Jurassic Park

‘জুরাসিক পার্ক’-এর সেই দাবিই এ বার সত্যি হল! মশাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকে সমসাময়িক বহু প্রাণীর ডিএনএ-ভান্ডার

১৯৯৩ সালে মুক্তি পায় জুরাসিক পার্ক। সেই সিনেমা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে মশাদের নিয়ে গবেষণা শুরু করেন আমেরিকার এক পতঙ্গবিদ এবং তাঁর বন্ধু। তাতেই মিলল নতুন তথ্য।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৭
ছড়ির মাথায় বসানো রয়েছে মশার জীবাশ্ম। ১৯৯৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জুরাসিক পার্ক’ সিনেমার দৃশ্য।

ছড়ির মাথায় বসানো রয়েছে মশার জীবাশ্ম। ১৯৯৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জুরাসিক পার্ক’ সিনেমার দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত।

স্টিফেন স্পিলবার্গের তৈরি জুরাসিক পার্ক সিনেমার সেই ছড়ির কথা মনে পড়ে? পার্কের প্রতিষ্ঠাতা জন হ্যামন্ড যে ছড়ি নিয়ে ঘুরতেন, ওই ছড়ির মাথায় বসানো ছিল এক মশার জীবাশ্ম। সিনেমার গল্প বলছে, ওই জীবাশ্ম-মশার রক্ত থেকেই ডাইনোসরের ডিএনএ বার করা হয়েছিল। তা দিয়েই তৈরি করা হয়েছিল ডাইনোসর। তবে তা ছিল নিছকই কল্পকাহিনি। এ বার দেখা গেল, মশারা সত্যিই বিভিন্ন প্রাণীর ডিএনএ বহন করতে পারে।

Advertisement

জুরাসিক পার্ক সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৯৩ সালে। মশার মধ্যে যে অন্য প্রাণীর ডিএনএ-ও লুকিয়ে থাকতে পারে, সে বিষয়ে তখনও পর্যন্ত কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ছিল না। এ নিয়ে কোনও গবেষণা হয়নি তখন। বলতে গেলে, জুরাসিক পার্ক সিনেমা থেকেই এই গবেষণার সূত্রপাত। গবেষকদলের প্রধান পতঙ্গবিদ লরেন্স রিভ্‌সও তা স্বীকার করেন। রিভ্‌সের কথায়, “লোকে বলে জুরাসিক পার্ক নাকি নতুন প্রজন্মের জীবাশ্মবিদদের অনুপ্রাণিত করেছিল। কিন্তু এটা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে মশা নিয়ে গবেষণা করতে।”

ডিএনএ বা ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড হল এমন এক জৈব, যা প্রত্যেক প্রাণীর বিষয়ে বিস্তর তথ্য বহন করে। প্রতিটি প্রাণীর নিজস্ব ডিএনএ থাকে। এটি একটি বিশাল তথ্যভান্ডারের মতো, যেখানে কোনও প্রাণীর সকল জেনেটিক তথ্য গচ্ছিত থাকে। কোনও প্রাণীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন তথ্য জানতে সাহায্য করে। বলা যেতে পারে, যে কোনও জেনেটিক গবেষণার মূল ভিত্তিই হল ডিএনএ। ফলে মশার রক্তে যদি সত্যিই অন্য কোনও প্রাণীর ডিএনএ থাকে, তা গোটা প্রাণীকুলের বিষয়ে বিস্তর তথ্যের জোগান দিতে পারে। এই ভাবনা থেকেই গবেষণা শুরু করেন রিভ্‌স।

রিভ্‌স এবং তাঁর পতঙ্গবিদ বন্ধু হান্না অ্যাট্‌সমা প্রথমে গবেষণার জন্য একটি জায়গা বেছে নেন। আমেরিকার মধ্য ফ্লরিডায় ১০, ৯০০ হেক্টরের একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে চিহ্নিত করেন তাঁরা। রিভ্‌স-অ্যাট্‌সমার নেতৃত্বে এক গবেষকদল আট মাস ধরে বিভিন্ন মশার নমুনা সংগ্রহ করেন। ওই বিস্তীর্ণ সংরক্ষিত এলাকা থেকে ২১টি ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির ৫০ হাজারেরও বেশি মশা ধরেন তাঁরা। এর মধ্যে থেকে কয়েক হাজার স্ত্রী মশাকে পৃথক করে গবেষণার কাজে ব্যবহার করেন তাঁরা।

বস্তুত, পুরুষ মশা অন্য প্রাণীর রক্ত খায় না। তারা ফুল, গাছের পাতা থেকে রস পান করে। মশার জন্য রক্ত কোনও খাবারের উৎসও নয়। তাদের প্রজননের ক্ষেত্রে এটি প্রয়োজন। শুধুমাত্র স্ত্রী মশাই অন্য প্রাণীর রক্ত খায়। ফলে গবেষণার জন্য স্ত্রী মশাই প্রয়োজন ছিল রিভ্‌সদের। ওই স্ত্রী মশাগুলির শরীর থেকে পাওয়া রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে দেখেন তাঁরা। গবেষকদলের কথায়, এর ফলে তারা ছোট ব্যাঙ থেকে শুরু করে গরু-সহ বিভিন্ন প্রাণীর বিষয়ে তথ্য পেয়েছেন।

গবেষণায় দেখা যায়, স্ত্রী মশার রক্ত থেকে মোট ৮৬টি ভিন্ন ভিন্ন প্রাণীর ডিএনএ পাওয়া গিয়েছে। উল্লেখ্য, মশার রক্ত বলতে, তারা যে সব প্রাণীর রক্ত খেয়েছে, সেই রক্তের কথাই এখানে বলা হচ্ছে। মশার শরীরে নিজস্ব রক্তও থাকে। তবে তা অন্য প্রাণীর মতো লাল নয়। মশার রক্তকে বলে হিমোলিম্ফ। তাদের রক্তে কোনও হিমোগ্লোবিন থাকে না। ফলে খালি চোখে মশার পেটে যে লাল রক্ত দেখা যায়, তা অন্য প্রাণীরই। সেই রক্ত নিয়েই গবেষণা চলে।

গবেষকদের দাবি, ওই এলাকায় মশারা যে সব মেরুদণ্ডী প্রাণীর রক্ত খেয়ে থাকতে পারে, তার প্রায় ৮০ শতাংশেরই ডিএনএ পাওয়া গিয়েছে মশাদের শরীরে থাকা রক্তে। গবেষকদলের প্রধান রিভ্‌সের কথায়, গবেষণায় খুব বৈচিত্রময় জীবনচক্রের সন্ধান মিলেছে। যে ডিএনএ ভান্ডার মিলেছে, তাতে বিভিন্ন ধরনের প্রাণী রয়েছে। গাছে থাকা প্রাণী থেকে শুরু করে বিভিন্ন উভচর, পরিযায়ী, শিকারি, এমনকি বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীও রয়েছে এই তালিকায়।

যদিও এমন কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণীও রয়েছে ওই অঞ্চলে, যাদের কোনও ডিএনএ-র নমুনা মশার শরীর থেকে পাওয়া রক্তে মেলেনি। যেমন বিলুপ্তপ্রায় ফ্লরিডা প্যান্থারের কোনও ডিএনএ-র নমুনা পাওয়া যায়নি। মাটিতে গর্ত করে থাকা এক ধরনের ছুঁচো ইস্টার্ন মোলেরও কোনও ডিএনএ মেলেনি ওই রক্তের নমুনায়।

পরবর্তী সময়ে ওই দল আরও একটি গবেষণা চালায়। এ বারের গবেষণায় নেতৃত্ব দেন জীববিজ্ঞানী সেবেস্টিয়ান বোটেরো-কা-ওলা। দ্বিতীয় বারের গবেষণায় দেখা যায়, মশারা যখন সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে (বর্ষার মরসুমে), তখন এই রক্তের নমুনা পরীক্ষা প্রায় প্রাণীশুমারির সমানই হয়ে যায়। যদিও শুষ্ক সময়ে প্রাণীশুমারির ক্ষেত্রে প্রথাগত নিয়মই বেশি কার্যকর।

তবে সিনেমায় যেমন জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া মশা থেকে ডাইনোসরের ডিএনএ বার করতে দেখা গিয়েছিল, তেমন কোনও সম্ভাবনার কথা এখনও জানা যায়নি। গবেষকদের দাবি, জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া মশার শরীর থেকে ব্যবহারযোগ্য কোনও ডিএনএ-র নমুনা বার করা সম্ভব নয়। তাঁদের কথায়, মশার শরীর থেকে অন্য প্রাণীর ডিএনএ বার করার এই পদ্ধতি অনেক প্রজাতিকে ডাইনোসরের মতো বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া থেকে আটকাতে সাহায্য করতে পারে।

পতঙ্গবিদ অ্যাট্‌সমা গবেষণাপত্রে লিখেছেন, কোনও এলাকার জীববৈচিত্র বোঝার জন্য মশার শরীর থেকে পাওয়া রক্তের নমুনা পরীক্ষা একটি কার্যকরী উপায় হয়ে উঠতে পারে। এ ছাড়া ঘুরে ঘুরে প্রাণীশুমারি একটি ব্যয়বহুল এবং কষ্টসাধ্য প্রক্রিয়া। তার থেকেও নিস্তার দিতে পারে প্রাণীশুমারির নতুন এই পন্থা। বিভিন্ন অঞ্চলে এই পদ্ধতি যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি। তবে অ্যাট্‌সমা এ-ও জানিয়েছেন, যে সব এলাকায় প্রচুর মশা রয়েছে, একমাত্র সেই সব এলাকাতেই এই পদ্ধতি সাশ্রয়ী এবং কার্যকর হবে।

Advertisement
আরও পড়ুন