সস্ত্রীক ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ‘অপহরণ’! রাজধানী কারাকাসের প্রাসাদ থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ডেল্টা ফোর্স। লাটিন (দক্ষিণ) আমেরিকার খনিজ তেলসমৃদ্ধ দেশটিতে এ-হেন মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মৌখিক ভাবে সরব হয়েছে রাশিয়া ও গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের (পিপল্স রিপাবলিক অফ চায়না) মতো ‘মহাশক্তি’। যদিও ওয়াশিংটনকে চাপে ফেলার মতো কোনও পদক্ষেপ করেনি বেজিং বা মস্কো। কেন এই দ্বিচারিতা? এর নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ, বলছেন বিশ্লেষকেরা।
গত শতাব্দীর ‘ঠান্ডা লড়াই’-এর সময় দুনিয়ার চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) — মোটামুটি ভাবে এই দুই জোটে বিভক্ত ছিল পৃথিবী। ফলে কোনও দেশ এক পক্ষের আগ্রাসনের শিকার হলেই অপর পক্ষ ছুটে আসত তাকে সাহায্য করতে। উহাহরণ হিসাবে কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সঙ্কট বা ভিয়েতনাম ও কোরীয় যুদ্ধের কথা বলা যেতে পারে। সোভিয়েত পতনে সেই অবস্থার আমূল বদল ঘটায় ওয়াশিংটনের যে সুবিধা হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়ার পক্ষে কোনও ভাবেই ভেনেজ়ুয়েলার পাশে দাঁড়ানো সম্ভব ছিল না। কারণ, গত পৌনে চার বছরের বেশি সময় ধরে পশ্চিম সীমান্তে ইউক্রেনের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে মস্কো। তাতে জলের মতো টাকা খরচ হচ্ছে ক্রেমলিনের। পাশাপাশি, এই লড়াইয়ে বিপুল পরিমাণে হাতিয়ার এবং সৈনিকও হারিয়েছে তারা। সহ্য করতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমি দুনিয়ার চাপিয়ে দেওয়া ১৬ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞা।
এই পরিস্থিতিতে ভেনেজ়ুয়েলার পাশে দাঁড়িয়ে আমেরিকার মতো ‘সুপার পাওয়ার’-এর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলার মতো ঝুঁকি কখনওই নিতেন না রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বরং মাদুরো ‘অপহরণ’ তাঁর সামনে অন্য রাস্তা খুলে দিয়েছে। আগামী দিনে ওয়াশিংটনের কায়দাতেই ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কিকে তুলে আনার ছক কষতে পারে তাঁর বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে তখন কূটনৈতিক কায়দায় তা আটকানো সম্ভব হবে না, বলছেন বিশ্লেষকেরা।
দ্বিতীয়ত, মাদুরো কখনওই মস্কোর জন্য দুর্দান্ত বিকল্প ছিলেন এমনটা নয়। মার্কিন আগ্রাসনের আগে রাশিয়ার প্রতি সে ভাবে আনুগত্য দেখায়নি কারাকাস। বরং চিনের সঙ্গে কিছুটা খোলামেলা মেলামেশা করতেন ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট। যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডো বাহিনীর হাতে ‘বন্দি’ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেও বেজিঙের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। হাতিয়ার, তেল থেকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, সব কিছুতেই ড্রাগনের সঙ্গে লেনদেন বৃদ্ধির ব্যাপারে আগ্রহ দেখা যাচ্ছিল তাঁর।
রাশিয়ার মতোই চিনের ক্ষেত্রে আবার অন্য যুক্তি রয়েছে। অতীতেও এই ধরনের পরিস্থিতিতে আবেগের উপর ভর করে বেজিংকে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যায়নি। ‘ঠান্ডা লড়াই’-এর সময় থেকেই সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে অনীহা আছে ড্রাগনের। বর্তমানে তাদের মূল লক্ষ্যবস্তু হল সাবেক ফরমোজ়া দ্বীপ বা তাইওয়ান (রিপাবলিক অফ চায়না)। ওয়াশিংটনকে বাধা না দিয়ে কি সেই রাস্তাই পরিষ্কার করতে চাইছেন মান্দারিন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং? উঠছে প্রশ্ন।
দীর্ঘ দিন ধরেই তাইওয়ানকে তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে আসছে চিন। মাঝেমধ্যেই প্রশান্ত মহাসাগরের ওই দ্বীপরাষ্ট্রটিকে চক্রব্যূহে ঘিরে ধরে সামরিক মহড়া চালিয়ে থাকে বেজিং ‘পিপল্স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ-র নৌ ও বিমানবাহিনী। তবে সাবেক ফরমোজ়া দ্বীপটিকে কব্জা করতে গেলে যুক্তরাষ্ট্র যে চুপ করে বসে থাকবে না তা ভালই জানেন প্রেসিডেন্ট শি। আর তাই ভেনেজ়ুয়েলা ইস্যুতে কোনও পদক্ষেপ না করে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাইছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, চিন চায় আগামী দিনে তারা তাইওয়ান আক্রমণ করলে একই রকমের পদক্ষেপ করুক যুক্তরাষ্ট্র। ভেনেজ়ুয়েলার ব্যাপারে ‘নিশ্চুপ’ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের থেকে সেই প্রতিশ্রুতি আদায়ের চেষ্টা করতে পারে বেজিং। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের সময় ফরমোজ়া ইস্যুকে দ্বিপাক্ষিক বিষয় বলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কূটনৈতিক ভাবে ওয়াশিংটনকে দূরে সরিয়ে রাখার চালও দিতে পারে তারা।
মুখে অবশ্য ভেনেজ়ুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসন নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছে বেজিং ও মস্কো। শুধু তা-ই নয়, মাদুরো ‘অপহরণ’ নিয়ে নজিরবিহীন ভাবে তিনবার প্রতিক্রিয়া দিয়েছে চিন। গত ৪ ডিসেম্বর ড্রাগনের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়ে দেয়, জোর করে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রীকে দেশ থেকে বার করে নিয়ে গিয়ে আন্তর্জাতিক আইন ভেঙেছে আমেরিকা। এটা রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদের উদ্দেশ্য এবং নীতির সঙ্গে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পরে এই ইস্যুতে চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, ‘‘ বর্তমানে বিশ্ব যে ধরনের পরিবর্তন এবং অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, তা এক শতাব্দীতেও দেখা যায়নি। একতরফা আধিপত্যবাদ আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কোনও দেশের জনগণ যে উন্নয়নের পথ বেছে নিয়েছেন, সকল রাষ্ট্রের উচিত তাকে সম্মান করা। আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদ মেনে চলা উচিত সকলের। বিশেষত বৃহৎ শক্তিগুলির উচিত এ ক্ষেত্রে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া।’’
অন্য দিকে, ভেনেজ়ুয়েলার মাদুরো-হরণে আর্থিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে কী লাভ হবে, সেই হিসাব কষা শুরু করে দিয়েছে ভারত। খনিজ তেলে সমৃদ্ধ কারাকাসে বড় বিনিয়োগ ছিল এ দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ওএনজিসি বিদেশ লিমিটেডের (ওভিএল)। বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক দিক থেকে নয়াদিল্লির সুবিধা হতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
সংবাদসংস্থা পিটিআই-এর প্রতিবেদন অনুসারে, পূর্ব ভেনেজ়ুয়েলার একটি তেল উত্তোলন কেন্দ্রে অন্য সংস্থার সঙ্গে যৌথ ভাবে কাজ করছিল ওভিএল। কিন্তু আমেরিকা ভেনেজ়ুয়েলার জ্বালানি রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় তেল উত্তোলনের কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
একটা সময় পর্যন্ত প্রতি দিন প্রায় চার লক্ষ ব্যারেল খনিজ তেল ভেনেজ়ুয়েলা থেকে আমদানি করত ভারত। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর ২০২০ সালে তেল আমদানি অনেকটাই কমিয়ে দেয় নয়াদিল্লি। সেই সময় তেল উত্তোলন কেন্দ্রের অন্যতম অংশীদার হিসাবে ওভিএলের পাওনা ছিল প্রায় ৪,৮২৫ কোটি টাকা। যদিও ধুঁকতে থাকা কারাকাসের থেকে সেই টাকা উদ্ধার করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা ফেরত পেতে পারে ওভিএল।
মাদুরো-অপহরণের পর ট্রাম্প জানিয়েছেন, এ বার ভেনেজ়ুয়েলার তেল উত্তোলন এবং বিক্রির বিষয়টি তাঁরাই দেখবেন। এই পরিস্থিতিতে কারাকাসের তেল উত্তোলনকেন্দ্রগুলির পরিকাঠামো উন্নত করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে পূর্ব ভেনেজ়ুয়েলার ওই তেল উত্তোলনকেন্দ্রটির পরিকাঠামো আরও উন্নত করে উত্তোলনের পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ থাকছে ওভিএল-এর সামনে। সেই তেল অন্য দেশে বিক্রি করে মোটা মুনাফাও করতে পারে তারা।
ভেনেজ়ুয়েলার পরিস্থিতি নিয়ে যখন লাভ-লোকসানের হিসাব চলছে, সেই সময় ভারতের এক বিশেষজ্ঞ সংস্থা (থিঙ্ক ট্যাঙ্ক) জানিয়েছে, দক্ষিণ আমেরিকার ওই দেশে সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে নয়াদিল্লির উপর কোনও বাণিজ্যিক প্রভাব পড়বে না। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর কারাকাসের থেকে তেল আমদানি ৮১.৩ শতাংশ কমিয়ে দেয় কেন্দ্র। নতুন করে এই পরিমাণ আর কমবে না বলেই মত ওই থিঙ্ক ট্যাঙ্কের।
ট্রাম্প প্রশাসন সূত্রে খবর, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি সস্ত্রীক মাদুরোকে আদালতে পেশ করতে পারে আমেরিকা। ফেডারেল ম্যানহাটন আদালতে তাঁদের হাজির করানোর কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনেই বিচার হবে তাঁদের। তবে সেখানে ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
মাদুরো অপহরণের পর ভেনেজ়ুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হন ডেলসি রড্রিগেজ়। কুর্সিতে বসেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছাড়ছিলেন তিনি। তার পরই ‘কথা না শুনলে চরম মূল্য দিতে হবে’ বলে পাল্টা হুঁশিয়ারি দেন ট্রাম্প। এই হুমকির পর খানিকটা সুর নরম করেছেন ডেলসি, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ডেলসি জানিয়েছেন, আমেরিকা এবং ভেনেজ়ুয়েলার সম্পর্কে ভারসাম্য এবং শ্রদ্ধা দেখতে চান তিনি। সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট লিখেছেন, ‘‘ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ এবং শ্রদ্ধাশীল সম্পর্ক স্থাপন আমাদের অগ্রাধিকার। পারস্পরিক সহযোগিতা ও উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার জন্য আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছি।’’
সব ছবি: সংগৃহীত।