করা হয়েছে, কাজার রাজবংশের কন্যা ফাতেমা খানম এসমত আল-দৌলেহ এত সুন্দরী ছিলেন যে তিনি প্রেমপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর ১৩ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছিলেন।
সেই সব পোস্টের দাবি, ফাতেমা খানুম এতটাই সুন্দরী ছিলেন যে, তাঁকে পারস্যের সৌন্দর্যের প্রতীকও ধরা হত সে সময়। তবে সেই পোস্টের সঙ্গে প্রায়শই যে ছবিগুলি পোস্ট করা হয়, সেই ছবি অনুযায়ী, সমাজের মানদণ্ডে আদতেও সুন্দরী ছিলেন না ফাতেমা। তা হলেও কেন তাঁকে সৌন্দর্যের প্রতীক ধরা হত? কেনই বা তাঁর জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন ১৩ পুরুষ?
এ নিয়ে প্রশ্ন জাগলেও তার উত্তর অনেকেই জানেন না বা খোঁজার চেষ্টা করেননি। পরিবর্তে পোস্ট-রিপোস্টের সংখ্যা ঝড়ের গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে।
কিন্তু সে সব ভাইরাল পোস্টের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে কোন রহস্য? লিংকোপিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ভিক্টোরিয়া ভ্যান অর্ডেন মার্টিনেজের লেখা ‘জাঙ্ক হিস্ট্রি’ বইয়ে লেখিকা ব্যাখ্যা করেছেন, কী ভাবে ভাইরাল পোস্টে অনেক তথ্য ভুল ভাবে উপস্থাপিত হয়।
আসলে যে রাজকুমারীকে নিয়ে কথা হয়, তিনি এক জন ছিলেন না। ছিলেন দু’জন। আসলে দুই বোন। তাঁদের ছবিই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ওই পোস্টগুলিতে দেওয়া হয়। দাবি করা হয় এক জন হিসাবে।
১৭৮৯ থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত পারস্যে কাজার রাজবংশের শাসন ছিল। সেই বংশেরই দুই রাজকন্যা ফাতেমা খানুম ওরফে এসমত আল-দৌলেহ এবং জহরা খানুম ওরফে তাজ আল-সালতানেহ।
ফাতেমা এবং জহরা— দু’জনেই ছিলেন কাজার বংশের শাসক তথা শাহ, নাসের আল-দিন শাহ কাজারের কন্যা। নাসের খুব অল্প বয়স থেকেই ফোটোগ্রাফিতে আগ্রহী ছিলেন। মাঝেমধ্যেই বোন এবং কন্যাদের ছবি তুলতেন তিনি।
ফাতেমার জন্ম ১৮৫৫ সালে। জহরার ১৮৮৪ সালে। এটিআই ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, তাঁরা সৎবোন ছিলেন। কিন্তু অনলাইনে প্রকাশ্যে আসা ছবিগুলিতে তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩০ বছরের বয়সের ব্যবধান বোঝা যায় না। ফলে সত্যতা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হল দুই রাজকন্যার চেহারা। যাঁদের নাকি ‘অত্যন্ত সুন্দরী’ মনে করা হত, তাঁরা ছিলেন স্থূল এবং তাঁদের ঠোঁটের উপর গোঁফের রেখা ছিল, যা আজকের সমাজের সৌন্দর্যের মানদণ্ড অনুযায়ী অস্বাভাবিক।
তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর পারস্যে, মহিলাদের গোঁফ আকর্ষণীয় বলে বিবেচিত হত এবং অনেক মহিলা এই বৈশিষ্ট্যটি বাড়ানোর জন্য তাদের ঠোঁটের উপর কোল ব্যবহার করতেন।
এই নিয়ে হার্ভার্ডের ইতিহাসবিদ আফসানেহ নাজ়মাবাদি একটি বইও লিখেছেন। বইটির নাম ‘উওমেন উইথ মাস্টাচ্স অ্যান্ড মেন্ উইথআউট বিয়ার্ডস: জেন্ডার এন্ড সেক্সুয়াল অ্যাংজ়াইটি অফ ইরানিয়ান মডার্নিটি’। নাজমাবাদি সেই বইয়ে ব্যাখ্যা করেছেন, পারস্যবাসী যখন বেশি করে ইউরোপে ভ্রমণ করতে শুরু করেন, তখন তাঁদের সৌন্দর্যের মানগুলি পরিবর্তিত হতে শুরু করে।
অতএব, রাজকন্যাদের সম্পর্কে ভাইরাল পোস্টগুলি ভুল নয়। পারস্যের তখনকার সৌন্দর্যের মান এখনকার চেয়ে আলাদা ছিল। ঠোঁটের উপর সরু গোঁফের রেখা থাকাকেই সুন্দর বলে গণ্য করা হত। ফলে দুই রাজকন্যাই তাঁদের সময়কালে সৌন্দর্যের মানদণ্ড পূরণ করেছিলেন।
বলা হয়, উভয় রাজকন্যাই খুব অল্প বয়সে বিয়ে করেছিলেন। ফাতেমা বিয়ে করেছিলেন ১১ বছর বয়সে এবং জহরা ১৩ বছর বয়সে। সেই সময় রাজকুমারী বা রাজপরিবারের মহিলাদের মুখ সাধারণত তাঁদের পরিবার এবং নিকটাত্মীয়েরাই দেখতে পেতেন। তাই ১৩ জন পুরুষ ফাতেমার প্রেমে পড়ে আত্মহত্যা করেছিলেন— এমন দাবির কোনও ঐতিহাসিক সত্যতা বা প্রমাণ মেলেনি।
ফাতেমা ছিলেন শাহের দ্বিতীয় কন্যা। এক জন ফরাসি শিক্ষকের কাছ থেকে পিয়ানো এবং সূচিকর্ম শিখেছিলেন তিনি। তাঁর বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসা ইউরোপীয় কূটনীতিকদের স্ত্রীদের আতিথেয়তার ভারও ছিল তাঁর উপর।
অন্য দিকে, ফতেমার সৎবোন জহরা ছিলেন শাহের দ্বাদশ কন্যা। বলা হয়, জহরার মধ্যে ছিল নারীবাদী এবং জাতীয়তাবাদী চিন্তা। প্রতিভাবান লেখিকা হিসাবেও নিজের পরিচিতি তৈরি করেছিলেন তিনি। ‘ক্রাউনিং অ্যাঙ্গুইশ: মেমোয়ার্স অফ আ পারস্য প্রিন্সেস ফ্রম দ্য হারেম টু মডার্নিটি’ নামে একটি বইও লিখেছিলেন তিনি।
সেই বইয়ে জহরা লিখেছেন, ‘‘পারস্যের নারীদের মানবজাতি থেকে দূরে রাখা হয়েছে এবং গবাদি পশু ও জন্তুদের পাশে জায়গা দেওয়া হয়েছে। তাঁরা তাঁদের পুরো জীবন কারাগারে হতাশার মধ্যে কাটাচ্ছেন তিক্ত আদর্শের ভারে পিষ্ট হয়ে।’’
ফাতেমা এবং জহরা— উভয়েই অসাধারণ জীবনযাপন করেছিলেন, যা ভাইরাল পোস্টের মাধ্যমে তাঁদের সৌন্দর্য বিচার বা ভুয়ো গল্পের মাধ্যমে পরিচিতি লাভের থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, এ-ও স্পষ্ট যে ভাইরাল পোস্টগুলির দাবি মতো, কাজারের রাজকন্যা কোনও এক জন ছিলেন না। ছিলেন দু’জন।
কথায় আছে একটি ছবি হাজার শব্দের সমান। কাজারের রাজকন্যা নিয়ে ভাইরাল ছবিগুলি মজাদার এবং সমাজমাধ্যমে পোস্ট বা শেয়ার করা সহজ। কিন্তু সেই ছবির নেপথ্যে থাকা ইতিহাস জানাও প্রয়োজনীয়।
সব ছবি: সংগৃহীত।