এক দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পিট হেগসেথ। অন্য দিকে যুদ্ধ দফতরের (ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার) সদর কার্যালয় পেন্টাগনের একগুচ্ছ আধিকারিক। ইরান যুদ্ধের আবহে ঘরোয়া ‘গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে’ জেরবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র! উদ্ভূত পরিস্থিতির সঙ্গে ‘ঠান্ডা লড়াই’য়ের সময়ের তুলনা টেনে ইতিমধ্যেই একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আমেরিকার বেশ কিছু গণমাধ্যম। তার মধ্যেই আবার দু’পক্ষের ‘দড়ি টানাটানি’তে বার বার ছাঁটাই হচ্ছেন ফৌজের পদস্থ কর্তারা। এর জেরে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘর্ষরত বাহিনীর মনোবল গুঁড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ল বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
চলতি বছরের ২২ এপ্রিল, বুধবার নৌসেনা সচিব জন ফেলানকে বরখাস্ত করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল। সেখানে তিনি লিখেছেন, জনকে অবিলম্বে পদ থেকে সরে যেতে বলা হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক ভাবে তাঁর অপসারণের কারণ ব্যাখ্যা করেনি আমেরিকা। ওয়াশিংটনের গণমাধ্যমগুলির অবশ্য দাবি, প্রেসিডেন্টের আবাসন তথা কার্যালয় হোয়াইট হাউস এবং যুদ্ধ সদর দফতর পেন্টাগনের মতপার্থক্যের বলি হয়েছেন ফেলান।
মার্কিন সেনার ‘হাঁড়ির খবর’ ফাঁস করার ব্যাপারে সেখানকার ‘পলিটিকো’ নামের সংবাদমাধ্যমটির বেশ নামডাক রয়েছে। তাঁদের দাবি, পিট সচিব হওয়ার পর থেকেই পেন্টাগনের অন্দরে বেধে যায় ক্ষমতার লড়াই। কুর্সিতে বসা ইস্তক ফেলানকে পছন্দ করতেন না ট্রাম্পের ‘স্নেহধন্য’ হেগসেথ। তাঁর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সংস্কার এবং আধুনিকীকরণের কাজ যথেষ্ট ঢিমেতালে করছেন জন। যদিও এ ব্যাপারে দু’জনের মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য রয়েছে বলেও খবর পাওয়া গিয়েছে।
‘পলিটিকো’ জানিয়েছে, গত এক বছরে অত্যন্ত ব্যয়বহুল রণতরী নির্মাণে যথেষ্ট ‘গা-ছাড়া’ মনোভাব দেখান জন। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে ডেপুটি স্টিফেন ফাইনবার্গকে সঙ্গে নিয়ে ধীরেসুস্থে এগোচ্ছিলেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, নৌবাহিনীর শক্তিবৃদ্ধিতে বিকল্প একটি পরিকল্পনার নীলনকশাও ট্রাম্পের সামনে তুলে ধরেন ফেলান। সেখানে সমুদ্র আক্রমণকারী ড্রোনের গণউৎপাদনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু, তাতে খুশি হওয়া তো দূর অস্ত, নৌসচিবের উপর যথেষ্ট বিরক্ত এবং ক্ষুব্ধ হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
জনের উপর ট্রাম্পের ‘মেজাজ বিগড়োনো’ একেবারে অমূলক নয়। সদ্য ভোটে জিতে গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) ডিসেম্বরে ফ্লরিডায় ‘মার-এ-লাগো’ রিসর্টে যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সেখানে ‘সোনালি নৌবহর’ তৈরির ঘোষণা করেন তিনি। ঠিক হয়, ‘গোল্ডেন ফ্লিট’-এর রণতরীগুলি পরিচিতি পাবে ট্রাম্প শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ হিসাবে। ওই সময় তাঁর সঙ্গেই ছিলেন যুদ্ধসচিব হেগসেথ এবং বিদেশমন্ত্রী মার্কো রুবিয়ো। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতিও দেন ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস)।
ট্রাম্পের কথায়, ‘‘সোনালি নৌবহরে থাকবে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগামী রণতরী। দৈত্যের মতো আকার নিয়ে সমুদ্রে দাপিয়ে বেড়াবে তারা। শুধু তা-ই নয়, এখনও পর্যন্ত তৈরি হওয়া যে কোনও যুদ্ধজাহাজের চেয়ে ১০০ গুণ বেশি শক্তিশালী হবে ওই সমস্ত রণতরী।’’ শপথ নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের জন্য ১,৭০০ কোটি ডলার বরাদ্দ করেন তিনি। কিন্তু, গোটা বিষয়টিতে বাদ সাধেন নৌসচিব জন। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাহিনীর প্রয়োজনমাফিক যুদ্ধাস্ত্র কেনায় জোর দেন তিনি। এই নিয়ে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বাড়তে থাকে তাঁর দূরত্ব।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে নানা ইস্যুতে পিট হেগসেথের সঙ্গে তুঙ্গে ওঠে জন ফেলানের বিবাদ। সূত্রের খবর, যুদ্ধসচিবকে এড়িয়ে প্রায়ই ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবে দেখা করতেন তিনি। নৌবাহিনীর সমস্যার কথা সরাসরি প্রেসিডেন্টের কাছে তুলে ধরার প্রবণতা ছিল তাঁর। ‘পোটাস’ কিন্তু ব্যাপারটাকে একেবারেই ভাল চোখে দেখেননি। উল্টে একে ‘ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া’র শামিল বলেই মনে হতে থাকে তাঁর। ফলে সব দিক থেকে জনের উপর চাপ বাড়ছিল বললে অত্যুক্তি হবে না।
বিশেষজ্ঞদের কথায়, এ বছরের এপ্রিল আসতে আসতে দু’পক্ষের মধ্যে ফাটল অনেকটাই চওড়া হয়ে যায়। ‘সোনালি নৌবহর’ প্রকল্পের মূল নীলনকশা হোয়াইট হাউসে সকলের সামনে তুলে ধরতে অস্বীকার করেন জন। পাশাপাশি, একে ‘দেখনদারি’ শক্তি প্রদর্শন বলতেও দ্বিধা করেননি তিনি। এর জেরে নৌসচিবের পদ থেকে তাঁকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করেন হেগসেথ। ২১ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনার চূড়ান্ত নথি ট্রাম্পের টেবিলে পাঠানোর কথা ছিল ফেলানের। ঠিক তার পর দিনই পেন্টাগন ছাড়েন তিনি।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, নৌসচিবের আগে আমেরিকার আর্মি চিফ অফ স্টাফ জেনারেল র্যান্ডি জর্জকে ছাঁটাই করেন ট্রাম্প। গত ২ এপ্রিল তাঁকে পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বলেন হেগসেথ। সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিনই সন্ধ্যার মধ্যে একটি বিবৃতি দেয় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দফতরের সদর কার্যালয় পেন্টাগন। সেখানে বরখাস্তের কথা বলা হয়নি। পেন্টাগনের বিবৃতি অনুযায়ী, ‘‘আমেরিকার ৪১তম সেনা সর্বাধিনায়ক (আর্মি চিফ অফ স্টাফ) হিসাবে অবসরগ্রহণ করেছেন জেনারেল র্যান্ডি জর্জ।’’
চার তারাযুক্ত (ফোর স্টার) জেনারেল জর্জের আর্মি চিফ অফ স্টাফ হিসাবে কার্যকালের মেয়াদ আরও দেড় বছর বাকি ছিল। তার আগেই কেন তাঁকে সরানো হল, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব এখনও দেয়নি পেন্টাগন। তবে হোয়াইট হাউসের আনাচকানাচ থেকে উঠে আসছে নানা তত্ত্ব। এর মধ্যে সবচেয়ে জোরালোটি হল, ট্রাম্পের নীতির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে চলতে না পারা, যার জেরে যুদ্ধসচিব পিট হেগসেথের রোষেও পড়েন তিনি।
এ বছরের জানুয়ারির শুরুতেই ভেনেজ়ুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে বড় সাফল্য পায় মার্কিন ফৌজ। দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে ঢুকে সস্ত্রীক সেখানকার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্রের ডেল্টা ফোর্স। এর জেরে রাতারাতি কারাকাসের যাবতীয় খনিজ তেলের নিয়ন্ত্রণ হাতে পেয়ে যান ট্রাম্প। পাশাপাশি, আরও এক বার ‘সুপার পাওয়ার’ হিসাবে সারা বিশ্বে প্রতিষ্ঠা হয় ওয়াশিংটনের শক্তি।
সাবেক সেনাকর্তাদের বড় অংশই মনে করেন, ইরানেও ভেনেজ়ুয়েলার মতো সাফল্য পেতে চাইছেন ট্রাম্প। তেহরানের প্রত্যাঘাতের জেরে বাস্তবে তা অসম্ভব। জেনারেল জর্জ হয়তো সেটাই ‘একগুঁয়ে’ প্রেসিডেন্টকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, যার জেরে চাকরি হারাতে হল তাঁকে। বাইডেন জমানায় আর্মি চিফ অফ স্টাফ হিসাবে নিয়োগপত্র পান জর্জ। তাঁর অপসারণের প্রভাব বাহিনীর নিচুতলায় পড়লে পশ্চিম এশিয়ায় লড়াইয়ের মধ্যে পরিস্থিতি যে জটিল হবে, তা বলাই বাহুল্য।
পেন্টাগনের দুই আধিকারিককে উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, জর্জের পাশাপাশি এপ্রিলে সেনা প্রশিক্ষক বিভাগের (আর্মি ট্রান্সফরমেশন অ্যান্ড ট্রেনিং কমান্ড) অফিসার জেনারেল ডেভিড হোডনে এবং চ্যাপলেন কোরের প্রধান মেজর জেনারেল উইলিয়াম গ্রিনকেও বরখাস্ত করেন হেগসেথ। সূত্রের খবর, ট্রাম্পের কঠোর জাতীয় নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজতে চাইছেন তিনি। এর জেরে তাঁর কলমের খোঁচায় চাকরি যাচ্ছে একের পর এক শীর্ষ সেনা অফিসারের।
এ বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি একসঙ্গে পাঁচ জন ফৌজি আধিকারিককে বরখাস্ত করেন হেগসেথ। তাঁরা হলেন, জয়েন্ট চিফ্স অফ স্টাফ, এয়ারফোর্স জেনারেল সি কিউ ব্রাউন, চিফ অফ নেভাল অপারেশন্স, অ্যাডমিরাল লিসা ফ্রাঞ্চেত্তি, জ্যাগ (জাজ অ্যাডভোকেট জেনারেল) আর্মি, লেফটেন্যান্ট জেনারেল তৃতীয় জোসেফ বার্জার, জ্যাগ এয়ারফোর্স, লেফটেন্যান্ট জেনারেল চার্লস এল প্লামার এবং জ্যাগ নেভি রেয়ার অ্যাডমিরাল লিয়া এম রেনল্ড্স। এঁদের অধিকাংশই ফোর স্টার জেনারেল বলে জানা গিয়েছে।
এই পাঁচ জনের বরখাস্ত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার ছ’দিনের মাথায় (পড়ুন ২৮ ফেব্রুয়ারি) ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে মার্কিন সেনা। তার সাঙ্কেতিক নাম ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। আক্রমণের নীলনকশা তৈরিতে জয়েন্ট চিফ্স অফ স্টাফ, এয়ারফোর্স জেনারেল ব্রাউন এবং চিফ অফ নেভাল অপারেশন্স, অ্যাডমিরাল ফ্রাঞ্চেত্তির কোনও ভূমিকা ছিল কি না, তা অবশ্য জানা যায়নি। তবে হামলার ব্যাপারে আপত্তি তোলায় তাঁদের চাকরি গিয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ মনে করেন, এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফৌজের ভিতরে বিদ্রোহের জন্ম দিচ্ছেন ট্রাম্প ও হেগসেথ। তা ছাড়া যুদ্ধসচিবের ‘বিকৃত’ মানসিকতা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে উঠেছে সমালোচনার ঝড়। কিছু দিন আগে পিট ঘোষণা করেন, মার্কিন বাহিনীকে আরও ক্রুর এবং নৃশংস করে তুলতে চান তিনি। সংঘর্ষ চলাকালীন নিরীহ নাগরিকদের গণহত্যা তাঁর কাছে একেবারেই অপরাধ নয়। হেগসেথের এ-হেন বক্তব্যের পর তুঙ্গে ওঠে বিতর্ক।
এ বছরের মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে লোহিত সাগরে আচমকাই অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয় পরমাণু শক্তিচালিত বিমানবাহী মার্কিন রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড। সঙ্গে সঙ্গে গ্রিসের সেনাঘাঁটিতে ওই যুদ্ধজাহাজকে সরিয়ে নেয় পেন্টাগন। একটি বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড ‘সেন্টকম’ জানায়, রণতরীটির লন্ড্রি রুম থেকে ছড়িয়েছে আগুন, যা নিছকই দুর্ঘটনা। কিন্তু কয়েক দিন যেতেই প্রকাশ্যে আসে অন্তর্ঘাতের তত্ত্ব।
মার্কিন নৌসচিব জন ফেলানের বরখাস্তের সঙ্গে ফোর্ডকাণ্ডের কোনও যোগ আছে কি না তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। তবে এই ঘটনার প্রভাব বাহিনীর নিচুতলায় পড়লে ইরান রণাঙ্গনে ফের এক বার বড় রকমের বেকায়দায় পড়বে ট্রাম্প প্রশাসন। কারণ, বর্তমানে তেহরানের উপর চাপ বাড়াতে হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ রেখেছে ওয়াশিংটন, যার জন্য সেখানে একাধিক রণতরী মোতায়েন করতে হয়েছে পেন্টাগনকে।
ছবি: রয়টার্স, সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।