উত্তর আমেরিকা পাতের নীচে প্রবেশ করছে ইয়াকুটাত মাইক্রোপ্লেট। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
উত্তর আমেরিকা মহাদেশের একেবারে উত্তর-পশ্চিম প্রান্ত। আলাস্কার ডেনালি ন্যাশনাল পার্কের মাটি কেঁপে উঠেছিল ২০০২ সালের নভেম্বরে। রিখটার স্কেলে সেই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭.৯। তীব্রতা এতটাই যে, সুদূর টেক্সাস, ওয়াশিংটন প্রদেশেও কম্পন অনুভূত হয়। সম্প্রতি ভেনেজ়ুয়েলার জোড়া ভূমিকম্পে বিধ্বংসী ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে ফের আলোচনায় উঠে এসেছে ২৪ বছর আগের সেই বিপর্যয়। বিজ্ঞানীরা তার উৎস নিয়ে গবেষণা করে নতুন একটি ভূমিকম্পের সরলরেখা আবিষ্কার করে ফেলেছেন। দাবি, সেই রেখা ধরেই বার বার ভূমিকম্প হচ্ছে!
আলাস্কার মাটি কেঁপেছিল ডেনালি-টটসুন্ডা ফল্ট (ফাটল) ধরে। ২০০২ সালের ওই বিপর্যয়ও তাই ‘ডেনালি ভূমিকম্প’ নামে পরিচিত। ভূমিকম্পের উৎসটিকে চিহ্নিত করে সম্প্রতি একটি গবেষণা করেছেন বিজ্ঞানীরা। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূকম্পন বিশারদ মেঘান মিলারের নেতৃত্বে সেই গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকার ‘দ্য সিস্মিক রেকর্ড’ নামের জার্নালে। এই গবেষণায় মেশিন লার্নিং পদ্ধতি ব্যবহার করে অতীতের ধারাবাহিক ছোটবড় ভূমিকম্পের একটি ‘ক্যাটালগ’ বা সূচি তৈরি করা হয়। দেখা গিয়েছে, একটি নির্দিষ্ট সরলরেখা ধরে ভূমিকম্পগুলি হয়েছে। একে শুধু রেখা না বলে বিজ্ঞানীরা ‘ক্ষুরধার প্রান্তরেখা’ বলে উল্লেখ করেছেন।
আলাস্কা রয়েছে উত্তর আমেরিকা মহাদেশীয় পাতের উপর। এর পাশেই রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত। এই দুই পাতের মাঝে একটি উপপাত বা মাইক্রোপ্লেটের নাম ইয়াকুটাত। সেখান থেকেই বিপর্যয়ের উৎপত্তি। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ইয়াকুটাত পাতটি উত্তর আমেরিকা পাতের নীচে ধীরে ধীরে ঢুকে যাচ্ছে। আগামী দিনে তা মহাদেশীয় পাতের সঙ্গেই মিশে যেতে চলেছে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। উত্তর আমেরিকা পাতের এবং ইয়াকুটাতের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে আছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাতও। ফলে জটিলতা বেড়েছে। গবেষকদের দাবি, ইয়াকুটাতের প্রান্তরেখা এত স্পষ্ট ভাবে আগে কখনও ধরা পড়েনি। মেঘানের মতে, এই রেখা আবিষ্কারের জন্য মেশিং লার্নিং পদ্ধতি ব্যবহার করা জরুরি ছিল।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ২৫০ কিলোমিটার লম্বা একটি রেখা। তাতেই পর পর ভূমিকম্প হয়ে চলেছে গত কয়েক দশক ধরে। কোনওটি টের পাওয়া যাচ্ছে, কোনওটি বিধ্বংসী হয়ে উঠছে, আবার কোনও কম্পনের অস্তিত্বই অনুভব করা যাচ্ছে না। মেঘান বলেন, ‘‘ইয়াকুটাত মাইক্রোপ্লেটের ধার বরাবর হাজার হাজার ছোট ছোট ভূমিকম্প একটি রৈখিক গুচ্ছ তৈরি করেছে। আগে যাদের শনাক্তই করা যায়নি। ভূ-অভ্যন্তরে তলিয়ে যাওয়া ইয়াকুটাত পাতের একটি সুনির্দিষ্ট প্রান্ত এর ফলে দৃশ্যমান হয়েছে। প্রাচীন পদ্ধতিতে এটি ধরা যায়নি। মেশিংন লার্নিং কাজে লেগেছে।’’
প্রান্তরেখাটিকে আরও স্পষ্ট করে তুলতে ভূমিকম্পের শব্দতরঙ্গের তথ্যও বিশ্লেষণ করেছেন মেঘানরা। সেখান থেকে জানা গিয়েছে, উত্তর আমেরিকা পাতের নীচে ইয়াকুটাত পাতের বিস্তৃতি সম্পর্কে এত দিন বিজ্ঞানীদের যা ধারণা ছিল, পাতটি তার চেয়েও অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। পাতগুলির এই ক্রমাগত সংঘর্ষের ফলে অঞ্চলটির উপর প্রবল চাপ তৈরি হচ্ছে। তা দক্ষিণ-মধ্য আলাস্কায় ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির আচরণে প্রভাব ফেলছে। মেঘানদের মতে, ভূ-পাতগুলির এই ঘনসন্নিবিষ্ট সংযোগস্থলটিই ২০০২ সালে ৭.৯ মাত্রার ডেনালি ভূমিকম্পের পটভূমি তৈরি করেছিল। আলাস্কার অভ্যন্তরে রেকর্ড করা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প ছিল সেটাই। তবে ওই কম্পনে তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। জনবিরল অঞ্চলে ভূমিকম্প হওয়ায় হতাহতেরও কোনও খবর আসেনি।
আলাস্কা সংলগ্ন আগ্নেয়গিরিগুলি ভূতাত্ত্বিক বিচারে তুলনামূলক নবীন। গবেষণায় দাবি, সেই আগ্নেয় ক্ষেত্রগুলি তৈরিতেও ইয়াকুটাত পাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ডেনালি ফল্ট এবং ইয়াকুটাত পাত নিয়ে আগামী দিনে আরও বিশদে গবেষণা হবে, আশাবাদী মেঘানরা।