ICC T20 World Cup 2026

আফগান ক্রিকেটকে সাবালক করে ছুটি ট্রটের! চার বছরে গড়েছেন পরিবার, বিদায়বেলায় চোখে জল কোচের

জোনাথন ট্রট দায়িত্ব নেওয়ার সময় দল হিসাবে আফগানেরা খুব গুরুত্ব পেত না। দু’এক জনের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের উপর নির্ভরশীল ছিল সাফল্য। এই ভাবনাটাই বদলে দিয়েছেন ট্রট। গড়ে তুলেছেন পরিবার।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:২৩
picture of cricket

বিদায়বেলায় জোনাথন ট্রট। ছবি: রয়টার্স।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পর্যন্ত জোনাথন ট্রটকে কোচ নিযুক্ত করেছিল আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (এসিবি)। সেই হিসাবে বৃহস্পতিবার কানাডার বিরুদ্ধে শেষ বার আফগান ডাগ আউটে বসেছিলেন ইংল্যান্ডের প্রাক্তন ক্রিকেটার। রশিদ খানেরা কানাডাকে ৮২ রানে হারালেও বিশ্বকাপের সুপার এইটে উঠতে পারেননি। ম্যাচের পর আফগানিস্তানের কোচ হিসাবে শেষ বার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি ট্রট। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন রশিদেরাও।

Advertisement

২০২২ সালে আফগানিস্তানের জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ট্রট। তাঁর কোচিংয়েই সাদা বলের ক্রিকেটে আফগানিস্তান নতুন শক্তি হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রথম বার সুপার এইটে ওঠেন রশিদেরা। এ বারও আফগানদের নিয়ে ভাল কিছুর প্রত্যাশা ছিল ক্রিকেটপ্রেমীদের। দলকে প্রত্যাশিত সাফল্য দিতে পারেননি ট্রট। খেলায় সাফল্যের মতো ব্যর্থতাও থাকে। পেশাদার ট্রটকে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে দলের হার যতটা না নাড়া দিয়েছে, তার চেয়েও বোধহয় বেশি নাড়া দিয়েছে রশিদদের সঙ্গে বিচ্ছেদ। কথা বলতে গিয়ে থমকে গিয়েছেন। বিচ্ছেদের কষ্ট গলার কাছে দলা পাকিয়েছে। চোখের কোণ চিক‌চিক করেছে। মুখে ফুটে উঠেছে বন্ধু-বিচ্ছেদের যন্ত্রণা। দেখে বোঝা যাচ্ছিল, প্রিয় ক্রিকেটারদের বিদায় জানাতে মন চাইছিল না তাঁর।

গত চার বছরে আফগান ক্রিকেটারদের বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন ট্রট। বিদায়বেলায় তিনি বলেছেন, ‘‘আফগানিস্তানের প্রত্যেক ক্রিকেটারের অভাব অনুভব করব। প্রচণ্ড ভাবে করব। ওদের সঙ্গে আমার দারুণ সম্পর্ক। এমন একটা দলের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়ে আমি গর্বিত। ওদের সঙ্গে এক সাজঘরে থাকার অভিজ্ঞতা অসাধারণ। মহম্মদ নবি, রশিদ খানের মতো সিনিয়র ক্রিকেটারদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা দারুণ।’’ ট্রট আরও বলেছেন, ‘‘সত্যি বলতে, এই সাজঘরটার অভাব খুব অনুভব করব। আফগানিস্তানের প্রতিটি সমর্থকের ভালবাসা, উন্মাদনার অভাব অনুভব করব। এই সমর্থকেরা এবং দুর্দান্ত স্মৃতিগুলো সারাজীবন আমার হৃদয়ে থাকবে।’’

আবেগপ্রবণ রশিদ খানকে সামলাচ্ছেন জোনাথন ট্রট।

আবেগপ্রবণ রশিদ খানকে সামলাচ্ছেন জোনাথন ট্রট। ছবি: রয়টার্স।

শুধু ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের কথা বললেই হবে না। ২০২৩ সালের এক দিনের বিশ্বকাপেও ক্রিকেট দুনিয়াকে চমকে দিয়েছিল আফগানিস্তান। ইংল্যান্ডের হয়ে ৫২টি টেস্ট এবং ৬৮টি এক দিনের ম্যাচ খেলেছেন ট্রট। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর সাড়ে ছ’হাজারের বেশি রান রয়েছে। ক্রিকেটার হিসাবে সে ভাবে তারকার মর্যাদা পাননি। জো রুট, অ্যালিস্টার কুকদের মতো আকর্ষণীয় ক্রিকেটজীবনও নেই ট্রটের। তবে কোচ হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন অন্য উচ্চতায়। আফগানিস্তানকে শুধু একটা-দুটো ম্যাচে চমকে দেওয়ার মতো দল তৈরি করে থামেননি। এমন ভাবে তৈরি করেছেন, যাতে ধারাবাহিক সাফল্য পায়। বিশ্বের আর পাঁচটা দল সমীহ করতে বাধ্য হয়। যাতে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিলে ক্রিকেটপ্রেমীরা হতাশ হন। কোচ ট্রটের কৃতিত্ব এখানেই। যখন দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন দল হিসাবে আফগানেরা খুব বেশি গুরুত্ব পেত না। দু’-এক জনের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের উপর নির্ভরশীল ছিল তাঁদের সাফল্য। এই ভাবনাটাই বদলে দিয়েছেন ইংল্যান্ডের প্রাক্তন ব্যাটার। বিন্দু বিন্দু করে সিন্ধু গড়তে শিখিয়েছেন। প্রত্যেকের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন। শিখিয়েছেন দলগত প্রচেষ্টা কী ভাবে একটা দলের শক্তি বদলে দিতে পারে।

সিনিয়র বা জাতীয় দলের কোচিংয়ের মূল শর্ত ‘ম্যান ম্যানেজমেন্ট’। হাতে ধরে শেখানোর তেমন কিছু থাকে না। দরকার শুধু কিছু ভুল শুধরে দেওয়া, প্রয়োজনে টেকনিকের কিছু পরিবর্তন, রণকৌশল তৈরি করা, প্রতিপক্ষের শক্তি-দুর্বলতা বুঝে প্রথম একাদশ নির্বাচন। এগুলোই কোচদের কাজ। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ১৪ বা ১৫ জন মানুষকে (কখনও কখনও সংখ্যাটা ২৪-২৫ জন) একটা ভাবনায় বেঁধে রাখা। যারা ভিন্ন চরিত্রের, ভিন্ন মানসিকতার এবং ভিন্ন দক্ষতার। এই সব কিছুর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হয়। ট্রট ঠিক এই জায়গাতেই সফল। তালিবান শাসনে ফেরা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের জাতীয় দলকে পরিবারে পরিণত করেছেন।

আফগান ক্রিকেটের উত্থানে ট্রটের অবদান অস্বীকার করা যাবে না কখনও। নিজে তারকা হতে চাননি। পর্দার আড়ালে থেকে নিঃশব্দে কাজ করেছেন। অথচ নিয়ন্ত্রণ আলগা হতে দেননি। ক্রিকেটারদের স্বার্থে কর্তাদের সঙ্গে বিবাদেও জড়িয়েছেন। আফগান ক্রিকেটকে আলাদা পরিচয় দিয়েছেন। বলা যায়, সাবালক করে দিয়েছেন। রশিদেরা জানেন এই অবদানের কথা। আফগান অধিনায়ক বলেছেন, ‘‘ট্রট আসার পর গত কয়েক বছরে আমরা দুর্দান্ত কিছু সময় কাটিয়েছি। আফগান ক্রিকেটের জন্য উনি অনেক করেছেন। ওঁর জন্যই আমরা আজ এই জায়গায় পৌঁছেছি। আমাদের দলটাকে এক সুতোয় বেঁধে রাখার ক্ষেত্রেও ওঁর অবদান কম নয়। ওঁর চলে যাওয়াটা আমাদের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন। কষ্টের। কিন্তু এটাই জীবন। কোনও কিছুই চিরস্থায়ী নয়। ট্রটের জন্য সব সময় আমাদের শুভেচ্ছা থাকবে। আশা করব, ভবিষ্যতেও যোগাযোগ থাকবে। উনি আমাদের কাছাকাছিই থাকবেন।’’

৯৫ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলা ইব্রাহিম জ়াদরান ম্যান অফ দ্য ম্যাচের পুরস্কার নেওয়ার পর কোচের কথাই বলেছেন প্রথমে। তাঁকেও আবেগপ্রবণ দেখিয়েছে। কোচকে পুরস্কার উৎসর্গ করে আফগান ওপেনার বলেছেন, ‘‘এই পুরস্কারটা আমাদের কোচকে উৎসর্গ করছি। জোনাথন ট্রট, আপনার কাছে অনেক কিছু শিখেছি। শুধু আমাকে নয়, উনি আমাদের সকলকে উৎসাহিত করেছেন। সব সময় পাশে থেকেছেন। ওঁর প্রশিক্ষণে আমরা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এবং আইসিসি প্রতিযোগিতাগুলোয় অনেক কিছু অর্জন করেছি। ট্রটের সঙ্গে এটাই আমাদের শেষ দিন। আমরা সকলে ওঁর অভাব অনুভব করব। ওঁর জন্য সব সময় শুভকামনা থাকবে।’’ কথা শেষ করে পুরস্কার নিয়ে কোচের সঙ্গে ছবি তোলেন জ়াদরান।

কানাডাকে হারানোর পর সাজঘরে রশিদেরা উচ্ছ্বাসে মেতেছেন। নাচ-গান করেছেন। সেখানেও মধ্যমণি ছিলেন ট্রট। প্রিয় কোচকে ঘিরে রেখেছিলেন মুজিব উর রহমান, দারউইশ রাসুলি, রহমানুল্লাহ গুরবাজ়েরা। সাজঘরের সেই ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে সমাজমাধ্যমে।

Advertisement
আরও পড়ুন