El Nino

জলবায়ুর পরিবর্তনই কি ঘন ঘন ডেকে আনছে এল নিনো! তীব্র করছে সমুদ্রের উষ্ণ স্রোতকে? বিজ্ঞানীরা একমত নন

এল নিনো নিয়ে ১৯৫০ সালের আগে সে ভাবে খাতায় কলমে কোনও পরিসংখ্যান মেলে না। নাবিকদের ডায়েরি বা লিখিত নথি থেকে কিছু তথ্য পাওয়া যায়, তা-ও ১৮০০ শতক থেকে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৪ জুন ২০২৬ ০৯:০২

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

এ বছর ফিরে এসেছে এল নিনো। আবহবিদেরা সতর্ক করেছেন, আগের বারের থেকে আরও তীব্র হতে পারে সেই উষ্ণ স্রোত। তার প্রভাবে আরও বাড়তে পারে পৃথিবীর তাপমাত্রা। ভাঙতে পারে আগের রেকর্ড। জলবায়ুর পরিবর্তনই কি তীব্র করেছে এল নিনোকে, ফিরিয়ে আনছে বার বার? তার জেরেই কি বাড়ছে বিপর্যয়? এই নিয়ে শুরু হয়েছে তর্ক-বিতর্ক। এক দল বিজ্ঞানী জলবায়ুর পরিবর্তনকেই দায়ী করছেন। অন্য দল তা মানছেন না।

Advertisement

কয়েক বছর অন্তর আবির্ভাব হয় এল নিনোর। তার প্রভাবে গোটা পৃথিবীরই তাপমাত্রা বাড়ে। আবহবিদেরা জানিয়েছে, গোটা ২০২৭ সাল ধরে চলবে এই এল নিনো। তার প্রভাব পড়বে আবহাওয়ায়। গত কয়েক দশক ধরে ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে এল নিনোর তীব্রতা। ১৯৮০-র দশক থেকেই তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে বিজ্ঞানীরা। তাঁদের অনেকেই মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যই এল নিনোর তীব্রতা বাড়ছে। তার প্রভাবে উষ্ণতা বাড়ছে, কোথাও কোথাও খরার প্রকোপও বাড়ছে। তবে এক দল বিজ্ঞানীর দাবি, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং এল নিনো— এই দু’টি বিষয়কে মেলালে চলবে না। দুইয়ের যোগ নিয়ে যথেষ্ট প্রমাণ নেই।

বিজ্ঞানীদের মতে, এল নিনো অতিশয় জটিল এক প্রক্রিয়া। তার নেপথ্যে রয়েছে মহাসাগর এবং বায়ুমণ্ডলে একাধিক প্রক্রিয়া। ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, আমেরিকার সরকারি সংস্থা দ্য ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বলছে, এই এল নিনোকে কন্ট্রোল করে অনেকগুলি ‘সুইচ’। তার মধ্যে একটি হতে পারে জলবায়ুর পরিবর্তন। তা বলে এল নিনোর প্রভাব তীব্র করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা কতটা, সেই নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানের আইবিএস সেন্টার ফর ক্লাইমেনট ফিজিক্সের অধ্যাপক অ্যাক্সেল টিমারম্যান জানিয়েছেন, জলবায়ু প্রক্রিয়ার সবচেয়ে ‘কোলাহলপূর্ণ’ অংশ হল এল নিনো। সেই কোলাহলেই যে বদল হচ্ছে, তা ধরার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা।

‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ জানিয়েছে, মোট ১৬ জন বিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলেছেন প্রতিবেদকেরা। তাঁদের মধ্যে আট জনেরই দাবি, এল নিনো যে ক্রমে তীব্র হচ্ছে, তার নেপথ্যে রয়েছে জলবায়ুর পরিবর্তন। সেই মতবাদের ধারকদের মধ্যে অন্যতম হলেন দ্য ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মাইকেল ম্যাকফাডেন।

চলতি বছর আবহাওয়া সংস্থাগুলি যে পূর্বাভাস দিয়েছে, তা সত্যি হলে ১৯৫০ সাল থেকে যত এল নিনো এসেছে, তার মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী হতে চলেছে এ বছরেরটি। আবহবিদদের একাংশের মতে, চলতি বছরের এল নিনোর কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের তাপমাত্রা গড়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে।

চিনের ওশান বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েনজু কাই গত ২০ বছর ধরে এল নিনো নিয়ে গবেষণা করছেন। সেই গবেষণা ‘নেচার’-এ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁদের মতে শিল্পায়নের পরে এল নিনোর সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেয়েছে আড়াই শতাংশ। তার আগে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ কম ছিল বলে এল নিনো হত তুলনায় কম, এমনটাই দাবি কাইয়ের। তাঁর মতে, জলবায়ুর পরিবর্তন না হলে এল নিনোর আবির্ভাব এ ভাবে বাড়ত না।

এল নিনো নিয়ে ১৯৫০ সালের আগে সে ভাবে খাতায় কলমে কোনও পরিসংখ্যান মেলে না। নাবিকদের ডায়েরি বা লিখিত নথি থেকে কিছু তথ্য পাওয়া যায়, তা-ও ১৮০০ শতক থেকে। তার আগের তথ্য এখনও অজানা।

ন্যাশনাল সেন্টার ফর অ্যাটমোস্ফিয়ারিক রিসার্ডের গবেষক ক্লারা ডেসার আবার এল নিনোর তীব্রতা, ঘন ঘন ফিরে আসার জন্য জলবায়ুর পরিবর্তনের হাত রয়েছে বলে মানতে চান না। তাঁর মতে, জলবায়ুর বিশৃঙ্খল স্বভাবই এর জন্য দায়ী। এল নিনো নিয়ে নির্দেশিকা জারি করার সময় ওয়ার্ল্ড মেটেরিওলজিক্যাল অর্গানাইজেশনও জানিয়েছে, এল নিনোর তীব্রতা বৃদ্ধি, বার বার আগমনের নেপথ্যে জলবায়ুর পরিবর্তনের হাত রয়েছে বলে কোনও প্রমাণ মেলেনি। ইন্টারগভরমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ-এর গবেষক কবের আবার দাবি, শিল্পায়নের আগে এল নিনোর তীব্রতা এখনকার থেকে অনেক কম ছিল। রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব অ্যান্টনিয়ো গুতেরেসের ব্যাখ্যা, ‘‘উষ্ণ পৃথিবীর আগুনে আরও কিছুটা ঘি ঢালবে এল নিনো।’’ তাঁর মতে, কারণ যা-ই হোক, প্রভাব পড়বে তীব্র।

এল নিনো কী

কয়েক বছর অন্তর প্রশান্ত মহাসাগরে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী যে বাতাস সাধারণত উষ্ণ জলকে ইন্দোনেশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে দেয়, সেই বাতাস হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে উষ্ণ জল আবার পূর্ব দিকে ফিরে আসে এবং দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল ঘেঁষে বইতে থাকে। এই স্রোতের প্রভাবে মধ্যপ্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ অংশ উষ্ণ হয়ে ওঠে। বইতে শুরু করে উষ্ণ স্রোত। একেই বলে এল নিনো। স্প্যানিশ শব্দ ‘এল নিনো’-র অর্থ ‘ছোট্ট ছেলে’। শত শত বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকার মৎস্যজীবীরা প্রশান্ত মহাসাগরে এই অস্বাভাবিক স্রোত লক্ষ্য করেছিলেন। স্রোতের নামকরণও করেছিলেন তাঁরা।

Advertisement
আরও পড়ুন