সাংবাদিক বৈঠকে কথা বলছেন মিঠুন (কালো পাঞ্জাবি)। একদম ডানদিকে দাঁড়িয়ে মুস্তাফিজুর। ছবি: সমাজমাধ্যম।
অবশেষে গলল বরফ। ক্রিকেটারদের সংগঠনের চাপের কাছে নতিস্বীকার করল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। বিসিবি-র অর্থ কমিটির সদস্য নাজমুল ইসলামকে সব ধরনের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত বিসিবি আনুষ্ঠানিক ভাবে কিছু জানায়নি। তবে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ‘প্রথম আলো’ এমনটাই জানিয়েছে। এখন দেখার, স্থগিত হয়ে যাওয়া ক্রিকেট আবার শুরু হয় কি না।
বুধবার রাতেই কোয়াব জানিয়েছিল, নাজমুল যদি পদত্যাগ না করেন তা হলে বাংলাদেশে সব ধরনের ক্রিকেট বন্ধ রাখা হবে। সকাল পর্যন্তও নাজমুল পদত্যাগ না করায় বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) নোয়াখালি বনাম চট্টগ্রামের খেলা সময়ে শুরু হয়নি। দুই দলের ক্রিকেটারেরাই মাঠে যাননি। ফলে টসও করা যায়নি।
এর পরেই ঢাকার একটি হোটেলে সাংবাদিক বৈঠক করে কোয়াব। টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক লিটন দাস, টেস্ট দলের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত এবং বিতর্ক যাঁকে দিয়ে শুরু, সেই মুস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিক বৈঠকে হাজির ছিলেন। কোয়াব সভাপতি মহম্মদ মিঠুন বলেন, “আমরা একটাই শর্তে মাঠে যেতে পারি। যদি বিসিবি এসে আমাদের বলে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ওঁকে (নাজমুল) সরিয়ে দেওয়া হবে, তা হলেই সেটা সম্ভব। যদি উনি থাকেন, তা হলে ম্যাচ বন্ধ থাকার দায় ক্রিকেটারেরা নেবে না। বিসিবি-কে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করতে হবে।” বিসিবি শর্ত মেনে নিলে সন্ধ্যাতেই মাঠে নামার প্রতিশ্রুতি দেন ক্রিকেটারেরা।
বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় সাংবাদিক বৈঠকের কথা থাকলেও তা শুরু হয় ২.৩০টা নাগাদ। বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিসিবি-র সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন কোয়াবের সদস্যরা। সাংবাদিক বৈঠকে এসে সে ব্যাপারে মিঠুন বলেন, “আমরা বিসিবি-র সঙ্গে অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। কিন্তু কোনও সমাধান পাইনি। আমাদের সব আশা শেষ হয়ে গিয়েছে। ক্রিকেটারেরা তো গর্বের জন্য খেলে। আমাদের কাছে সেটাই নেই।”
নাজমুলের পদত্যাগ ছাড়াও কোয়াবের তরফে আরও কিছু বিষয়ে বিসিবি-র হস্তক্ষেপ দাবি করা হয়েছে। তার মধ্যে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে বিপিএল থেকে নয় ক্রিকেটারের বাদ পড়া, ঢাকার প্রথম ডিভিশন ক্রিকেট লিগের দুরবস্থা এবং মহিলা দলের অলরাউন্ডার জাহানার আলমের যৌন হেনস্থার অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। মহিলা ক্রিকেট দলের পরিষেবা বাড়ানোর দাবি করে কোয়াব।
মিঠুন আরও বলেন, “আমাদের অবস্থান এখনও একই জায়গায় রয়েছে। আমরা ক্রিকেটের বিরুদ্ধে নয়। তবে সব কিছুর একটা সীমা রয়েছে। সেটা কেউ পেরিয়ে গেলে মুশকিল। এ সব ঘটনা গোটা ক্রিকেটঅঙ্গনকে কালিমালিপ্ত করেছে। সকলকে অপমান করা হয়েছে। উনি আইসিসি ট্রফি জেতা থেকে শুরু করে প্রতিটা বিষয়ে আমাদের অপমান করেছেন। ওঁর কাছে বিশ্বকাপেরও কোনও অর্থ নেই। ওঁর কথায় ক্রিকেটের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা ছিল না।”
ক্রিকেটারেরা নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকবেন বুঝে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল ১০.৫০ নাগাদ বিসিবি একটি বিবৃতি দেয়। সেখানে তারা আবার জানায়, এক ব্যক্তির মন্তব্যের কারণে ক্রিকেটারেরা যে ক্ষুব্ধ সেটা তারা বুঝতে পারছে। কঠোর হাতে এবং নিয়ম মেনে এই ধরনের ঘটনা সামলানোর আশ্বাস দেওয়া হয়। নাজমুলের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে, সে কথাও বলা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের অনুরোধ করা হয়, দেশের গৌরবের কথা ভেবে তাঁরা যেন বিপিএলের ম্যাচ খেলেন। কিছু ক্ষণ পরেই নাজমুলকে কারণ দর্শানোর চিঠি পাঠায় বিসিবি।
উল্লেখ্য, বিশ্বকাপ খেলতে না গেলে ক্রিকেটারদের বিসিবি ক্ষতিপূরণ দেবে কি না, এই প্রশ্নের উত্তরে বুধবার নাজমুল বলেন, ‘‘ওরা গিয়ে কিছুই করতে পারে না। তা-ও আমরা ওদের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করি। আমরা কি ওদের কাছে টাকা ফেরত চাই?’’ এ ছাড়াও তিনি বলেন, ‘‘বোর্ডই যদি না থাকে, তা হলে ক্রিকেট বা ক্রিকেটারেরা থাকবে কী করে?’’ তাঁর এই মন্তব্য আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে লিটন দাসদের সম্পর্কে নাজমুলের এমন মন্তব্য ভাল ভাবে নেয়নি বাংলাদেশের ক্রিকেটমহল।
তাঁর এই বক্তব্য জানাজানি হওয়ার পরই মুখ খোলেন মিঠুন। কোয়াব সভাপতি পরিষ্কার জানিয়ে দেন, নাজমুলের এই বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, ‘‘সকলেই জানেন কিছু দিন ধরে কী চলছে। প্রথমে একজনকে নিয়ে, এখন সব ক্রিকেটারকে নিয়ে যে ভাবে কথা বলা হচ্ছে, যে ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে, তা কোনও ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ সব আশা করা যায় না। ভাষা সম্পর্কে একজন পরিচালকের সতর্ক থাকা উচিত। তাঁর বক্তব্য গোটা ক্রিকেটমহলকে কষ্ট দিয়েছে।’’ এর পর হুঁশিয়ারির সুরে মিঠুন বলেন, ‘‘আমাদের সব ক্রিকেটারকে নিয়ে উনি যে ভাবে কথা বলছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। উনি বৃহস্পতিবার ম্যাচের আগে পদত্যাগ না করলে আমরা সব ধরনের ক্রিকেট বয়কট করব।’’