Marilyn Monroe

মায়াকাননের নক্ষত্রনারী

সময়ের সৌজন্যে কিংবদন্তি মেরিলিন মনরো যখন শতবর্ষপূর্তির তটরেখায়, তখন তাঁকে শুধু আর চর্যাপদের হরিণী মনে করা যথেষ্ট নয়। যে-সব তথ্যাবলি তাঁকে কামপুত্তলী হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, সে সব আজ বাতিল দস্তাবেজ। তাঁর বইয়ের আলমারিতে থাকত ‘মাদাম বোভারি’ ও ‘ইউলিসিস’, পছন্দ করতেন জ্যাক কেরুয়াক, স্যামুয়েল বেকেট-এর লেখা। হাতব্যাগে থাকত আলব্যেয়র কামু-র ‘দি ফল’।

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ৩১ মে ২০২৬ ০৬:২৯

ছবি: অমিতাভ চন্দ্র।

মেরিলিন মনরো (১৯২৬-১৯৬২) নিঃসন্দেহে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের হলিউড-সম্রাজ্ঞী শুধু নন, প্রতি পলে-অনুপলে এক কিংবদন্তি। তাঁর আপাত-আধিপত্যের আড়ালে সাংস্কৃতিক পুঁজিবাদ প্রচার করে গেছে একটি বিশ্বাস্য ছলনা যে, কাগজকুড়ুনি ঘরের হতভাগা মেয়েও কী করে সাফল্যের চূড়ায় উঠতে পারে, হয়ে ওঠে নারীরহস্যের চির প্রবাদবাক্য ‘লা ফাম মিস্তিক’— কুন্দ শুভ্র নগ্নকান্তি সুরেন্দ্রবন্দিতা/ তুমি অনিন্দিতা।

১৯৬২-র অগস্ট মাসে যখন মেরিলিনের নিশ্চল, নিরাবরণ দেহ আবিষ্কৃত হয়, যখন তাঁর একবিন্দু গোপনীয়তাও সর্বজনীন হয়ে ওঠে মিডিয়ার কোলাহলে, তখন আমেরিকান পপ-শিল্পী অ্যান্ডি ওয়রহল পঞ্চাশটি সিল্ক স্ক্রিন প্রিন্ট রচনা করে রমণীয়তার জরায়ু পর্যন্ত অন্তর্ঘাত চালালে জ্বলজ্বল করে ওঠে যে, মেরিলিনের ‘নায়াগ্রা’-র (১৯৫৩) যৌনপ্লাবন কী ভাবে পর্যবসিত হয়েছে বিপণির স্নায়ুহীন জমিতে। অবাক হয়ে ভাবি, জীবনানন্দ কি নিজের অজানতেই পূর্বাভাস করেছিলেন একটি অসার বাজার-প্রতিমার? “রূপ কেন নির্জন দেবদারু দ্বীপের নক্ষত্রের ছায়া চেনে না— পৃথিবীর সেই মানুষীর রূপ?/ স্থূল হাতে ব্যবহৃত হয়ে— ব্যবহৃত— ব্যবহৃত— ব্যবহৃত— ব্যবহৃত/ ব্যবহৃত হয়ে/ ব্যবহৃত— ব্যবহৃত—/ আগুন বাতাস জল: আদিম দেবতারা হো হো করে হেসে উঠলো;/ ব্যবহৃত— ব্যবহৃত হ’য়ে শুয়ারের মাংস হ’য়ে যায়?”

মেরিলিন নিজেও বুঝতে পারছিলেন, তিনি অন্তিম দৃশ্যে হয়তো হলিউডের প্রদর্শনীতে মাংসের পসরা। তাঁর উদ্যত কুসুমদ্বয় অথবা সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত জয় করা নিতম্ব নিতান্তই আমিষ রূপকথা। আর সেই জন্যই তিনি জীবনের শেষ সাক্ষাৎকারে ‘লাইফ’ পত্রিকাকে জানান— “এটাই সমস্যা যে যৌন প্রতীক শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় দ্রব্যে। আমি নিজেকে পণ্য ভাবতে ঘৃণা বোধ করি।” বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ উপন্যাসের শেষে আয়েশা গরলাঙ্গুরীয় পরিখার জলে ফেলে দেন। কিন্তু মেরিলিন মনরো পারেন না। হীরকে ওষ্ঠ রাখাই তাঁর নিয়তি। আজ পর্যন্ত তাঁর হিমশীতল, নীরব ও নগ্ন শরীর আমাদের সভ্যতার রাশভারী কুচকাওয়াজে একটি অনিবারণীয় ছন্দপতন।

অনস্বীকার্য যে অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো যৌনতার বিশ্ববিখ্যাত বিচ্ছুরণ। সারা পৃথিবীর পুরুষ, বিশেষ করে শ্বেতাঙ্গ সমাজ, তাঁর থেকে চোখ সরাতে পারেনি। ক্ষণজীবিনী, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তিনি ভূমিকম্পের অধিক। ডেমোক্র্যাট পার্টির সদস্য হিসেবে জন এফ কেনেডির সঙ্গে তাঁর পরিচয় স্বাভাবিক; কিন্তু তাঁকে দেখলে যে প্রেসিডেন্টের রক্তচঞ্চলতাও বৃদ্ধি পেত, এমন গুজব ততটা ভিত্তিহীন নয়। আশ্চর্য এই যে, একই সঙ্গে তাঁর মৃত্যুতে আটলান্টিকের ও-পার থেকে বিধুর হয়ে উঠেছিলেন জঁ ককতো-র মতো অভিজাত চিন্তক। আক্ষেপ করেছিলেন, “এর পর থেকে গুণী শিল্পীদের যেন এমন দুর্দশায় না চলে যেতে হয়।” আর তরুণ ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো তো তাঁর লাবণ্যময়তার অনুরক্ত। আকৈশোর যে লাবণ্য তাঁকে চার্লি চ্যাপলিন ও জেমস ডিন-এর মধ্যবর্তিনী করে তোলে, তিনি ‘দি সেভেন ইয়ার ইচ’ (১৯৫৫) দেখে শিশুর মতো খুশি হয়ে ওঠেন, “হাউ কুড এনিওয়ান রেজ়িস্ট আ ফিল্ম দ্যাট হ্যাজ় মেরিলিন মনরো ইন ইট?”

আর পিয়ের পাওলো পাসোলিনির মতো চলচ্চিত্রস্রষ্টা তাঁকে উপাস্য ভাবেন। মেরিলিন-প্রস্থানে পাসোলিনির শোকোচ্ছ্বাস ছিল কাব্যিক: “প্রাচীন পৃথিবী থেকে পরিত্রাণ পাওয়া তোমার/ সৌন্দর্য হারিয়ে গেল সোনালি ঘুঘুর মতো/ প্রাচীন পৃথিবী থেকে পরিত্রাণ পাওয়া তোমার সৌন্দর্য/ ভবিষ্যতের থেকে চেয়ে নেওয়া/ সমকালীন পৃথিবীর দ্বারা দখলীকৃত/ পরিণত হল একটি নশ্বর যন্ত্রণায়...”

অভিনেত্রী: গ্রেটা গার্বো।

অভিনেত্রী: গ্রেটা গার্বো।

আর কী আশ্চর্য! স্বয়ং মেরিলিনের আরাধ্যা ছিলেন যন্ত্রণার মধ্যে বিধুর হয়ে থাকা আর একটু আগের মনমোহিনী গ্রেটা গার্বো (১৯০৫-১৯৯০)। মনে করা যাক, ‘কুইন ক্রিস্টিনা’ (১৯৩৩) ছবিতে তাঁর বিখ্যাত ক্লোজ-আপ। প্রেমিক নিহত, তিনি সিংহাসনচ্যুতা। তাঁর চোখে ধু ধু নিঃস্বতা। অথচ অন্তিম মুহূর্তে তাকেই তো, সেই শূন্যতাকেই, মনে হয় নক্ষত্রনারীর কেশপাশ। নন্দনতাত্ত্বিক বেলা বালাজ় ওই চোখের মধ্যেই দেখলেন যন্ত্রণার একাকিত্ব। মুখের সেই সৌন্দর্যকে, নাসারন্ধ্র ও ভ্রু-রেখার সেই ঐশ্বর্যকে দেখেই ফরাসি দার্শনিক রঁল্যা বার্থ লেখেন, “গার্বো’স ফেস রিপ্রেজ়েন্টস দিস ফ্র্যাজাইল মোমেন্ট হোয়েন দ্য সিনেমা ইজ় অ্যাবাউট টু ড্র অ্যান এগজ়িস্টেনশিয়াল ফ্রম অ্যান এসেনশিয়াল বিউটি, হোয়েন দ্য আর্কেটাইপ লিনস টুওয়ার্ডস দ্য ফ্যাসিনেশন অব মর্টাল ফেসেস, হোয়েন দ্য ক্ল্যারিটি অব দ্য ফ্লেশ অ্যাজ় এসেন্স ইল্ডস ইটস প্লেস টু আ লিরিসিজ়ম অব আ উওম্যান।”

এই গীতিকবিতাই পয়ারে লেখা থাকে মেরিলিনের ভঙ্গিমায়। এক-একটি নারী যেন ঈশ্বরীর মতো। সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে থাকেন মেরিলিন মনরো। ছবির নাম ‘দি সেভেন ইয়ার ইচ’। সেই কবে বোদলেয়ার লিখেছিলেন ‘পাপের ফুল’। এত দিনে তা ঝরে পড়ল স্বর্গের বাগানে। সারা বিশ্ব মেরিলিন মনরোর মধ্যে দেখতে চেয়েছিল বাসনার বহ্নিশিখা। তবু তো কার্তিয়ের ব্রেসঁ প্রথম সাক্ষাৎকারেই দেখেন সেই দৃষ্টিপাত, যা সহসা অন্তর্হিত হয়; আবার অমরতা যাকে ফিরিয়ে দেয় সময়ের বেলাভূমিতে। মেরিলিন তাঁর মৃত্যুকে লুকিয়ে রাখেন চোখের পল্লবে। মুখের রেখায় জমে থাকে শ্রাবস্তীর কারুকার্য। ছবিঘরের অনেক বাইরে, আমাদের মনের গহনে তারাদের ফুটে ওঠা দেহের উৎসব শেষে ইতিহাস তাদের পুনর্নির্মাণ করে ভোরের কল্লোলে। তা হলে মেরিলিন, ‘অয়ি পদ্মপলাশলোচনে, তুমি কে?’

আর এইখানেই মূল সমস্যা। একটু প্রসঙ্গান্তরে যাই। বছরটা ১৮৯৫। পৌষ মাসের তুষারপাত তুচ্ছ করে প্রথম চলমান চিত্রমালা আবির্ভূত হল ফরাসি দেশে। প্যারিসের দর্শক পৃথিবীতে প্রথম নব চিত্ররঙ্গের আস্বাদ পাচ্ছেন, আর সে বছরই প্রখর বৈশাখে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘মানভঞ্জন’ গল্পটি। সেটি ছিল নক্ষত্র-পরিক্রমা সম্বন্ধে এক ধরনের সাংস্কৃতিক আলোকসম্পাত। স্টার-ব্যবস্থা বিষয়ে আমাদের আদিপাঠ।

অভিনেত্রী: ব্রিজিত বার্দো।

অভিনেত্রী: ব্রিজিত বার্দো।

রবীন্দ্রনাথের গল্পের নায়িকা গিরিবালা ব্যক্তির অন্দরকে শহরের সদরের সঙ্গে যুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চেতনায় নক্ষত্রের জন্ম হয়। যদিও আরও পঁচিশ বছর পর, লন্ডনের রাজপথে প্রকাশ্য দিবালোকে হলিউড কিন্নরী মেরি পিকফোর্ডের জন্য জনসাধারণের পাগলামিতে বিরক্ত হয়েছিলেন তিনি। আসলে তাঁর স্বভাবের আভিজাত্য এ ধরনের হুজুগ মেনে নিতে পারত না। ‘নহ মাতা, নহ কন্যা, নহ বধূ সুন্দরী রূপসী’— সিনেমার আকাশে যে তারা ফুটে ওঠে, তার তাৎপর্য তবে কোথায়? রবীন্দ্রনাথকেই যদি উদ্ধৃত করি, “চারিদিকে এবং চিরকাল যে রূপ দেখিয়া আসিতেছি, এ একেবারে তাহা হইতে অনেক স্বতন্ত্র।” অথচ যা পরিহাসের তা হল, এই স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আমরা সাধারণত নীরব থাকি। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা সত্যজিৎ বা আন্তোনিয়োনি বলতে যতটা বোঝেন, ততটাই স্বেচ্ছায় অজ্ঞ থাকেন মধুবালা বা সোফিয়া লোরেন সম্পর্কে। আজ পর্যন্ত কোনও ভারতীয় মেধাজীবী হেলেনের তুলনারহিত পদযুগল নিয়ে চিন্তাও করেন না, অথচ মেরলিন ডিয়েট্রিশের মুক্ত ঊরুদেশ কত না মনীষাদীপ্ত আলোচনার জন্ম দিয়েছে ইউরোপে ও আমেরিকায়। উপন্যাসিক আঁদ্রে মালরো তো বলেইছেন, “ডিয়েট্রিশ কোনও অভিনেত্রী নন, তিনি অতিকথা।” আঁদ্রে বাজ়াঁ-র মতো বাস্তববাদী চলচ্চিত্র-তাত্ত্বিক তাঁর শরীরের ভাঁজে ভাঁজে আবিষ্কার করেছেন জ্যামিতিক সুষমা। এমনকি ১৯৬৫ সালে ‘নিউজ় উইক’ পত্রিকা যখন বিখ্যাত পরিচালক জোসেফ ফন স্টার্নবার্গের রিভিউ ছাপে, তখন তাঁকে সবচেয়ে বেশি দাম দেয় ‘ব্লু এঞ্জেল’-এর স্রষ্টা হিসেবে। ‘নিউজ় উইক’ তাঁকে বর্ণনাই করে মেরলিন ডিয়েট্রিশের রচয়িতা হিসেবে। শরীরের এই উন্মোচন কী ভাবে ইডিপাস কমপ্লেক্সের সঙ্গে যুক্ত, তা নিয়ে লেখা হয়েছে দার্শনিক সন্দর্ভ। এ ভাবেই মনোবিদেরা ব্যাখ্যা করেছেন বিখ্যাত আমেরিকান অভিনেত্রী মে ওয়েস্ট-এর আক্রমণাত্মক যৌন আবেদনকে। ফ্রান্সে ব্রিজিত বার্দো আর মেরিলিন মনরোকে নিয়ে নবতরঙ্গ, বিশেষত ত্রুফোর উচ্ছ্বাস তো এখন ইতিহাসের অংশ। ১৯৬০ সালে স্বয়ং সিমোন দ্য বোভোয়া লিখলেন তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ, ‘ব্রিজিত বার্দো অ্যান্ড দ্য লোলিটা সিনড্রোম’। সে লেখায় প্রকাশিত হল, কোনও সমাজে একই সঙ্গে বাসনা ও বিদ্রোহের স্মারক এই নতুন নারী ব্রিজিতকে কী ভাবে নির্মাণ করে, আর তাঁর নগ্নতার প্রকৃত রহস্য দ্রৌপদীর শাড়ির মতোই যুদ্ধোত্তর ফরাসি দেশের খবরের কাগজের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে থাকে। ‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড উওম্যান’ (১৯৫৬), রজার ভাদিমের ছবি দেখে নবতরঙ্গ আর সেই সূত্রে আমরাও জানলাম, সেই নারী ব্রিজিত বার্দো। আর তিনিই আধুনিক পশ্চিমের সেই নারী-নীহারিকা যিনি গার্হস্থকে টেনে নিয়ে যান জনপরিসরে। আপাতভাবে যা মেরিলিন মনরোর অন্তর্বাস বিষয়ে একটি দীর্ঘ স্তবগাথা, ‘নায়াগ্রা’ (১৯৫২) নামের ছবিটির সেই আলোচনায় ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর মতো মেধাবী পরিচালক আসলে বলতে চাইছিলেন যে, পরিচালককে ছাপিয়ে কী ভাবে মেরিলিন নিজেই হয়ে ওঠেন সময়ের ইস্তাহার।

যদি আরও একটু তলিয়ে দেখি, তা হলে নক্ষত্রের নির্মাতাও কিন্তু পুরুষ। এক জন নট যদি তারকা হন, তবে তিনি স্বনির্ভর। তাঁর উপস্থিতি বুঝিয়ে দেয় তিনি কী কী করতে পারেন বা তাঁর পক্ষে কী কী করা সম্ভব। অন্য দিকে নায়িকাকে নির্ভর করতে হয় সমাজ-নির্দেশিত মানচিত্রের উপর। এক জন নারীচরিত্রের গঠন সম্পূর্ণই হয় না যদি না তাঁর বেশভূষা, তাঁর কণ্ঠস্বর, তাঁর রুচি থেকে বোঝাতে পারেন যে, তিনি পুরুষের পৃথিবীতে কী ভাবে ব্যবহারযোগ্য। এক জন পুরুষ মূলত দ্রষ্টা, এক জন মহিলা মূলত দ্রষ্টব্য। সত্যি কথা বলতে কী, নারীকে প্রদর্শিতা হওয়ার মুহূর্তেও নিজেকে জরিপ করতে হয়, মেরিলিন ও ব্রিজিত দু’জনেই জানেন তাঁদের ‘টিআরপি’ দাঁড়িয়ে আছে তাঁদের বিক্রয়মূল্যের উপর। সেই বিক্রয়মূল্য লরা মালভি-র মতো বিশিষ্ট তাত্ত্বিকের ভাষায়, ‘টু বি লুকড অ্যাট-নেস’— দৃষ্টি আকৃষ্ট হওয়ার যোগ্যতা। ‘শরীর, শরীর, তোমার মন নাই কুসুম!’ ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ তা হলে এই! এই শরীরেই পুরুষের আহ্লাদ! শরীরই একমাত্র বিনোদন। শরীরই একমাত্র ভ্রমণকেন্দ্র। নায়কের সঙ্গে নায়িকার প্রধান পার্থক্য এই যে, মার্লন ব্র্যান্ডোর উপস্থিতিই প্রত্যক্ষ প্রতিশ্রুতি। মেরিলিনের সৌন্দর্যকে শুধু ব্যবহারের অপেক্ষার প্রহর গুনতে হবে, তা তিনি যতই জেমস জয়েস বা কেরুয়াক পড়ুন, আর কবিতা লিখুন। শরীরের অদূরে পাহারায় থাকা ভবিতব্য।

যখন চলচ্চিত্রের আদিযুগ, তখন তো স্টার-ব্যবস্থার লেশমাত্র ছিল না। ছোট ছোট চিত্রমালা, তাতে নট-নটীদের নাম থাকার প্রশ্নও ছিল না। কিন্তু শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকেই যখন সিনেমা নামের ম্যাজিক জনসাধারণকে আচ্ছন্ন করতে শুরু করে, তখন থেকেই হলিউড আর স্টার-সিনেমার একটি রহস্যময় সমীকরণ প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। আমেরিকান সিনেমার এটাই মস্ত কৃতিত্ব যে, হলিউড যেমন শুধু ভৌগোলিক অবস্থান নয় ক্যালিফোর্নিয়ায়, আসলে এক ধরনের স্বপ্নের কারখানা, এক সব পেয়েছির দেশ, তেমনই তার আকাশে তারারাও আসলে মনের নির্মাণ। আমেরিকান পরিচালক জন ফোর্ড এক বার বলেছিলেন, “হলিউডকে মানচিত্রে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না, অথচ সে সর্বজনীন।” নক্ষত্রেরাও তা-ই। তারা কি শুধুই নিরুপম চরিত্রকুশলী? নিঃসন্দেহে হলিউডের কুবেরদেবের অমোঘ সম্বল মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি এই তারকা পরিবহণ। কিন্তু শুধু অভিনয়-পারিপাট্যের জন্যই কি কেউ তারকা হবেন? মোটেও না। ভারী চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ নেড ট্যানেন, “আ স্টার হ্যাজ় টু থিংস অ্যান অ্যাক্টর ডাজ় নট হ্যাভ: ক্যারিশমা অ্যান্ড দ্য এবিলিটি টু সেল টিকেট।” ব্যবসার প্রয়োজনে তাই কোনও চরিত্রকে অতিরিক্ততার মোড়কে মুড়ে দেওয়া হয়। এই সংস্কৃতি শুরু হয় ১৯১০ সাল থেকে, যখন প্রযোজক কার্ল লেমলে, ফ্লোরেন্স লরেন্স নামক সামান্য নটীকে বাড়তি প্রচার দিয়ে সাজালেন। সমাজতাত্ত্বিক এদগার মর‌্যাঁ-র কথা ধার করে বলতে হয়, ‘নক্ষত্র হলেন স-জীবনী অভিনেতা’, অর্থাৎ পর্দার চরিত্র যদি বাস্তব জীবনের সঙ্গে জুড়ে অন্য কোনও জৈব রসায়ন উপহার দেয়, তবে তারকার জন্ম সম্ভব। কোনও কোনও সময় এই জীবনী তাঁদের জৈব সত্তাকেও ঢেকে দেয়। অতএব উন্মাদ বন্যার মতো তাঁর আলোকচিত্রিত দৈহিক স্থাপত্য আর ব্যক্তিগত জীবনের অনাচার নিয়ে পঞ্চাশ দশকের হলিউডে শুক্লাপঞ্চমীর চাঁদ হয়ে শোভা পেতে লাগলেন মেরিলিন মনরো। যুগপৎ আমাদের বিষকন্যা ও আমাদের মায়াকাননের ফুল।

অভিনেত্রী: রিটা হেওয়ার্থ।

অভিনেত্রী: রিটা হেওয়ার্থ।

এই জন্যই চলচ্চিত্রবিদ রিচার্ড ডায়ার স্টার-দের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন যে, তাঁরা ‘স্ট্রাকচার্ড পলিসেমি’ অর্থাৎ সংগঠিত বহুব্যঞ্জনা। নক্ষত্রের ব্যক্তিগত জীবন শুধু তাঁর কর্মজীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয় না, এক তৃতীয় জীবন দেওয়া হয় তাকে, এক নতুন চিত্রপ্রতিমা! কত কাছে তবু কত দূর! আর ছায়াপুঞ্জ থেকে যেমন তারার উদ্ভব হয়, তেমন করেই চলচ্চিত্রীয় তারকার উদ্ভব হয় আমাদের যৌথ অবচেতনায়। এ রকম একটি মুহূর্তের শব্দহীন বর্ণনা আছে ভিত্তোরিয়ো ডি সিকা-র‘বাইসাইকেল থিভ্স’(১৯৪৮) ছবিতে। এক দিকে মইয়ে দাঁড়িয়ে দেওয়ালে পীনোন্নতপয়োধরা রিটা হেওয়ার্থের পোস্টার আটকানো, অন্য দিকে মাটিতে পোস্টার সাঁটার দায়িত্বে থাকা মজুরটির সাইকেল চুরি যাওয়া। স্টারডম ও গ্রাসাচ্ছাদনের অন্তর্বর্তী বাস্তবটিকে কী অসামান্য ভাবেই না উন্মুক্ত করেছিলেন পরিচালক!

খুব সহজে বললে, স্টার এমন এক অভিনেতা বা অভিনেত্রী, যিনি রূপকথার মতো ধূলিমলিনতা-মুক্ত। ডিপলিটিসাইজ়ড বাচন যেমন রল্যাঁ বার্থ বলেছেন, আর সে জন্যই অনৈতিহাসিক, যেমন ভারতে মধুবালা তাঁর করুণ শঙ্খের মতো আবেদনে অথবা আমেরিকায় মেরিলিন তার উষার উদয়সম অনবগুণ্ঠিতা রূপে। আর নারী, অস্তিত্ব ও ভাবের দিক থেকে, আরও বেশি পুরাণপ্রতিমা হিসেবে কাজ করতে পারে বলেই, এদগার মর‌্যাঁ মনে করেন, সে পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি মায়াবিনী ও স্বভাবতই কৌতূহলোদ্দীপক স্টার। উপরন্তু নারীকে তারকা হিসেবে নির্মাণ করায় পুরুষশাসিত সমাজের স্বার্থেও আঁচড় পড়ে না। যে কোনও শাসকগোষ্ঠী, যে কোনও আধিপত্যকামী প্রবণতা ওই রেখাচিত্রের আড়ালে তার ক্ষমতাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। এমনকি ক্ষমতার অপব্যবহারও এক ধরনের নৈতিক মান্যতা পায়। ‘সাবসিডিয়ারি সার্কুলেশন’ যাকে বলি, এই যে অভিনয়ের বাইরে গুজব-লেখনীতে, পত্রিকায়, ফ্যাশনে ও প্রচারে নক্ষত্র নির্মাণ করা হল, তা আসলে সামাজিক দোলাচল ও অস্থিতিকে একটা সাম্যবস্থায় নিয়ে আসার চেষ্টা। এক জন তারকার জীবনের সূত্রে দেখানো যায় যে, যাকে মনে হচ্ছিল দুরূহ সামাজিক সমস্যা, তারও সরল নিষ্পত্তি আছে। আর যে-হেতু সামাজিক সমস্যাপট শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিজীবনের ছন্দে পর্যবসিত হয়, সুতরাং প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র নিজেকে বিপন্ন বোধ করে না। অর্থাৎ যে দ্বন্দ্বের নিরসন বাস্তবের কোনও স্তরেই করা সম্ভব ছিল না, তার সমাধান সম্ভব হয়ে ওঠে ছায়াছবির জীবনে। তারকার জনপ্রিয়তা অনেকটাই নির্ভর করে তাঁরা হতশ্রী ও নিরাশার শিকার জনারণ্যকে কতটা সংহত ও প্রাণময় রূপে ফিরিয়ে আনতে পারেন, সেই সামর্থ্যের উপরে। তারকার প্রতি আমাদের যে দুর্নিবার আকর্ষণ, বা বলা যায় যে দুর্নিবার আকর্ষণ তারকা নির্মাণ করে, যাকে ইংরেজিতে ‘ক্যারিশমা’ বলে, তার স্বরূপ প্রথম রাষ্ট্রবিষয়ক আলোচনায় প্রয়োগ করেন বিশিষ্ট সমাজতাত্ত্বিক ম্যাক্স ওয়েবার। পরে এই বিশ্লেষণ যখন অন্যান্য সামাজিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান প্রসঙ্গেও আরোপিত হল, আমরা জানতে পারলাম সামাজিক আবহাওয়া অনিশ্চিত, অস্থির ও দ্বৈততায় ভরা থাকলে ক্যারিশমার উপযোগিতা বেড়ে যায় আর এই আশ্বাসপরায়ণ রশ্মি যে ব্যক্তি বা সামাজিক গোষ্ঠী, জনমানসের দোলাচল দূর করতে প্রয়োগ করেন, তাঁদের প্রতি জন-আস্থা বেড়ে যায়।

হার্বাট মার্কিউস অযথা মনে করেননি যে, স্টার-ব্যবস্থা জনমানসে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আধার। হলিউডের স্টার-তন্ত্র অনেক সময়ই সামাজিক দুর্যোগ প্রশমনে ব্যবহৃত হয়। আপাতত আমরা বরং মেরিলিন মনরো নামের কিংবদন্তির মায়া-কুয়াশার উৎস সন্ধান করি।

পঞ্চাশের দশকে মেরিলিন যখন সমুদ্র থেকে উঠে আসা মৎস্যকন্যার মতো আমেরিকান জীবনের তটরেখায় আছড়ে পড়লেন, তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু যুদ্ধের রেশ কাটেনি। ম্যাকার্থি-সন্ত্রাস ও ঠান্ডা যুদ্ধ সামাজিক জীবনধারার কাঁপুনি প্রশমিত হতে দিচ্ছে না। এক দিকে কমিউনিজ়ম বিষয়ে আতঙ্ক ও অস্বস্তি, অন্য দিকে যৌনতা বিষয়ে ফ্রয়েডের ধারণা চুইয়ে চুইয়ে এসে পড়ছে জীবনে। নৈতিকতা ও যৌনতার নতুন নতুন প্রশ্ন, নারী ও পুরুষের যৌন আচরণ নিয়ে কিনসি রিপোর্ট ও ব্যক্তির মতাদর্শহীন অবস্থান কী চূড়ান্ত ম্যাসোকিজ়ম তৈরি করে, তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত মেরিলিন ও তার স্পার্কলিং সেক্স অ্যাপিল। মেরিলিনের বিখ্যাত নগ্ন চিত্রসমূহের অগ্ন্যুৎপাত সম্পূর্ণ আমেরিকান পুরুষতন্ত্রকে আত্মনিগ্রহের দিকে ঠেলে দেয়। তাঁর আকস্মিক উদয়, শরীরের ক্ষমাহীন সন্ত্রাস ও পূরবীবিধুর অস্তকে প্রায় বিধিলিপি বলে মনে হয়। যেন দৈববাণী! আমেরিকান গণতন্ত্রের রূপরেখা যত অনচ্ছ হয়ে যাচ্ছে, সংস্থার সর্বময়তা যত বিমূর্ত রূপ নিচ্ছে, তত গণতান্ত্রিক বিনোদনমাধ্যমে সেই অসহায়তা পরিব্যাপ্ত হচ্ছে। কবি ওয়ল্ট হুইটম্যানের আমেরিকার বদলে ওয়াল স্ট্রিটের আমেরিকায় নৈতিক ভিত্তির যে দৈন্য সেই ইডিয়োলজিক্যাল টেনশন মেরিলিন মনরোর মধ্য দিয়ে মুদ্রিত হয় পঞ্চাশের দশকে। মেরিলিনের ব্যক্তিকামনার বিস্ফোরণ চূড়ান্ত বিচারে আমেরিকান সমাজব্যবস্থার অসঙ্গতিই প্রকাশ করে। প্রদর্শনবাদ, অর্থাৎ শ্রীমতী মনরোর প্রসিদ্ধ নগ্নতারও সামাজিক ভিত্তি আছে।

১৯৫৩ সাল। পর পর কয়েকটি ঘটনা ঘটে। হলিউড বিপণন সংস্থাগুলি প্রথমে ভোটের মাধ্যমে শ্রীমতী মনরোকে আমেরিকার শীর্ষ নারীনক্ষত্র হিসেবে ঘোষণা করে। কারণ স্বাধিকারপ্রমত্তা এই যুবতীর হাত ধরে সময় কথা বলছিল। টেলিভিশনের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সামনে চলচ্চিত্রের জন্য সেন্সর ব্যবস্থা কিছুটা শিথিল করা হয়। অগস্ট মাসে নারীদের যৌনাচারণ বিষয়ে বিখ্যাত কিনসি প্রতিবেদনের দ্বিতীয় অংশ প্রকাশিত হল। প্রথম অংশ ১৯৪৮ সালে শুধু পুরুষ প্রজাতির জন্য নিবেদিত ছিল। সেই প্রথম প্রকাশ্যে মিথুন লগ্নে পুরুষের প্রাধান্য খর্ব হয়ে বরং স্বচ্ছ হয়ে উঠল মর্মান্তিক যৌন হীনম্মন্যতা। আর কয়েক মাসের মধ্যেই শীতকালে প্রকাশিত হল দুনিয়া কাঁপানো ‘প্লেবয়’ পত্রিকা। সেই পত্রিকার স্প্রেড-আউট পাতায় মেরিলিনের নগ্নতা আমাদের পক্ষে ভূমিকম্প ও প্রলয় দেখা দিল। এই নগ্নতা পশ্চিমি চিত্রকলায় মানের অলিম্পিয়া (১৮৬৩) বা মোদিগলিয়ানির আধশোয়া নগ্নিকা (১৯১৭)-এর সঙ্গে তুলনীয় নয়। মেরিলিন যুগপৎ উল্লাস ও অভিশাপ। ‘নায়াগ্রা’, ‘জেন্টলমেন প্রেফার ব্লন্ডস’ ও ‘হাউ টু ম্যারি আ মিলিয়নেয়ার’ এই তিনটি ছবি নিয়ে ভুবনমোহিনী মেরিলিন তার শিরোনামে চলে এলেন। রহস্যময়ী ও নিষ্পাপ, বেপরোয়া অথচ দেবকন্যা। কিন্তু ভুললে চলবে না আমেরিকান পুরুষ স্টাররাও তখন অনিয়মের স্মারক। কিছুটা বাঁধনছাড়া, যেমন মার্লন ব্র্যান্ডো, জেমস ডিন ও এলভিস প্রেসলি। মেরিলিন মনরোকে ঘিরে যে বলয়চ্ছটা তা আসলে কমিউনিস্ট আতঙ্ক, শেয়ার বাজারের ওঠাপড়া ও নারী-যৌনতার অসামান্য বিক্রিয়া যে কামনার এই ঈশ্বরী শয়নকক্ষের অতিমানবিক পরিতৃপ্তি।

ঐতিহাসিক ভাবেই মেরিলিন ফ্রয়েডের শাস্ত্রবাক্য ছাড়িয়ে, গ্রন্থাগার ও বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর ছাড়িয়ে, এই মনীষীকে ইয়াঙ্কি সভ্যতার ঘরোয়া উপকরণ করে তুলেছিলেন। নারীদেহ, ফ্রয়েডীয় মনোভাবনায়, পুরুষের কাছে যুগপৎ বাসনা ও আতঙ্কের বিষয়। নারীশরীর যেমন ভ্রমণের আমন্ত্রণ, তেমনই অঙ্গহানির গোপন সঙ্কেত। উপরন্তু কিনসি প্রতিবেদনে প্রমাণিত হয় যে, নারীর রতিতৃপ্তি পুরুষের জানা পাটিগণিত থেকে আলাদা। এমন অবস্থায় মেরিলিনের নগ্নকান্তি অসংবৃত বসন আমেরিকান পুরুষকে, সেই সূত্রে পুরুষতন্ত্রকেই, সান্ত্বনা দেয় যে, রতিক্রিয়া ও রাগমোচন গভীর ও জটিল সঙ্কট হতে পারে, কিন্তু মেরিলিন তো আইসক্রিমের মতোই গলে যায়। সে সঙ্কটহারিণী। মেরিলিন মনরো তাঁর ভাস্কর্যপ্রতিম দেহকে আমেরিকান রাজনীতির প্রতিফলন ও অভ্যন্তরীণ সমরাস্ত্র করে ফেলেছিলেন।

মনরো তো শুরু থেকেই নায়িকা নন। সূচনায় তিনি তো উদ্ভিন্নযৌবনা বালিকামাত্র, সচিব অথবা তুচ্ছ কোনও অনামী চরিত্র। এমনকি ১৯৫৫ সালের ‘দি সেভেন ইয়ার ইচ’-এও তো তাঁর নাম নেই। তিনি শুধুই সুবিধাজনক যৌনস্বস্তি, যুগ-যুগান্তর হতে তুমি শুধু বিশ্বের প্রেয়সী, হে অপূর্বশোভনা ঊর্বশী! ১৯৫৩ সালে ‘নায়াগ্রা’-তে তাঁর দেহই দর্শকের পরমপ্রাপ্তি হয়ে চলচ্চিত্রটিকে মাঝে মাঝেই গৌণ করে দেয়। ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো, ছদ্মনামে, তাঁর অননুকরণীয় ভাষায় লিখেছেন, “উই আর আ লং ওয়ে ফ্রম মেরিলিন মনরো’জ় হিপস ফারদার ইয়েট ফ্রম নায়াগ্রা ফলস, বাট লাকিলি নায়াগ্রা ওয়াজ় নট মেড ফ্রম আউট-টেকস। হোয়াট ইজ় ইম্পরট্যান্ট হিয়ার ইজ়: ‘প্লিজ়, মেরিলিন পুট অন সাম আন্ডারওয়্যার’।” পাপারাৎজ়িদের কৌতূহলী জিজ্ঞাসা ছিল, ‘আপনার রাতপোশাক কী, মেরিলিন?’ তৎক্ষণাৎ সমস্ত সভ্যতাকে নিরাবরণ করে শ্রীমতী মনরোর চটজলদি জবাব, ‘জাস্ট মাই অ্যালার্ম ফর নাইন ও’ক্লক।’ এই যে রক্তিম ওষ্ঠদ্বয়, যা উন্মোচিত হলে স্বর্গদ্বার খুলে যায়, যিনি স্বয়ং কামনার ঈশ্বরী, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে খবরের বুলেটিনের অধিক প্রচার দেওয়া হয় পিন-আপ ছবি আর ফিসফাস গুজবের জীবনীতে। প্রতিভার কথা বলা হয় না।

এমন এক জন যিনি মনোরোগিণীর সন্তান; এমন এক জন যাঁর মা শৈশবে মানসিক হাসপাতালে থাকায় তিনি নানা পরিবারের সান্নিধ্যে, অবহেলায় বড় হয়েছেন; এমনকি অনাথালয়ে কাটিয়েছেন; মাত্র ন’বছর বয়সে যিনি প্রথম যৌন লাঞ্ছনার শিকার; ঋতুযন্ত্রণার শিকার এক জন; তিনটি অসফল বিবাহ; একাধিক গর্ভপাত; জনশ্রুতি: এক জন নিম্ফোম্যানিয়াক যিনি ফ্রিজিড; এত জটিল এক নারী যে তাঁকে চুম্বন করা প্রায় হিটলারকে চুমু খাওয়া; আর অবশেষে অত্যধিক ঘুমের ওষুধ খাওয়ায় ওই মর্মান্তিক হননঋতু ও নিঃসঙ্গ মৃত্যু...

আর ইন্ডাস্ট্রি বিশেষ ভাবে তাঁকে শ্বেতাঙ্গ পুরুষের বিলাসদ্রব্য হিসেবেই বানিয়েছিল। এই নারী সমগ্র শ্বেতাঙ্গ সমাজে এক জন শ্বেতাঙ্গিনী হিসেবেই পুরুষের চোখের আহ্লাদ। মেরিলিন তাঁর মুক্ত অবয়ব থেকে যে স্বাধীনতার পতাকা ওড়ান, তা শ্বেতাঙ্গ পুরুষেরই। মেরিলিনকে তেমন ভাবে হারলেমের কালো মানুষ বা ল্যাটিন আমেরিকার অনুপ্রবেশকারীদের প্রতিনিধি হিসেবে হলিউড রচনাও করেনি। সারা জীবন এমন যৌনপুতুল হিসেবে তাঁকে পর্দায় দেখা গেছে যে, সাদা পুরুষের দল নিশ্চিত থেকেছে, এই খেলার পদ্ধতি তাঁর জানা। মেরিলিনের বিদ্রোহ বরং ‘ফেমিনিন মিস্টিক’ বিষয়ে ধারণাগুলিকে সম্পাদিত করে নারীত্বের স্তবক নির্মাণ করে। আমাদের মনে পড়ে, ‘জেন্টলমেন প্রেফার ব্লন্ডস’-এর সেই বিখ্যাত গান: ‘হিরেই হল একটি মেয়ের শ্রেষ্ঠ বন্ধু’, মেরিলিন গাইছেন আর তার বাঁ হাতে হিরের নেকলেস ও ডান হাতে রিভলভার। মেরিলিন হয়তো পারঅক্সাইড ভেজানো সোনালি চুলে, রঞ্জিত ওষ্ঠাধরে, উদ্যত কদম্বদ্বয়ে শরীরী কামনার একটি প্রতীক। তবু স্বর্ণকেশী সুন্দরী ফাঁকি দিলেন সুবর্ণ সাম্রাজ্যের রাজন্যবর্গকে। ঘুমের মধ্যেই সোনালি চিল আর শিশির শিকার করে নিয়ে গেল পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ফোটোগ্রাফড মহিলাকে। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট যাঁর অন্যতম প্রণয়ী, তিনি স্বেচ্ছায় বেছে নিলেন বিদায়বেলার করুণ, একাকী পথ।

নর্মা জিন মর্টেনসন তাঁর আসল নাম। ছদ্মনাম মেরিলিন মনরোর আড়ালেই তিনি ইহলোকে ছিলেন। অদৃষ্টের কৌতুক যে, তাঁকে আমৃত্যু একটি মোহিনী আড়ালে থাকতে হয়েছে। কী সুকঠোর তপস্যা! যাঁকে আমরা জেনে এসেছি— ডাম্ব, চাইল্ডিশ ব্লন্ড, ইনোসেন্টলি আনঅ্যাওয়ার অব দ্য হ্যাভক হার সেক্সিনেস কজ়েস অ্যারাউন্ড হার। তিনি প্রকৃতই বৌদ্ধিক চর্চার উন্নত স্তরে স্বচ্ছন্দ ছিলেন। স্বভাবকবি থেকে স্বাভাবিক কবি হওয়ার পথে তাঁর যাত্রা। সাধারণত প্রচার করা হয় না যে, তিনি আমেরিকার সবচেয়ে কুলীন অভিনয়ের পাঠশালা, নিউ ইয়র্কের ‘অ্যাক্টরস স্টুডিয়ো’তে নাট্যগুরু লি স্ট্রাসবার্গ-এর কাছে মেথড অ্যাক্টিং শিখতে যেতেন। অত্যন্ত নিবিড় ভাবে অধ্যয়ন করেছেন সিনেমার নির্মাণপ্রক্রিয়া। তিনি নিজেও বলেন যে, এই অভিজ্ঞতাসমূহ তাঁর নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ। তাঁর এপিফ্যানি প্রথম প্রেমের মতো ‘প্রথম স্বাদ প্রকৃত অভিনয়ের আর আমি আটকে গেলাম।’ প্রযোজকরা চেয়েছিলেন যাতে তিনি রিটা হেওয়ার্থ-এর অনুরূপ এক অপ্সরায় রূপান্তরিত হন। কিন্তু মেরিলিন জানতেন, হলিউডের ছকভাঙা অঙ্ক তাঁর নয়। এলিয়া কাজ়ান, মার্লন ব্র্যান্ডো, নিকোলাস রে ও ইউল ব্রেনারের মতো অনুরাগী বন্ধু থাকায় তাঁর হলিউডের নির্বিকল্প রানি হয়ে ওঠায় কোনও মেধার সমস্যা ছিল না। এক জন সচ্ছল মেধাবিনীকে আমৃত্যু বুদ্ধিহীন রূপসী ও যৌনপ্রতিমা হিসেবে শুটিং ফ্লোরে কাজ করতে হল— নিজেকে এমন নিয়মিত ভিন্ন রূপে পরিবেশন করার ক্ষমতা ক’জনের থাকে? ‘প্লেবয়’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা তাঁর ছবি মলাটে ছাপল, ভিতরে তাঁর সেন্টারস্প্রেড ছবির নগ্নতা কত ঋষির তপোভঙ্গের কারণ হল, কিন্তু হাসিমুখে মেরিলিন জানিয়ে গেলেন, “আমি যখন দরকার বুদ্ধিমতীর ঝকঝকে অভিনয় করতেই পারি, কিন্তু বেশির ভাগ পুরুষেরা এটা চায় না।” ফলে তাকে পুং-দৃষ্টিপথের নিশানা হয়েই থাকতে হল। শুধু তা-ই নয়, হলিউড তাঁকে রিটা হেওয়ার্থ-এর একটি জলছবি বানাতে চেয়েছিল। সাদা পোশাক-পরিহিতা, ব্লিচ করা এই স্বর্ণকেশিনীকে হতমান ও আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ পুরুষের প্রমোদ উদ্যানের প্রজাপতি হয়ে উড়তে হয়েছে। বিষ্ণু দে হয়তো মেরিলিনের অনুরূপ কাউকে দেখেই লিখেছিলেন ‘জন্মাষ্টমী’! এই কবিতার কতিপয় চরণ: “বিদ্যাসুন্দরের যত নব্য হৈচৈ!/ কলম্বস-আবিষ্কৃতা, বিদেশিনী মহাশ্বেতা,/ স্নানসজ্জা বাহু আর কদলীদলিত ঊরু/ বৃথাই নাড়ালে/ পল্লব অঞ্জন চোখে মুক্তাবিন্দু খল শোকে/ বৃথাই দাঁড়ালে।”

তবু মেরিলিন, তাঁর জীবনীকাররা জানাচ্ছেন, নিজের ভঙ্গি ও বাচনসুষমা নিয়ে নিজের মিমিক্রিও করতেন মাঝে মাঝে। অর্থাৎ আধুনিক অর্থেই তিনি ছিলেন পাবলো পিকাসোর ‘আয়নার সামনে তরুণী’ (১৯৩২)। অথচ এই মদালসা রমণীর পড়ার ঘরে থাকত ‘মাদাম বোভারি’ ও ‘ইউলিসিস’, জ্যাক কেরুয়াক ও স্যামুয়েল বেকেটের লেখা তিনি পছন্দ করতেন। আলব্যেয়র কামু-র ‘দি ফল’ তাঁর হাতব্যাগে থাকত। এমনকি যা সচরাচর আলোচনাই হয় না, নাট্যকার আর্থার মিলারের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব, প্রণয় ও পরিণয়ের ফলে মেরিলিন আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা ‘ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন’-এর রোষদৃষ্টিতে পড়েন। যদিও গোপন তদন্তে আমেরিকান কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে মেরিলিনের যোগাযোগের সুনির্দিষ্ট কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবু এফবিআই তাদের মন্তব্যে লেখে যে, “মেরিলিন অত্যন্ত ইতিবাচক ও সংহত ভাবে বামপন্থী। যদি বা তিনি কমিউনিস্টদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়ে থাকেন, লস অ্যাঞ্জেলেসের শ্রমিক আন্দোলনের কর্মীদের সে প্রসঙ্গে যদিও তেমন স্পষ্ট ধারণা নেই।” এ ছাড়াও জায়মান বিট প্রজন্ম ও প্রতি-সাংস্কৃতিক সাহিত্যকর্মীদের প্রতি উৎসাহ ছিল তাঁর। সংযোগ ছিল ডিলান টমাস ও পাসোলিনির সঙ্গেও। নিজের খসড়া খাতায় লিখতেন নানা কবিতা। আর্থার মিলারের ভাষায়, তেমন সমাপ্ত কিছু নয়, ঈষৎ পরিমার্জনা হয়তো দরকার ছিল। যেমন একটি ছোট লেখায় মেরিলিন লিখেছেন: “ওগো আমার পুতুল কেঁদো না তুমি/ কেঁদো না/ আমি তোমায় কোলে নিয়ে দোলা দিয়ে/ ঘুম পাড়িয়ে দেব/ চুপ! চুপ! আমি এখন ভান করছি যে/ আমি তোমার মা নই যে মারা গেছে/ সাহায্য করো সাহায্য করো/ হাত বাড়িয়ে দাও বুঝতে যে জীবনের কাছাকাছি আছি/ যখন আমি যখন আমি যা চাই তা মৃত্যু।”

আর একটি লেখায় লিখছেন: “সব সময়ই কিছু সেতু আছে— ব্রুকলিন ব্রিজ/ না, না, ব্রুকলিন ব্রিজ নয়/ যে-হেতু আমি ওই সেতুটাকে ভালবাসি/ (সব কিছুই ওখান থেকে মনোরম আর বাতাস খুব পরিষ্কার)/ সেখানে হেঁটে যাওয়া মনে হয় শান্তির/ যদিও তলায় গাড়িগুলো পাগলের মতো যাচ্ছে/ সুতরাং এটা নিশ্চয়ই অন্য কোনও ব্রিজ হবে/ একটা কুৎসিত কিছু, কোনও দৃশ্য নেই/ ব্যতিক্রম শুধু/ আমি/ বিশেষ ভাবে যেমন অন্য সব ব্রিজের মধ্যে—/ একটা কিছু আছে আর তা ছাড়া/ আমি কোনও কুৎসিত সেতু দেখিনি।”

অন্য একটি কবিতা— “ওগো সময়/ একটু দয়ালু হও।/ এই ক্লান্ত মানুষটাকে/ ভুলতে দাও সেই স্মৃতি/ যা বিষাদের/ আমার একাকিত্ব ঢিলে করে দাও/ মনটাকে হালকা করে দাও/ যখন তুমি কুরে খাচ্ছ আমার দেহ।”

মনোবিদের পরামর্শ তাকে রক্ষা করতে পারেনি। সমুদ্রের অনন্ত তটরেখা থেকে তিনি রাজহাঁসের মতো উড়ে গেছেন। যে যায় হারিয়ে যায় শূন্যে মায়াসারসের মতো। আজ শতবর্ষের মুহূর্তে মনে হল, এই গরিব পৃথিবী একটি অনাথিনীকে আশ্রয় দিতে পারেনি। হয়তো ইতিহাস দেবে বলেই।

আরও পড়ুন