Tsunami with Earthquake in Greenland

৬০ তলা বাড়ির সমান উঁচু ঢেউয়ের সুনামি! বিশ্ব জুড়ে ভূমিকম্প হয়েছিল টানা ন’দিন, অবশেষে রহস্য উদ্‌ঘাটন

গ্রিনল্যান্ডের পূর্ব প্রান্তের সুনামির পর টানা ন’দিন ধরে ভূমিকম্প হয়। ঢেউ উঠেছিল ৬৫০ ফুট পর্যন্ত। এর আগে আরও কোনও সুনামিতে এই ধরনের ঘটনা লক্ষ করা যায়নি।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৬
৬৫০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে কেঁপে উঠেছিল আলাস্কা থেকে অস্ট্রেলিয়া।

৬৫০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে কেঁপে উঠেছিল আলাস্কা থেকে অস্ট্রেলিয়া। ছবি: পিক্স্যাবে।

২০০৪ সালের যে সুনামি গোটা বিশ্বে সাড়া ফেলেছিল, তাতেও ঢেউয়ের উচ্চতা ১০০ থেকে ১৫০ ফুটের বেশি হয়নি। ভারত ছাড়াও সেই সুনামিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, তাইল্যান্ডের মতো সমুদ্র তীরবর্তী দেশ। কিন্তু তাই বলে ২০০ নয়, ৩০০ নয়, ঢেউয়ের উচ্চতা একেবারে ৬৫০ ফুট! ৬০ তলা বাড়ির সমান!

Advertisement

২০২৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এমনই এক সুনামির অভিশাপ নেমেছিল পৃথিবীর বুকে। টানা ন’দিন ধরে ভূমিকম্প হয়েছিল বিশ্ব জুড়ে। এই ধাঁধার উত্তর পেতে দিনের পর দিন ধরে কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্য এবং ভূকম্পন তরঙ্গের দিকে চোখ রেখেছিলেন বিজ্ঞানীরা। অবশেষে রহস্যের কিনারা করা গেল।

গ্রিনল্যান্ডের পূর্ব প্রান্ত এমনিতে শান্ত, স্থির এবং তুষারাবৃত। সেখানেই তিন হাজার ফুট উঁচু পর্বত দ্বারা বেষ্টিত একটি খাঁড়ি রয়েছে— নাম ডিকসন খাঁড়ি। ৬৫০ ফুট উচ্চতার ঢেউয়ের সুনামির সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের সেই খাঁড়ির যোগ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। বছর দুয়েক আগে ডিকসনের মধ্যে বরফের পাহাড় ভেঙে পড়েছিল। বিজ্ঞানীরা বলেন, প্রায় দু’কোটি ঘনমিটারের পাহাড় ভাঙায় সুনামির ঢেউ উঠেছিল ৬৫০ ফুট পর্যন্ত। এতে কোনও বিস্ময় নেই। কিন্তু সংশয়ের বীজ বোনে তার পরবর্তী ভূমিকম্প। কেন টানা ন’দিন ধরে ভূমিকম্প হল? কেনই বা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের রিখটার স্কেলে কম্পনের তরঙ্গ খেলে গেল সমানতালে?

গ্রিনল্যান্ডের জনবসতি নিতান্তই কম। ডিকসনের জলোচ্ছ্বাসে মানুষের কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে ইলা দ্বীপের একটি গবেষণাকেন্দ্রে দু’লক্ষ ডলারের (১.৭ কোটি টাকা) যন্ত্রপাতি, বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যায়। পাহাড় ভেঙে পড়ার পর ডিকসনের জল দীর্ঘ দিন ধরে উত্তাল ছিল। পাহাড়ের একটি দেওয়াল থেকে অন্য দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে বেড়িয়েছে। কৃত্রিম উপগ্রহচিত্রেও সেই ছবি ধরা পড়েছে। পরবর্তী সময়ে কম্পিউটার মডেলে দেখা গিয়েছে, ডিকসনের এই জলোচ্ছ্বাসের মধ্যেও নির্দিষ্ট ছন্দ ছিল। জলস্তর ৩০ ফুট করে উঠেছে এবং ৩০ ফুট করেই নেমেছে। এর ফলে সমুদ্রের তলদেশে প্রবল চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। সেটাই ভূকম্পনের উৎস হয়ে থাকতে পারে।

ভূমিকম্প হলে পরিমাপক যন্ত্রে সাধারণত একাধিক এলোমেলো রেখচিত্র ফুটে ওঠে। এ ক্ষেত্রে কিন্তু তা হয়নি। গ্রিনল্যান্ডের জলোচ্ছ্বাসের পর দেড় মিনিট বাদে বাদে মসৃণ রেখচিত্র পাওয়া যাচ্ছিল যন্ত্রে। প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে তা চলেছে। যদিও কম্পন ছিল মৃদু, সাধারণ মানুষ তা টের পাননি। তবে আলাস্কা থেকে অস্ট্রেলিয়ার ভূমিস্তরকে নাড়িয়ে দিয়েছিল এই জলোচ্ছ্বাস। এর আগে কোনও সুনামি পরবর্তী জলোচ্ছ্বাসে এই ছন্দ লক্ষ করা যায়নি। অভূতপূর্ব এই ঘটনার জন্য অনেকে ডিকসন খাঁড়ির আকারকে দায়ী করেছেন। কিন্তু সংশয় থেকেই গিয়েছে।

ভূতত্ত্ববিদ্যায় ডিকসন খাঁড়ির ঘটনা এতই আলোড়ন ফেলেছিল যে, বিশ্বের নানা প্রান্তে ৪১টি প্রতিষ্ঠান থেকে ৭০ জনেরও বেশি বিশেষজ্ঞ এই সংক্রান্ত গবেষণায় যোগ দেন। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের জিয়োলজিক্যাল সার্ভের সদস্য ক্রিস্টিয়ান ভেনেভিগ বলেন, ‘‘আমরা যখন এই গবেষণার সফর শুরু করেছিলাম, এটা কী ভাবে সম্ভব হল, তা নিয়ে কারও সামান্যতম ধারণাও ছিল না। আমরা শুধু জানতাম, পাহাড়ধসের সঙ্গে বিষয়টার সম্পর্ক রয়েছে। বড়সড় আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই রহস্য উদ্‌ঘাটন সম্ভব হয়েছে।’’ সুপারকম্পিউটার এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ঘটনার পুনর্নিমাণ করা হয়েছিল। কী ভাবে হিমবাহ গলে হুড়মুড়িয়ে পাহাড়ের একটি অংশ ভেঙে পড়ল এবং ডিকসন খাঁড়িতে তার কী প্রভাব পড়ল, তা কৃত্রিম ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন বিজ্ঞানীরা। বহু হিসাবনিকাশের পর মেলে সমাধান।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে ডিকসন খাঁড়ি সংলগ্ন পাহাড়ের বরফ অনেক দিন ধরেই গলছিল। অতীতেও একাধিক বার হিমবাহের বরফের চাঁই ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। কিন্তু আবার বরফ জমে গিয়ে সেই পতন ঠেকিয়ে দিয়েছিল। উষ্ণায়ন ও সমুদ্রের জলে শেষ পর্যন্ত পতন আর ঠেকিয়ে রাখা যায়নি। সান ফ্রান্সিসকোর সমুদ্রতত্ত্ববিদ অ্যালিস গ্যাব্রিয়েলের কথায়, ‘‘বিশ্ব জুড়ে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। যা আগে এত দিন অস্বাভাবিক ছিল, এখন তা স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে।’’ ২০১৭ সালেও গ্রিনল্যান্ডের অন্য একটি খাঁড়িতে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল, জানাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের একাংশের মতে, এমন সুনামি এবং তৎপরবর্তী কম্পন আগামী দিনে বিশ্ব উষ্ণায়নের আরও ভয়াবহ পরিণতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন থেকেই তার জন্য সতর্ক হওয়া দরকার।

Advertisement
আরও পড়ুন