ICC T20 World Cup 2026

দলে ট্যাক্সিচালক থেকে শিক্ষক! ইডেনে সোমে টি২০ বিশ্বকাপে অভিষেক, ফুটবলের দেশ ইটালির ক্রিকেট ইতিহাস ২৩৩ বছরের

দলে যেমন ইটালিতে জন্ম নেওয়া ক্রিকেটার রয়েছেন, তেমনই রয়েছেন ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত ক্রিকেটার। প্রত্যেকের পেশাও ক্রিকেট নয়।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৩
cricket

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ইটালির ক্রিকেট দল। ছবি: সংগৃহীত।

সোমবার সকালে ইডেনের পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে কেউ ভাবতে পারেন, ভারতে কি ফুটবল বিশ্বকাপ চলছে? আর সেখানেই নামছে চার বারের বিশ্বজয়ী ইটালি? না, ফুটবল নয়, ক্রিকেটের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে নামছে ইটালি। প্রথম বার ক্রিকেটের কোনও বড় প্রতিযোগিতায় দেখা যাবে আজুরিদের।

Advertisement

যদি ভাবেন, ইটালিতে ক্রিকেটের চল কয়েক বছর হল শুরু হয়েছে, তা হলে ভুল ভাববেন। সে দেশে ক্রিকেটের পা পড়েছিল ফুটবলেরও আগে। ব্রিটিশ নাবিক, আমলা, ব্যবসায়ীদের হাত ধরে ইউরোপের দেশে ক্রিকেট পৌঁছেছিল। কিন্তু এই খেলা জনপ্রিয়তা পায়নি। ফুটবলের কাছে পিছিয়ে পড়েছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী তা সীমাবদ্ধ ছিল দেশের কিছু এলাকায়। কিন্তু কোনও দিন হারিয়ে যায়নি। ক্রিকেটের যে সলতে সেখানে পাকানো হয়েছিল, তাতেই আগুন ধরেছে।

৯ ফেব্রুয়ারি ইডেনে স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলতে নামবে ইটালি। ঘটনাচক্রে তাদের প্রথম খেলা ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। কিন্তু বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিয়ে দেওয়ায় স্কটল্যান্ড সুযোগ পেয়ে গিয়েছে। এই দুই দল ছাড়া গ্রুপ সি-তে রয়েছে ইংল্যান্ড, নেপাল ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ়।

ইটালির এই দলে নানা সংস্কৃতির মেলবন্ধন। বিভিন্ন দেশের ক্রিকেটার রয়েছেন সেখানে। যেমন ইটালিতে জন্ম নেওয়া ক্রিকেটার রয়েছেন, তেমনই রয়েছেন ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত ক্রিকেটার। প্রত্যেকের পেশা যে ক্রিকেট তেমনটাও নয়। কেউ কেউ সারা বছর ক্রিকেট খেললেও অনেকে অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত। তালিকায় শিক্ষক থেকে ফিজ়িয়োথেরাপিস্ট, হোটেলকর্মীরাও রয়েছেন।

দলের অধিনায়ক ৪২ বছর বয়সি ওয়েন ম্যাডসন। ১৫ জনের দলে সবচেয়ে বড় তারকা জেজে স্মাটস। এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন তিনি। রয়েছেন দু’জোড়া ভাই হ্যারি ও বেঞ্জামিন মানেনটি এবং অ্যান্থনি ও জাস্টিন মস্কা। প্রথম বার বিশ্বকাপ খেলতে নামলেও তাঁরা যে শুধু নাম কা ওয়াস্তে খেলতে আসেননি তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন ম্যাডসন। বলেন, “আমরা ম্যাচ জিততে চাই। ভাল ক্রিকেট খেলতে চাই। দলের ছেলেরা বেশ কিছু দিন ধরে একসঙ্গে খেলছে। বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। আমরা আত্মবিশ্বাসী।”

cricket

ইটালিতে ক্রিকেটের ইতিহাস

১৭৯৩ সালে নাপোলিতে পা রাখেন ব্রিটিশ সৈনিক অ্যাডমিরাল হোরাশিয়ো নেলসন। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সেনা সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন তিনি। সফলও হয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে নাপোলি থেকে ৬ হাজারের বেশি সৈন্য ইটালি পাড়ি দেন। নাপোলিতে থাকাকালীন ফাঁকা সময়ে বাকিদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতেন নেলসন। সেই প্রথম ক্রিকেটের শুরু সে দেশে।

এক শতাব্দী পরে ১৮৯৩ সালে ইটালিতে ইংল্যান্ডের দূতাবাসের কর্মীরা জেনোয়া ক্রিকেট ও অ্যাথলেটিক ক্লাব শুরু করেন। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই ক্রিকেটকে টেক্কা দিয়ে দেয় ফুটবল। জেনোয়াতে ফুটবল ক্লাব চালু করেন জেমস রিচার্ডসন। সেই ক্লাব ১৮৯৮ সালে ইটালির প্রথম ফুটবল প্রতিযোগিতা জেতে। ১৮৯৯ সালে ইটালির প্রথম ফুটবলার হিসাবে বিদেশে খেলতে যান হারবার্ট কিলপিন। সেখানে কয়েক জন ব্যবসায়ী তাঁকে ইটালিতে ক্লাব তৈরির প্রস্তাব দেন। হারবার্ট তৈরি করেন মিলান ক্রিকেট ও ফুটবল ক্লাব। পরবর্তী কালে এই ক্লাবেরই নাম হয় এসি মিলান। ১৯১৯ সাল পর্যন্ত সেখানে ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেট খেলাও হত। কিন্তু ১৯১৯ সালে তা বন্ধ হয়ে যায়।

football

২০০৬ সালে ফুটবল বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন ইটালি দল। —ফাইল চিত্র।

১৯৬০-এর দশকে আবার ক্রিকেট শুরু হয় ইটালিতে। রোমে কয়েকটি প্রতিযোগিতাও হয়। ইটালি ক্রিকেট সংস্থার সিইও লুকা ব্রুনো মালাসপিনা জানিয়েছেন, ফুটবলের পর দ্বিতীয় কোনও খেলা সেখানে জনপ্রিয় হতে শুরু করেছিল। তাঁরা স্কুলের ছেলেদের মধ্যে ক্রিকেটের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। লুকা বলেন, “একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে সবটা শুরু হয়েছিল। স্কুলগুলোর দিকে নজর দেওয়া হয়েছিল। তার পর পাড়ায় পাড়ায় ক্রিকেটের প্রসারের চেষ্টা হয়। অপরিচিত একটি খেলা থেকে ধীরে ধীরে ক্রিকেট জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।”

ইটালির ক্রিকেটে ঐতিহাসিক মুহূর্ত

লক্ষ করলে দেখা যাবে, এমন এক বছরে ইটালি ক্রিকেট বিশ্বকাপ খেলতে চলেছে, যে বছরে তারা ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেনি। ১৯৫৮ সালের পর থেকে ২০১৮ ও ২০২২ সালে পর পর দু’বার ফুটবল বিশ্বকাপে ছিল না ইটালি। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপেও খেলার সম্ভাবনা ঝুলে রয়েছে।

২০০৬ সালে ভারত থেকে ইটালি গিয়েছিলেন জসপ্রীত সিংহ। পঞ্জাবের ফাগওয়ারার বাসিন্দা ইটালির এই উত্থানের সাক্ষী। নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বের ম্যাচে শেষ বল করেছিলেন তিনিই। সেই ম্যাচে ইটালি ৯ উইকেটে হারলেও প্রথম বার বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল।

প্রথমে টেপ বলে খেলা শুরু করলেও পরবর্তী কালে বেরগামো ক্রিকেট ক্লাবে খেলা শুরু করেন জসপ্রীত। মিলানের ৬০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে টেলগেট নামের এক জায়গায় থাকেন তিনি। সেখানেই এই ক্লাব রয়েছে। ২০১৬-১৭ সালে ইটালি ক্রিকেট সংস্থা আয়োজিত বিভিন্ন ম্যাচে ভাল খেলে নজর কাড়েন জসপ্রীত। ২০১৯ সালে ইটালির জাতীয় দলে অভিষেক তাঁর।

এখন অবশ্য বছরের বেশির ভাগ সময় ইংল্যান্ডের বার্মিংহ্যামে থাকেন জসপ্রীত। সেখানেই অনুশীলন করেন তিনি। ইংল্যান্ডে নিজের খরচ চালাতে ট্যাক্সি চালান জসপ্রীত। ৯ ফেব্রুয়ারি স্বপ্নপূরণ হবে তাঁর। জসপ্রীত বলেন, “নভেম্বর মাসে দুবাইয়ে খুব ভাল শিবির হয়েছে। সেখান থেকে শ্রীলঙ্কাতেও কয়েক জন খেলতে গিয়েছিল। পরে জানুয়ারিতে আবার দুবাইয়ে গিয়ে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলেছি। ওদের হারিয়েছি। কোনও টেস্ট খেলিয়ে দেশের বিরুদ্ধে সেটাই আমাদের প্রথম জয়। পরে নামিবিয়াকেও হারিয়েছি।”

বিশ্বকাপে দল খেলতে নামলেও ইটালি ক্রিকেট সংস্থার মূল লক্ষ্য সে দেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা আরও বাড়ানো। ইটালির লোকেরা খেলা ভালবাসেন। ফুটবলপ্রেমী জনতার মনে ক্রিকেটকে পাকাপাকি ভাবে ঢুকিয়ে দিতে চাইছেন লুকারা। ইটালি ক্রিকেট সংস্থার সভাপতি লোরিয়া হাজ় পাজ় জানিয়েছেন, বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করা ইটালির ক্রিকেটের ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তিনি বলেন, “বছরের পর বছর ধরে ত্যাগ ও পরিশ্রমের ফল পাচ্ছি। ১১ জুলাই দিনটা ভোলার নয়। সে দিনই আমরা বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করেছিলাম। এটা গোটা দেশের ক্রিকেটপ্রেমী জনতার জয়। অনেক বছরের অপেক্ষার অবসান হয়েছে। এ বার চাই, দেশ জুড়ে ক্রিকেট জনপ্রিয়তা পাক।”

উত্থানের নেপথ্য নায়ক

ইটালির ক্রিকেট দলে যেমন বিভিন্ন দেশের ক্রিকেটারেরা রয়েছেন, তেমনই কোচিং দলেও রয়েছে বৈচিত্র। তাদের প্রধান কোচ জন ডেভিসন কানাডার হয়ে ২০০৩ সালের এক দিনের বিশ্বকাপ খেলেছিলেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে ৬৭ বলে শতরান করেছিলেন। দলের ব্যাটিং কোচ কেভিন ও’ব্রায়ান আয়ারল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপ খেলেছেন। ২০১১ সালের এক দিনের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। ৫০ বলে শতরান করেছিলেন।

দলের মিডিয়া ম্যানেজার রাকবির হাসান বাংলাদেশের ঢাকার বাসিন্দা। তাঁর নিজের দেশ বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না থাকলেও রাকবির থাকবেন। তিনি জানিয়েছেন, কী ভাবে ডেভিসন, ও’ব্রায়ানেরা ইটালিকে বিশ্বকাপের জন্য তৈরি করেছেন। রাকবির বলেন, “ওদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ওরা বিশ্বকাপে খেলার দরুণ জানে, কতটা পেশাদারিত্ব প্রয়োজন। পাশাপাশি খেলার খুঁটিনাটিও ওদের জানা। চাপ সামলে কী ভাবে সফল হতে হবে সেই শিক্ষা ওরা দিয়েছে। তাতে সকলের সুবিধা হয়েছে। ইটালি প্রথম বার নামলেও কেউ যদি আমাদের হালকা ভাবে নেয়, তারা ভুল করবে।”

২৩৩ বছর ধরে ইটালিতে ক্রিকেট বেঁচে থাকলেও এত দিন আইসিইউতে ছিল। এই প্রথম বার বিশ্বক্রিকেটের মানচিত্রে তারা। লুকা, ডেভিসন, ম্যাডসন, জসপ্রীতদের একটাই লক্ষ্য। এমন একটা সময় আসবে, যখন ইটালি বিশ্বকাপ খেলছে বললে ফুটবল নয়, ক্রিকেটের কথাই ভাববেন সকলে।

Advertisement
আরও পড়ুন