বাস্তবে অস্তিত্বহীন। অথচ সমাজমাধ্যমে দিব্যি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নেটপ্রভাবী সুন্দরী তন্বী। নানা ধরনের ভিডিয়োয় মুখ দেখিয়ে মাসে লক্ষাধিক টাকাও রোজগার করছে দিব্যি। ইনস্টাগ্রামে অনুসরণকারীর সংখ্যা এক লক্ষেরও বেশি।
কখনও বোগেনভেলিয়ার ঝাড়ের নীচে স্বতস্ফূর্ত উপস্থিতি। আবার কখনও রাতপোশাকে শোয়ার ঘরের ভিডিয়োয়। কাঁধখোলা কালো গাউনে সমুদ্রের পারে উষ্ণতা ছড়াচ্ছেন মোহময়ীরূপে। আবার শাড়িতেও তিনি অনন্যা।
চুল ছোট করে ছাঁটা। হালকা মেকআপ। পোশাকের সঙ্গে মানানসই ছিমছাম গয়না। ভারতীয় পোশাকই হোক বা পাশ্চাত্য পোশাক, সবেতেই সমান ভাবে আকর্ষণীয়া।
তিনি অন্য যে কোনও লাইফস্টাইল বা ফ্যাশন সংক্রান্ত বিষয়স্রষ্টার মতোই। কিন্তু একটাই পার্থক্য। বৃতিকা পটেল রক্ত-মাংসে গড়া কোনও মানবী নন। সমাজমাধ্যমে ঝড় তোলা এই নেটপ্রভাবী কৃত্রিম মেধা দিয়ে তৈরি।
এআই ইনফ্লুয়েন্সার বা ভার্চুয়াল মডেল হল এমন একটি চরিত্র যা কম্পিউটার গ্রাফিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা হয়। এদের কোনও বাস্তব অস্তিত্ব নেই। কিন্তু মানুষের মতোই সমাজমাধ্যমে ছবি, ভিডিয়ো পোস্ট করে। অনুসরণকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে।
ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং হাব-এর মতে, এআই ইনফ্লুয়েন্সার বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি নেটপ্রভাবীরা হল এক ডিজিটাল চরিত্র বা অবতার। নির্মাতাদের হাতযশে পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠে সমাজমাধ্যমে। শুধুমাত্র ভার্চুয়ালি উপস্থিত থেকেও তারা মানুষের মতো ফ্যাশন শুট করে। রিল বানায় এবং নানা সংস্থার হয়ে বিজ্ঞাপনী প্রচারের পোস্ট করে।
প্রথম এআই ইনফ্লুয়েন্সারদের আবির্ভাব ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে। সম্প্রতি শক্তিশালী এআই মডেলগুলির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে সমাজমাধ্যম জুড়ে এদের রমরমা। সমাজমাধ্যমে এই ধরনের হাজার হাজার চ্যাটবট বা কৃত্রিম মানব-মানবীর প্রোফাইল ছড়িয়ে পড়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ছবি ও ভিডিয়ো তৈরি হওয়ার কারণে প্রথম ঝলকে এদের আসল মানুষ থেকে আলাদা করা কঠিন। খুঁটিয়ে দেখলে কৃত্রিমতার ফাঁকফোকরগুলি মানুষের চোখে ধরা পড়ে। যেমন ত্বক একটু বেশিই মসৃণ। ছবিগুলো একটু বেশিই পরিমার্জিত।
বিজনেস অফ ফ্যাশন ম্যাগাজ়িনে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কী ভাবে ভার্চুয়াল নেটপ্রভাবীরা নানা লিঙ্ক শেয়ার, সংস্থার বিজ্ঞাপন এবং সাবস্ক্রিপশন মডেলের মাধ্যমে টাকা উপার্জন করছে। যেমন বৃতিকা। ইনস্টাগ্রামে তার ৩০০ জন সাবস্ক্রাইবার রয়েছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বৃতিকার ভিডিয়ো দেখার জন্য সাবস্ক্রাইবারেরা প্রতি মাসে ৩৯৯ টাকা করে খরচ করেন। ফলে তার মোট মাসিক আয় প্রায় ১.২ লক্ষ টাকা। এ ছাড়াও বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে প্রচার এবং অন্যান্য আয়ও রয়েছে। সেগুলি স্বতন্ত্র উপার্জন।
এই ডিজিটাল ব্যক্তিত্বরা এখন দৈনন্দিন জীবনে, নেটমাধ্যমে বিচরণের ক্ষেত্রে অনায়াসে মিশে যাচ্ছেন। এ দেশেও বৃতিকার মতো একাধিক নেটপ্রভাবীর জনপ্রিয়তা বাড়ছে হু হু করে।
এর অন্যতম কারণ, কৃত্রিম নেটপ্রভাবীদের বয়স বাড়ে না। তাদের ভিডিয়োয় কোনও খুঁত খুঁজে পাওয়া যায় না। যে কোনও নান্দনিকতা বা প্রচারের সঙ্গে মানানসই করে তাদের তৈরি করা যায়।
বাস্তব মডেল বা শুটিংয়ের জন্য বিশাল টিম, স্টুডিয়ো বা যাতায়াত খরচের প্রয়োজন হয় না। এআই চরিত্রেরা ক্লান্ত হয় না। নির্মাতারা তাদের ইচ্ছেমতো যে কোনও জায়গায় বা যে কোনও পোশাকে তাদের উপস্থাপন করতে পারেন। রক্ত-মাংসের মানুষের মতো এদের ব্যক্তিগত জীবনের বিতর্ক ব্র্যান্ডের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলে না।
বৃতিকা পটেল একা নয়, বিশ্বে এখন এই ধরনের প্রচুর নেটপ্রভাবী রয়েছে যারা সাধারণ মানুষের চেয়েও বেশি আয় করছে। এআই দিয়ে তৈরি ছবি বা ভিডিয়ো এতটাই নিখুঁত হয় যে অনেক সময় আসল এবং নকলের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সাবস্ক্রিপশন মডেলে এরা অনুসরণকারীদের সঙ্গে এমন ভাবে চ্যাট বা যোগাযোগ করে (যা মূলত এআই চ্যাটবট দ্বারা পরিচালিত) যা ভক্তদের কাছে খুব আকর্ষণীয় বলে মনে হয়। রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়েন, কিন্তু এআই নেটপ্রভাবী ২৪ ঘণ্টাই সক্রিয় থাকতে পারে।
ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের বিশ্লেষকদের মতে, ৩০০ জন সাবস্ক্রাইবার থেকে ১.২ লক্ষ টাকা আয় করা মুখের কথা নয়। এর নেপথ্যে রয়েছে প্রিমিয়াম কন্টেন্ট। সাধারণ ইনস্টাগ্রাম ফিডের বাইরে ‘এক্সক্লুসিভ’ ছবি বা ভিডিয়োর জন্য মানুষ বড় অঙ্কের টাকা খরচ করতেও দ্বিধা করেন না।
স্বল্প পরিমাণ কিন্তু অনুগত সাবস্ক্রাইবার থাকলে সেখান থেকে নিয়মিত আয় নিশ্চিত করা সহজ হয়।
সব ছবি: সংগৃহীত।