IPL 2026

৫ ম্যাচে উইকেট নেই বুমরাহের! আইপিএলে কেন এত নিষ্প্রভ বিশ্বের সেরা বোলার? উত্তর খুঁজল আনন্দবাজার ডট কম

এখনও পর্যন্ত আইপিএলে ১৯ ওভার বল করে ১৬৪ রান দিয়েছেন জসপ্রীত বুমরাহ। ওভার প্রতি খরচ করেছেন ৮.৬৩ রান। ১২২টি বল করেও উইকেট নেই। আইপিএলে নিষ্প্রভ দেখাচ্ছে তাঁকে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০০
picture of cricket

জসপ্রীত বুমরাহ। ছবি: পিটিআই।

এ বারের আইপিএলে সবচেয়ে করুণ অবস্থা কার? কলকাতা নাইট রাইডার্সের, মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের না কি জসপ্রীত বুমরাহের। এগিয়ে বুমরাহই। মুম্বই একটা ম্যাচ জিতেছে। কেকেআর অন্তত এক পয়েন্ট পেয়েছে। কিন্তু পাঁচ ম্যাচের পর বিশ্বের সেরা জোরে বোলার একটিও উইকেট পাননি! কেন এত নিষ্প্রভ দেখাচ্ছে তাঁকে?

Advertisement

বুমরাহের উইকেট না পাওয়া কেন অস্বাভাবিক?

উইকেটের জন্য বুমরাহের দিকে তাকিয়ে থাকেন শুভমন গিল, সূর্যকুমার যাদবেরা। তাঁদের আগে ভারতীয় দলের দুই প্রাক্তন অধিনায়ক বিরাট কোহলি এবং রোহিত শর্মারও ভরসা ছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হোক বা আইপিএল— প্রতিপক্ষ শিবিরকে উদ্বেগে রাখেন বুমরাহ। বিশ্বের অন্যতম সেরা জোরে বোলার। নিখুঁত নিশানায় বল রাখেন। যথেষ্ট গতি রয়েছে। বিশ্বের তাবড় ব্যাটারেরা তাঁর সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। এ হেন বুমরাহকে নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। আইপিএল যত এগোচ্ছে, তত চওড়া হচ্ছে মুম্বই ইন্ডিয়ান্স কর্তৃপক্ষের কপালের ভাঁজ। উদ্বেগ বাড়ছে ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যেও। মুম্বইয়ের প্রতিপক্ষ দলগুলির সমর্থকেরা নিজেদের দলের জয়ের পাশাপাশি বুমরাহের সাফল্য কামনা করেন। ঠিক যেমন কোহলি, রোহিত, সূর্য বা শুভমনের ব্যাটিং চাক্ষুষ করতে গ্যালারিতে ভিড় জমান তাঁরা।

পাঁচ ম্যাচে কী করেছেন বুমরাহ?

আইপিএলে বুমরাহকে চেনা যাচ্ছে না। পাঁচটি ম্যাচ খেলার পরও তাঁর উইকেটের ঝুলি শূন্য! অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই বাস্তব। সে কারণেই চেনা যাচ্ছে না বুমরাহকে। কেকেআরের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে ৩৫ রান দেন ৪ ওভারে। দ্বিতীয় ম্যাচে দিল্লি ক্যাপিটালসের বিরুদ্ধে ২১ রান দেন ৪ ওভারে। তৃতীয় ম্যাচে রাজস্থান রয়্যালসের বিরুদ্ধে ৩২ রান দেন ৩ ওভারে। চতুর্থ ম্যাচে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে ৩৫ রান দেন ৪ ওভার বল করে। পঞ্জাব কিংসের বিরুদ্ধে ৪ ওভারে বুমরাহ দিয়েছেন ৪১ রান। সব মিলিয়ে ১৬৪ রান দিয়েছেন ১৯ ওভার বল করে। ওভার প্রতি বুমরাহ খরচ করেছেন ৮.৬৩ রান। ১২২টি বল করেও উইকেট নেই।

জসপ্রীত বুমরাহ।

জসপ্রীত বুমরাহ। ছবি: পিটিআই।

ব্যাখ্যা নেই মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের কাছেও

আইপিএলে এখনও পর্যন্ত বুমরাহের পারফরম্যান্স তাঁর সুনামের সঙ্গে মানানসই নয়। তবু তাঁর উপর মুম্বই শিবিরের ভরসা অটুট। কোচ মাহেলা জয়বর্ধনে বলেছেন, ‘‘আমার তো মনে হয়, বুমরাহ ভালই বল করছে। আমরা শুধু পাওয়ার প্লে-তে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে পারছি না। আসলে কেউই বুমরাহের বিরুদ্ধে খুব একটা ঝুঁকি নিতে চায় না। আমরা বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করছি। বুমরাহও ভাবছে। তবে ব্যাটারেরা ভাল ব্যাট করছে।’’ ভাল বল করেও কেন উইকেট পাচ্ছেন না বুমরাহ? কারণ অজানা মুম্বই কোচের। জয়বর্ধনে বলেছেন, ‘‘বুমরাহ কেন উইকেট পাচ্ছে না, এটা নির্দিষ্ট ভাবে বলা সম্ভব নয়। কোনও পিচেই উইকেট পায়নি। আমাদের এই বিষয়টা নিয়ে ভাবতে হবে।’’

মুম্বই শিবির ভাবছে। ভারতীয় ক্রিকেটমহলও ভাবছে। বুমরাহের সমস্যা ঠিক কোথায়, তা খোঁজার চেষ্টা চলছে। বুমরাহ কি ফর্মে নেই? ভারতীয় দলের প্রাক্তন ক্রিকেটার ইরফান পাঠানের পর্যবেক্ষণ, ‘‘বুমরাহের বোলিংয়ে বড় কোনও সমস্যা নেই। এ বার আইপিএলে ও বলের গতি একটু কমিয়ে দিয়েছে। গড়ে ১৩০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে বল করছে। ৪৪ শতাংশ স্লোয়ার করছে। মানে একটা বল অন্তর মন্থর গতিতে করছে। তবে মুম্বইয়ের জন্য বুমরাহের উইকেট পাওয়া জরুরি।’’

কেন বলের গতি কমালেন বুমরাহ?

ব্যাটারদের খেলার জন্য বাড়তি সময় দিচ্ছেন বুমরাহ। জয়ববর্ধনে জানিয়েছেন, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে টানা খেলার ধকল পড়ছে বুমরাহের উপর। বিশ্বকাপের সময় কুঁচকিতে হালকা চোটও পেয়েছিলেন তিনি। তাই কিছুটা সাবধানি বুমরাহ। মুম্বই কোচ বলেছেন, ‘‘আমরা বুমরাহের উপর বাড়তি চাপ দিতে চাইছি না। ধীরে ধীরে নিজের বলের গতি ফিরে আসবে। এটা বুমরাহই সবচেয়ে ভাল বুঝতে পারবে। তবে প্রতি ম্যাচেই বুমরাহের বলের গতি একটু একটু করে বাড়ছে। ওকে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দও দেখাচ্ছে। তবে উইকেট পাওয়ার জন্য ভাগ্যও প্রয়োজন হয়।’’

পাঠানের বক্তব্য, বলের গতি বাড়ালেই উইকেট পাবেন বুমরাহ। তিনি বলেছেন, ‘‘স্লোয়ার বলের সংখ্যা কমাতে হবে। ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশের বেশি স্লোয়ার করার দরকার নেই। ব্যাটারকে খেলার বেশি সময় দিলে চলবে না। বলের গড় গতি বাড়ালে স্লোয়ারগুলো আরও কার্যকর হবে। আরও ভাল সুইং পাবে। ব্যাটারেরা সমস্যায় পড়বে।’’

জসপ্রীত বুমরাহ।

জসপ্রীত বুমরাহ। ছবি: পিটিআই।

বিশ্বকাপের চোট ভোগাচ্ছে?

তা হলে কি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময় পাওয়া কুঁচকির চোট নিয়েই আইপিএল খেলছেন বুমরাহ? ফিটনেসের সমস্যা রয়েছে? তেমন হলে দেশের অন্যতম সেরা বোলারকে কী করে আইপিএল খেলার অনুমতি দিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)? মুম্বই শিবির সূত্রে খবর, বুমরাহের চোট নেই। ফিটনেসের সমস্যাও নেই। তবে এখনই ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। উইকেট না পেয়ে বুমরাহ নিজেও হতাশ। বিষয়টা তাঁকেও ভাবাচ্ছে।

আইপিএলে বুমরাহের এমন উইকেটহীন থাকার ঘটনা এই প্রথম নয়। আগেও দু’বার এমন হয়েছে। ২০১৪ সালের আইপিএলে চেন্নাই সুপার কিংস (৩৩/০), সানরাইজার্স হায়দরাবাদ (২৪/০), কেকেআর (২৩/০) এবং রাজস্থানের (২৩/০) বিরুদ্ধে টানা উইকেট পাননি। ২০১৬ সালের আইপিএলেও হায়দরাবাদ (৩৫/০), বেঙ্গালুরু (২৮/০) এবং পঞ্জাবের (১৩/০) বিরুদ্ধে উইকেট পাননি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও এমন ব্যর্থতা এসেছে বুমরাহের ক্রিকেটজীবনে। ২০১৭-১৮ মরসুমে টানা তিনটি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচে উইকেট পাননি। তার মধ্যে দু’টি ম্যাচ ছিল শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে এবং একটি ম্যাচ দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। এই নিয়ে চার বার টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে টানা তিনটি বা তার বেশি ম্যাচে উইকেট পেলেন না।

বুমরাহের ব্যর্থতা না ব্যাটারদের কৃতিত্ব?

আগের তিন বারের মতো এ বারও নিশ্চয়ই উইকেট-খরা কাটিয়ে ফেলবেন বুমরাহ। যেটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হল, টানা পাঁচ ম্যাচ উইকেটহীন আগে কখনও থাকেননি বুমরাহ। কোনও ধরনের ক্রিকেটেই নয়। বুমরাহকে কেন এতটা নিষ্প্রভ লাগছে? রবিচন্দ্রন অশ্বিনের মূল্যায়ন, ‘‘প্রথমত, ব্যাটারেরা বুমরাহের ওভারগুলো সাবধানে খেলার চেষ্টা করছে। দ্বিতীয়ত, বুমরাহকে রোজ নতুন বল দেওয়া হচ্ছে না। কোনও দিন প্রথম ওভারে আনা হচ্ছে, কোনও দিন ষষ্ঠ ওভারে। তৃতীয়ত, অন্য বোলারদের থেকে ঠিক মতো সাহায্য পাচ্ছে না। উইকেট পাওয়ার থেকেও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে গুরুত্বপূর্ণ রান তোলার গতি আটকে দেওয়া। বুমরাহ এই কাজটা ঠিকই করছে। ওর ইয়র্কারগুলো সমস্যায় ফেলছে ব্যাটারদের।’’

বাংলার প্রাক্তন ক্রিকেটার সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও মনে করেন না বুমরাহ ফর্মে নেই। অশ্বিনের মতোই তাঁর বক্তব্য, ‘‘যে কোনও দিন উইকেট পাবে। বুমরাহের বোলিংয়ে কোনও সমস্যা নেই। সুযোগ কিন্তু তৈরি হচ্ছে। ভেঙে ভেঙে ৩-৪ ওভার বল করলে অনেক সময় উইকেট আসে না। এ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে উইকেট নেওয়ার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিপক্ষের রান তোলার গতি আটকানো। এ ক্ষেত্রে বুমরাহ এখনও চ্যাম্পিয়ন।’’

জসপ্রীত বুমরাহ।

জসপ্রীত বুমরাহ। —ফাইল চিত্র।

অতিরিক্ত ক্রিকেট

বাংলার আর প্রাক্তন ক্রিকেটার সৌরাশিস লাহিড়ীর বক্তব্য, ‘‘টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বুমরাহ নিজেকে দেশের জন্য উজাড় করে দিয়েছে। তার পরই আইপিএল খেলতে হচ্ছে। অতিরিক্ত ধকল পড়ছে বুমরাহের উপর। ওকে দেখে একটু ক্লান্ত লাগছে আমার। সে জন্যই হয়তো ১০০ শতাংশ দিতে পারছে না। বিসিসিআইয়ের নজর দেওয়া উচিত। ও আমাদের দেশের, ক্রিকেটের সম্পদ। সম্পূর্ণ তরতাজা না থাকলে জোরে বোলারদের পক্ষে সেরা পারফর্ম করা সম্ভব নয়।’’

পিঠের গুরুতর চোট পাওয়ার পর বুমরাহের বলের গতি আগের চেয়ে কমেছে। কুঁচকির অস্বস্তি তাঁকে আরও সতর্ক রাখছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চলেন। শরীরের উপর কতটা চাপ পড়ছে, তার হিসাব রাখেন। টানা খেলে চলায় বুমরাহ সম্ভবত সাবধানি। এমন কিছু করতে চাইছেন না, যা তাঁর ক্রিকেটজীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।

জসপ্রীত বুমরাহ।

জসপ্রীত বুমরাহ। ছবি: পিটিআই।

টানা ক্রিকেট, চোট, ক্লান্তির মতো বিষয়গুলি উঠে আসছে বুমরাহের ব্যর্থতার কারণ হিসাবে। নানা প্রশ্ন উঠছে। অতিরিক্ত ক্রিকেট নিয়ে কথা হচ্ছে। কিন্তু আইপিএল যে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) সোনার ডিম দেওয়া হাঁস। বোর্ডের আয়ের একটা বড় অংশ আসে এই টি-টোয়েন্টি লিগ থেকে। দু’মাসের প্রতিযোগিতায় প্রথম সারির ক্রিকেটারদের প্রায় ১৪টি ম্যাচ খেলতে হয়। তাঁদের ছাড়া লিগ আয়োজন করলে আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা। স্পনসরেরা অখুশি হতে পারে। তাই বিশ্বকাপের পর পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পেলেও নেমে পড়তে হয় বুমরাহদের। খেলার মতো অবস্থায় থাকলেই হল। কোথাও হয়তো ক্রিকেটের মানের সঙ্গেই আপস করে ফেলা হচ্ছে। মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের সাফল্যের জন্যও বুমরাহের উইকেট নেওয়া প্রয়োজন।

Advertisement
আরও পড়ুন