ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।
প্রস্তর যুগের শেষ দিকের কথা। আজ থেকে প্রায় পাঁচ-সাত হাজার বছর আগে। তখন কেমন ছিল মানুষের খাদ্যাভ্যাস? যা পাওয়া যেত, তা-ই কি আগুনে ঝলসে খেয়ে নিত? সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হচ্ছে, ওই সময়ে খাওয়া-দাওয়ার বিষয়ে বেশ ‘সচেতন’ ছিল মানুষ। তখন যে তারা শুধু মাংস ঝলসে খেয়ে নিত, এমনটাও নয়। মাংসের সঙ্গে বিভিন্ন ফলমূল মিশিয়ে রান্না করে খেত।
আগুনের সঙ্গে মানুষের পরিচিতি ঘটার পরেও বহু বছর ধরে আগুন ছিল মানুষের আয়ত্তের বাইরে। আগুনকে নিজের প্রয়োজন মতো আয়ত্ত করার কৌশল মানুষ শেখে আজ থেকে প্রায় চার লক্ষ বছর আগে, প্রাচীন প্রস্তর যুগে। সেই থেকেই মানুষের খাদ্যাভ্যাসে বদল আসতে শুরু করে। কাঁচা মাংসের বদলে ঝলসে বা পুড়িয়ে খাওয়ার অভ্যাস শুরু হয়। তার পরে ধীরে ধীরে তা আরও বদল হতে থাকে। নব্য প্রস্তর যুগে রান্না করার কৌশলও শিখে নিয়েছিল মানুষ। এ বার নতুন এক গবেষণায় দেখা গেল, নব্য প্রস্তর যুগে একেবারে বিভিন্ন উপকরণ মিশিয়ে বিভিন্ন ‘রেসিপি’ বানাতে পারত ইউরোপীয় মানুষেরা।
গবেষণায় এ-ও দেখা গিয়েছে, এক এক এলাকায় এক এক ধরনের সামগ্রী রান্না হত। কোন কোন সামগ্রী রান্নায় ব্যবহার হবে, তা-ও সচেতন ভাবে বাছাই করা হত সেই সময়ে। গবেষকদের দাবি, এত দিন যা মনে করা হত, তার চেয়েও অনেক বেশি উন্নত ছিল নব্য প্রস্তর যুগের ইউরোপীয়দের রন্ধনকৌশল। গত বুধবার ‘প্লস ওয়ান’ জার্নালে এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।
ব্রিটেনের ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লারা গনজ়ালেজ় কারেটেরো এবং লিড্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অলিভার ক্রেগ যৌথ ভাবে এই গবেষণাটি করেন। লারা মূলত প্রাচীন উদ্ভিদের অবশিষ্টাংশ নিয়ে গবেষণা করেন। অন্য দিকে অলিভার প্রত্নতত্ত্বের অধ্যাপক। তাঁরা ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে নব্য প্রস্তর যুগের কিছু মাটির পাত্র সংগ্রহ করেন। ডেনমার্ক, পূর্ব রাশিয়ার ইভানোভো অঞ্চল-সহ মোট ১৩টি এলাকা থেকে ৮৫টি মৃৎপাত্র বিশ্লেষণ করে দেখেন তাঁরা। এর মধ্যে ৫৮টি পাত্রে গাছপালার অবশিষ্টাংশ উল্লেখযোগ্য ভাবে শনাক্ত করা গিয়েছে।
এই ৫৮টি মৃৎপাত্রের বেশির ভাগই প্রায় ৫০০০-৮০০০ বছরের পুরনো। যা থেকে ওই সময়ে ইউরোপে বসবাসকারীদের খাদ্যতালিকা সম্পর্কে বিশদ ধারণা পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা। গাছপালার অবশিষ্টাংশ পাওয়ার পরে সেগুলি মাইক্রোস্কোপের তলার ফেলে বিশ্লেষণ করে দেখেন গবেষকেরা। তাতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। অলিভারের কথায়, ওই সময়ে ইউরোপে বসবাসকারীরা কিছু ‘রেসিপি’ রান্না করতে জানত। যেমন, মাটির পাত্রে মাছের সঙ্গে ভাইবারনাম বেরি (জামের মতো দেখতে এক জাতীয় ফল) মিশিয়ে রান্না করত তারা। আবার ওক-লিভ্ড গুজ়ফুট (এক ধরনের ছোট গুল্ম, দেখতে অনেকটা শাকপাতার মতো) এবং বিট মিশিয়ে আগুনের আঁচে রান্না করতেও জানত ওই সময়ের মানুষেরা।
বিশ্লেষণ করা ওই মাটির পাত্রগুলির বেশির ভাগেই চর্বিযুক্ত অবশিষ্টাংশ মিলেছে। নতুন গবেষণায় অলিভার এবং লারার মতে, নব্য প্রস্তর যুগের ওই পর্বে মানুষের খাবার রান্নার পদ্ধতি ছিল বেশ পরিশীলিত। কী রান্না করা হবে, সে বিষয়ে তারা যথেষ্ট সচেতন ছিল। বিভিন্ন গাছের মূল, কন্দ বা ফলের বিষয়ে তাদের যথেষ্ট ভাল জ্ঞান ছিল, এমন আভাসও মিলেছে এই গবেষণায়। মৃৎপাত্রগুলি বিশ্লেষণ করার সময়ে কিছু ক্ষেত্রে রান্নার উপকরণে বৈচিত্রও দেখা গিয়েছে। গবেষকদের অনুমান, সম্ভবত সেগুলির ভাল স্বাদ বা অন্য কোনও খাবারের সঙ্গে সেগুলি খেতে ভাল লাগার কারণেই বাছাই করা হত।
তবে এলাকাভেদে রান্নার পদ্ধতি বদলেছে, এমন আভাসও মিলেছে। যা থেকে গবেষকেরা মনে করছেন, এক এক এলাকার মানুষ এক এক ধরনের স্বাদের খাবার পছন্দ করত। যেমন, ইউক্রেন এবং রাশিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় যারা বাস করত, তারা মিষ্টিজলের মাছই বেশি খেত। বুনোঘাস দিয়ে মাছ রান্না করত তারা। আবার মধ্য রাশিয়ায় যারা থাকত, তারা অ্যামারান্থাস (এক ধরনের গাছ) দিয়ে রান্না করা মাছ খেতে বেশি পছন্দ করত। ডেনমার্কে যারা থাকত, তারাও অ্যামারান্থাস খেতে পছন্দ করত। তারা অবশ্য এই গাছের ফুলও খেত। বস্তুত, ওই সময়ে যে উদ্ভিজ উপকরণগুলি রান্নায় ব্যবহার হত, তার কিছু উপকরণ এখনও মানুষের খাদ্যাভ্যাসে রয়ে গিয়েছে। যেমন ভাইবারনাম বেরি বা গুয়েলডার রোজ় বেরির নমুমা পাওয়া গিয়েছে বেশ কয়েকটি মৃৎপাত্রে। এই ফলটি এখনও পোল্যান্ড, ইউক্রেন এবং রাশিয়ায় খাওয়ার চল রয়েছে।