পুষ্পসজ্জা: বাংলাদেশের ঢাকায় ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-উপলক্ষে সেজে উঠছে ভাষা-শহিদদের স্মরণে নির্মিত শহিদ মিনার। ছবি: বাপী রায় চৌধুরী।
দীর্ঘদিন অক্ষর সহবাসে আছি। বাংলা ভাষা, ধ্বনি, এমনকি তার বর্ণমালারও কত দেয়ালা, কত বিভঙ্গ! তাই নিয়ে মজে আছি এ জন্ম। বর্ণের শুদ্ধ ভুল নিয়ে যে কত পাগলামি ছিল! ‘নদী’ বানান কখনও হ্রস্ব-ই লিখব না। আর ‘মিঠি’, লিখতে দীর্ঘ-ঈ দিলে, দাঁতে মিছরিদানা লেগে থাকবে। গলবে না। এই রকম কত কী! বৈশ্য কন্যার যাবতীয় পাটোয়ারি বুদ্ধি নিয়ে মূলস্রোতে ভেসে থাকার হাপোর-ঝাপোড় চেষ্টা চালালে মন্দ হত না। কিন্তু বুঝেছি, দূরে বসে সে প্রয়াস সহজ হবে না কিছুতেই।
‘তোমার খুকি কিচ্ছু বোঝে না মা, তোমার খুকি ভারি ছেলেমানুষ’... বিংশ শতাব্দী পেরিয়ে একবিংশতির শূন্য দশকেও কলকাতা এমন ছেলেমানুষ, প্রশ্ন করে— “তোমাদের ওখানে ট্রেন যায়? ছয়ের বা সাতের দশকে শুনেছি...”
“বাঃ! জামাটা তো খুব সুন্দর দেখতে, এখানে এসে কিনেছ?”
“না তো, আমাদের টাউনেই।”
“ওখানে দোকান-বাজার আছে?”
“যাবা। গেলেই দেখতে পাবা।”
কলকাতার কাছে উত্তরবঙ্গ মানে দার্জিলিং। কালিম্পং, কার্শিয়াং, ভুটান, সিকিম— বিভিন্ন হোটেল, হোম-স্টে। কোন জেলা, কোন স্টেশন পেরিয়ে যেতে হয়— জানা নেই। একটা জেলাশহরে ট্রেন যায় কি না, দোকান-বাজার আছে কি না, কুইজ় মাস্টার কলকাতার ওই সপ্রতিভ প্রশ্ন নিয়ে মফস্সলকে বিদ্রুপ করতে পারেনি, কিন্তু মফস্সলের ভাষা নিয়ে আমোদে ফেটে পড়েছে মহানগর। খাবা, যাবা, দিবা, করবা! ক্রিয়াপদের অপরিশীলিত স্থানীয় উচ্চারণ, সেই সঙ্গে বিহার-রাজমহল সন্নিহিত ‘খোট্টা’ ভাষার চোরাটান— লোকজনের প্রচুর আমোদের খোরাক। মহানগরীর বাইরে— অন্যান্য জেলা শহরেরও একই রকম অভিজ্ঞতা। মেদিনীপুরের মানুষ টুম্পা, মালদার বাদিয়া, আরও কত কত ডাকনাম।
তো ভাষা নিয়ে কেন্দ্র-নগরীর এই সব বামুনগিরি দেখতে দেখতে মনে হয়, ‘এসো এসো পুরুলিয়া, মেদিনীপুর, ২৪ পরগনা, বাঁকুড়া, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, দার্জিলিং... আরও আরও বাদ পড়ে যাওয়া জেলা-মফস্সল-গঞ্জ, দল বেঁধে এসো— মাঠঘাট খেতখামার এসো কোমর বেঁধে। নিজের ভাষা, গদ্য-পদ্য-প্রবন্ধ-গান এসো। জানো। জানাও মান্য বাংলার বাইরে আরও কত বাংলা। এই মাসই তো জানার, জানাবার উপযুক্ত সময়।’
এই ফেব্রুয়ারি। গাঁদাফুল আর পলাশ জড়ানো। মাঘের শেষ আর ফাল্গুনের শুরু। ভ্যালেন্টাইন’স ডে, মাঘীপূর্ণিমা... হলুদ গোলাপ, গোলাপি খাম, গঙ্গাস্নান, একটু ধোঁয়া মাখা লালচে চাঁদ। সেই চাঁদ দেখলাম বড়দির বাড়িতে যাওয়া আর ফিরে আসার সময়। মাঘীপূর্ণিমায় খিচুড়ি খেয়েছে ওরা। খুব ছোটবেলায় রাম সিং-এর রিকশায় বাবা-মার সঙ্গে গঙ্গাস্নানের জন্য শাদুল্লাপুর অভিযান ছিল আমার। মাটির হাঁড়িতে আতপচাল-মুগডালের খিচুড়ি। মড়া পুড়িয়ে এসে হাতি-পায়া লুচি দিয়ে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত শ্মশানযাত্রীর ক্ষুন্নিবৃত্তি।
ফেব্রুয়ারি নিয়ে লিখতে বসে এই সব গঞ্জ-কথা, শ্মশান-কথা লিখছি কেন! কারণ নানা রকম বাদিয়া বার্তা, গৈ-গেরাম, ধানবাড়ি-গানবাড়ি, শেরশা-বাদিয়া, সাদরি, সূর্যাপুরী— ঝুড়ি আর ধামাভর্তি গপ্পো, কিস্সা আর ছিলকা নিয়ে হাজির। কেন? কারণ ফেব্রুয়ারি। একুশে ফেব্রুয়ারি— মাতৃভাষা দিবস। পুরোটাই জানি। পশ্চিম পাকিস্তান বাংলা হটিয়ে উর্দু ভাষা চাপাতে চাইছিল পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের ঘাড়ে।
তার পর কী ভয়ানক লড়াই হল মা?
না। না। কিছু লড়াই না। বাচ্চা বাচ্চা খালিহাত কিশোর-যুবকদের সঙ্গে, রাষ্ট্রের আবার লড়াই কী! দুমদাম গুলি খেয়ে মরল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এম এ-র শেষবর্ষের ছাত্র আবুল বরকত, মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজের আই কম-এর ছাত্র রফিকউদ্দীন আহমেদ ও গফরগাঁওয়ের কৃষক পরিবারের ছেলে আবদুল জব্বার। বসন্তে ফাল্গুন, নাকি চৈত্রের ঝড়ে পড়ে গেল তারা। বাংলা ভাষার জন্য। ব্যবহারিক সুবিধের জন্য সেদিন ৮ ফাল্গুন নয়, সেদিন একুশে ফেব্রুয়ারি— ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’
একবিংশের শুরুতে আমরা ঘরোয়া ভাবে একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করেছি। ১৯৯৯-এর ১৭ নভেম্বর রাষ্ট্রপুঞ্জ ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। কবি, লেখক ভাইরা জেলাশহর ছেড়ে বাইরে পড়তে যায়। নানা রকম উদ্যাপন, ছোট কাগজ, নতুন বই, নতুন ভাবনার ঢেউ আসে। তুহিন দাশ আসেন ‘তরাই গন্ডার’ নিয়ে— ‘হেই ভারতবর্ষ আছেন নাকি’...
ভারতবর্ষ যে শৌখিন মধ্যবিত্তর বৈঠকখানায় নেই, তা জানতেন। তবু সেখানকার সাহিত্যসভায় দাস কাটিয়া দাশ হতে হয়! ‘চিরকুট’ উপন্যাসে গুলু, গুরুদাস সাহা ছোট পত্রিকায় কবিতা লিখেছে জেনে অনীক চট্টোপাধ্যায় তাকে চেপে ধরেন।
“কোন চান্স নেই। বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারির কয়েকজন সাহিত্যিক আর কবির নাম করে যা—”
“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়...”
“ব্যাস ব্যাস, ওতেই হবে, আর কবি?”
“রবি ঠাকুর... নজরুল, মাইকেল মধুসূদন, সুকান্ত ভট্টাচার্য, বীরেন চাটুজ্যে।”
“তো কি বুঝলি?”
বুলা, হীরুর না বোঝা মুখের দিকে তাকিয়ে, অনীকদা বলেন— “সবাই চাটুজ্জ্যে, বাঁড়ুজ্যে রে। একটা দুটো দত্ত আর ঘোষ পাবি। মুসলমান আর ক্রিশ্চান হলে প্লাস পয়েন্ট। কিন্তু একটা দেখা সাহা কি হালদার দন্ত্য স দাস দেখা।... ”
সেই জন্যই কি প্রতিবাদী, প্রতিষ্ঠানবিরোধী তুহিনদা তালব্য শ লিখলেন! কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ তো তখন শুধু শ্রেণিবৈষম্যে বিশ্বাস করে, বর্ণবৈষম্যে নয়। তবুও!
বাংলা নিয়ে পাগলামি ছিল। বাংলা নিয়ে শিরোনাম চাই। ইশকুল কলেজ আপিসে বাংলা প্রতিবেদন চাই। এই সব দাবিদাওয়ায় ব্যস্ত থাকতে থাকতে এক সময় দেখি মহানগরীর বাংলা মাধ্যম ইশকুলগুলো কেমন ঝাঁপ ফেলে দিচ্ছে। ডাক দফতর বাংলায় লেখা ঠিকানা নিতে চাইছে না, এমন নয় যে চিঠি বাংলার বাইরে যাবে। শিক্ষিত বাঙালি বাংলা মাধ্যমে পাশ করে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ছেলেমেয়েদের পড়াচ্ছেন ইংরেজি মাধ্যমে। বিংশ শতাব্দীর শেষ দশক থেকে শোনা যাচ্ছিল, বিশ্বায়ন আসছে। কিন্তু সেটা যে কী, খায় না গায়ে মাখে বুঝতে বুঝতেই মুখ বিজ্ঞাপনে ঢেকে যায়। গদ্য পদ্য প্রবন্ধ গল্প উপন্যাস— কার কোমর ধরে উড়ে যাব, নাকি মাটি কামড়ে প্রতিরোধে যাব? মাটি— জানি না কি আমরা! কলোনি জানে! কলাই খেতের মতো গাঢ় রং, ‘ভিটেমাটি’-র সম্পাদক হরিচরণ সরকার মণ্ডল— টাউনের সাহিত্য বাসরে চুপচাপ কবিতা পাঠ করে নেবে যান। শহর প্রতিক্রিয়াহীন! ভাষাটা যেন কেমন না! তিনি শহরে থাকেন কিন্তু গ্রামীণ ইশকুলের শিক্ষক। মাটি কামড়ে চালান প্রতিরোধের লড়াই। আমরা যে মান্য বাংলা বলি, তার বাইরে তো অনেক ভাষা — সেগুলো শুনবেন না, দিদিমণি?
আরে! কে বলে শুনব না! আমরা তো শুনতেই চাই। শিখতেও চাই। আঞ্চলিক ভাষার কবিতা তো পারব না। কিন্তু গদ্য-গল্প-উপন্যাস শিখতে গেলে, স্থানিক আবহ, ঘ্রাণ আনতে এখানকার ভাষা শুনব না? বড় হয়েছি কলোনিতে। পুব বাংলা থেকে আসা একাশিটি পরিবার। সরকারি চাকুরে সবাই, তাই পাঁচমেশালি বৃত্তের মানুষ নেই। দুই-এক ঘর বাদে সবাই সরকারি রাজস্ব সংগ্রহ বা অন্য কোনও সরকারি বিভাগ। এক জন করে শিক্ষক, অধ্যাপক ও ডাক্তারও আছেন। কিন্তু করণিককুলই সংখ্যাগরিষ্ঠ। ছিন্নমূল মানুষের এ-পারে যে নিশ্চিন্ত আশ্রয়, সে তো সরকারি চাকরির সূত্রে। মাটিতে পা রাখার জন্য চাকরিই প্রথম চাহিদা, সুতরাং প্রাণপণে লেখাপড়া। জেলার স্থানীয় লোকের সঙ্গে মেলামেশা কিংবা তাঁদের ভাষার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে— তা তো নয়।
ফি-বছর গরমকালে কলোনির মাঠে একখণ্ড শামিয়ানার নীচে কিছু মানুষের তুমুল রঙ্গরস। বাঘছাল পরা জটাজূটধারী ছাইমাখা শিব— ঈশ্বর তিনি, দেবাদিদেব। অথচ ছেঁড়া গেঞ্জি, চোখে পিঁচুটি পড়া কিছু দরিদ্র মানুষের বাক্যবাণে কোণঠাসা, বিধ্বস্ত, আত্মরক্ষায় পরাঙ্মুখ। অথচ তাঁকে এই লোকগুলো বেশ ঘটা করেই ডেকে এনেছে। এই হেটো মানুষদের দলপতি মটরবাবুর পরিচয় বলে দেওয়ার দরকার হয় না— চেহারায়, কণ্ঠস্বরে, বাচনভঙ্গি, হাস্যরসে, অঙ্গভঙ্গিতে তিনি স্বতন্ত্র। তাঁর প্রকাশভঙ্গি এমনই রসপূর্ণ যে, রামগরুড়ের ছানা হয়ে থাকা যায় না। নাক-উঁচু বাবুসমাজও সে গানে মজে। সারা চৈত্র জুড়েই ঈশ্বরের ফোটোকপিরা নানা বেশে দোকানে দোকানে, পাড়ায় পাড়ায় নেচে বেড়ায়। সংক্রান্তির ভোরে এঁদেরই জমজমাট রোড-শো আর রাতে পিঠে বঁড়শি গেঁথে ঝুলে পড়ার আমোদ। এঁদের যাপন, রহন-সহন— লেখায় আনতে হলে মান্য বাংলায় কি ঠিক কুলোবে?
এই যে একবিংশ শুরু হতে না হতেই আমার জেলা ভাঙনে জেরবার হল— ভিটে হারাল— জমি জীবিকা সব গেল মা গঙ্গার পেটে, সেই ভাষ্য, সেই ঘটনাপ্রবাহ তো তাঁদের মুখেই শোনা ভাল। জমি হারিয়ে ঘর হারিয়ে যাঁরা বহুতল আর মিনার বানানোর শ্রমিক, মহান ভারতবর্ষের ভিন্প্রদেশে নিজের ভাষা বলতে গিয়ে পিটুনি, হত্যা... এই সব জলবালু-কথা উঠে আসুক বরিন্দ, দিয়ারা, টালের কলমে। বিভিন্ন জেলায়, বিভিন্ন ভাষায়, বিভিন্ন প্রেক্ষিতে। খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ অধিকাংশই সংখ্যালঘু এবং নিম্নবর্গের শূদ্র। উচ্চবর্ণের সেবা, পদলেহন করে বেঁচে থাকাই তাঁদের কাজ। বর্ণবাদী দমন দলনের শিকার তাঁরা। শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, জ্ঞান, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, সব কিছু থেকে পরিকল্পিত ভাবে বঞ্চিত। তাঁরা বর্ণবাদী দলনের শিকার তাই, দলিত।
যাপনের বৈচিত্র, শোষণ বা দলনের অভিজ্ঞতা, শহুরে ভূগোলের বাইরে তাঁদের বেঁচে থাকার নানা রকম তরিকা ও কেরামতি, প্রকাশের ভাষা ও ভঙ্গিও আলাদা। সাহিত্য জিনিসটা তথাকথিত সুকুমার বৃত্তি হিসেবেই থেকে গেছে। ব্রাত্যদের বাগ্বৈশিষ্ট্য ও উচ্চারণরীতি ভাষায় ঢোকানোর কলজে ভদ্রলোকদের হয়নি। বাংলা ভাষা তো শুধু রাজধানীর, মান্য বাঙালির নয়। হোক না আরো খোলামেলা। গাঁইয়া। বাদিয়া। রোদজল বঞ্চনা রক্ত মেখে থাকুক না তাঁদের প্রত্যক্ষ যাপনচিত্র।
তাঁদের নিয়ে দলিত আকাদেমির ঘোষণায় এক শ্রেণির উচ্চবর্ণ বিশিষ্ট জনেরা কেন যে এমন ত্রাহি ত্রাহি রব তুললেন! নিম্নবর্গ সমীক্ষা, ভারতীয় সাহিত্য, দলিত সাহিত্য নিয়ে যতই মাতামাতি হোক— বাংলা বাজার, বাঙালি পাঠিকা-পাঠক সেই থোড়বড়ি খাড়া উচ্চবর্ণের অন্দরমহলের কেচ্ছা-কাহিনি দেখতে, পড়তে ভালবাসে। ভয় নেই, আপনাদের বাজার কিছু মার খাবে না।
বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে— উত্তর থেকে দক্ষিণে, পুবে পশ্চিমে নানা ধরনের বাংলা ভাষার সম্ভারের খোঁজ পাওয়া যায় ‘লিটল ম্যাগাজ়িন’ বা ক্ষুদ্র সাহিত্যপত্রিকাগুলিতে। এই পত্রিকাগুলি কোনও সমান্তরাল সাহিত্যসৃষ্টির আখড়া নয়। বরং এর অবস্থান প্রচলিত সাহিত্যের বিপরীতে। মানুষকে অবলম্বন করেই সাহিত্য। কিন্তু জনজীবনের শোষণ-বঞ্চনাকে অবলম্বন করে লিখে সহানুভূতি, করুণা সৃষ্টি নয়, বরং ক্ষুদ্র সাহিত্যপত্রিকার কাজ, নিম্নকোটির মানুষের গা-গতরের ভাষা ব্যবহার করে ভদ্দরলোকদের হাত থেকে বাঁচানো। পাঠককে তৃপ্তি দেওয়া বা ভাত-ঘুম উচ্চাশা থেকে বেরিয়ে... স্থানিক ভাষা, দৈনন্দিন জীবনের অশিষ্ট ভাষা ও সেই ভাষার সাযুজ্যে নিম্নবর্গের মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রতিফলিত করা। কাজটা কঠিন। ভদ্রলোকের পক্ষেও কঠিন। দলিতরাই পারবেন।
ভারতে দলিত ছাতার নীচে এক সঙ্গে রাজবংশীয়, অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি ও মুসলমানরা আসবেন। ‘দলিত’ কিন্তু কোনও ‘জাত’ নয়, দলিত একটা সত্তা। এই ‘দলিত’ শব্দ কিন্তু বহু পুরনো। একবিংশের দ্বিতীয় শতকে, এ নিয়ে হুজ্জুতি কেন, কে জানে! ১৯৯২-এ অর্জুন ডাঙ্গলের সম্পাদনায় বেরিয়েছে, ‘পয়জ়নড ব্রেড’— দলিত গল্প, কবিতা, আত্মজীবনী, আলোচনার সঙ্কলন। এর সঙ্গে সঙ্কলিত হয়েছে বাবাসাহেব আম্বেডকর হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে দলিত আন্দোলন শুরু করে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তার অনুলিখনের ইংরেজি অনুবাদ। ১৯২৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর মাহাড়ে অস্পৃশ্যদের জন্য নিষিদ্ধ চাভাদর লেকের জলপান করে বাবাসাহেব হিন্দুদের বিরুদ্ধে দলিত আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৫৬-র ডিসেম্বরেই প্রথম দলিত সাহিত্য সম্মেলন ডাকা হয়েছিল, কিন্তু আম্বেডকরের মৃত্যুতে প্রথম সম্মেলন হয় ১৯৪৮ সনে। এত সব কথা লিখলাম, দেবেশ রায় সম্পাদিত সাহিত্য আকাদেমির ‘দলিত’ বই থেকে। এ বই মান্য সাহিত্যের দিকপালরা দেখেননি, ভাবতে কষ্ট হয়। অবাক লাগে! এই না জানা, উপেক্ষা, ব্যঙ্গ, ব্যঙ্গের মোড়কে আঘাত— এটাই ব্রাহ্মণ্যবাদ।
এ প্রসঙ্গে বলা ভাল, এই উপেক্ষা শুধু শূদ্রের জন্য নয়। নারীদের জন্যও। সাহিত্যের জগতে ‘অর্ধেক আকাশ’—ইত্যাদি বলে মেয়েদের যে তোল্লাই দেওয়ার রেওয়াজ, সেখানে দেখা দরকার মেয়েদের অবস্থানটা, ঠিক কোথায়! অর্ধেক আকাশ বলে আদৌ কোনও কথা হয় না। একটাই আকাশ। সাহিত্য মানে পুরুষ-অধ্যুষিত রাজত্ব। তাই লেখার ক্ষেত্রে, আলোচনার ক্ষেত্রে মেয়েদের লেখাকে তাঁরা উপেক্ষা করেন। ‘সেরিব্রালিটি নেই’ বলেন। মেয়েদের মধ্যে ভাল লিখছে বলে লিঙ্গভিত্তিক গোষ্ঠীতে আটকে রাখতে চান, সামগ্রিক উৎকর্ষের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করেন সুচতুর ভাবে। উল্লেখ না করার মধ্যে মুছে ফেলার একটা রাজনীতি আছে।
একই ভাবে দলিত কলম— সে নারী, পুরুষ যাঁর কলম-ই হোন না কেন— তাঁদের জন্য থাকে শুধু উপেক্ষা পরিহাস আর অবজ্ঞা। ওই ‘মেয়েদের মধ্যে ভাল লেখে’ বা দলিত কলমকে ‘দলিতের মধ্যে ভাল লেখে’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার প্রয়াস। এতে প্রশংসার ছলে তার পরিসরকে সঙ্কীর্ণ করে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলে।
সাহিত্যে মেয়েদের ক্ষেত্রে ‘অর্ধেক আকাশ’ শব্দটা ব্যবহার করে একটা সাম্যবাদী ফ্লেভার আনার চেষ্টা চলে। সেখানে দেখতে চাই, নারীর অবস্থানটা কোথায়! রবীন্দ্রনাথ নারীর অবস্থান নিয়ে বলেছেন: “মানব সমাজে স্ত্রীলোক সর্বাপেক্ষা পুরাতন, পুরুষ নানা কার্য নানা অবস্থা নানা পরিবর্তনের মধ্যে সর্বদাই চঞ্চল ভাবে প্রভাবিত হইয়া আসিতেছে: স্ত্রীলোক স্থায়ীভাবে কেবলই জননী ও পত্মীরূপে বিরাজ করিতেছে, কোনো বিপ্লবেই তাহাকে বিক্ষিপ্ত করে নাই। এই জন্য সমাজের মর্মের মধ্যে নারী এমন সুন্দর রূপে সংহত রূপে মিশ্রিত হইয়া গিয়াছে”... এখানে তাকে গোষ্ঠীবদ্ধ করা হল। আবার চিহ্নিত করা হল জননী ও পত্নীরূপে। পৃথিবীতে একটি জাতি মানব জাতি। তার আবার দুই ভাগ —স্ত্রী, পুরুষ। স্ত্রী জাতিকেও দাগ কেটে দু’জন করেছে— সতী, যিনি ঘরনি, পতিব্রতা। অসতী— যিনি বহুবল্লভা ইত্যাদি। পুরুষও জনক ও পতি। কিন্তু আমরা কখনও বলি না, পুরুষ জগতে পিতা ও পতিরূপে বিরাজ করে।
কিন্তু এ অবস্থা তো পাল্টেছে। তীক্ষ্ণ ঝকঝকে মেধাবী মাটি সংলগ্ন, জীবনের ওঠাপড়া গায়ে মেখে দগ্ধ অগ্নিবর্ণ অক্ষররা উঠে আসছে— কী দাপ এবং তাপ তাঁদের কণ্ঠে। লেখনীতে। উত্তর দক্ষিণ পুব পশ্চিমে—দাবিয়ে রাখা, দমিয়ে রাখা কণ্ঠ উঠে আসছে যন্ত্রণা আর উল্লাস নিয়ে। আমরা পুরুষ-লেখক নারী-লেখক বলতে ভালবাসি না। বলব না। মেয়েরাও ভালবাসে না সংরক্ষিত লেডিজ় কম্পার্টমেন্টে উঠতে। বঙ্কিমচন্দ্র থেকে আজকের তরুণ লেখকগোষ্ঠীর লেখার কথা যখন বলি— আমরা গোষ্ঠীর দিকে আঙুল তুলে বলি না— পুরুষের লেখায় সেরিব্রাল এলিমেন্ট খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা বলতে পারি, জনপ্রিয় লেখক হয়েও তিনি কেন আমাদের প্রিয় নন। অন্যধারার লেখক কেন আমাদের প্রিয়। এখানে আমরা গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে বলি না— পুরুষের লেখা ভাল লাগে না। একই ভাবে বলি না, দলিতের লেখায় সেরিব্রাল এলিমেন্ট নেই। পড়ি না। যাঁদের ছায়া মাড়াতে সমাজের ভয়, ঘৃণা— সেই গোষ্ঠীর, সেই অবহেলিতদের আবার সাহিত্য কোথায়!
আসলে ভয়। সত্যি কথা, মাটির কথা, মানুষের কথা—তাঁদের বিরুদ্ধে ঘটে চলা সীমাহীন অন্যায়ের কথা শুনতে ভালবাসে না নব্য ভারত। সহস্রবর্ষ ব্যাপী শোষণের প্রতিকার চেয়ে খানা-খন্দ-খাদান থেকে উঠে আসা কণ্ঠকে ভয় তারা পায়। কারণ এখন তাঁদের প্রতিবাদ ধার করা মান্য বাংলায় নয়, আঞ্চলিক ভাষাগুলি খুঁজে নিচ্ছে ওড়ার আকাশ।
নিজের জেলায় বরিন্দ, টাল, দিয়ারা, পলিয়া, চাঁইমণ্ডল, খারোয়ার, বাদিয়া... কত বিভঙ্গে দুই মলাটে নিজেদের জানান দিচ্ছে... প্রতিটি জেলাতেই এই প্রচেষ্টা। দেখতে পাব স্থানাঙ্ক নির্ণয়ের মরিয়া প্রচেষ্টা। দলিতের লেখায় সেরিব্রাল এলিমেন্ট নেই, পড়ি না— এই উন্নাসিকতার দিন শেষ। বরং এই যে, কেন্দ্র ভেঙে বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা ঘরের নানা স্বর উঠে আসছে— তাঁদেরকে আমরা বরণ করে নিতে চাই। লিপি হারিয়ে গেলে, ‘আমরা এত গরিব যে বর্ণমালাও রাখতে পারিনি’-র শোক চেপে, বইতে হয় আন্তর্জাতিক হওয়ার পাপ।
অন্যায় অপরিণামদর্শী ভাগাভাগিতে বাংলার কত অংশ কেটে অন্য রাজ্যে চলে গেছে, দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকতে থাকতে লেখকরা কত পরদেশি শব্দ নিয়ে এসেছেন বাংলার ভান্ডারে, বর্ণহিন্দুর বাইরেও আছেন কত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, জাতি, উপজাতি— তাঁদের ভান্ডারেও বিবিধ রতন—তারা আমার হাতে রাখে হাত, আমি তারে পারি না এড়াতে। শুনি। বারবার শুনতে চাই— অন্য ঘর আর অন্য স্বরের কথা।