ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৩
Bengali Literature

দেখা হবে

আজ বোধহয় সকালে উঠেই নন্দা স্নান সেরে নিয়েছে। এখনও চুল সামান্য ভিজে রয়েছে। খুব কালো দেখাচ্ছে তার ঘন কোঁকড়া চুলগুলো।

বিপুল দাস
শেষ আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২৬ ০৮:১৮
ছবি: কুনাল বর্মণ।

ছবি: কুনাল বর্মণ।

পূর্বানুবৃত্তি: নন্দার কথা থেকে মন্টু জানতে পেরেছিল, নন্দার বহু অশান্তি, রাগারাগি সত্ত্বেও মাছ ধরার নেশা ছাড়তে পারেনি শিবু। কোনও কোনও দিন নেশা করে টলতে টলতেও ফিরেছে। বাড়িতে দোলপূর্ণিমার উৎসবের দিনও অতিথি-অভ্যাগতরা বাড়ি এসে শিবুকে দেখতে না পেয়ে প্রশ্ন করেছে নন্দাকেই। বানিয়ে বানিয়ে উত্তর দিতে গিয়ে ভিতরে ভিতরে ক্ষুব্ধ, উত্তেজিত হয়ে উঠেছে নন্দা। শিবুকাকার সঙ্গে মাছ ধরতে বসে এই কথাগুলোই মনে পড়ছিল মন্টুর। হঠাৎ সাপ দেখে সে সাবধান করে শিবুকে। শিবু তাড়িয়ে দেয় সাপটাকে। নন্দার জন্মদিনের কথা শিবুকে মনে করায় মন্টু। নন্দার প্রতি শিবুর এই অবহেলায় যে নন্দা এক দিন তাকে ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারে, এই আশঙ্কাও প্রকাশ করে মন্টু। তাতে অবশ্য শিবুর কোনও হেলদোল হয় না।

সব মনে আছে মন্টুর। সে কত দিন আঙুলের কসরত শিখতে চেয়েছে, হাঁকিয়ে দিয়েছে শিবু। এক দিন দেখিয়েছিল, এক জন বুড়োমানুষ লাঠি হাতে হাঁটছে। খরগোশের কান নড়ছে, কুকুর ডাকছে, হরিণ শিং নাড়িয়ে নাচছে, প্রজাপতি ডানা মেলে উড়ছে। শিবু বলেছিল, এটাকে বলে শ্যাডো আর্ট। ছায়াবাজি দেখিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে রেখেছিল শিবু। এখন নিজের বৌকে মাছের ছায়া দেখিয়ে জপিয়ে রেখেছে।

বাড়িতে ফিরে আসছে মন্টু। এখন রোদ খুব চড়া, বেলা একটু পড়লেই রোদ নরম হয়ে আসে। নভেম্বরের প্রথম থেকেই ভোরে আর সন্ধ্যায় পুকুরের জল থেকে ধোঁয়া ওঠা শুরু হবে। পুরো কার্তিক মাস জুড়ে এই বাড়িতে আকাশপ্রদীপ জ্বলে। পূর্বপুরুষেরা নাকি এই আলোর নিশানা দেখে ঘরে ফেরে। জেঠিমার তো পুজো-আচ্চা, বাই-বাতিকের শেষ নেই। চান্স পেলেই হল। সে সৌভাগ্যচতুর্দশী হোক, আর উত্থান-একাদশী হোক— ঘটাপটার শেষ নেই। সে-সব কলামুলো আর সন্দেশ এখনও তার পেটে গজগজ করছে।

“তোর কাকা এল না?”

মন্টুকে একা ফিরতে দেখে নন্দা জিজ্ঞেস করল।

আজ বোধহয় সকালে উঠেই নন্দা স্নান সেরে নিয়েছে। এখনও চুল সামান্য ভিজে রয়েছে। খুব কালো দেখাচ্ছে তার ঘন কোঁকড়া চুলগুলো। সাদা বেসের ওপর নীল রঙের লম্বা স্ট্রাইপ দেওয়া শাড়ি পরেছে নন্দা। আরও লম্বা দেখাচ্ছে তাকে। কপালে খুব ছোট একটা কালো টিপ পরেছে। নন্দার দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিল মন্টু। সাদা ব্লাউজ়ের নীচে কালো ব্রা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। বিষ-ভর্তি থলি নিয়ে যেন উদ্ধত এক জোড়া ফণা। তীব্র সেই দৃশ্যের দিকে তাকাতে পারল না মন্টু।

অন্য দিকে চোখ রেখে মন্টু বলল, “এই আসছে। জানিস, আমি আজ জীবনে প্রথম মাছ ধরেছি। আর, একটা সাপ দেখেছি। অসাধারণ ডিজ়াইনের। আমি না, জাস্ট স্পেলবাউন্ড হয়ে গেছি। কেন যে সবাই সাপ দেখলেই লাঠি নিয়ে তেড়ে যায়! কী সুন্দর একটা প্রাণী।”

নন্দা মন্টুর সামনে এসে দাঁড়াল। খুব বিপজ্জনক ভাবে মন্টুর সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে নন্দা। হঠাৎ ঘোর লাগছিল মন্টুর। ঘোর ভেঙে বেরিয়ে আসার জন্য সে কিছু বলতে চাইছিল খুব জোরে। এই মুহূর্তটা থেকে জোর করে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। অথচ তার যেন স্বরভঙ্গ হয়েছে। যেন স্বপ্নের ভিতরে সে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু বলতে পারছে না।

“না মন্টু, তুই আর কোনও দিন মাছ ধরতে যাবি না। যদি যাস, আমার সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক থাকবে না। কী এনেছিস আমার জন্য? আমার বার্থডে গিফ্ট?”

“ওহো, তোকে তো উইশ করাই হয়নি। হ্যাপি বার্থডে নন্দা। মেনি হ্যাপি রিটার্নস অব দ্য ডে।”

“বোস, আমার জন্য পায়েস রাঁধা হয়েছে। একটু মুখে দিয়ে যা।”

“কী রে, তোর চোখে জল কেন? এই নন্দা, কী হয়েছে? এনিথিং রং?”

আরও কাছে এগিয়ে এল নন্দা, তার পর মন্টুকে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রাখল। পাগলের মতো মাথা ঘষতে লাগল।

“তোরা... তোরা কিচ্ছু বুঝিস না। খুব ভুল একটা বিয়ে দিয়েছিস আমার। এখন আমি কী করব বল!”

“এই, কী করছিস, দরজা খোলা!”

“গো টু হেল উইথ ইয়োর দরজা। বল, আমি কী করব... তোকে বলতেই হবে...”

নন্দাকে আস্তে আস্তে সরিয়ে দিল মন্টু। মরে গেছে, একেবারে মরে গেছে ছোট্ট পুঁটিমাছটা। ঠোঁট থেকে বঁড়শি খুলে নেওয়ার মতো নন্দাকে ছাড়িয়ে নিল মন্টু।

দ্রুত পায়ে হাঁটছিল ভুজঙ্গ। সাড়ে ন’টার ভিতর তাকে বিভু সমাদ্দারের পেট্রল পাম্পে পৌঁছতে হবে। হাতের অ্যাটাচি ব্যাগটা সাইজ়ে বেশি বড় নয়, কিন্তু তুলনায় বেশ ভারী। মাঝে মাঝে কৌতূহল হচ্ছিল ভিতরে কী আছে জানার জন্য। উপায় নেই। তা হলে কোনও নির্জন জঙ্গলে গিয়ে পাথর দিয়ে তালা ভাঙতে হবে। তার কাছে এটার চাবি থাকার কথা নয়। তা ছাড়া, ভুজঙ্গ জানে এটার কম্বিনেশন লক রয়েছে। সামনে কতগুলো নম্বর-লেখা চাকা আছে। সেগুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নির্দিষ্ট নম্বরে মিললে ডালা খুলবে। সেই নম্বর না জানলে তালা খোলা অসম্ভব। চারটে চাকা, প্রত্যেকটা শূন্য থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যা আছে। বাই চান্স লেগে যেতে পারে, এই আশায় কত লক্ষ বার চেষ্টা করে যেতে হবে তা হলে! ও কথা ভেবে লাভ নেই। যাঁর হাতে এটা পৌঁছবে, সে নিশ্চয় কম্বিনেশন নম্বর জানে। ভুজঙ্গ বিভু সমাদ্দারের পুরনো লোক, এর আগেও বিভুর কাজ সে উতরে দিয়েছে। তাকে বিশ্বাস করে একটা কাজ দিয়েছে, মুখ বুজে কাজ শেষ করে তার প্রাপ্য সে বুঝে নেবে।

বকুলডাঙা থেকে যে পথ নতুন হাইওয়েতে মিশেছে, ঠিক সেই মোড়ের মাথায় বিভু সমাদ্দারের পেট্রল পাম্প। হাইওয়ের কথা বাতাসে ভাসতেই বিভু ওখানে একলপ্তে অনেকটা জমি ধরে রেখেছিল। বিভুর দাদা শিবু, শিবপ্রসাদ সমাদ্দার, এ তল্লাটের পুরনো নেতা। এক সময় ঘন ঘন দিল্লি যাতায়াত ছিল। কংগ্রেস আমলে এক বার লোকসভা আসনে জিতেও ছিল। সে-সব যোগাযোগের কারণেই হয়তো বিভু পারমিট পেয়ে যায়।

হাইওয়ে দিয়ে দূরপাল্লার গাড়ি বকুলডাঙায় না ঢুকে হাইওয়ে দিয়ে বেরিয়ে যেতে শুরু করল। অবস্থানগত কারণে বিভুর পাম্পের তেল বিক্রি বেড়ে গেল। এই মোড় থেকেই একটা পথ ডান দিকে ঘুরে বাংলাদেশ বর্ডারের দিকে চলে গেছে। এ পথেই রয়েছে অনেক পুরনো এক মন্দির। লিঙ্গেশ্বরের মন্দির। ভক্তদের যাতায়াত নিয়মিত লেগেই আছে। তা ছাড়া ট্যুরিস্টদের আনাগোনাও আছে। শোনা যায়, মন্দির নাকি দ্বাদশ শতকের সেন আমলের। গর্ভগৃহে লিঙ্গদেব রয়েছেন। মন্দিরের এখানে-সেখানে ছোট ছোট প্রচুর পাথরের মূর্তি। বেশির ভাগ ক্ষয়ে গিয়ে এখন বিকৃত আকারের হয়ে গেছে। পুণ্যার্থীদের তেল-সিঁদুরের কল্যাণে তাঁদের আসল রূপ কিছুই বোঝা যায় না।

জায়গাটা দ্রুত জমজমাট হয়ে উঠল। পাম্পের দু’পাশ দিয়ে হোটেল, রেস্তরাঁ, গাড়ি সারাইয়ের গ্যারাজ, গুটখা, পান-বিড়ির দোকান। রাতে ধাবার সামনে খাটিয়ার উপর দূরপাল্লার ড্রাইভাররা শুয়ে থাকে। একটু দূরে কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে আলো-আঁধারি মেখে কতগুলো রোগা মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ওদের শরীর থেকে এক রকম গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে। সস্তা সেন্ট, উগ্র লাল লিপস্টিক আর খিদের গন্ধ। গন্ধটা বাতাসে ভেসে খাটিয়া পর্যন্ত পৌঁছয়। কত দূরদূরান্ত থেকে ট্রাকগুলো এসে এখানে দাঁড়ায়। কানপুর, ঔরঙ্গাবাদ, পটনা, দিল্লি। গন্ধটা ওদের নাকে পৌঁছলে আর এক রকম খিদের জন্য উপোসি অজগরের মতো ঘুম ভাঙে ওদের। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে। দরদাম করে একটা মেয়েকে ট্রাকে তুলে নেয়। পথে নির্জনে কোথাও তাকে নিয়ে নেমে যায়। এক লোটা জল নিয়ে ড্রাইভার কোনও সামাজিক বনসৃজন প্রকল্পের নিরাপদ ছায়াতলে তার সায়া তোলে। লোটার জলে সাফা হয়ে ফিরে আসার পর খালাসি যায় তার পাওনা বুঝে নিতে।

ভুজঙ্গ এখান থেকে বাইক নেবে। যেখানে যাওয়ার কথা, অত দূর হেঁটে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। পাম্পে তার জন্য বাইক রেখেছে বিভু। বাইকের পিছনে বাঁ দিকে একটা বক্স আছে, সেখানে তার অ্যাটাচি এঁটে যাবে। বিভু হিসাবি লোক, ভেবেচিন্তে তার জন্য এই বাইক ঠিক করে রেখেছে। বাইকের নম্বরও বলে দিয়েছে। একান্ন বাইশ।

শুধু হিসাবি নয়, বিভু অসম্ভব ধূর্তও বটে। বর্ডার লাইনে সে বহু দিন ধরে কাজ করে আসছে। এর আগেও ভুজঙ্গ তার হয়ে কাজ করেছে। শুধু ভুজঙ্গ নয়, তার মতো আরও কয়েক জন লোক আছে বিভুর। কেউ ক্যারিয়ার, কেউ হিসাবপত্র দেখে, কেউ দরকারি যোগাযোগ রাখে। ভুজঙ্গ মাঝে মাঝে ভাবে, বিভুর আর কত টাকা দরকার। তেল বিক্রি করেই তার কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, এ-সব দু’নম্বরি কারবার করার কী দরকার তার! মানুষের বোধহয় লোভের শেষ নেই। আর, আইন-আদালতে অসংখ্য ফাঁকফোকর থাকে, পুলিশ-প্রশাসনে অসংখ্য লোভের মুখ হাঁ করে থাকে। বিভুর মতো লোকজন পাঁকাল মাছ হয়ে সে-সব ছিদ্র দিয়ে অনায়াসে আসা-যাওয়া করে।

বাঁ হাতে বাঁধা ঘড়ি দেখল ভুজঙ্গ। প্রায় সাড়ে ন’টা। পেট্রল পাম্প দেখা যাচ্ছে। একটু জোরে পা চালাল ভুজঙ্গ। বিভুর সাড়ে ন’টা মানে ন’টা তিরিশ মিনিট। এক মিনিট এ দিক-ও দিক তার পছন্দ নয়। এক বার আকাশের দিকে তাকাল ভুজঙ্গ। অগস্টের মাঝামাঝি। দু’দিন আগেই বিদ্যামন্দিরের মাঠে প্রত্যেক বছরের মতো পনেরোই অগস্টের রানিং ট্রফির খেলা হয়ে গেল। এ বার মাঠের চার পাশে ফ্লাডলাইটের আলোয় রাতেও খেলা হয়েছে। খেলার মাঝেই বৃষ্টি নেমেছিল। তাও খেলা থামেনি।

রোদ নয়, অ্যাটাচির ওজনের জন্য সামান্য ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ভুজঙ্গ। রোদ তেমন নেই, আকাশে কালো মেঘ। আকাশজোড়া নয়, পশ্চিমের আকাশ ঢেকে রয়েছে, কিন্তু বাকি আকাশে ছেঁড়া-ছেঁড়া কালো মেঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফলত বেশ ছায়া-ছায়া ভাব পথঘাট-ঘরবাড়ি জুড়ে। মাঝে মাঝে ভেজা বাতাস ছুটে আসছিল। ভুজঙ্গ বুঝতে পারছিল, দূরে কোথাও বৃষ্টি নেমেছে। এ বার এখনও তেমন টানা বৃষ্টি এ দিকে হয়নি। আগেকার মতো সেই দশ-পনেরো দিন ধরে সূর্যের দেখা নেই, জামাকাপড়ে গন্ধ— তেমন বৃষ্টি আর হয় না এখন। চার পাশে সবুজ জঙ্গল-ঘেরা সেই মফস্‌সল শহর এখন কংক্রিটের জঙ্গল। গরু-ছাগল আসল ঘাসের স্বাদ ভুলে গেছে। লোকজন ঠাকুরের জন্য নকুলদানা আর ওদের জন্য গোকুলদানা কেনে। শহরের চার পাশে যে শাল শিমুল জারুল সেগুনের বলয় ছিল, সে সব কবেই উধাও। বৈকুণ্ঠপুর ফরেস্ট থেকে টিয়ার ঝাঁক উড়ে আসত ছোট্ট এই শহরের দিকে। নিলু ডাক্তার হাঁচি শুনে পেশেন্টের পিত্তদোষের কথা বুঝতে পারতেন, নেতাজি ক্লাবের ছানু মৌলিক ইস্টবেঙ্গলে তিন সিজ়ন খেলেছিল, হর উকিলের বৌ আসলে পঞ্জাবি ঠিকাদার সুরিন্দর সিং-এর বৌ। সুরিন্দর মার্ডার হলে হর উকিল সেই কেস লড়েছিল। পুরনো লোকজন এখনও সে-সব গল্প করে।

একান্ন বাইশ বাইক নিয়ে ভুজঙ্গ দেখল, পিছনে, বাঁ দিকে কালো একটা বক্স এক্সট্রা লাগানো রয়েছে। তার অ্যাটাচি সেখানে দিব্যি এঁটে যাবে। হয়তো এ-সব ব্যাগ-ট্যাগ নেওয়ার জন্যই বিভুর বুদ্ধিতে এটা পরে সেট করা হয়েছে। বক্স খুলে সেখানে তার হাতের অ্যাটাচি ভরে নিল ভুজঙ্গ। হাত ব্যথা হয়ে গেছে। সাদা রঙের একটা এসইউভি এসে পাম্পে দাঁড়াল। তেল ভরবে। সামনের বাঁ দিকের জানালার কাচ নামাল একটি মেয়ে। মেয়েটির দিকে এক বার তাকিয়ে ভুজঙ্গ হাঁ হয়ে গেল। এ রকম অসম্ভব সুন্দরী মেয়ে পথেঘাটে দৈবাৎ দেখা যায়। কেউ এক বার তাকালে দ্বিতীয় বার ঘুরে তাকাবেই। এ রকম সুন্দরী দেখলে ভুজঙ্গর বুকের ভিতরটা যেন কেমন করে ওঠে। তার মতো মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। বুকের ভিতরের কষ্টটা টের পায় ভুজঙ্গ। এই মেয়েটিকে সে জীবনেও স্পর্শ করতে পারবে না। মানুষ কত অপূর্ণ সাধ-আহ্লাদ নিয়ে এক দিন মরে যায়। কেউ জানতেও পারে না, তার কিসের কষ্ট ছিল। অপূর্ণতা নিয়েই ছাই হয়ে যায়, মাটির নীচে মাটি হয়ে যায়।

আড়চোখে মেয়েটার শরীর দেখল ভুজঙ্গ। চোখে সানগ্লাস। দরজা খুলে মেয়েটি বাইরে এলে ভুজঙ্গ দেখল, জিন্‌স আর সাদা টপ পরা মেয়েটি বেশ লম্বা। তার উপর হাই-হিল পরায় আরও লম্বা দেখাচ্ছে। শরীরের ভিতরে একটা ছটফটানি টের পেল ভুজঙ্গ। যা কোনও দিন পাওয়া যাবে না, তার জন্য তীব্র একটা তৃষ্ণা। শেষে মনে মনে একটা খুব খারাপ গালাগালি দিল মেয়েটাকে।

পকেটে ফোন বেজে উঠল তার। বিভুর ফোন। একটু সরে গিয়ে বোতাম টিপল ভুজঙ্গ।

“রওনা হয়েছিস?”

“এই তো, জাস্ট পৌঁছলাম। এখনই রওনা হব।”

“সাবধানে যাস। অবশ্য সব ফিট করা আছে আমার। তবু কোথাও কোনও ঝামেলা হলে বোকার মতো এই নম্বরে ফোন করে বসিস না। অন্য নম্বরে করিস। আর শোন, রেনকোট নিয়ে বেরোস। মনে হচ্ছে আবার নামতে পারে।”

“ঠিক আছে, তুই ভাবিস না।”

বিভু সমাদ্দারের সঙ্গে ভুজঙ্গ হালদারের তুইতোকারির সম্পর্ক। কিন্তু ভুজঙ্গ জানে, কত দূর পর্যন্ত বিভু তাকে অ্যালাও করবে। সেই সীমানা সে কখনও পেরোয় না। বিভুর পায়ের নীচে শক্ত জমি ছিল। বুদ্ধি ছিল। সে-সব দিয়ে শক্ত বনিয়াদের উপর নিজের সাম্রাজ্য তৈরি করে নিয়েছে। শুধু ধূর্ত নয়, নিজের স্বার্থের ব্যাপারে সে নিষ্ঠুরতার চূড়ান্ত সীমাতেও যেতে পারে। সে রকম ঘটনা ভুজঙ্গ জানে। বিভুর সঙ্গে বেইমানি করার কথা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। একদম বাতাসে মিশে যাবে। বন্ধু বলে তাকে রেয়াত করবে না বিভু। বর্ডারে তার বডি পড়ে থাকবে। তার পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকবে বিদেশি জিনিসপত্র। বিএসএফ-এর কমান্ড্যান্ট আর পঞ্চায়েত প্রধান মিলে লাশ আইডেন্টিফাই করবে। ট্রেসপাসিং-এর সময় এ রকম তো কতই হয়।

ভুজঙ্গকে গণপিটুনির হাত থেকে বাঁচিয়েছিল বিভু সমাদ্দার। হাটের রসিক পালের বৌকে ফুসলে ঘরের বাইরে এনেছিল ভুজঙ্গ। গুজগুজ ফুসফুস চলছিল। ক্লাবের ছেলেরা তক্কে তক্কে ছিল। এক বর্ষার দুপুরে ভুজঙ্গর হঠাৎ গা ম্যাজম্যাজ করে উঠল। শরীরের এই উপদ্রবে নাচার ভুজঙ্গ ছাতা নিতে রসিক পালের ঘরে গিয়ে উঠল। এ রকম ওয়েদারে একা একা কেমন যেন কষ্ট হয়। পুরুষমানুষের শতেক খোয়ার। শরীরটা মাঝে মাঝে এমন তুরুকনাচন নাচায়, শালার বেইমান শরীর, ভূতের ভয়ও থাকে না! ঝড়-বৃষ্টি-বজ্রপাত, ঠান্ডার কামড়, চামড়া জ্বলে যাওয়া রোদ— কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করে পুরুষমানুষ বিবশ আরশোলার মতো কাচপোকার পিছনে ছুটতে থাকে। হাটের কানিপাগলিরও পেট হয়ে যায়। ভুজঙ্গ হালদারও ছাতার আড়াল নিয়ে হাটে মশলার বেনে রসিক পালের ঘরে গিয়ে উঠেছিল।

ঘর থেকে তাকে টেনে-হিঁচড়ে বার করে এনেছিল ক্লাবের ছেলেরা। তাদের শান্ত এরিয়ায় অসামাজিক কাজকর্ম তারা অ্যালাও করবে না। ভুজঙ্গ তাদের হাতে-পায়ে ধরেছিল। কথা দিয়েছিল জীবনে আর এসব করবে না। ছেলেদের তখন এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখার নেশা চাগিয়ে উঠেছে। এ ব্যাপারে শেষ দেখতে চাইছিল তারা।

প্রথম লাথিটা মেরেছিল ক্লাবের সেক্রেটারি হারু প্রামাণিক। সেক্রেটারি, সুতরাং যে কোনও ব্যাপারে বউনি করার হক তার। তা সে বোতল হোক, বা তোলার মালকড়ি— প্রথমে হাত দেবে হারু। সুতরাং সে মারতেই পারে। তলপেটে মোক্ষম লাথি পড়তেই ভুজঙ্গ বমি করে দিয়েছিল। তার পর এলিয়ে পড়ে। হারু অ্যান্ড কোম্পানি ঘাবড়ে গিয়েছিল। লোকটা মরে না যায়। ডোজ়টা একটু বেশি হয়ে গেছে। বিভু সমাদ্দারকে খবর দিয়েছিল কেউ। শালা মরে গেলে ম্যাও সামলাবে কে। ক্লাবের প্রেসিডেন্ট বিভুদার কাছে খবর পৌঁছল। বিভু যখন এসে পৌঁছল, তখন বমির উপর মাছির ওড়াউড়ি শুরু হয়েছে।

ভুজঙ্গ হালদারকে চিনতে বিভুর সময় লাগেনি। কাঠগোলার ম্যানেজার অনঙ্গ হালদারের ছেলে। ক্লাস নাইন পর্যন্ত তার সঙ্গে পড়েছে। তার পর আর তার কোনও খবর রাখেনি বিভু। প্রায় স্মৃতি থেকেই সে হারিয়ে গিয়েছিল। ভুজঙ্গর এমন কোনও উজ্জ্বল পেখম ছিল না যে, তার খবর বিভু রাখবে। হাজার মানুষের ভিড়ে অতি সাধারণ এক জন মানুষ হয়ে সে কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল। ভুজঙ্গর মাথার চুল দেখে বিভুর মনে পড়ল। শুয়োরের পিঠে যেমন লোমগুলো খাড়া হয়ে থাকে, তার মাথার চুল ছিল অবিকল সেরকম। আর ওই ঘন জোড়া ভুরু। তাকে দেখে মনে হত অনেকে যেমন শখ করে গোঁফ রাখে, পরিচর্যা করে, তা দেয়— সেও বোধহয় শখ করে ওরকম ভুরু রেখেছে। ফাঁক পেলেই তা দেয়।

হাসপাতাল থেকে সুস্থ করে আনার পর ভুজঙ্গকে নিজের কাজে লাগিয়ে নিয়েছিল বিভু। তারাকান্ত মজুমদারের জুতোর দোকান ‘পদপল্লব’-এ সেল্‌সম্যানের কাজ। ভুজঙ্গর আর কোনও উপায় ছিল না। এখানে ওখানে উঞ্ছবৃত্তি করে ঘোরার চেয়ে এ কাজ মন্দ কিসে। মাসখানেক কাজ করার পর একদিন বিভু তাকে দেখা করার জন্য খবর পাঠাল।

“আয়, কাজকর্ম ঠিকঠাক করছিস তো?”

ভুজঙ্গ ভয় পেল। মালিক তারাকান্ত তার নামে চুকলি কাটল নাকি। কাজ তো সে একদম ঠিকঠাকই করছে। টাইমলি যায়। সারাদিন পরিশ্রম করে। ক্যাশে মালিক নিজে বসে। ঝামেলার প্রশ্নই নেই।

“একদম ঠিকঠাক। তুই কাজ ঠিক করে দিয়েছিস, ঠিকঠাক না হলে চলবে কেন?”

“গুড। তোর সঙ্গে একটা দরকারি কথা আছে। গত এপ্রিলে, এই ধর মাঝামাঝি, রূপেশ বর্মণের মাল একবার তুই টেনেছিলি? তার পর ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়েছিলি। এক মাস পালিয়েছিলি স্বরূপগঞ্জে। ঠিক কি না?”

মুখ শুকিয়ে গেল ভুজঙ্গর। সে কথা বিভু জানল কী করে! অমাবস্যার রাত ছিল। লাইন ক্লিয়ারের সিগন্যাল ছিল। বড় বড় কার্টন চার বার পারাপার করে তার সাহস বেড়ে গিয়েছিল। ঘাসজমির আড়াল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে লাইন পেরোতে গিয়েছিল সে। চৌকি থেকে ‘হল্ট’ শুনেও গ্রাহ্য করেনি। কানের পাশ দিয়ে সিসার গুলি শিস কেটে বেরিয়ে যাওয়ার পর বিপদ বুঝতে পেরেছিল। ফের ঘাসজমির আড়ালে ডুব মেরেছিল বাঁচার জন্য। বুঝতে পেরেছিল তার মাথার উপর দিয়ে গুলি ছুটে যাচ্ছে। ওই অবস্থাতেই মিলিটারিদের মতো বুক ঘষটে লাইন পার হয়েছিল। পড়ে রইল কার্টন। কে জানে কী ছিল। তাদের মতো ক্যারিয়াররা জানতে পারে না শক্ত পিচবোর্ডের বাক্সের ভিতরে কী থাকে। মেয়েদের পোশাক বা কসমেটিক্স নয়, তা হলে অত ভারী হত না। ভারী যন্ত্রপাতি হয়তো। মনে পড়েছিল গুলি-খাওয়া জহিরুলের কথা। ধানখেতে রক্তে ভেসে-যাওয়া তার বডির পাশেই ছেতরে পড়ে ছিল বিদেশি সুগন্ধীর শিশি। আর বাবলু বৈদ্য। তারকাঁটার বেড়ায় ঝুলে-থাকা বডি থেকে সারারাত টুপটুপ করে রক্ত পড়েছে ফোঁটা ফোঁটা। কার্টন ছিঁড়ে বেরিয়ে-আসা বিদেশি ক্যামেরা, হেমন্তের শিশির আর বাবলু বৈদ্যর রক্ত মিলেমিশে সীমান্তের ঘাসে ছড়িয়ে ছিল।

ক্রমশ

আরও পড়ুন