একটা পাথর। তার এক পাশে ইরান, অন্য দিকে কাতার। সামান্য এই সীমারেখার তলায় ‘কুবেরের ধন’ লুকোনো আছে বললে অত্যুক্তি হবে না। এ-হেন ঐশ্বর্য আর কিছুই নয়, তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি (লিক্যুইফায়েড ন্যাচরাল গ্যাস)। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আঁচ সেখানে গিয়ে পড়ায় জ্বালানি সঙ্কটের আশঙ্কায় দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়েছে আতঙ্ক। পরিস্থিতির বদল না হলে এ দেশের আমজনতার রান্নাঘরে হাঁড়ি চড়বে না বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের একাংশের।
পারস্য উপসাগরের বুকে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র। গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে এর হদিস পায় ইরান ও কাতার। তবে সেখানকার সম্পদের অধিকার নিয়ে অবশ্য দুই প্রতিবেশীর মধ্যে কোনও বিরোধ দেখা যায়নি। শান্তিপূর্ণ ভাবেই গ্যাসক্ষেত্রটিকে দু’টি ভাগে ভাগ করে নেয় তারা। দোহার অংশটির নাম হয় ‘নর্থ ডোম’। আর উল্টো দিকে নিজেদের গ্যাসক্ষেত্রটিকে ‘সাউথ পার্স’ হিসাবে চিহ্নিত করে তেহরান। সেটা হাতে আসার পরও বদলায়নি সাবেক পারস্যের ভাগ্য।
‘সাউথ পার্স’ পাওয়া সত্ত্বেও ইরানের আর্থিক পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন না হওয়ার নেপথ্যে মূল কাঁটা আমেরিকা। ১৯৯৫ সালে তেহরানের উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে তখন ছিলেন বিল ক্লিন্টন। ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর ২০১৮ সালে সেটা আরও কঠোর করেন তাঁর উত্তরসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে ওই এলাকায় গ্যাস উত্তোলনের পরিকাঠামো তৈরি করতেই সাবেক পারস্যের লেগে যায় কয়েক বছর।
অন্য দিকে এই সময়সীমায় চুপ করে বসে থাকেনি কাতার। নর্থ ডোম থেকে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনে বিপুল বিনিয়োগ করে দোহা। ফলে অচিরেই খনি সংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠে তাদের শোধনাগার। পরবর্তী ২০ বছরে পারস্য উপসাগরের তলদেশ থেকে এলএনজি বার করে চড়া দামে খোলা বাজারে বিক্রি করেছে এই উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র। শুধু তা-ই নয়, উত্তোলনের সময় মাঝেমধ্যেই সাউথ পার্সের দিকে হাত পড়েছে তাদের। সব জেনেও চুপ থেকেছে ইরান।
২১ শতক আসতে আসতে নর্থ ডোমের গা ঘেঁষে বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি পরিশোধনাগার এবং ভান্ডার গড়ে তোলে কাতার। বর্তমানে দিনে প্রায় ১,৮৫০ কোটি কিউবিক ফুট তরল প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করে থাকে দোহা। সেখানে সাউথ পার্স থেকে দিনে মাত্র ২০০ কোটি কিউবিক ফুট এলএনজি তুলছে তেহরান। তা ছাড়া নিষেধাজ্ঞার কারণে দ্বিতীয় সমস্যা হিসাবে ওই জ্বালানি বিশ্ববাজারে সে ভাবে বিক্রি করতে পারছে না ইরান। তাঁদের প্রাকৃতিক গ্যাসের একমাত্র ক্রেতা হল চিন।
কিন্তু, চলতি বছরের ১৮ মার্চ ইজ়রায়েলি বায়ুসেনা সাউথ পার্সে হামলা করতেই বদলে যায় যাবতীয় হিসাব। পাল্টা প্রত্যাঘাতে নেমে কাতারের রাস লাফান শোধনাগারে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। আক্রমণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই ইস্যুতে বিবৃতি দেয় দোহা। সেখানে বলা হয়, তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের অন্তত তিনটি পরিকাঠামোয় আগুন লেগে গিয়েছে। যদিও হতাহতের কোনও খবর নেই।
ইরানি হামলার পর রাস লাফানের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও তড়িঘড়ি সেখানে গ্যাস উত্তোলন বন্ধ করে কাতার। এর জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে এলএনজির দাম। এই ঘটনায় লড়াইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে পৌঁছে প্রবল চাপের মুখে পড়ে আমেরিকা ও ইজ়রায়েল। ফলে কিছুটা বাধ্য হয়েই ঢোক গিলেছেন ট্রাম্প। পরিস্থিতি সামলাতে আপাতত তেহরানের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জেরে এলএনজি বিক্রির মেগা সুযোগ তেহরানের সামনে চলে এসেছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
৯,৭০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত নর্থ ডোম এবং সাউথ পার্সের আর্থিক গুরুত্ব অপরিসীম। সম্পূর্ণ গ্যাসক্ষেত্রটির এক তৃতীয়াংশ রয়েছে ইরানের দখলে। সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, সংঘাত পরিস্থিতিতে কাতারে আঘাত হেনে নিজেদের এলএনজি উৎপাদন বাড়াতে পারে তেহরান। তখন চড়া দামে এই জ্বালানি বিশ্ববাজারে বিক্রি করতে তেমন সমস্যা হবে না তাদের।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, দোহা থেকে ৮০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত রাস লাফান শোধনাগারটি দুনিয়ার ২০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ করে থাকে। পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এত দিন এশিয়া এবং ইউরোপের বাজারের জ্বালানির চাহিদার ভারসাম্য রক্ষা করছিল কাতারের ওই প্রতিষ্ঠান। কিন্তু, ইরানি হামলায় এ বার সেটা ব্যাহত হতে চলেছে। ইতিমধ্যেই এই ঘটনার প্রভাব বিশ্বের একাধিক দেশের শেয়ারবাজারের উপর পড়েছে।
সাউথ পার্স এবং রাস লাফানে হামলার পরের দিনই ইউরোপের প্রধান গ্যাস বাণিজ্য কেন্দ্র নেদারল্যান্ডসের টাইটেল ট্রান্সফার ফেসিলিটিতে এলএনজির দাম ১৫.৩৩ ডলার থেকে বেড়ে এক লাফে ৭৮.০৬ ডলারে পৌঁছে যায়। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো পশ্চিম এশিয়ার আরব মুলুকগুলির জ্বালানি পরিবহণের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে রেখেছে আইআরজিসি। ফলে তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের দর ১০০ ডলার ছাড়াতে পারে বলেও ওয়াকিবহাল মহল সূত্রে মিলেছে ইঙ্গিত।
দুনিয়া জুড়ে এ-হেন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে ইরান যে সে ভাবে গুরুত্ব দিয়েছে, এমনটা নয়। বরং তেল এবং গ্যাস সঙ্কটকে নিজেদের রণকৌশলের অংশ হিসাবে ব্যবহার করছেন আইআরজিসির কমান্ডারেরা। রাস লাফান-কাণ্ডের পর তাই আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলকে হুঁশিয়ারি দিয়ে তেহরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ান সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্স হ্যান্ডলে (আগে নাম ছিল টুইটার) লিখেছেন, ‘‘আমাদের জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা হলে পরিস্থিতি হাতে বাইরে চলে যাবে।’’
এই প্রসঙ্গে আইআরজিসির এক কমান্ডার বলেছেন, “আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাঁটিতে হামলার পুনরাবৃত্তি ঘটলে আমেরিকা-ইজ়রায়েল এবং তাদের বন্ধুদের জ্বালানিঘাঁটিগুলি ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত আমরা থামব না।’’ অন্য দিকে পেজ়েশকিয়ানের হুমকি হল, ‘‘এই ধরনের আগ্রাসী মনোভাব ইহুদি-মার্কিন এবং তাঁদের সমর্থকদের কোনও লাভ এনে দেবে না। বরং তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে এবং এমন অনিয়ন্ত্রিত পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে, যার প্রভাব সমগ্র বিশ্বকে গ্রাস করবে।”
সাউথ পার্সে হামলার পর বিশ্বের জ্বালানি বাজারে উথালপাথাল শুরু হলে বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, ‘‘এই হামলার বিষয়ে বিন্দুবিসর্গ জানত না আমেরিকা। ওয়াশিংটনকে পুরোপুরি অন্ধকারে রেখে তেহরানের তরল প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রকে নিশানা করে ইজ়রায়েল।’’ তাতে সার্বিক গ্যাসঘাঁটির একটি ছোট অংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
গত ১৯ মার্চ সাউথ পার্স নিয়ে নিজের সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি তাৎপর্যপূর্ণ পোস্ট করেন ট্রাম্প। সেখানে এই ধরনের হামলা আর হবে না বলে ইরানকে আশ্বাস দিয়েছেন ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস)। তবে তেহরান যদি ফের কাতারকে নিশানা করে, সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। তখন পুরো সাউথ পার্স ঘাঁটি আমেরিকা ধ্বংস করে দেবে বলে হুমকির সুরে ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষীয়ান প্রেসিডেন্ট।
বিশ্লেষকদের দাবি, ইরান যুদ্ধে গ্যাসক্ষেত্রে হামলার সর্বাধিক প্রভাব পড়বে ইউরোপে। কারণ, এত দিন রাশিয়ার থেকে এলএনজি কিনছিল তারা। কিন্তু, ২০২২ সালে ইউক্রেনের লড়াই শুরু হওয়ায় মস্কোর উপর চাপে ১৬ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞা। ফলে ক্রেমলিনের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস কেনা বাধ্য হয়ে কমাতে হয় তাদের। তার পরেও নর্থ স্ট্রিম পাইপলাইন দিয়ে কিছু এলএনজি পাচ্ছিল পশ্চিম ইউরোপের একাধিক দেশ। কিন্তু বাল্টিক সাগরের নীচের ওই পাইপলাইন ইতিমধ্যেই ধ্বংস করেছে কিভ।
সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে কাতারি গণমাধ্যম আল জ়াজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আমেরিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ব্যবসা বিভাগের অধ্যাপক বাবাক হাফেজ়ি বলেছেন, ‘‘পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলি এখন উভয় সঙ্কট। রাশিয়ার থেকে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস কিনতে হলে নিষেধাজ্ঞা নাকচ করা ছাড়া উপায় নেই। তা ছাড়া নিজেদের টাকাতেই হয়তো নর্থ স্ট্রিম পাইপলাইন সারাতে হবে তাদের। একমাত্র ভরসার জায়গা ছিল দোহা। কিন্তু, ইরানি হামলার পর সরবরাহ বন্ধ রেখেছে দোহা।’’
সাউথ পার্স-কাণ্ডের পর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলেও বিশ্বের জ্বালানি বাজার চাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করেন বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের দাবি, কাতারের মতো এলএনজি রফতানির দুর্দান্ত পরিকাঠামো নেই তেহরানের। বরং ঘরোয়া চাহিদার ৮০ শতাংশ সাউথ পার্সের মাধ্যমে পূরণ করে থাকে সাবেক পারস্যের প্রশাসন। চিনকে বাদ দিলে তাদের এলএনজির দ্বিতীয় বড় ক্রেতা হল ইরাক। বাগদাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশই ওই জ্বালানির উপর নির্ভরশীল।
সামরিক বিশ্লেষকদের বড় অংশই মনে করেন, এ বছরের এপ্রিলে ইরানে স্থল অভিযানের নির্দেশ দেবেন ট্রাম্প। সেই লক্ষ্যে পশ্চিম এশিয়ার বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি করছে ওয়াশিংটন। ফলে আগামী দিনে খনিজ তেলের পাশাপাশি তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্কট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। আর তাই মরিয়া হয়ে বিকল্প উৎসের অনুসন্ধান চালাচ্ছে নয়াদিল্লি।
ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।