কেন ক্রমে মানুষের উপর নির্ভরশীল হচ্ছে মশা! গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
শান্তিতে কোনও খোলা জায়গায় দু’দণ্ড বসার উপায় নেই। কুট করে এসে কামড়ে যায় মশা। পেট ভরে শুষে নেয় রক্ত। প্রতিরোধের জন্য একের পর এক ব্যবস্থা ‘ফেল’ করেছে। ঘরে আটকানো গেলেও বাইরে তাদের দেদার আনাগোনা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বহু যুগ আগে সম্ভবত মানুষ দেখলেই তাকে কামড়াতে, তার রক্ত শুষতে ধেয়ে আসত না মশা। তা হলে কেন হঠাৎ মানুষের রক্তের প্রতি এত লোভ জন্মাল তাদের? বিজ্ঞানীরা বলছেন, জঙ্গল যত কমেছে, তত মশার এই মানুষকে কামড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে। আসলে মানুষের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে মশারা।
ব্রাজ়িলের আটলান্টিক অরণ্যের মশাদের নিয়ে এই পরীক্ষা করেন বিজ্ঞানীরা। এই জঙ্গল প্যারাগুয়ে, আর্জেন্টিনা পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। জীববৈচিত্রের জন্য বিখ্যাত ব্রাজ়িলের এই অরণ্যভূমি। হাজার হাজার উদ্ভিদ, প্রাণীর বাস সেখানে। কিন্তু মানুষের আগ্রাসনে সেই জঙ্গলের ব্যপ্তি কমে গিয়েছে অনেকটাই। অতীতে যতটা জায়গা জুড়ে ছিল, তার মাত্র ৩০ শতাংশ জায়গায় আজ টিকে রয়েছে সেই জঙ্গল। সেখানেই মশাদের নিয়ে গবেষণা করেন ব্রাজ়িলের ফেডেরাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং অলওয়াল্ডো ক্রুজ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, বসতি স্থাপন করতে ক্রমে এই জঙ্গল কেটে সাফ করেছে মানুষ। বিলুপ্ত হয়েছে বহু প্রাণী। যারা বেঁচেছে, তারা সংখ্যায় কমে গিয়েছে। জীববৈচিত্র হারিয়ে গিয়েছে। এক সময়ে বিভিন্ন প্রাণীর শরীরে কামড় বসিয়ে খাবার গ্রহণ করত মশা। নিত্য দিন বদলাতে পারত নিজেদের স্বাদ। এখন তাদের কাছে সেই সুযোগ কমে এসেছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সে কারণেই আরও বেশি করে মানুষের রক্তশোষণ শুরু করেছে তারা।
‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন ইকোলজি অ্যান্ড ইভলিউশন’-এ বিজ্ঞানীদের সেই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা গিয়েছে, আটলান্টিক অরণ্যভূমিতে ১,৭১৪টি মশার উপর পরীক্ষা করা হয়েছে। মোট ৫২ প্রজাতির। ওই ১,৭১৪টি মশার মধ্যে ১৪৫টি স্ত্রী। সেই ১৪৫টি স্ত্রী মশার মধ্যে ২৪টির রক্ত পরীক্ষা করে বোঝা গিয়েছে, কাদের কামড়েছিল তারা। সেই পরিসংখ্যান থেকে জানা গিয়েছে, ২৪টি স্ত্রী মশার মধ্যে ১৮ টির পেটে মিলেছে মানুষের রক্ত। বাকিদের পেটে ইঁদুর, পাখি, অ্যাম্ফিবিয়ান, কুকুর শ্রেণির প্রাণী ক্যানিডের রক্ত মিলেছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই তথ্য থেকেই স্পষ্ট যে, ওই মশাদের আদতে মানুষকে কামড়ানোর প্রবণতা বেশি। আটলান্টিক অরণ্যে জীব বৈচিত্র নেহাত কম নয়। তার মধ্যেও মশারা বেছে বেছে মানুষকেই নিশানা করেছে, এমনটাই মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। ব্রাজ়িলের ফেডেরাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সার্জিয়ো মাচাদোর মতে, এর ফলে মশার থেকে মানুষের শরীরে রোগ সংক্রমণের সম্ভাবনাও বেশি। মশারা কোনও ভাইরাস বা ব্যাকটিরিয়ায় আক্রান্ত কোনও রোগীকে কামড়ানোর পরে অন্য কোনও রোগীকে কামড়ালে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
এই পরিস্থিতির জন্য কোনও না কোনও ভাবে মানুষই দায়ী বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, জঙ্গল কেটেছে মানুষ। মরেছে পশুপাখি। মশাদের থাকার জায়গা, খাবারের উৎসে টানা পড়ায় তারা আরও কাছাকাছি গিয়েছে মানুষের। বলা ভাল, মানুষের কাছে যেতে বাধ্য হয়েছে। বেঁচে থাকতে বদলে ফেলেছে খাদ্যাভ্যাস। মাচাদো জানান, মশাদের প্রকৃতিজাত খাবারের উৎসে টান পড়েছে। তারা বাধ্য হয়েই বিকল্প উৎস সন্ধান করেছে। উপায় না দেখে মানুষের রক্ত খেতে শুরু করেছে। কারণ ওই এলাকায় মানুষের আনাগোনা বেড়ে গিয়েছে। মাচাদো মানুষকে বলেছেন ‘প্রিভ্যালেন্ট হোস্ট’ অর্থাৎ ব্যাপক হারে ছড়িয়ে থাকা আয়োজক।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই গবেষণাকে কাজে লাগালে মশা থেকে মানুষে সংক্রমণ ঠেকানো যেতে পারে। মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।