Human Evolution Research

বিবর্তন থামেনি, বদলেই চলেছে মানুষ! লাল চুল, পুরুষের টাক-সহ পরিবর্তনের বিবিধ সঙ্কেত খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা

প্রকৃতিতে যোগ্যতমেরাই টিকে থাকতে পারে। বাকিরা হারিয়ে যায় সময়ের গর্ভে। টিকে থাকার এই লড়াইয়ের সঙ্গীই বিবর্তন। কোন বৈশিষ্ট্য টিকে থাকবে, প্রকৃতি তা নির্বাচন করে দেয়। মানুষও এর ব্যতিক্রম নয়।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০০
একটু একটু করে বিবর্তিত হয়ে চলেছে মানুষ।

একটু একটু করে বিবর্তিত হয়ে চলেছে মানুষ। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

মানুষের বিবর্তন থামেনি। বছরের পর বছর ধরে একটু একটু করে বিবর্তিত হয়ে চলেছে মানুষের নানা শারীরিক গড়ন, বৈশিষ্ট্য এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত খুঁটিনাটি। সম্প্রতি একটি গবেষণায় তারই প্রমাণ দেখালেন বিজ্ঞানীরা। দীর্ঘ দিন ধরে বিজ্ঞানীদের একটা বড় অংশের ধারণা ছিল, আধুনিক মানুষের বিবর্তন থমকে গিয়েছে। একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে আসার পর মানুষ আর বিবর্তিত হয়নি বলে তাঁরা মনে করতেন। নতুন গবেষণায় সেই ধারণাই ধাক্কা খেল। উঠে এল একাধিক নয়া তত্ত্ব।

Advertisement

ব্রিটিশ প্রকৃতিবিদ চার্লস ডারউইনের ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’ সূত্র বিবর্তনের ইতিহাসে ধ্রুব সত্য। তিনি বলেছিলেন, প্রকৃতিতে তারাই টিকে থাকতে পারে, যারা যোগ্যতম। বাকিরা হারিয়ে যায় সময়ের গর্ভে। টিকে থাকার এই লড়াইয়ের সঙ্গীই বিবর্তন। প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে প্রাণীও তার মতো করে বদলাতে থাকে। কোন বৈশিষ্ট্য টিকে থাকবে, প্রকৃতি তা নির্বাচন করে দেয়। পশু-পাখি-মানুষ কেউই এই ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’-এর বাইরে নয়। গবেষকদল এই সূত্রকেই ধ্রুবতারা করে এগিয়েছেন। কিছু দিন আগে তাঁদের গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ‘নেচার’ পত্রিকায়। মানব বিবর্তন সংক্রান্ত এই গবেষণায় শামিল হয়েছিলেন আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। সঙ্গে ইরান এবং অস্ট্রিয়ার বিজ্ঞানীও যোগ দিয়েছিলেন।

মূলত পশ্চিম ইউরেশীয় মানবগোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ করেছেন বিশেষজ্ঞেরা। গত ১০ হাজার বছর ধরে ইউরোপ এবং এশিয়ার পশ্চিমাংশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর অন্তত ১৬ হাজার ডিএনএ সংগ্রহ করেছেন তাঁরা। সময় লেগেছে প্রায় সাত বছর। এই জিন সঙ্কেতগুলি বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, একাধিক বৈশিষ্ট্য মানুষের শরীরে পরিবর্তনের পর স্থায়ী হয়েছে। লালচে চুল, পুরুষের টাকের সম্ভাবনা হ্রাস তার মধ্যে অন্যতম। ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ এই বৈশিষ্ট্যগুলিকে বিবর্তনের অনুকূলে এনে দিয়েছে। লন্ডনের কিংস কলেজের নৃবিজ্ঞানী মাইকেল বার্থোম এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিনি বলেছেন, ‘‘প্রায়ই ধরে নেওয়া হয়, আমরা আজ যা এবং যেমন, সেটাই চূড়ান্ত। এটাকেই বিবর্তনের সর্বোচ্চ শিখর বলে মনে করা হয়। কিন্তু একটি জীবন্ত সত্তা হিসাবে মানুষের বিবর্তন সর্বদা অব্যাহত থাকবে।’’

আজ থেকে প্রায় তিন লক্ষ বছর আগে আফ্রিকায় আধুনিক মানুষের উৎপত্তি। বিজ্ঞানীদের বক্তব্য, তার পর থেকে বিবর্তন খুব কমই হয়েছে। জিনের নির্দিষ্ট একটি রূপ ‘অ্যালিল’কে এর জন্য দায়ী করা হয়। এটি মানব বৈশিষ্ট্যগুলিকে এমন এক চরম আকার প্রদান করে, যা বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে উপযোগী। পরবর্তী প্রজন্মেও তা সঞ্চারিত হয়ে চলে। ফলে জিনের অন্যান্য রূপগুলি সে ভাবে প্রকট হতে পারে না। এই বিশ্লেষণ থেকেই অনেকের ধারণা হয়েছিল, মানুষের বিবর্তন থমকে গিয়েছে। তবে নতুন গবেষণায় ৪৭৯টি নতুন অ্যালিল শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব এগুলিকে ত্বরাণ্বিত করেছে। গবেষণায় দাবি, খাদ্য সংগ্রাহকের জীবন থেকে বেরিয়ে এসে মানুষ যখন চাষবাস শুরু করল, খাদ্য উৎপাদক হয়ে উঠল, তখন থেকে বিবর্তন আরও ত্বরাণ্বিত হয়েছে। গবেষণায় যোগদানকারী হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনবিজ্ঞানী আলি আকবরি বলেছেন, ‘‘মানুষের বিবর্তন আদৌ শ্লথ হয়ে যায়নি। আমরা কেবল এত দিন সেই সঙ্কেতটিকে ধরতে পারছিলাম না।’’

প্রাকৃতিক নির্বাচন যে সমস্ত অ্যালিল বা জিনগত রূপবৈশিষ্ট্যকে জোরালো ভাবে সমর্থন করেছে, তার মধ্যে অন্যতম চুলের লালচে রং। এ ছাড়া, ফর্সা ত্বক, পুরুষকের টাক পড়ার প্রবণতা হ্রাস, সিলিয়াক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং মদ্যপানের ঝুঁকি হ্রাসের মতো বৈশিষ্ট্যগুলিও মানব জীবনে বিবর্তনের মাধ্যমে স্থায়ীত্ব পাচ্ছে। ‌অধিকাংশ বৈশিষ্ট্যই ডিএনএ-র একটি মাত্র একক পরিবর্তনের ফলে উদ্ভূত, দেখিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। কেন এই ‘অ্যালিল’গুলি অন্যগুলিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে এল? আকবরির সংক্ষিপ্ত উত্তর, ‘‘আমরা সেটা জানি না।’’

হার্ভার্ডের বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে সংগঠিত এই গবেষণার সঙ্গে বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ দ্বিমত পোষণ করেছেন। অনেকেই বিবর্তনের এই নতুন তত্ত্ব মানতে রাজি নন। তবে তাঁরা মেনে নিয়েছেন, এই গবেষণা আগামী দিনে চিকিৎসা পদ্ধতির উন্নতিতে সাহায্য করবে। বিবর্তন সম্পর্কে ১০০ শতাংশ নিশ্চিত হতে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষ এবং অন্য প্রজাতির প্রাণীর উপর এই ধরনের আরও গবেষণা দরকার বলে মনে করছেন একাংশ।

Advertisement
আরও পড়ুন